বৃহস্পতিবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১
Online Edition

যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার: যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সরকারের মনোভাব বুঝতে এবং বাংলাদেশের অবস্থান জানাতে ওয়াশিংটন যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন। গতকাল সোমবার রাতে তার যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে রওনা দেয়ার কথা এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি তার দেশে ফেরার কথা রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতায় পালাবদলের পর প্রথম দেশটি সফরে যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। তার এই সফর হবে তিন দিনের। ড. মোমেন দুপুরে সাংবাদিকদের বলেন, আমেরিকা যাচ্ছি, এখানে আমাদের কয়েকটি মিটিং আয়োজন হয়েছে। বিশেষ করে নতুন সরকার আসছে। নতুন সরকারের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন চাই। যুক্তরাষ্ট্রে গত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছে ডেমোক্র্যাটরা। বিদায়ী প্রেসিডেন্ট রিপাবলিকান প্রার্থী ডনাল্ড ট্রাম্পকে হারিয়ে জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন জো বাইডেন।
এই সফরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এন্থনি ব্লিনকেন, সিনেট ফরেন রিলেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান বব মেনেন্দেজসহ আরও কয়েকজন সিনেটরের সঙ্গে মোমেনের বৈঠক হবে। এছাড়া কাউন্সিল ফর ফরেন রিলেশন্সে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও নিউলাইনস ইনস্টিটিউটে রোহিঙ্গাবিষয়ক দুটি পৃথক সভা ও ইউএস চেম্বারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াশিংটন পোস্টে একটি সাক্ষাৎকারও দেবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
যেসব বিষয়ে  আলোচনা হবে: ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্র নীতি থেকে ভিন্ন মনোভাব পোষণ করে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সরকার। ফলে বাইডেন প্রশাসন বাংলাদেশের কাছে কী আশা করে সেটি জানা এবং ওয়াশিংটনের কাছে বাংলাদেশের প্রত্যাশা কী, সেটি তুলে ধরবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এছাড়া মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বর্ষে উভয় দেশের রাজনৈতিক উচ্চ পর্যায়ে সফর হলে দুই দেশের সম্পর্ক আরও দৃঢ় ও জোরালো হবে এই বিষয়টিও তুলে ধরবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
ওয়াশিংটনের বৈঠকগুলোতে রোহিঙ্গা, বিনিয়োগ বহুমুখীকরণ ও বাণিজ্য বৃদ্ধি, বঙ্গবন্ধুর খুনী রাশেদ চৌধুরীর প্রত্যাবাসন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র। মিয়ানমারে ক্ষমতার পালাবদলের বিষয়ে বাংলাদেশ তার অবস্থান পরিষ্কার করেছে এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হচ্ছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন। বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি একটি টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য রোহিঙ্গা গণহত্যার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতেও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চাইবে বাংলাদেশ। এছাড়া জাতিসংঘ যেন বাংলাদেশ ছাড়াও মিয়ানমারে আরও বেশি সম্পৃক্ত হয়, সেজন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করবে ঢাকা।
বাংলাদেশে বেশিরভাগ মার্কিন বিনিয়োগ জ্বালানি খাতে। কিন্তু এছাড়াও তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃষিসহ অন্যান্য খাতেও অধিক বিনিয়োগ চায় বাংলাদেশ। বিনিয়োগ বহুমুখীকরণের পাশাপাশি বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্যও জিএসপিসহ অন্যান্য বাজার সুবিধা নিয়ে আলোচনা হবে। প্রসঙ্গত,বাংলাদেশ ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৬৮০ কোটি ডলারের রফতানি এবং প্রায় ২২০ কোটি ডলারের পণ্য সে দেশ থেকে আমদানি করেছে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর খুনী রাশেদ চৌধুরীর প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা চলে আসছে। এরইমধ্যে রাশেদ চৌধুরীর রাজনৈতিক আবেদন পুনর্বিবেচনার জন্য মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস নির্দেশ দিয়েছে। এ বিষয়টিও পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোরালোভাবে তুলে ধরবেন। এছাড়া, তথ্য প্রযুক্তিতে পৃথিবীর এক নম্বর দেশ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নতির জন্য এই প্রযুক্তির কিছু উপাদান হস্তান্তরের অনুরোধ করবে ঢাকা। ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির উন্নয়ন উপাদানের বিষয়ে কোনও আপত্তি নেই বাংলাদেশের। এই কৌশলের অধীনে অবকাঠামো সংক্রান্ত তহবিল থেকে সহায়তা চায় বাংলাদেশ।
জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ একটি অগ্রণী রাষ্ট্র এবং আগামী এপ্রিলে জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের উপস্থিতি আশা করে যুক্তরাষ্ট্র। সফরের বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল সোমবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের অনেক সম্ভাবনা আছে এবং আমরা সম্পর্ক আরও উন্নত করতে পারি। তিনি জানান, বাংলাদেশ সম্পর্কে কিছু মিডিয়ায় নেতিবাচক সংবাদ পরিবেশন হচ্ছে এবং সেটিকে কাউন্টার করার জন্য মার্কিন সংবাদ মাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেবেন।
সফর নিয়ে মোমেন বলেন, আমি ব্রড বেইজড আলাপ করব। তারা নতুন একটা ফরেন পলিসি দিয়েছে। স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসাবে বাংলাদেশ এখানে ভূ-রাজনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেসব আমরা তাদের তুলে ধরব। সুতরাং তারাও আমাদের সেভাবে দেখে। মোমেন জানান, সফরে আজ মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন এবং চেয়ারম্যান অব দি সেনেট ফরেন রিলেশন্স কমিটির বৈঠকে যোগ দেবেন তিনি। তিনি বলেন, আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী সম্পর্কের উন্নয়ন করতে চাই। আমাদের অনেক সম্ভাবনা আছে, আর আমেরিকাও অনেক বড় দেশ। তাদের সাথে যদি আমাদের সম্পর্ক আরও উন্নত করতে পারি, দিজ ইজ এ উইন-উইন। আমাদের দেশে এখনে অনেক কিছু অফার করার সুযোগ আছে- এই মন্তব্য করে মোমেন বলেন, আমেরিকা এক নম্বর ইনভেস্টর ইন বাংলাদেশ। মোস্টলি ইন এনার্জি সেক্টর আবার অন্যান্য সেক্টরও আছে। আমরা এখন ফার্মাসিউটিক্যালস সেক্টর ওপেন করেছি। উই ওয়ান্ট টু ব্রডেনিং। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি গণমাধ্যমে ব্রিফিংয়ের পরিকল্পনাও রয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর।
আমাদের দেশ সম্পর্কে কোনো কোনো সময় নেতিবাচক প্রচারণা বিদেশে হয়। আমরা সেই নেতিবাচক প্রচারণা নিয়ে সেখানে দুয়েকটা মিডিয়াতে সাক্ষাৎকার দেব। মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নেতিবাচক প্রচারণার জবাব দেওয়া। কী ধরনের নেতিবাচক প্রচার-সে বিষয়েও বলেন দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসা মোমেন। তিনি বলেন, যেমন ধরুন- বলা হয় আমরা খুব বেশি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড করি। একেবারে মিথ্যা কথা। আমাদের দেশে কালেভদ্রে দুয়েকটা হয়। আমেরিকাতে পুলিশ অনেক লোক মারে, ইচ্ছা করে মারে না, মরে যায়। গত এক বছরে দেখেন ১০০৪ জনকে পুলিশ মেরে ফেলেছে। উইদাউট ডিউ প্রসেস অব দি ল’। ইচ্ছা করে তো মারে না, বিভিন্ন কারণে মারা যায়। আর আমাদের এখানে মনে হয়, যেন আমরা ইচ্ছা করে করেছি! কোন কোনে গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেবেন, তাও এখনও নির্দিষ্ট হয়নি জানিয়ে মোমেন বলেন, মিডিয়া হাউজ ওদের উপর নির্ভর করবে।
মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তিতে যুক্তরাষেট্রর নতুন সরকারের কাউকে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা এর আগেও আমন্ত্রণ জানিয়েছি। নতুন সরকারকেও আমরা একই রকম আমন্ত্রণই জানাব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ