শনিবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

অনুবাদক কাজী নজরুল ইসলাম

শওকত আলী: জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। যার হাত ধরে বাংলাসাহিত্য গিয়ে পৌঁছেছে এক অনন্য স্থানে। বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় রয়েছে তাঁর বিচরণ। তিনি নিজ সৃষ্টিতে যেমন স্বতন্ত্র তেমনি তাঁর অনুবাদ সাহিত্যগুলোও অনন্য। নজরুল ইসলাম তাঁর সাহিত্য জীবনে তিনটি কাব্যগ্রন্থ অনুবাদ করেন সেসব অনুবাদেই মূল ভাষা থেকে অনুদিত। ফার্সি ও আরবি ভাষা থেকে অনুবাদকৃত গ্রন্থগুলো হলো রুবাইয়াৎ-ই হাফিজ, (১৯৩০)রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম, ও কাব্য আমপারা(১৯৩৩)। যা বাংলা ভাষা ও বিশ্ব সাহিত্যকে দিয়েছে বহমান এক গতি। তাঁর অনুবাদ কর্মগুলি ছিল মৌলিক ও সাহিত্যিক মানে অনন্য।নজরুলের করা অনুবাদগুলির মধ্যে ‘রুবাইয়াৎ-ই- ওমর খৈয়্যাম’ সাহিত্য বোদ্ধা, সাহিত্য সমালোচক ও সাহিত্যরস সন্ধানীদের নিকট প্রশংসিত ও সর্বোচ্চ গ্রহণীয়। বাংলায় আর যারা রুবাইয়াৎ-এর অনুবাদ করেছেন তাদের চেয়ে কাজী নজরুল ইসলাম মূল কবির (ওমর খৈয়াম) দেশ ও কালের স্বাদ সঞ্চার করতে পেরেছিলেন বলে অধিক প্রশংসিত হয়েছে।

রুবাইয়াৎ বা রুবাঈ এর সংজ্ঞায় এ টি এম মোস্তফা কামাল লিখেছেন:”রুবাই” আরবী শব্দ। অর্থ-চতুষ্পদী অর্থাৎ চার পংক্তি বিশিষ্ট কবিতা। এটা বিশেষ ধরনের কবিতা। কিছু কিছু কবিতা আছে বিশেষ কিছু নিয়ম কানুন মেনে সেগুলো লেখা হয়, যেমন- সনেট, লিমেরিক,রুবাই ইত্যাদি। রুবাইয়ের বহুবচন রুবাইয়াত।১০৪৮ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যের (বর্তমান ইরান) কবি উমর খৈয়াম, হাফিজ প্রমুখের হাতে কবিতার এই বিশেষ ফর্মটি চরম উৎকর্ষ লাভ করে। এটি ছড়া নয়। ছড়া হচ্ছে মূলত: শিশুতোষ রচনা। রুবাই উচ্চমার্গের দার্শনিক রচনা।

নজরুলের ফার্সি শেখা এবং ফার্সি প্রীতি দেখলে বোধগম্য হবে যে। শৈশবে বেনেপাড়ার বিনোদ চাটুজ্জের পাঠশালায়, কিছুদিন পড়ে নজরুল গ্রামের মক্তবে লেখাপড়া শুরু করেন। এখানে তিনি কোরআন পাঠ আয়ত্ত করেন। মক্তবে তিনি আরবি ও ফার্সি ভাষার প্রথম পাঠ লাভ করেছিলেন মৌলবি কাজী ফজলে আলীর কাছে। পরে বিশেষ করে ফার্সি শেখেন তাঁর চাচা কাজী বজলে করিমের কাছে।এবং নজরুল নিজে রুবাইয়াৎ-ই হাফিজের মুখবন্ধে উল্লেখ করেন যখন কবি বাঙালী পল্টনে সেখানে একজন পাজ্ঞাবী মৌলবি ছিল, তাঁর কাছে হাফিজের কতগুলি কবিতা আবৃত্তি শোনে নজরুল মুগ্ধ হয়। সেদিন থেকে কবি মৌলবির কাছে ক্রমে ফার্সি শিখেন এবং ফার্সি কবিদের প্রায় সমস্ত বিখ্যাত কাব্যই পড়ে নেন।

ওমর খৈয়ামের কাব্য সাধারণত ছয় ভাগে বিভক্ত। ১”শিকায়াত-ই রোজগার”, অর্থাৎ গ্রহের ফের বা অদৃষ্টের প্রতি অনুযোগ। ২ “হাজও” অর্থাৎ ভ-দের, বাকধার্মিকদের প্রতি শ্লেষ-বিদ্রুপ ও তথাকথিত আলেম বা বিজ্ঞানীদের দাম্ভিকতা ও মূর্খদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ। ৩ “ফিরাফিয়া” ও “ওসালিয়া” বা প্রিয়ার বিরহে ও মিলনে লিখিত কবিতা। ৪”বাহরিয়া”——বসন্ত, ফুল, বাগান, ফল,পাখি,ইত্যাদি প্রশংসায় লিখিত কবিতা। ৫ কুফরিয়া —-ধর্মশাস্ত্র-বিরুদ্ধ কবিতাসমূহ। এইগুলো ওমরের শ্রেষ্ঠ কবিতা রূপে কবি সমাজে আদৃত। স্বর্গ নরকের আলীক কল্পনা বাহ্যিক উপাসনার আসারতা পাপ পুণ্যের মিথ্যা ভয় ও লাভ ইত্যাদি নিয়ে লিখিত কবিতাগুলো এর অন্তর্গত। ৬ “মুনাজাত” বা খোদার প্রার্থনা। এ প্রার্থনা অবশ্য সাধারণের মত প্রার্থনা নয়, সুফির প্রার্থনার মতো এ হাস্য-জড়িত। নজরুল ওমরের “কুফরিয়া” শ্রেণির কবিতা গুলু মূল কবির লেখার স্বকীয়তা বজায় রেখে অরিজিনাল অর্থাৎ মূল ফার্সি থেকে অনুবাদ করেন। একথাটি রুবাইয়াৎ-ই ওমর খৈয়ামের ভূূমিকা, দেখলে’ই আমরা বুঝতে পারি।”আমি অর্থাৎ ‘নজরুল’ আমার ওস্তাদি দেখাবার জন্য ওমর খৈয়ামের ভাব-ভাষা বা ষ্টাইলকে বিকৃতি করিনি —অবশ্য আমার সাধ্যমতো এর জন্য আমার অজস্র পরিশ্রম করতে হয়েছে, বেগ পেতে হয়েছে”। কাজী নজরুল ইসলাম ওমরের রুবাইয়াৎ বলে প্রচলিত একহাজার রুবাইয়াৎ থেকেই কিঞ্চিদধিক দুশো রুবাই বেছে নেয়,এবং তা ফার্সি ভাষার রুবাইয়াৎ থেকে। কারণ, আমাদের বিবেচনায় এইগুলো ছাড়া বাকি রুবাই ওমরের প্রকাশভঙ্গি বা স্টাইলের সঙ্গে একেবারে মিশ খায় না।

আগেই উল্লেখ করেছি কাজী নজরুল ইসলাম যখন বাঙ্গালি পল্টনে তখন সেখানে পাজ্ঞাবী এক মৌলবির কাছে হাফিজের দীওয়ান শুনে মুগ্ধ হয় এবং ভালোভাবে ফার্সি রপ্ত করে। বাঙালি পল্টনে থাকাকালে কবির মনে হাফিজের দীওয়ান অনুবাদের ইচ্ছা হয়। দীওয়ান-ই হাফিজের মুখবন্ধে কবি নিজেই লিখেছেন “লিখবার যথেষ্ট সাহস সঞ্চয় করতে না পারায় লিখা হয়নি। কিন্তু এর কয়েক বছর পর হাফিজের দীওয়ানগুলো অনুবাদ করেন এবং তা বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত ও হয়। নজরুল তখন হাফিজের প্রায় পঁয়ত্রিশটি গজল অনুবাদ করেন।

কাজী নজরুল ইসলাম হাফিজের রুবাইয়াৎগুলো মূল ফার্সি থেকে অনুবাদ করে। কবির কাছে যতগুলো ফার্সি “দীওয়ান-ই হাফিজ” ছিল তাঁর সব কয়টাতেই পঁচাত্তরটি রুবাইয়াৎ পেয়েছিল।কিন্তু ফার্সিসাহিত্যের দু’জন ব্রাউন এবং মৌলানা শিবলী নৌমানী তাদের গ্রন্থে উনসত্তরটি রুবাইয়াৎ এর কথা উল্লেখ করেন। নজরুলও হাফিজের দুইটি রুবাইয়াৎ বাদ মূল গ্রন্থে অনুবাদ করেননি। মুখবন্ধে উল্লেখ করেন যদিও কবির আরও তিন চরটি বাদ দেওয়া নিজের জন্য উচিত মনে করেছেন। যে দুটি রুবাইয়াৎ গ্রন্থিত করা হয়নি তা হলো।

১। জমায় না ভিড় অসৎ এসে/যেন গো সৎলোকের দলে।/পশু এবং দানব যত/যায় যেন গো বনে চলে।/আপন উপার্জনের ঘটায়/হয় না যেন মুগ্ধ কেহ,/আপন জ্ঞানের গর্ব যেন/করে না কেউ কোনো ছলে।২। কালের মাতা দুনিয়া হতে,/পুত্র, হৃদয় ফিরিয়ে নে তোর!/যুক্ত করে দে রে উহার/স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ ওর।/হৃদয় রে, তুই হাফিজ সম/হস যদি ওর গন্ধ-লোভী,/তুইও হবি কথায় কথায়/দোষগ্রাহী, অমনি কঠোর!

যেদিন নজরুল রুবাইয়াৎ-ই হাফিজ অনুবাদ শেষ করেন সেদিন কবিপুত্র বুলবুল চার বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

কাজী নজরুল ইসলাম কাব্য আমপারার আরজে উল্লেখ করেন কবির জীবনের সবচেয়ে বড় সাধছিল পবিত্র “কোর-আন”শরীফের বাংলা অনুবাদ করার।কবি জীবনের প্রথম দিকে হয়তো সময় ও জ্ঞানের অভাবে তা করে উঠা হয় নি। কোরআন শরীফের মত মহাগ্রন্থের অনুবাদ করতে তিনি সাহস করতনা বা তা করার ও দরকার মনে করতনা। নজরুল মনে করতেন তাঁর চেয়ে যোগ্যতর ব্যক্তিগণ এই কোরআন, হাদিস, ফেকা, প্রভৃতির বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন তাহলে বাঙ্গালী মুসলমানের তথা বিশ্ব মুসলিম সমাজের অশেষ কল্যাণ হতো। অজ্ঞান-অন্ধকারে থাকা বাঙ্গালী মুসলমানদের বিশ্ব আলোক অভিযানের সহ যাত্রী হতো। নজরুলের বিশ্বাস ছিল কোর-আনের সরল অনুবাদ হলে তা অধিকাংশ মুসলমানেই সহজে কণ্ঠস্থ করতে পারবে।

নজরুল ইসলাম তাঁর কাব্য আমপারাটি এমনভাবে অনুবাদ করেন যাতে মক্তব-মাদ্রাসা, স্কুল-পাঠশালার, ছেলে-মেয়েরা এবং স্বল্প শিক্ষিত সাধারণের বোধগম্য হয়।কবি যে আসলে’ই সবার বোধগম্য সাধ্যাতীত করে লিখেছেন তা সূরা ফাতিহার অনুবাদ দেখলেই বুঝে আসে।

সূরা ফাতিহা অনুবাদ “সকলি বিশ্বের স্বামী আল্লাহ রহিম/করুণা অপার যাঁর নাই নাই সীমা/বিচার-দিনের বিভু! কেবল তোমারি/আরাধনা করি আর শক্তি ভিক্ষা করি/সরল সহজ পথে মোদের চালাও/যাদেরে বিলাও দয়া সে পথ দেখাও/অভিশপ্ত আর পথ ভ্রষ্ট যারা, প্রভু/তাহাদের পথে যেন চালায়োনা কভু।

নজরুল ইসলাম কাব্য আমপারাটি অনুবাদ করতে গিয়ে কিছু পুস্তকের সাহায্য গ্রহণ করেন তা হলো। Sale’e Quran, Moulana Md.Ali. Tofsir’i- Hosainy, Tofsir’i -Baizabi, Tofsir’i Kabiri, Tofsir’i-Azizi, Tofsir’i-Jalalain, এবং মৌলানা আক্রাম খান ও মৌলানা রুহুল আমিন সাহেবের আমপারা।

কাজী নজরুল ইসলাম’যে সুধু বাংলা ভাষায় দক্ষ তা নই।কবি যে বিশ্বসাহিত্য এবং নানা ভাষায় প-িত ছিলেন তা বুঝতে কবির তিনটি অনুবাদ গ্রন্থে’ই যথেষ্ট।

সূত্রঃ-

রুবাইয়াৎ-ই ওমর খৈয়াম

রুবাইয়াৎ-ই হাফিজ

কাব্য আমপারা

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ