শনিবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

রক্তে সিক্ত আমাদের বাংলাভাষা

সিনথিয়া পারভীন কাকলী: ভাষা মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের ভাব প্রকাশের সবচেয়ে অভিনব এবং শক্তিশালী মাধ্যম। ভাষা মানুষকে অন্যান্য প্রাণী হতে পৃথক করে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে। ব্যক্তি মানুষের অস্তিত্ব জড়িয়ে থাকে ভাষার সাথে। মানুষের আবেগ অনুভূতি অর্থাৎ ভেতরকার সামগ্রিক অবস্থা প্রকাশিত হয় ভাষার মাধ্যমে। প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ভাষা রয়েছে। যাকে বলা হয় মাতৃভাষা। বাঙালী জাতিও এর ব্যতিক্রম নয়। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। এটি আদরের দুলালী নয়, সোনার চামচ মুখে নিয়েও ভাষাটির জন্ম হয়নি। তাই আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভাষা বাংলাকে আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করতে হয়েছে। এই ভাষাকে রক্ষা করতে, যথাযথ মর্যাদা দিতে সোনার ছেলেদের ঢালতে হয়েছে বুকের তাজা রক্ত। যা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন। 

বিশ্বের প্রায় সকল ভাষার জন্ম অল্প কিছু ভাষাগোষ্ঠী থেকে। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী মূল ভাষাগোষ্ঠীগুলোর অন্যতম। এই মূল ভাষা হতে ক্রমাগত পরিবর্তিত হতে হতে যে রূপগুলো লাভ করেছে বাংলাভাষা তাদের’ই একটি। অসমিয়া ব্যতীত ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা বংশের পূর্বদিকের সবচেয়ে প্রান্তিক ভাষা বাংলা। খৃষ্টপূর্ব প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে মধ্য এশিয়ায় একদল লোক বসবাস করত। তারা প্রথমে যে ভাষা ব্যবহার করেছিল তা ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষা। পরবর্তীকালে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। ঐ সময়ে পাকিস্তানের উত্তর পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর একদল লোক ভারত বর্ষে প্রবেশ করে। তাদের ভাষাকে বলে আর্য ভাষা। এরা ধীরে ধীরে ভারত বর্ষের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। আর্য ভাষা কালক্রমে অনার্যগোষ্ঠীর ভাষার সাথে মিলেমিশে সৃষ্টি করে সংস্কৃত ভাষা। সংস্কৃত ছিল উচ্চ শ্রেণির মানুষের  লেখ্যভাষা। এটি ছিল সাধারণ মানুষের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এজন্য প্রয়োজন পড়ে সর্বসাধারণের নিকট গ্রহণযোগ্য সহজ ভাষার। বৈদিক ভাষা ক্রমাগত সরলীকৃত হতে হতে প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা থেকে সৃষ্টি হয় প্রাকৃত ভাষা। অঞ্চলভেদে প্রাকৃত ভাষার বিভিন্ন রূপভেদ লক্ষ্য করা যায়। এদের মধ্যে পৈশাচী প্রাকৃত, শৌরসেনী প্রাকৃত, মাগধী প্রাকৃত, মহারাষ্ট্রীয় প্রাকৃত উল্লেখযোগ্য। মাগধী প্রাকৃতের অপভ্রংশ থেকে জন্ম নিয়েছে আমাদের প্রাণপ্রিয় ভাষা বাংলা। নব্য ভারতীয় আর্য ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত এই ভাষা ঐতিহাসিক সূত্রে আইরিশ, ইংরেজি, ফরাসি, গ্রিস, রুশ ইত্যাদি ভাষার দূরবর্তী জ্ঞাতিভগ্নি। বাংলাভাষার অভিযোজন ক্ষমতা (Adaptation Power) অন্য যে কোন ভাষার চেয়ে অধিক। এই ভাষা অন্য ভাষার শব্দকে সহজে আপন করে নিতে পারে। নিজের শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ করণে তাই বাংলা ভাষার জুড়ি নেই। বাঙালীর ভেতরকার অনুভূতিগুলো সে সহজেই তার যাদুর কাঠির স্পর্শে বের করে আনতে পারে।

বাংলা ভাষাকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে আসে ‘বাংলা ব্যাকরণ’। বাংলা ব্যাকরণ শুধু সমৃদ্ধই নয় বৈজ্ঞানিকও বটে। বাংলা ব্যাকরণের বর্ণের বিন্যাস পদ্ধতি এতটাই বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক যে অবাক না হয়ে পারা যায় না। এতে রয়েছে উচ্চারণ স্থান অনুযায়ী বর্ণের শ্রেণী বিন্যাস। একই শ্রেণীভুক্ত বর্ণসমূহকে পাশাপাশি স্থান দেয়া হয়েছে বাংলা বর্ণমালায়। অথচ বর্তমানে যাকে উৎকৃষ্ট ভাষা হিসেবে গণ্য করা হয় সেই ইংরেজি ভাষায়ও বর্ণের এমন শ্রেণী বিন্যাস নেই। ইংরেজি ভাষায় একই পর্যায়ভূক্ত বর্ণ বা ধ্বনি সমূহকে খুঁজতে সারা বর্ণমালা ঘেটে একটা একটা করে বের করতে হয়। ইংরেজি ভাষার সকল ‘শ’ কে  দ্বারা প্রকাশ করা হয়। অথচ আমাদের বাংলা ভাষার ‘শ’ কে প্রকাশ করতে দেশি, বিদেশি ও তৎসম শব্দের জন্য রয়েছে আলাদা বর্ণ যেমন ‘শ, ষ, স’। বাংলা যে অন্যান্য ভাষা থেকে উৎকৃষ্ট তা প্রমাণ করতে হাজারো দৃষ্টান্ত রয়েছে। অথচ আজ আমাদের তরুণ প্রজন্ম বাংলা ভাষায় কথা বলতে ও এ ভাষায় সাহিত্য চর্চা করতে হীনমন্যতায় ভোগে ছুটছে ইংরেজি ভাষার দিকে। এতে তারা না পারছে ইংরেজি ভাষার দখল নিতে, না পারছে মাতৃভাষাকে আঁকড়ে থাকতে। তাদের জ্ঞাতার্থে বলি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাস ছিল ইংরেজি ভাষায় লেখা। মাইকেল মধুসূদন দত্ত নিজ ধর্ম, দেশ ত্যাগ করে পাড়ি জমান ইংরেজ মুলুক। খ্যাতি, যশ লাভের আশায় সাহিত্য রচনা করেন ইংরেজি ভাষায়। মজার বিষয় হচ্ছে উভয় সাহিত্যিক’ই পরবর্তীতে খ্যাতি লাভ করেন বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা করে। দেরিতে হলেও তাদের ভুল ভাঙে। বুঝতে পারেন মাসী কখনো মা হয় না। বাংলা মায়ের বুকে ফিরে এলে বাংলা ভাষাও তার সকল অভিমান ভুলে সন্তানকে কাছে টেনে নেয়। তাঁরাও হয়ে ওঠেন সাহিত্যাকাশের একেকটি উজ্জল নক্ষত্র। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে “গীতাঞ্জলি” কাব্যের জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এটি ডব্লিউ বি ইয়েটস কর্তৃক “Song offerings” নামে অনূদিত হয়েছিল। হলফ করে বলতে পারি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, কাজী নজরুল ইসলাম, মানিক বন্দোপাধ্যায়, বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মীর মশাররফ হোসেন প্রমুখ সাহিত্যিকের সাহিত্যকর্ম অনূবাদ করে বিশ্বের দরবারে উপস্থাপন করতে পারলে পৃথিবী বিখ্যাত সাহিত্যিকদের পেছনে ফেলে  সেগুলিও পারতো বংলা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের পাল্লাটা ভারী করতে। বর্তমান সময়ে কিছু কবি সাহিত্যিকের আবির্ভাব হয়েছে যারা মানছে না বাংলা ব্যাকরণের নিয়ম-নীতি। ধার ধারছেনা সঠিক বানানের। কল্পনা, ইচ্ছা শক্তি, আবেগ, অনুভূতি ব্যক্তির নিজস্ব সম্পদ। ভাষা সকলের সম্পদ। এর ওপর সকলের সমান অধিকার। তাই সকলের সম্পদ নিয়ে খেলা করার অধিকার কারোর নেই। সাম্প্রতিককালে রেডিও টেলিভিশন অনুষ্ঠান সঞ্চালনে  যেসব উপস্থাপক-উপস্থাপিকারা নিয়োজিত আছেন তাদের বেশীর ভাগেরই বোঝা যায় না কোন ভাষায় কথা বলছেন। না বাংলা, না ইংরেজি। ইংরেজি-বাংলা মিশ্রিত উচ্চারণে ইংরেজি ভঙ্গি। অদ্ভুত! এই রীতি সংক্রামকের মতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। এমনকি শিশুরাও এ থেকে বাদ পড়ছে না। এখনকার দিনে বাংলা ভাষার সাথে ইংরেজি ভাষা মিশ্রিত করে না বললে ‘স্টাইল’ হয় না। এক ভাষার সাথে আরেক ভাষার শব্দ মিশ্রণ! এ কোন স্টাইল? “রক্ত দূষিত হলে যেমন মানুষ বাঁচে না। তেমনি ভাষায় ভেজাল ঢুকলে ভাষাও বাঁচে না।” 

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারী এলেই শোনা যায় (ভাষা দরদিদের মুখে) সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করতে হবে, বাংলা উৎকৃষ্ট ভাষা ইত্যাদি ইত্যাদি। সর্বত্র প্রচলন শুধু মুখে বললেই হবে না। এর জন্য নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করা হয় ইংরেজিতে। তাই রুটি রুজির জন্য অনেকেই বাধ্য হয়ে ইংরেজি ভাষার প্রতি ঝুঁকছে। 

বিদেশি ভাষা শেখা দোষের নয়। তবে মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করে না। শিশু পরিবার থেকে শেখে। পরিবার মানুষের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বাংলাভাষাকে পদদলিত করার পেছনে আমাদের পরিবারগুলো অনেকাংশে দায়ী। সারক্ষণ যদি কোন শিশুর সামনে বাংলা ভাষার ত্রুটির ডালি নিয়ে বসা হয় তাহলে ঐ শিশুটি কোন দিনও এই ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে? আমাদের সমাজের উচ্চ বিত্তেরা/ তথাকথিত শিক্ষিতরা তাদের সন্তানকে বাংলা মাধ্যমে পড়াতে লজ্জা পান। এতে নাকি তাদের জাত যায়! তাই তারা প্রতিনিয়ত ছুটছেন ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ের দিকে। বিদেশিরা রপ্তানিযোগ্য পণ্যদ্রব্যে ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি তাদের মাতৃভাষায় উক্ত দ্রব্য সম্পর্কিত তথ্যাদি লিখে থাকে। আমরা কেন পারি না? ভাষা প্রচারের কথা বাদ’ই দিলাম। আমাদের প্রবাসী জনগোষ্ঠীর জন্যই না হয় এ কাজটি করি। সন্তান জন্মের পরে তার নামকরণেও চলছে বিদেশী নামের হিড়িক। রাখা হচ্ছে জ্যাকসন, টমাস, জর্জ প্রভৃতি নাম। এমনকি ব্যাট-বল-রিংগিত ও হচ্ছে মানুষের নাম। অথচ বাংলা ভাষায় শ্রুতিমধুর নামের কোন ঘাটতি নেই। দেশি জিনিসে বিদেশি মোড়ক দিলে সেটা বিদেশি হবে না। আর বাঙালী হতেই বা লজ্জা কোথায়? আমাদেরকে বাঙালী হতে পেরে গর্বিত হওয়া উচিৎ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ