বৃহস্পতিবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১
Online Edition

করোনায় জীবনের বিবর্ণ রঙ 

ইবরাহীম খলিল  : প্রাণঘাতী মহামারি করোনায় মানবিক সঙ্কট তৈরি হয়েছে বিশ্বজুড়ে। একজন রোগীর বর্ণনায়---- হাসপাতালে জায়গা নেই, চিকিৎসা দিতে হিমশিম ডাক্তারদের, বেডে সারাক্ষণ চিৎকার, কান্না। এমনকি মৃত্যুর সময় পরিবারের কেউ পাশে  নেই রোগীর। দুই ঘণ্টার বেশি চিৎকার, কান্নার পর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন গুরুতর অসুস্থ রোগী। বার্লিন প্রবাসী বাংলাভাষার কবি দাউদ হায়দার  করোনাকালীন সময়ের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবেই---

বন্দীজীবন কাকে বলে অজানা নয়,

জেলে ছিলাম মাসের পর মাস,

একাকীত্বের প্রহার, নিষ্ঠুর শৃঙ্খল

যুগপৎ সন্ত্রাস আর বীভৎস ভাইরাস 

আদ্যিকাল থেকে মানুষের আর্তনাদ

ক্ষুধাব্যাধির যন্ত্রণা

প্রহরে-প্রহরে মৃত্যু, কবর-শ্মশান

করোনা ভাইরাসের সঙ্গে লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন সিনিয়র স্টাফ নার্স। ------- আমার মনে হচ্ছে, আমি মৃত্যুর দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরে এসেছি। এই যন্ত্রণার কথা যদি সবাই জানতে পারত তাহলে কেউই এই মুহূর্তে বাসা থেকে বের হতে চাইত না। সবাই চাইত তার পরিবার যেন এই ভাইরাস থেকে নিরাপদে থাকে।

হাসপাতালে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলছিলেন, একেকটা দিন আমার কাছে এক বছরের মতো দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। আমার মেয়েরা আমাকে ফোন করত। কখন আমি বাড়ি ফিরব জানতে চাইত। পরিবার থেকে এভাবে দূরে থাকাটা ভীষণ যন্ত্রণার। মাঝে মাঝে আমি কাঁদতাম। ভাবতাম, আবার কখন মেয়েদের জড়িয়ে ধরতে পারব, একটু আদর করতে পারব! 

বাংলাদেশে ঠিক এই মুহূর্তে যদি বলা হয় বাংলাদেশে করোনা নেই তাহলে অনেকেই বিশ্বাস করবেন। বিশ্বাস করার মতো এর যথেষ্ট কারণ রয়েছে বৈ-কি। ঢাকা শহর থেকে শুরু করে গ্রামে-গঞ্জে মাঠে-ঘাটে হাটে কোথাও করোনা নিয়ে মানুষের মধ্যে যথেষ্ট সতর্কতা আছে বলে মনে হয় না। অথচ প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে; বাড়ছে লাশের মিছিল। কিন্তু এ নিয়ে মানুষের মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। বলতে গেলে মানুষের মধ্যে এ সংক্রান্ত কোনো বিকার নেই। বিকার না থাকাটাই স্বাভাবিক। কেননা মহান রাব্বুল আলামিন এই বাংলাদেশ নামক ভূখ-টির ওপর যথেষ্ট দয়া করেছেন। এই দেশে যদি ইউরোপের মতো অবস্থা হতো তাহলে ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশের অবস্থা যে কি হতো তা অনেকেই কল্পনাও করতে পারছিলেন না। বিশেষ করে শীতকালে করোনা দ্বিতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কায় অনেকের চোখের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল। 

বিশ্ব মহামারি করোনা এসে মানুষের জীবনের অনেকগুলো দিক পরিবর্তন করে দিয়েছে । বিশেষ করে জীবনের রঙ বদলে দিয়েছে । বলা যায়, জীবনের রঙিন আবহকে অনেকটা ফ্যাকাসে বিবর্ণ করে দিয়েছে । চিরাচরিত অভ্যাস বদলে দিয়ে নতুন অভ্যাসে বাধ্য করে দিয়েছে । যা চলবে আরও অনেকদিন। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিষয়গুলোকে ধরে রাখবে দীর্ঘদিন। যেমন: কিছুক্ষণ পর পর সতর্কতার সঙ্গে হাতে স্যানিটাইজার মাখা, ঘরের বাইরে বের হলেই মুখে মাস্ক পড়া, চলাফেরায় শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, ভিড় এড়িয়ে চলা ইত্যাদি। এ যেন জীবনের নতুন প্রটোকল। মানুষ দেখলো যুদ্ধ-হাঙ্গামা ছাড়াই কারফিউ লকডাউন দেওয়ার মতো নতুন পরিস্থিতি। ব্যস্ত শহর শুনশান নীরবতা, স্বেচ্ছায় গৃহবন্দী, দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি ট্রেন-বাস, হাসপাতালের মর্গে সারি সারি অস্পৃর্শ্য লাশ। এনালগ সিস্টেমের পরিবর্তে ডিজিটাল নির্ভরতা। কাজকর্ম ফেলে জীবন রক্ষার তাগিদে শহর থেকে পালিয়ে যাওয়াসহ আরও অনেক কিছু। দৈনন্দিন জীবনে যুক্ত হয় অনেক নতুন নিয়মকানুন। বাদ পড়ে যায় জীবনের অনেক চিরাচরিত পুরনো অভ্যাস। যাকে বলা হচ্ছে নিউ নরমাল বা নতুন স্বাভাবিকতা। বলা যায়, এগুলো এখন মানুষের জীবনের নতুন রঙ। পরে আস্তে আস্তে করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে থাকে। বর্তমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া জনজীবন অনেকটাই স্বাভাবিক। 

করোনা প্রথম তার রঙ দেখাতে শুরু করে পৃথিবীর অন্যতম সেরা ধনী দেশ চীনে । তখন থেকেই চীনের মানুষও তাদের রঙ বদলাতে শুরু করেন। বদলে ফেলেন জীবনের অনেক আচার। জীবনের অনেক রঙ বদলের কারণে অবশ্য বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে তাদের কম ক্ষতি হয়েছে। মানুষ মারা গেছে অনেক কম। বাংলাদেশে আসে আরও অনেক পরে। এজন্য অবশ্য এদেশের মানুষের অসতর্কতাকে দায়ী করা হয়। 

করোনা ভাইরাসের মহামারি এখনো চলছে। কত দিন চলবে, তা-ও কেউ সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারছে না। এখন বলা হচ্ছে, নতুন উদ্ভূত পরিস্থিতির সঙ্গে মানুষের খাপ খাইয়ে নেওয়ার কথা। চলে আসছে নয়া স্বাভাবিকতার প্রসঙ্গ। জীবন বদলের ধারায় সামাজিক দূরত্ব, ইমিউনিটি, স্বাস্থ্যবিধি, কোয়ারেন্টিন, করোনা ভাইরাস, মহামারি, কোভিড, সীমিত পরিসর, স্যানিটাইজার, লকডাউন, হোম অফিস, পিপিই, প্লাজমা, ওয়েবিনার, আইসোলেশন, প্যান্ডেমিক শব্দগুলো হয়ে উঠেছে নিত্যব্যবহার্য।

করোনায় মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন হয়েছে আচরণগত। ধরা যাক করোনার আগে কারো সঙ্গে দেখা হলে সবার আগে সালাম, করমর্দন। আরেকটু বেশি ঘনিষ্ঠতা হলে কোলাকুলি। অতি ছোঁয়াচে করোনা ঠেকাতে এই আচরণে নিষেধাজ্ঞা আসলো। বিজ্ঞানীরা বললো ৩ থেকে ৬ ফুট দূরত্ব বজায় রেখে  চলাফেরা করতে। আর করমর্দনের পরিবর্তে দুইজনের কনুই বা মুষ্টিবদ্ধ হাতের স্পর্শ কিংবা পায়ে পা ঠেকিয়ে শুরু করলো অভিবাদন প্রক্রিয়া। যারা এগুলো করতে চান না তাদের কেউ বেছে নিলেন সামনে দুই হাত একসঙ্গে তুলে অভিবাদনের পথ। যার একটিও মুসলমানদের রীতির মধ্যে পড়ে না। তবে আবার কবে যে মানুষ প্রাণ খুলে নিজস্ব বা ঘণিষ্ঠজনদের সঙ্গে করর্মদন কোলাকুলি করতে পারবে তা কেবল আল্লাহ মালুম।

 এদিকে করোনা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য একে একে ঢেকে গেল সবার মুখ। অবস্থা এমন হলো যে- ‘মাস্ক নেই তো সেবা নেই’ ঘোষণা এলো  সরকারের পক্ষ থেকে। নিয়ম হলো- সরকারি-বেসরকারি কার্যালয়সহ সবখানে। সাধারণ মানুষকে মাস্ক পরায় বাধ্য করতে ভ্রাম্যমাণ আদালতকে নামাতে হয়েছে পথে। করা হয় জরিমানাও। এরপর  সরকারি দপ্তর বিপণিবিতান সিনেমা হল যেকোন জায়গায় ঢুকতে গেলে স্যানিটাইজার মাখানো শরীরে ছিটানো শরীরের তাপমাত্রা মাপা হয়ে উঠেছে পরিচিত দৃশ্য। জায়গায় জায়গায় জীবাণুরোধী গেইট বা পা মুছার ব্যবস্থাও জারি হয়ে যায় অনেকস্থানে। মুখবন্ধনি বা মাস্ক পরাই যেন হয়ে উঠেছে করোনার মহামারি বছরে প্রতীক। করোনায় মারা গেলে তার দাফন কিংবা অন্তেষ্টিক্রিয়ায় আত্মীয়-স্বজন আর পাড়াপড়শির উপস্থিতি শূন্য হয়ে যায়। বিখ্যাত বিখ্যাত ব্যক্তিদেরও প্রশাসন কিংবা স্বেচ্ছাসেবীদের সহায়তায় কবরস্থ করা হয়। যাদের জানাযায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি হওয়ার কথা ছিল। 

করোনাকালের ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহামারি দীর্ঘায়িত হউক তা কেউ চায় না। বিপদের মধ্যে যে ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো এসেছে তাও ধরে রাখা দরকার। যেমন এখন জুমে মিটিং হচ্ছে, অনলাইনে ক্লাস হচ্ছে এটা মহামারির কারণে হয়েছে। এরমাধ্যমে কাজের ভলিউম বাড়লো। পরিশ্রম আগের মতই থাকবে। কিন্তু কাজের আওতা বাড়লো। 

মহামারিতে মানুষের আচরণগত পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সমাজবিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি যদি স্থায়ী হয় তাহলে বাংলাদেশের জন্য সুখবর। কারণ বাংলাদেশে শ্বাসতন্ত্রের অসুখে অনেক মানুষ ভোগে। মাস্ক পরাটা যদি অভ্যাসের মধ্যে নিয়ে আসা যায় তাহলে অসুখবিসুখ কমে আসবে।  

করোনায় বেশ কিছু আশংকা তৈরি করে দিয়েছে। পরিসংখ্যান এবং গবেষণা বলছে,  করোনা পরিস্থিতি ছোট পরিবার গড়ার প্রবণতা বৃদ্ধি করতে পারে। কারণ, রেস্তোরাঁর দিক থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যবিধি রক্ষার জন্য নিজেই রান্না করছে। কিন্তু দু-একজনের জন্য হাত পোড়ানো এক কথা, আর ১০-১২ জনের জন্য রান্না করা আরেক। গৃহস্থালিকাজের চাপ কমানোর জন্যই মানুষ হয়তো ছোট সংসার গঠনের দিকে ঝুঁকবে। এতে সন্তান উৎপাদনের হার কমে যেতে পারে। কারণ, খরচের লাগাম টানা, সঞ্চয় প্রবৃত্তি, রান্নার হ্যাপা প্রভৃতি বিবেচনায় মানুষ ছোট পরিবার গঠনে বেশি আগ্রহী হতে পারে। কেউ কেউ আবার এক সদস্যের পরিবারেও আগ্রহী হতে পারে। কমে যেতে পারে বিয়ের হার।

করোনা মহামারিতে দীর্ঘ সময় বিভিন্ন দেশে লকডাউন থাকায় অনেকে বলছেন, শিশুর জন্মহার এ সময় বেড়ে যেতে পারে। তবে কিছু বিশেষজ্ঞ এর সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন। ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর জ্যেষ্ঠ প্রভাষক রিচার্ড ইভানস মনে করেন, সাধারণ মানুষ এখন জীবন বাঁচানোর যুদ্ধে রত। যখন কেউ জীবন ও জীবিকা বাঁচানোর জন্য গলদঘর্ম হয়ে ওঠে, তখন আর যা-ই হোক, সে সন্তান জন্মদানে আগ্রহী হয় না। 

সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা বর্তমান করোনা মহামারি ঠেকানোর অন্যতম উপায় হিসেবে দেখা দিয়েছে। এটি মানুষের মনোজগতে এতটাই পরিবর্তন এনেছে যে ধারণা করা হচ্ছে, মহামারির প্রবল রূপ চলে যাওয়ার পরও তা বজায় থাকবে। ফলে সাধারণ ভোক্তারা আর সুপারমার্কেট, শপিং মল বা রেস্তোরাঁয় গা ঘেঁষাঘেঁষি করে অপরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে সহাবস্থান করায় আগ্রহী হবে না। ফলে এই সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের ব্যবসায়িক মডেল নিয়ে নতুন করে ভাবতে হতে পারে।

একই সমস্যায় পড়তে পারে একসঙ্গে অনেক কর্মী নিয়ে কাজ করা বড় প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে একটি বড় জায়গায় অনেক মানুষের অবস্থান নিশ্চিত করা আর লাভজনক থাকবে না। সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি জানিয়েছে, এরই মধ্যে এ ধরনের কাজ করা রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান উইওয়ার্কের বাজারমূল্য কমতে শুরু করেছে। কারণ একটি বড় স্থানে অনেক মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিতের ব্যবস্থাপনায় মানুষ হুট করেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।

একই অবস্থা দেখা দিতে পারে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় চালানোর প্রচলিত ধারণায়। এক ক্লাসে ৫০ জন শিক্ষার্থী থাকবে সেই ধারণা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসা অসম্ভব কিছু নয়।

করোনা মোকাবিলা করতে গিয়ে প্রথম এবং ব্যাপক অভিজ্ঞতা হয় চীনের। বিশ্লেষকরা বলছেন স্বাস্থ্য সেবায় বেসরকারি এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা তাদের সাফল্যের বড় চাবিকাঠি। তাই, ভবিষ্যতে এধরনের প্রার্দুভাব এড়াতে নিজেদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনছে দেশটি।

যেহেতু কোনো ওষুধ জানা নেই, সংক্রামক এ রোগ থেকে বাঁচতে ঘন ঘন হাত ধোয়া ও মাস্ক পড়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছিল শুরু থেকেই। দেশে যখন প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ল, বিক্রির চাপে আর মজুদদারির কারণে বাজার থেকে উধাও হয়ে গেল মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, গ্লাভসসহ বিভিন্ন সুরক্ষা সামগ্রী, যেগুলো আগে স্বাস্থ্যকর্মীরাই ব্যবহার করতেন। 

করোনায় অর্থনৈতিক জীবনেরও বড় রকমের আচরণগত পরিবর্তন এনেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গতবছরের মার্চ মাসেই মার্কিন মুলুকে মুদিদোকানের কেনাকাটা আগের বছরের চেয়ে ৭৭ শতাংশ বেড়ে যায়। রেস্তোরাঁ ব্যবসায় বিকিকিনি কমে যায় ৬৬ শতাংশ। রেস্তোরাঁ ব্যবসায় তা ছিল গড়ের চেয়ে ৪৮ শতাংশ কম। আমেরিকার মতো বাংলাদেশেও চিত্র ভিন্ন হবে না, তা শুধু সাধারণ ছুটি ও তার শর্ত বিবেচনায় নিলেই বোঝা যায়।

রেস্তোরাঁ ব্যবসায় এই ভাটার টানের ঠিক বিপরীতে মানুষের ঘরে রান্না করার হার বেড়ে গেছে। কারণ, স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয়টি মহামারির কারণে বেড়েছে অনেক গুণ। মানুষ এখন খাবার বানানোর দিক থেকে অন্যের তুলনায় নিজের ওপরই বেশি বিশ্বাস রাখছে। খাবার ও পানীয় বিপণনের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠান হান্টারের গবেষণায় দেখা গেছে, করোনাকালে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ৫৪ শতাংশ বেশি মার্কিন নিজে রান্না করছেন এবং এর মধ্যে ৩৫ শতাংশ বলছেন, রান্না করা তাঁরা অন্যান্য সময়ের তুলনায় বেশি উপভোগ করছেন।

এমন পরিস্থিতিতে হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ বলছে, করোনা মহামারি মানুষের মধ্যে বেশ কিছু আচরণগত পরিবর্তন এনে দিতে পেরে। কিছু প্রবণতা এরই মধ্যে দেখা দিয়েছে। এগুলো আরও প্রকট হতে পারে। মহামারির কারণে এরই মধ্যে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা বাসায় বসে অফিসের কাজ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। উন্নত বিশ্বে আগেও এর চল ছিল। কিন্তু অনন্যোপায় হওয়ার পর এই ধরনকেই স্থায়ী করার কথা ভাবছেন অনেক উদ্যোক্তা। বলা হচ্ছে, এর ফলে ব্যয়বহুল অফিস স্থাপন ও এর ব্যবস্থাপনা চালানোর আর প্রয়োজন হবে না। ফলে অনেক খরচ বেঁচে যাবে।

গুগল বলে দিয়েছে, ২০২১ সালেই পর্যন্ত তাদের সিংহভাগ কর্মী নাকি বাড়িতে বসেই অফিসের কাজ সম্পাদন করতে পারবেন। টুইটারের সিইও জ্যাক ডরসি তো চান, কর্মীদের স্থায়ীভাবে বাসায় রেখেই কাজ করাতে। এমনকি করোনাকাল চলে যাওয়ার পরও এভাবেই ওয়ার্ক ফ্রম হোম চালু রাখার পক্ষে তিনি।

তবে সমালোচকেরা বলছেন, বাসায় বসে কাজ করার এই সুবিধা বড় বড় শহরে হয়তো করা সম্ভব হবে। কিন্তু প্রত্যন্ত এলাকার চাকুরেদের এই সুবিধা দেওয়া কঠিন। আবার উন্নত দেশগুলো যত সহজে এটি বাস্তবায়ন করতে পারবে, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর পক্ষে তা করা বেশ কঠিন হয়ে পড়বে। 

চীনের আদলে লকডাউন শুরুর পর ইউরোপের অনেক দেশে টয়লেট পেপার মজুদ করারও প্রবণতা দেখা গেল। ভাইরাসের বিস্তার ঠেকানোর মরিয়া চেষ্টায় চীনা নববর্ষের ছুটির আগের দিন অবরুদ্ধ করে ফেলা হয় উহান। বন্ধ করে দেওয়া হয় সব ধরনের যানবাহন। শহরের সব বাসিন্দাকে বাধ্য করা হয় যার যার বাড়িতে সঙ্গনিরোধ বা কোয়ারেন্টিনে যেতে। একদিনের মধ্যেই সাড়ে পাঁচ কোটির বেশি মানুষকে অবরুদ্ধ করা হয় দেশটিতে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে এই ব্যবস্থা নাম পায় ‘লকডাউন’। মার্চের শেষে বাংলাদেশেও লকডাউনের সেই ব্যবস্থা শুরু হয়। অবশ্য সরকারিভাবে একে বলা হয় ‘সাধারণ ছুটি’।

বাংলাদেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায় ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে। একই বছরের ২৬ মার্চ থেকে সব অফিস আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে সারা দেশে সব ধরনের যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। সেই সঙ্গে সবাইকে যার যার বাড়িতে থাকার নির্দেশ দেওয়ায় বিশ্বের আরও অনেক দেশের মত বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষও ঘরবন্দী দশার মধ্যে পড়ে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ