বৃহস্পতিবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১
Online Edition

কবি নজরুল অনন্য এক স্রষ্টার নাম

 

সৈয়দ আলী হাকিম : (গত সংখ্যার পর)

‘মালেকুশ শুয়ারা’ উপাধি প্রাপ্তি

১৯২৬ সালের জুলাই মাসে কবি নজরুল প্রথম চট্টগ্রামে যান কবি হাবিবউল্লাহ বাহার এর আমন্ত্রণে। সেখানে কবি নজরুলকে বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী আন্দারকিল্লা শাহী জামে মসজিদে কবি নজরুলকে সংবর্ধণা দেয়া হয়, ঐ সংবর্ধণা অনুষ্ঠানে মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে কবি নজরুলকে ‘মালেকুশ শুয়ারা’ উপাধি প্রদান করা হয়।  ‘মালেকুশ শুয়ারা’ শব্দের অর্থ ‘ছন্দের মালিক’। কোনো মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে কোনো কবিকে কোনো খেতাব দেয়ার নজির আর নেই।

মন্দিরে কবি নজরুলকে সংবর্ধণা

মসজিদে কবি নজরুলকে যেমন সংবর্ধণা দেয়া হয় তেমনি মন্দিরেও তাকে সংবর্ধণা দেয়া হয়। ১৯২৯ সালে হিন্দুদের তীর্থস্থান চট্রগ্রাম সীতাকুন্ডু মন্দিরে হিন্দুসভায় কবি নজরুলকে সংবর্ধণা দেওয়া হয়। (সূত্র-বাংলাদেশে নজরুল, রশীদ হায়দার, পৃষ্ঠা -১৩৬)। ভাবুনতো একবার যে কবিকে মসজিদে সংবর্ধণা দেয়া হচ্ছে, সেই কবিকে আবার মন্দিরেও সংবর্ধণা দেয়া হচ্ছে। কী আশ্চর্য! কী অসাধারণ! ঘটনা। 

সর্বাধিক বাজেয়াপ্ত কাব্য গ্রন্থের কবি

কবি নজরুল বিশ্ব সাহিত্যের একমাত্র কবি (ভয়ংকর বিদ্রোহী কবি) যার দশটি কাব্য গ্রন্থ সমকালীন ব্রিটিশ রাষ্ট্রযন্ত্রের রোষানলে পড়ে, এরমধ্যে পাঁচটি বাজেয়াপ্ত হয় (‘যুগবাণী’ (প্রবন্ধগ্রন্থ), ‘বিষের বাঁশী’, ‘ভাঙার গান’ ও ‘প্রলয় শিখা’ (কাব্য গ্রন্থ), এবং ‘চন্দ্র বিন্দু’ (সংগীত গ্রন্থ)। ‘যুগবাণী’ গ্রন্থটি কেবল ভারতে বাজেয়াপ্ত হয়নি, এই গ্রন্থটি বার্মায়ও (বর্তমান মায়ানমার)  বাজেয়াপ্ত করা হয়। বাকি পাঁচটি গ্রন্থ ( অগ্নিবীণা, সঞ্চিতা, ফণিমনসা ও সর্বহারা (কাব্য গ্রন্থ) এবং  ‘রুদ্রমঙ্গল’ (প্রবন্ধগ্রন্থ) বাজেয়াপ্তের অপেক্ষায় ছিল। ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাধীন না হলে বাকি পাঁচটিও বাজেয়াপ্ত হতো। সাহিত্য জগতে এমন নজীর আর কোনো কবির ক্ষেত্রে এখনো ঘটেনি। (সূত্র-ড. সুশীল কুমার গুপ্ত, নজরুল চরিতমানস, পৃষ্ঠা-৭৯)

কবিকে ভালোবাসার জন্য আত্মহত্যা!

১৯২৪ সালের ২২ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি মেদিনীপুরে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের চারদিন ব্যাপী সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন ২৩ ফেব্রুয়ারি কবি নজরুলকে সংবর্ধণা দেয়া হয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় মেদিনীপুর বাংলা স্কুলে নজরুলকে সংবর্ধণা ও অভিনন্দন পত্র দেয়া হয়। ২৫ ফেব্রুয়ারি মেদিনীপুর মহিলাদের পক্ষ থেকেও কবি নজরুলকে ঐদিন সংবর্ধণা দেয়া হয়। মহিলাদের সংবর্ধণা অনুষ্ঠানে ‘কমলা’ নাম্নী এক স্কুল শিক্ষকের মেয়ে নজরুলের কন্ঠে  গান-কবিতা  শুনে নিজের গলার হার খুলে কবির গলায় পরিয়ে দেয়। নজরুল আবার তা মেয়েটিকে ফিরিয়েও দেন। মেয়েটির এই কাজে নিন্দা ও অপবাদের ঝড় ওঠে। মেয়েটি তা সহ্য করতে না পেরে এসিড পান করে আত্মহত্যা করে। ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ও বেদনাদায়ক। তবে কবিতা, গান ও কবিকে ভালোবাসার কারণে এ ধরণের ঘটনা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমনকি বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে আগে কখনও ঘটেছে বলে আমাদের জানা নেই। (সূত্র-বাংলা সাহিত্যে নজরুল- আজহারউদ্দীন খান পৃষ্ঠা-৩৭ ও জৈাষ্ঠের ঝড়-অচিন্তিত্য কুমার সেনগুপ্ত, পৃষ্ঠা -১৬৯)

কোনো প্রতিষ্ঠিত কবির রাজনৈতিক দল গঠন ও নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করা

কবি নজরুল ১৯২৫ সালের নভেম্বর মাসে হেমন্ত কুমার সরকার, কুতুবউদ্দিন আহমদ, শামসুদ্দিন হোসেন প্রমুখ ব্যক্তিদের নিয়ে ‘দি লেবার স্বরাজ পার্টি অব ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। দলটির পরিবর্তিত নাম ‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ দল’ এই দলের পত্রিকার নাম ছিল ‘লাঙল’। ১৯২৬ সালের নভেম্বর মাসে কেন্দ্রীয় আইন সভার সভ্যপদে পূর্ব বঙ্গের ঢাকা-ফরিদপুর আসনে কংগ্রেস দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। অবশ্য তিনি পরাজিত হন। একজন কবির রাজনৈতিক দল গঠন ও রাজনৈতিক নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করার দৃষ্টান্ত নজরুল পূর্বে কোনো বাঙ্গালীর ছিল না।

কবিতা লেখার জন্য কারাবরণ

বাংলা সাহিত্য এবং বিশ্ব সাহিত্যে কবিতা লেখার কারণে কারাদন্ড ভোগের ইতিহাস কবি কাজী নজরুল ইসলামের পূর্বে আর কারো হয়েছে বলে আমার জানা নেই। ১৯২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার প্রথম বর্ষের ১২শ’ সংখ্যায়’ আনন্দময়ীর আগমনে ‘শিরোনাম কবি নজরুলের কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়। এই কবিতাটির বক্তব্য তৎকালীন ইংরেজ শাসকদের গায়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তারা কবি নজরুলকে ২৩ নভেম্বর ১৯২২ সালের বেলা বারোটার সময় কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করে। ১৯২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট মি. সুইনহোর কবি নজরুলকে এক বছর (১৫ ডিসেম্বর ১৯২৩ পর্যন্ত) সশ্রম কারাদন্ড দেয়। কবি নজরুলের মুক্তির জন্য দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের সভাপতিত্বে এক বিরাট জনসভা হয়। (সূত্র-নজরুল চরিতমানস,ড. সুশীল কুমার গুপ্ত)। ‘প্রলয় শিখা’ কাব্য গ্রন্থটি ইংরেজ শাসক বাজেয়াপ্ত করে ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩০ সালে। গ্রন্থটি বাজেয়াপ্তের পাশাপাশি সরকার কবি নজরুলকে গ্রেফতার করে। পাঁচশত টাকা জামিনে কবির মুক্তি লাভ হলেও কবির ছয়মাস জেল হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়। পরবর্তীতে ৪ মার্চ ১৯৩১ তারিখে  গান্ধী-লর্ড আরউইন চুক্তির ফলে এই কেইস থেকে মুক্ত হন। (সূত্র-নজরুল চরিতমানস, পৃষ্ঠা-৮১)

কারাগারে অনশনকারী কবি

কবি নজরুলের ‘আনন্দময়ীর আগমন’ কবিতা লেখার জন্য এক বছর জেল হয়। প্রথমে তাকে কলকাতার আলিপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয় ১৯২৩ সালের ১৬/১৭ জানুয়ারি থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত। সেখানে তিনি ১২৪ ধারা মতে রাজবন্দীর মর্যাদা পাচ্ছিলেন। কিন্তু ১৪ এপ্রিল তাকে বরহমপুর জেলে পাঠানোর নাম করে হুগলি জেলে পাঠায় রাজবন্দীর মর্যাদা না দিয়ে। কবি নজরুল এর প্রতিবাদে ১৪ এপ্রিল থেকেই অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। বন্ধু, বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, কবি রবীন্দ্রনাথ, এমনকি কবির মা এসেও সে অনশন ভাঙাতে পারেনি। টানা ৩৯ দিন অনশন করার পর কুমিল্লার কান্দিরপাড় থেকে বিরজাসুন্দরী দেবী এসে ২৩ মে ১৯২৩ সালে লেবুর সরবত পান করিয়ে কবি নজরুলের অনশন ভঙ্গ করান। কারা কর্তৃপক্ষ কবি নজরুলের প্রতি আরও রুষ্ট হয়ে তাকে নির্জন  কক্ষে স্থানান্তর করে। সেখানে তাকে ১৯দিন রাখা হয়। ১৮ জুন তাঁকে বহরমপুর জেলে রাজবন্দীর মর্যাদায় নিয়ে রাখা হয়। ১৯২৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর কবি নজরুল কারাবাস থেকে বীর বেশে মুক্তি পান। কারা ফটকে বহরমপুরবাসী অভ্যর্থনা দিয়ে ড. নলিনাক্ষ স্যান্যালের বাড়ী নিয়ে  যায়। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কবি নজরুলই প্রথম অনশন ধর্মঘটকারী কবি।

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বসন্ত’ নাটকের উৎসর্গ প্রাপ্তি

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার রচিত গ্রন্থসমূহ তার পারিবারিক বলয়ের বাইরে কবি নজরুলকেই প্রথম কোনো গ্রন্থ (‘বসন্ত’ নাটক)  উৎসর্গ করেন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উৎসর্গকৃত গ্রন্থটি পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের মাধ্যমে হুগলি জেলে কবি নজরুলের কাছে পাঠিয়ে দেন। পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্বৃতি দিয়েছেন, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন ‘জাতীর জীবনে বসন্ত এনেছে নজরুল।—-নজরুলকে আমি ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য উৎসর্গ করেছি এবং উৎসর্গ পত্রে তাকে ‘কবি’ বলে অভিহিত করেছি। জানি তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এটা অনুমোদন করতে পারো নি। আমার বিশ্বাস, তারা নজরুলের কবিতা না পড়েই এই মনোভাব পোষণ করেছে। আর পড়ে থাকলেও তারমধ্যে রূপ ও রসের সন্ধান করেনি, অবজ্ঞাভরে চোখ বুলিয়েছে মাত্র।—-আমি তাকে (নজরুলকে) সমগ্র অন্তর দিয়ে অকুন্ঠ আশীর্বাদ জানাচ্ছি। আর বলো, কবিতা লেখা যেন কোন কারণেই সে বন্ধ না করে। সৈনিক অনেক মিলবে, কিন্তু যুদ্ধে প্রেরণা যোগাবার কবিও তো চাই।’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এটি একটি অসাধারণ ঘটনা। (সূত্র-নজরুল-চরিতমানস, পৃষ্ঠা -৫৮, ৮২)। কবি নজরুল কারাগারে যখন অনশন করছেন তখন তার অনশন ভাঙতে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে টেলিগ্রামটি করেন তার ভাষা ছিল এ রকম- (এরাব ঁঢ় যঁহমবৎ ংঃৎরশব, ড়ঁৎ ষরঃবৎধঃঁৎব পষধরসং ুড়ঁ.)....‘অনশন ত্যাগ করো, আমাদের সাহিত্য তোমাকে চায়।’ ‘আমাদের সাহিত্য তোমাকে চায়’ এই কথাটি কতটা অসাধারণ তা মূল্যায়নের দাবি রাখে। একজন কবির জন্য আমাদের সাহিত্য অপেক্ষা করছে, একজন কবির বাঁচা মরার উপর নির্ভর করছে একটা জাতির সাহিত্যের অগ্রগতি, সমৃদ্ধি, বিকাশ। আর তা বলছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্ত কবি-সাহিত্যিক। কবি নজরুলের সাহিত্য প্রতিভার এ এক অসাধারণ স্বীকৃতি। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এরকম মূল্যায়ন কবি নজরুল সম্পর্কে আরও অনেকবার করেছেন।

কবি নজরুলের বিবাহ

কবি নজরুলের জীবনটাই যেন বৈচিত্র্যময়। ১৯২৩ সালের ১৭ জুন সৈয়দা খাতুন এর সঙ্গে নজরুলের  বিবাহ হয়, যদিও সে বিয়ে টেকেনি। ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল কবি নজরুলের সঙ্গে ‘দোলন’ বা ‘দুলি’ আসল নাম ‘আশালতা’ দেবী (নজরুলের দেয়া নাম ‘প্রমিলা’)এর  বিবাহ ছিল উপমহাদেশের ইতিহাসে কেবল নয় হিন্দু-মুসলিম ইতিহাসেও এক নজিরবিহীন বিবাহের ঘটনা। সাধারণত হিন্দু-মুসলমান বিবাহ হয় হিন্দু ছেলে বা মেয়ের ইসলাম ধর্ম কবুল করার পর মুসলিম রীতি অনুযায়ী। কিন্তু নজরুল-প্রমিলার বিবাহ (বর মুসলমান, কনে হিন্দু) হয় কারোরই ধর্মান্তর না ঘটিয়ে ‘আহলুল কিতাব’ ইসলামী নিয়মে। এ ক্ষেত্রে নজরুল হিন্দু ধর্ম গ্রন্থ বেদ কে আসমানী কিতাব হিসাবে বিবেচনায় নিয়ে ইসলামী রীতিতে বিয়ে করেছিলেন। (সূত্র-বিদ্রোহী রণক্লান্ত, পৃষ্ঠা -১৮৬)

নারী ও পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার কবি

কবি নজরুলের পূর্বে অনেক কবি নারী ও পুরুষের মান, সম্মান, অধিকার, মর্যাদা নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। কিন্তু কেউ নারী পুরুষের সমমর্যাদা দিয়ে কথা বলেছেন বলে আমার জানা নেই। সম্ভবত কবি নজরুলই প্রথম নারী ও পুরুষের  সমমর্যাদা দিয়ে কথা বলেছেন। ‘নারী’ কবিতায় কবি নজরুল বলেছেন——-

‘সাম্যের গান গাই

আমার চক্ষে পুরুষ রমনী কোন ভেদাভেদ নাই।’ 

‘বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর,

অর্ধেক তার করিয়াছে নারী,  অর্ধেক তার নর।’

এখানে উল্লেখ করা ভালো যে বিশ্ব ইতিহাসে ইসলাম ধর্মই প্রথম নারী ও পুরুষের সমমর্যাদা দিয়েছে। আল কোরআন নারী ও পুরুষ কে একে অন্যের পরিচ্ছদ বলে সমমর্যাদা দিয়েছে। কবি নজরুল কোরআনের বক্তব্যকে যেন কাব্যরূপ দিয়েছেন মাত্র।

কবি কাজী নজরুল ইসলাম আটটি ভাষায় সাহিত্য চর্চা করেছেন

বাংলা সাহিত্যে কেবল নয়, বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে যে ক’জন সাহিত্যিক একাধিক ভাষায় সাহিত্য চর্চা করেন তাদের মধ্যে কবি কাজী নজরুল ইসলাম অতুলনীয়। তিনি তার সাহিত্য চর্চায় সর্বাধিক আটটি ভাষার ব্যবহার করেছেন। বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফার্সি, উর্দু, হিন্দি, পাঞ্জাবি এবং সংস্কৃতি এই আটটি ভাষায় কবি নজরুল সাহিত্য-সাংস্কৃতিক চর্চা করেন। সাহিত্য-সংস্কৃতিক চর্চার জগতে এ এক অনন্য, অসাধারণ দৃষ্টান্ত। পৃথিবীতে অনেক জ্ঞানী ব্যাক্তি ছিলেন এবং আছেন যারা কবি নজরুল অপেক্ষা অনেক বেশি ভাষায় কথা বলতে ও লিখতে পারলেও সাহিত্য-সাংস্কৃতিক চর্চা করেননি।

বাঙলার ও বাঙালীর জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ

সময়টা ১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর অপরাহ্ন দুটো, কলকাতা  এলবার্ট হল। লোকে লোকারণ্য, তিলধারণের ঠাঁই নাই। ‘নজরুল সংবর্ধণা সমিতির’ (সভাপতি  সাহিত্যিক এস, ওয়াজেদ আলী। সম্পাদক ‘কল্লোল’ পত্রিকা সম্পাদক দীনেশ রঞ্জন দাশ ও ‘সওগাত’ পত্রিকার সম্পাদক এম. নাসিরুদ্দিন) আহবানে সভা। সভায় সভাপতিত্ব করছেন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। সভায় হাজার লোকের মাঝে উপস্থিত ছিলেন জলধর সেন, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, অপূর্বকুমার চন্দ, করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রমুখ প্রবীণ ও নবীন সাহিত্যিক ও সাহিত্য রসিক ব্যাক্তিগণ। এই সভার সভাপতি হিসাবে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কে ‘বাঙলার কবি, বাঙালীর কবি’ ঘোষণা দেন। উপস্থিত হাজার জনতা উৎফুল্ল চিত্তে করতালির মাধ্যমে ঐ ঘোষণার প্রতি সমর্থন জানায়। সভার পক্ষ থেকে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে একটি অভিনন্দন পত্র ও সোনার দোয়াত-কলম একটি রূপার কাস্কেটে ভরে উপহার হিসেবে দেয়া হয়। অভিনন্দন পত্রের শেষে লেখা হয় ‘গুণমুগ্ধ বাঙালীর পক্ষে’ নজরুল-সংবর্ধণা সমিতির সভ্যবৃন্দ। হাজার বছরের বাঙালী জাতী ও বাঙলা ভাষার ইতিহাসে এই প্রথম কোনো কবিকে বাঙালী জাতীর কবি, বাঙলা ভাষার কবি হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। (সূত্র-নজরুল চরিতমানস, পৃষ্ঠা-৮৮-৮৯) 

অল্প বয়সে (৩০-৩১ বয়সে) জাতীয় কবির মর্যাদা

১৫ ডিসেম্বর ১৯২৯ সালে কবি নজরুলকে পৃথিবীর একটি জাতির (বাঙালি), একটি ভাষার (বাংলা) জাতীয় কবি হিসাবে আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করা হচ্ছে তখন কবির বয়স মাত্র ৩০/৩১ বছর। পৃথিবীর ইতিহাসে নজরুলই সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে জাতীয় কবির মর্যাদা লাভ করেন।

কবি নজরুল বাঙালী জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা ও স্বাধীন স্বত্তার রূপকার

১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর কলকাতা এলবার্ট হলে কবি নজরুলকে ‘বাঙালীর জাতীয় কবি’  হিসাবে ঘোষণা দেয়ার পর নেতাজী সুভাসচন্দ্র বসু তাকে ‘বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা’ বলে আখ্যায়িত করেন। অন্যদিকে ১৯৭২ সালে কবি নজরুলকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে ঢাকায় আনেন এবং তাকে ‘বাঙালীর স্বাধীন সত্তার রূপকার’ বলে উল্লেখ করেন। ঐ সময়ের সরকারি পত্রিকা দৈনিক বাংলা প্রথম পৃষ্ঠার  শিরোনামে তা প্রকাশ করে। (সূত্র -‘সমকাল-সংস্কৃতি’ ড,আবুল আজাদ, পৃষ্ঠা-৫৭) বস্তুত নজরুল সাহিত্যে বাঙালী জাতিস্বত্তার বিকাশের পূর্বে বাঙালিরা ছিল উপমহাদেশে আর দশটা জাতি-উপজাতির মত একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী মাত্র। কবি নজরুলই প্রথম এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখান। তিনি বলেন, ‘বাঙালি যে দিন ঐক্যবদ্ধ হয়ে বলতে পরবে- ‘বাঙালির বাংলা’  সেদিন তারা অসাধ্য সাধন করবে।——-বাঙলা বাঙালির হোক! বাঙলার জয় হোক! বাঙালির জয় হোক।’ আজ বাঙালির জয় হয়েছে, বাঙালির বাংলাদেশ হয়েছে। বাংলা রাষ্ট্রভাষা হয়েছে। কবি নজরুলের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পেয়েছে।

বিশ্বের বিস্ময়কর প্রতিভাধর কবি কাজী নজরুল ইসলাম

জাতীয় কবি নজরুল গবেষণা পরিষদ খুলনা কর্তৃক ৬/৯/২০১১ সালের এক গবেষণায় নজরুল প্রতিভার বিভিন্ন দিক নিয়ে একটি তালিকা পুস্তিকাকারে   প্রকাশ করেছে।  তালিকাটির সংক্ষিপ্ত রূপ এখানে তুলে ধরা হলো—-কবি নজরুলের ব্যক্তিগত প্রতিভা-১৮টি, সামাজিক প্রতিভা-১২টি, সৈনিক প্রতিভা-৫টি, রাজনৈতিক প্রতিভা-১১টি, বেতার প্রতিভা-৪টি, চলচিত্র প্রতিভা-১১টি, সাংবাদিক প্রতিভা-৪টি, লেটো সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিভা-৫টি, বিভিন্ন ভাষায় সাহিত্য চর্চা-৮টি, অংকন-আল্পনা-১টি, গানে সুর সংযোজন-৪৬টি, লক্ষণগীত-ও তার দশটি ঠাটের জোড়া বিন্যাস-৬টি, নতুন তাল সৃষ্টি-৬টি, ব্যবহৃত তাল-১৪টি, ব্যবহৃত রাগ-৭০টি, নতুন রাগ সৃষ্টি-১৯টি, বিভিন্ন বিষয়ে সাহিত্য চর্চা-৩৯টি, আরবি-ফার্সি কাব্য ভাষার আঠারোটি ছন্দ (১-হযজ,২-রবজ,৩-রমল,৪-মোতাকারেব,৫-সরীএ,৬-খফীফ,৭-ময্তস্,৮-মোজারা,৯-কামেল, ১০ ওয়াফের, ১১-মোতদারিক, ১২-তবীল, ১৩-মদীদ, ১৪-বসীত, ১৫-মন্ সরহ, ১৬-করীব, ১৭-যদীদ, ১৮-মশাকেল) ১৮ টি (সূত্র-কান্ডারী হুশিয়ার, ১৮০ পৃষ্ঠা) অন্যান্য ৩টি, সর্বমোট ৩০৩টি। ভেবে দেখুন একজন মানুষ ৩০৩টি দিকে তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন! মানব সভ্যতার ইতিহাসে এতো বহুমুখী প্রতিভার স্ফূরণ আর কোনো মানুষের মধ্যে এসেছে বলে আমার জানা নেই। কবি নজরুল  মহান আললাহর এক বিষ্ময়কর সৃষ্টি!

কবি নজরুল ইসলাম যে সকল সম্মাননা পান

কবি নজরুলের বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিতি পাওয়াটাই বড় সম্মাননা। যে সময় গোটা উপমহাদেশের সকল পরাধীন মানুষেরই উচিত ছিল দখলদার ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে কথা বলা, বিদ্রোহ করা, সে সময় কবি নজরুলই সর্বোচ্চ হুংকার দিয়ে কথা বলেন, বিদ্রোহ করেন। কবি নজরুল ‘ধুমকেতু’ পত্রিকায় বলেন-‘ও সব স্বরাজ-টরাজ বুঝিনা, চাই ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতা।’ ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী তাই কবি নজরুলের উপর ভীষণ রুষ্ট ছিল, তাই তার বিরুদ্ধে রাজদ্রোহীতার অভিযোগ এনে এক বছর সশ্রম কারাদন্ড দেয়। একজন বাঙালী কবি হিসাবে এটাইতো কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর বড় পুরষ্কার -নোবেল প্রাইজ। কারাভোগের পুরস্কার ছাড়াও কবি নজরুল আর যে সব পুরস্কার পান—-

* ১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর কলকাতার এ্যালবার্ড হলে বাঙালীর জাতীয় কবি ও যুগ¯্রষ্টা কবি হিসাবে সম্মাননা দেয়া হয়।  

* ১৯৩২ সালে চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদে মসজিদ কমিটি এবং মুসল্লীদের পক্ষ থেকে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে  ‘মালেকুশ শুয়ারা’ অর্থাত সুরেরমালিক খেতাবে ভূষিত করা হয়।

* ১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ‘জগত্তারিণী স্বর্ণ পদক’।

* ১৯৪৫ সালে ভারত সরকার কর্তৃক পদ্মভূষণ উপাধি লাভ।

* ১৯৬৯ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্মান সূচক ডি.লিট. উপাধি লাভ।

* ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্মান সূচক ডি. লিট.উপাধি লাভ।

* ১৯৭৫ সালে সাহিত্যে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘২১শে পদক’ দেয়া ও জাতীয় কবির মর্যাদা দেয়া হয়। 

* ১৯৭৬ সালে ২৪ মে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কবি নজরুলকে ‘আর্মি ক্রেস্ট’ উপহার দেয়া হয়।

ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ তিনটি  দেশের সাহিত্যিক ভাতা প্রাপ্তি

কবি কাজী নজরুল ইসলামই একমাত্র বাঙালি কবি যিনি ভারত  ও পাকিস্তান দু’টি দেশের সাহিত্য ভাতা পেতেন ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশের সাহিত্য ভাতা  পেতেন। বলতে গেলে তিনি ভারত,পাকিস্তান ও বাংলাদেশ অর্থাৎ সাহিত্য ভাতা পেয়েছেন।

রাষ্ট্রপ্রধান কর্তৃক কবি নজরুলের কফিন বহন

১৯৭৬ সালে কবি নজরুল ইন্তিকাল করলে তাঁর লাশ কবরস্থ  করতে কবির কফিনবাহী খাটিয়া বহন করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, সেনা প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান (পরবর্তী রাষ্ট্রপতি), বিমান বাহিনী প্রধান, নৌ বাহিনী প্রধান। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো কবির ভাগ্যে পার্থিব এরূপ রাষ্ট্রীয় সন্মান এখন পর্যন্ত কারও হয়নি। আল্লাহ যাকে সন্মান দেন তাঁকে দুনিয়াতেও সন্মান দেন।

রাষ্ট্রী মর্যাদায় শেষ গোসল, কাফন ও দাফন

কবি কাজী নজরুল ইসলাম উপমহাদেশে প্রথম বাঙালী কবি যাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। কবি নজরুলের দাফনের সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান উভয়ই উপস্থিত ছিলেন। আর রাষ্ট্রের অন্যান্য উচ্চ পদস্থদের কথা নাইবা উল্লেখ করলাম। কবির কফিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে আনা হলে অপেক্ষমান ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের এক প্লাটুন সৈনিক তাকে বিশটি রাইফেল গর্জনের মাধ্যমে লাস্ট প্রেজেন্ট আর্মস শুরু করে, রেজিমেন্টাল কালার ও পতাকা  অবনর্মিত করে। সেকেন্ড রেজিমেন্টের বিউগলে করুণ সুর বেজে ওঠে, একুশ বার তোপধ্বনির পর কবির লাশ কবরে নামানো হয়। মাটি দেয়ার পর রাষ্ট্র, সরকার ও সর্বস্তরের পক্ষ থেকে ফুলেল শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়। কবির শেষ গোসলও হয় রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির অন্যতম উপদেষ্টা কর্নেল এম এস হকের তত্ত্বাবধানে  পি জি হাসপাতালের স্টুয়ার্ড সৈয়দ নাসির আলী কবিকে শেষ গোসল দেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের নজির অনেকের হয়তো আছে কিন্তু রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে বা মর্যাদায় শেষ গোসলের নজির কবি নজরুলের পূর্বে কারও হয়েছে বলে জানা নেই। (সূত্র-রবীন্দ্র নজরুল চরিত,-সরকার শাহাবুদ্দীন আহমেদ, পৃষ্ঠা-৬০৭)

কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর জীবন ও কর্মের যে সকল অনন্য, অসাধারণ, অতুলনীয় দিক সমূহের প্রতি এ পর্যন্ত যা কিছু নজরে পড়েছে তা সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হলো, যদি কোনো তথ্য-উপাত্তের অসংগতি, অতিরঞ্জন বা ঘাটতি পরিলক্ষিত হয় তবে তা লেখককে জানালে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ থাকব এবং পরবর্তিতে তা সংশোধনের ইচ্ছা পোষণ করছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ