শনিবার ০৮ মে ২০২১
Online Edition

বিমানে প্রথম বিদেশ সফর

শেখ এনামুল হক : শৈশব থেকেই বিদেশ সফর এবং বিমান ভ্রমণের প্রতি আমার আগ্রহ ছিল জবর। কিন্তু নানা কারণে এ ধরনের সফরে আমার অংশগ্রহণ হয়নি। ভাগ্যে থাকলে তো হবে! অবশেষে আল্লাহর রহমতে আমার ভাগ্যের দুয়ার খুলে গেল। বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সদস্য হিসেবে আমি প্রথম বিদেশ সফরের সুযোগ পেলাম। এ সময় ইউএনডিপির ((UNDP) অর্থায়নে অরৎ Air Polution In Asian cities  (এশিয়ার বিভিন্ন নগরে বায়ুদূষণ) শীর্ষক প্রকল্পে বিদেশ সফরের দুয়ার খুলে গেল। দৈনিক সংগ্রাম থেকে আমি নেপাল এবং মিজানুল করিম (বর্তমানে নয়াদিগন্তে কর্মরত) পাকিস্তান সফরের সুযোগ পেলাম। বর্তমানে দৈনিক সংগ্রামে কর্মরত অনুজপ্রতীম শফিক চৌধুরী তখন দেশ বাংলায় কর্মরত ছিলেন। তিনি দেশ বাংলা থেকে ভারত সফরের সুযোগ পেলেন। এসব সফর নির্দিষ্ট হয়েছিল লটারীর  মাধ্যমে। কোন কোন সদস্য কোন দেশে যাবে। আমার লটারী ভাগ্য খুব ভালো না হলেও এ ক্ষেত্রে ভালোই হলো। আমার ভাগে পড়ল নেপাল। 

পাহাড়-পর্বত এবং বিশে^র উচ্চতম পর্বত শৃঙ্খের দেশ নেপাল। সমগ্র বিশে^র চৌদ্দটি উচ্চতম পর্বতশৃঙ্ঘের মধ্যে আটটি নেপালে অবস্থিত। এর মধ্যে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্খ এভারেস্ট (উচ্চতা : ৮৮৪৯ বর্গমি.) নেপালেই অবস্থিত।

অনেকদিন থেকেই নেপাল সফরের স্বপ্ন দেখছিলাম। এবার এ স্বপ্ন পূরণের পালা। এসব চিন্তায় শিহরণের ঢেউ খেলে গেল। মনে পড়ে অনেক স্মৃতির  রেখা। বংশালে আমাদের সংগ্রামে কাজ করতেন বন্ধুবর হাসানুল করিম। উনি খুবই বন্ধুবৎসল ছিলেন। একদিন কথা প্রসঙ্গে তাকে বললাম, আমার বিমানে চট্টগ্রাম যাবার শখ। তবে তা পূরণ হচ্ছে না। উনি বললেন, দেখি আপনার শখ পূরণ করা যায় কিনা। কিন্তু রহমানুর রহীম আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা ছিল অন্য রকম। কিছুদিনের মধ্যে হাসানুল করিম ভাই আল্লাহর রাহে পাড়ি জমান।

অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এসে হাজির। ১৯৯৯ সালের ২৫ অক্টোবর দুপুর বারোটায় আমাদের তেজগাঁ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হাজির হতে হবে। ঐদিন বিমানবন্দরে হাজির হয়ে দেখতে পেলাম আমার সঙ্গী-সাথী সবাই হাজির। বিমান ছাড়ার কথা ছিল অপরাহ্ন ২টায়। কিন্তু বিমান ছাড়লো এক ঘণ্টা দেরিতে তিনটায়। বিমানে ওঠার পর যার পাশে আমার সিটÑ তাকে দেখে আমার চক্ষু ছানাবড়া। লোকটার বয়স আমার কাছাকাছি কিন্তু প্রতিবন্ধীর মতো। মুখ দিয়ে নালা ঝরছে। আমি এয়ার হোস্টেজদের অনুরোধ করলাম আমার আসন পরিবর্তন করা সম্ভব কিনা। তারা জবাব দিল সম্ভবতঃ সম্ভব হবে না। কারণ কোনো আসন খালি দেখা যাচ্ছে না। পরবর্তী পর্যায়ে আমি পুনরায় নেপাল সফর করেছি। ওমরাহ ও পবিত্র হজ¦ পালন উপলক্ষে দু’বার সৌদি আবর সফরে গিয়েছিÑ গিয়েছি স্ত্রী-পুত্রসহ  থাইল্যান্ড সফরে। প্রত্যেক সফরে বিমানে বেশ কিছু সিট ফাঁকা পেয়েছিÑ কিন্তু প্রথমবার বিমান সফরে বিমান আসনশূন্য ছিল না। অবশ্য বাংলাদেশ বিমানের এই বিমানটি ছিল ছোট ফকার ফ্রেন্ডশীপ বিমান। কি আর করা। অগত্যা ওই প্রতিবন্ধী লোকটার সাথেই প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় কাটিয়ে ছিলাম। ভাগ্যের ফের আর কাকে বলে!

আমাদের বিমান অবতরণ করবে কাঠম-ুর ত্রিভূবন বিমানবন্দরে। পাহাড়ঘেরা এই বিমানবন্দর নিয়ে নিঃসন্দেহে শংকিত ছিলাম। এই পাহাড়ঘেরা বিমানবন্দরে বেশ কয়েকবার দুর্ঘটনা ঘটেছে। দক্ষ পাইলট ছাড়া এই বিমানবন্দরে অবতরণ নিরাপদ নয়। অবশ্য তখন পর্যন্ত এই বিমানবন্দরে বড় ধরনের কোনো বিমান দুর্ঘটনা হয়নি। পরে হয়েছে। যা হোক, আল্লাহর হাজার শোকর, কোনো প্রকার ঘটনা ছাড়াই নিরাপদে বিমান থেকে অবতরণ করলাম। অবশ্য আনুষ্ঠানিকতা সেরে বিমানবন্দর থেকে বের হতে প্রায় ঘণ্টা খানেক লেগে গেল।

বিমানবন্দরের গেটে প্লাকার্ড হাতে লোকজন দেখে আমি হতবাক। কারণ বিভিন্ন হোটেলের নাম সংবলিত প্লাকার্ডধারী লোকেরা আহ্বান করছে তাদের হোটেলে ওঠার জন্য। পরবর্তীকালে বিভিন্ন দেশ সফরকালে এ ধরনের দৃশ্য চোখে পড়েনি।  হতে পারে দরিদ্র দেশÑ তারপর টুরিস্টদের ভিড়Ñ এসব কারণে হোটেলের লোকেরা পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এসব করে থাকে।

আমাদের জন্য নির্ধারিত হোটেলে গিয়ে আমরা ওঠে পড়লাম। অবশ্য আমার চোখ বার বার উঁকি দিচ্ছিল কাঠম-ু শহরের প্রতি। শুনেছিলাম কাঠম-ু শহর পাহাড়ঘেরা। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে কিন্তু পাহাড়-পর্বত কোথায়? কিন্তু রাতে পাহাড়ের দর্শন মিলেনি।  অবশ্য রাতে দেখতে পেলাম অদূরে অনেক উঁচুতে নিবু নিবু আলো জ¦লছে। পরে জানতে পারলাম তিনদিক পাহাড় ঘেরা কাঠম-ু শহরের ঐ পাহাড়গুলোতে গরিব লোকেরা টিনের ঘরবাড়ি বানিয়ে বাস করে। এই পাহাড়গুলোও ৮০০০/৯০০০ ফুট উঁচু। পরদিন সকালে কুয়াশা কেটে যাবার পর পাহাড়গুলো দেখতে পেলাম। যেখানে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পাহাড় ক্রিয়ক্রাডং ৩০০০ ফুটের মতো উঁচু, তার স্থলে কাঠম-ু শহরঘেরা পাহাড়গুলোর উচ্চতাই ৮০০০/৯০০০ বর্গফুট।

কাঠম-ু শহরের আরেকটি বিষয় উল্লেখ করার মতো। তা হচ্ছে হোটেলে খাবার অর্ডার দেবার পর আধা ঘণ্টার মধ্যেও খাবার আসছে নাÑ ব্যাপার কি? তখন বলা হলো, মুরগি জবাই করার পর তা দিয়েই রান্না করে খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে বলে এই বিলম্ব। এ সময় নেপালের রাজা ছিলেন বীরেন্দ্র বীর বিক্রম শাহ দেব। তিনি ছিলেন দেশপ্রেমিক। বাংলাদেশের সাথে তিনি সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতেন। আমরা যে সময় নেপাল সফর করেছি সে সময় নেপালে প্রচ- ভারত বিরোধী মনোভাব লক্ষ্য করেছি। ভারতীয়রা তাদের পাসপোর্টেই নেপালে আসতে পারে এবং নেপালে অবাধে ব্যবসা করতে পারে। নেপালে ভারতীয় মুদ্রার অবাধে বিনিময় চলে। এসব নানা কারণে নেপালে ভারত বিরোধী মনোভাব লক্ষ্য করেছি। বাংলাদেশে যেমন ভারত বিরোধী চেতনা বিদ্যমানÑ নেপালেও তাই। কয়েক বছর আগে ভারত কি যেন ছুতায় নেপালে নিত্যপণ্য, জ¦ালানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল। তখন নেপালের সংকট নিরসনে চীন এগিয়ে আসে। এখন তো নেপালের সাথে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে চীনের। এখন তো দাবি করা হচ্ছে যে অযোধ্যায় রামের জন্ম, তাও নাকি নেপালে অবস্থিত। ইদানীং ভারতের মানচিত্রে নেপালের কিছু এলাকা দখলীকৃত বলে চিত্রিত করে নয়া মানচিত্র প্রকাশ করেছে নেপাল। অবশ্য ভারত এর প্রতিবাদ জানিয়েছে।

যাক, এবার মূল কথায় আসি। কাঠম-ুতে আমরা কয়েকদিন কাটাই এবং কাঠম-ুর বায়ুদূষণ সম্পর্কে কয়েকটি কর্মশালায় যোগদান করি। আজ থেকে ২০-২১ বছর আগে এই উপমহাদেশের বায়ুদূষণ তত বিপজ্জনক পর্যায়ে ছিল নাÑ যেমনটি এখন হয়ে থাকে। এখন দেখা যায় বিশে^র শীর্ষ বায়ু দূষিত শহরের অন্যতম হচ্ছে বাংলাদেশের ঢাকা, ভারতের নয়াদিল্লী ও মুম্বাই এবং পাকিস্তানের করাচী ও লাহোর। এসব কর্মশালায় ভোজের আয়োজনও ছিল।বলাবাহুল্য ভোজ শেষে সুরাপানেরও ব্যবস্থা ছিল। নেপালে মদের প্রচলন সাধারণ ব্যাপার। সেখানে ধর্মীয় বা রাষ্ট্রীয় কোনো বিধিনিষেধ নেই। সুতরাং টুরিস্ট সিটি হিসেবে এখানে মদ্যপানের নিষেধাজ্ঞা না থাকাই স্বাভাবিক।

কয়েকদিন কাঠম-ুতে কাটানোর পর আমরা নেপালের শীর্ষস্থানীয় পর্যটন শহর পোখারা যাই। পোখারা হ্রদ ও পাহাড়বেষ্টিত একটি প্রধান পর্যটন শহর। কাঠম-ু থেকে পোখারার দূরত্ব ২০০ কিলোমিটার। বাসে যাওযার সময় লক্ষ্য করলাম ৫০/৬০ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করার পর ড্রাইভার বাস থামাচ্ছে এবং যাত্রীরাও চা-নাস্তা করছেন। কারণ জানা গেল, এই পাহাড়ী পথে গাড়ি চালনা কষ্টসাধ্য। এজন্য দু’এক ঘণ্টা পর পর ড্রাইভাররা বিশ্রাম নেয়। লক্ষ্য করলাম, পাহাড়ী রাস্তার পাশে পাহাড়ের গায়ে লেপ্টে আছে ১০/১৫ মণ ওজনের পাথর। অবশ্য পাহাড় থেকে এসব পাথর খসে গাড়ি বা পথচারীর ওপর  পড়েছে এমন কোনো রিপোর্ট পাওয়া গেল না। দেখা গেল পাহাড়ী রাস্তার পাশেই নদীতে ১০/১৫ মণ ওজনের বিস্তর পাথর রয়েছে।

 পোখরা থেকে দেখা যাচ্ছে দুটো সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্খÑ কাঞ্চনজংগা (৮৫৮৬ বর্গমিটার) এবং ধবলগিরি (৮১৬৭ বর্গমিটার) দূর থেকে মনে হয় ধবল তুষারাবৃত পর্বতশৃঙ্খ। পর্বতারোহীরা পোখারা থেকে এসব পর্বতাভিযানে যেয়ে থাকেন। অনেকেরই অভিমত, পোখারা না দেখলে নেপাল সফর অসম্পূর্ণ থেকে যায়। অনেকে বিমানযোগেও পোখারা সফরে যান। আমাদের নেপাল ভ্রমণের আগের বছর বাংলাদেশের একজন মহিলা চিকিৎসক বিমানযোগে পোখারা সফরকালে বিমানবিধ্বস্ত হয়ে নিহত হন।

যা হোক, পোখারা দু’দিন সফরের পর আমরা কাঠম-ু ফিরে আসি এবং দু’দিন পরেই ঢাকা ফিরে আসি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ