বৃহস্পতিবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১
Online Edition

দর্শনের স্বরূপ বা প্রকৃতি

আবু মহি মুসা : দর্শনের স্বরূপ বুঝতে হলে দর্শনের সংজ্ঞা জানতে হবে সর্বাগ্রে। তাহলে বোঝা যাবে দর্শন কি? কি তার ভূমিকা?  দর্শনের যে সংজ্ঞাগুলো পাওয়া গেছে এ দিয়ে দর্শন কি তা বোঝা যাবে না। যেমন, বলা হয়েছে, দর্শন হলো বুদ্ধি, বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে গোটা সত্তার একটা ব্যাখ্যার চেষ্টা। দর্শন বোঝার মূল সমস্যা এখানে। গাছের গোড়ায় না গিয়ে, আমরা এক লাফে গাছে আগায় উঠে গেছি। আমরা জ্ঞান সম্পর্কে কতটুকু জানি? জ্ঞানের চারটি স্তর বা অংশ। যেমন, সাধারণ জ্ঞান, বুদ্ধি, অলৌকিক জ্ঞান এবং দর্শন বা দার্শনিক জ্ঞান। এর উৎস, বৈশিষ্ট্য, ক্ষেত্র, ভূমিকিা সম্পর্কে সম্যক ধারণার অভাব রয়েছে। জ্ঞানের এই চারটি স্তরের সাথে জ্ঞানের আরও দুটো স্তর আছে- জ্ঞানের গতি ও প্রকৃতি:, এর একটি অভ্যন্তরীণ জ্ঞান, অন্যটি অতি সাধারণ জ্ঞান। দর্শনের স্বরূপ বা প্রকৃতি বুঝতে হলে দার্শনিক জ্ঞন সম্পর্কে পরিপূর্ণ একটি ধারণা থাকা প্রয়োজন। এ বিষয়ে আমরা পরে আলোচনা করবো। 

অভ্যন্তরীণ জ্ঞান : অভ্যন্তরীণ জ্ঞান বলতে এর ভূমিকা হচ্ছে খাদ্যের সংকেত দেয়া। একজন অজ্ঞান হয়ে যাওয়া মানুষ কিন্তু খাদ্য খাবে না। তার জ্ঞান থাকতে হবে। দর্শনে মনোবিজ্ঞান বলে একটি বিষয় আছে। মনোবিজ্ঞান বলতে এটা কিন্তু শুধু বিজ্ঞানের ব্যাপার নয়। এখানে দর্শনের ব্যাপারও আছে। যেমন, মন বিষয়টি কিন্তু ভাবের ব্যাপার। একই সাথে বিজ্ঞানেও ব্যাপার। যেমন, মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটলে, সেখানে চিকিৎসা-বিজ্ঞানের ভূমিকা রয়েছে। এ জন্য এটাকে বলা হয়েছে ‘মিশ্রক্ষেত্রের’ (synthetic grounds) ব্যাপার। মিশ্রক্ষেত্রের ব্যাপার বলেই মানসিক রোগীদের যে যেমন ওষুধ দেয়া হয়, তেমনি কাউনসিলিং করা হয়। ক্ষুধা লাগাটা হচ্ছে দৈহিক। কোনো ব্যক্তি তিন দিন অজ্ঞান হয়ে থাকলে  তার কিন্তু ক্ষুধা লাগবে না। এখানে দৈহিক এবং মানসিক দুটো বিষয় কাজ করে থাকে। এ জ্ঞানটি সব প্রাণীর মধ্যে রয়েছে। এ কারণেই বলা হয়েছে যে গাছের জ্ঞান আছে। জ্ঞান আছে বলে গাছ খাদ্য খেয়ে বেঁচে আছে।

অতি সাধারণ জ্ঞান : অতি সাধারণ জ্ঞান জৈবিক উত্তেজনা সৃষ্টি করে। অভ্যন্তরীণ জ্ঞান এবং অতি সাধারণ জ্ঞান, এ দুটো হচ্ছে সহজাত। এ দুটো সৃষ্টি হয় আপনা আপনি। সাধারণ জ্ঞান এবং বুদ্ধি হচ্ছে অভিজ্ঞতালব্ধ। অলৌকিক জ্ঞান এবং দর্শন হচ্ছে আধ্যাত্মিক জ্ঞান। 

দর্শন ব্যতীত জ্ঞানের অন্য স্তরের উৎস, বৈশিষ্ট্য, ক্ষেত্র, ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজন ছিল সর্বাগ্রে। কারণ, বুদ্ধিকে কখনো দর্শন হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে, যা গ্রহণযোগ্য নয়। বুদ্ধি জ্ঞানের একটি স্তর, তেমনি দর্শনও জ্ঞানের স্তর। দর্শন বুদ্ধি নয়, বুদ্ধি দর্শন নয়। এর পার্থক্য সম্পর্কে আমাদের ধারণা নেই বলে বুদ্ধি দিয়ে জ্ঞান অর্জনের কথা বলা হয়েছে। বুদ্ধি কিভাবে অর্জন করতে হয় সে বিষয়ে কোনো আলোচনা নেই। দর্শন নিয়ে অধ্যয়নের পূর্বে অন্যান্য জ্ঞানের স্তর সম্পর্কে ধারণা থাকার প্রয়োজন ছিল। সে ধারণা নেই বলে দর্শন বিষয়টি জটিল আকার ধারণ করে আছে আমাদের কাছে। এটাও কিন্তু দর্শনের সমস্যা। দুর্বোধ্যতার একটি কারণ। রাস্তায় গাড়ি চালাতে গিয়ে পথে গাড়িটা বিকল হয়ে গেছে। একজন দার্শনিক কিন্তু গাড়িটা ঠিক করতে পারবেন না। এ জন্য একজন অভিজ্ঞ মেকানিকের প্রয়োজন। দর্শনকে যেহেতু বলা হয়, সকল বিষয়ের প্রসূতি। দর্শন হচ্ছে বহুরূপী, বহুমুখী, ক্ষণে ক্ষণে যার রূপ পাল্টায়। যে কারণে দর্শনকে বুঝা যায় না। দর্শন এমন একটি বিষয়, লোহা দিয়ে যেমন হাতিয়ার তৈরি করা যায়, তেমনি অবার হাতিয়ার দিয়ে লোহা কাটা যায়। ঠিক তেমনি জ্ঞানের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে দর্শনের কোনো ভূমিকা নেই। 

দর্শন আমাদের জ্ঞানের উৎপত্তি, স্বরূপ এবং যথার্থতা নিয়ে আলোচনা করে। শুধু তাই নয়, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া যাবে দর্শনের মাধ্যমে। জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট যে বিষয়গুলো রয়েছে, যেমন প্রেম ভালোবাসা, দেশপ্রেম, মানবিক মূল্যবোধ, সততা, ন্যায়পরায়ণতা এ সব বিষয়ে দর্শন ধারণা দিয়ে থাকে। সাধারণ জ্ঞান, বুদ্ধি বা অলৌকিক জ্ঞানের মাধ্যমে এ সব ক্ষেত্রে ধারণা পাওয়া যাবে না।

বলা হয়েছে, দর্শনের কাজ বস্তু-বিষয়ক সমস্ত সমস্যার আলোচনা করা। এ প্রসঙ্গে দার্শনিক প্যাট্রিক দর্শনের স্বরূপ আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, ‘বস্তুর আদ্যপান্ত চিন্তা-কলা কিংবা বস্তুর আদ্যপান্ত চিন্তার প্রায়াসের অভ্যাস।’ এটা কিন্তু দর্শনের কাজ নয়। এটা হচ্ছে বিজ্ঞানের কাজ। বিজ্ঞানের কাজ, এবং দর্শনের কাজের মধ্যে অনেক পার্থক্য। বিজ্ঞান হচ্ছে বস্তুর সাথে সংশ্লিষ্ট জ্ঞান, দর্শনের কাজ হচ্ছে ভাবগত বিষয়ে সঠিক ধারণা দেয়া। এ জন্যই সৃষ্টি হয়েছে বস্তুবাদ এবং ভাববাদ।

আগেও বলা হয়েছে,  মানুষ  জ্ঞান সৃষ্টি করতে পারে না। জ্ঞানকে আহরণ করতে হয়। দার্শনিক জ্ঞান আহরণ করার পরে, দার্শনিক জ্ঞানই ভাবগত বিষয়ের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে থাকে। একমাত্র অভ্যন্তরীণ জ্ঞান এবং অতি সাধারণ জ্ঞান ব্যতীত জ্ঞানের অন্য সব স্তর বা অংশকে  আহরণ করতে হয়। যেমন, মটর মেকানিক, তাকে মটর মেরামতের জ্ঞান অর্জন করতে হয়েছে। এ জন্যই এটাকে বলা হয়েছে অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান। দর্শন জীবন ও জগৎ সম্পর্কে ধারণা দেয়। কিন্তু কেন জানতে পারিনি প্রেম কি, মন কি, দেশপ্রেম কি? প্রাচীন কালের মনীষীরা দর্শনকে বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞানকে দর্শন বলে দর্শনের সংজ্ঞা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। যে কারণে ভাবের বিষয়গুলোর সঠিক কোনো সংজ্ঞা পাইনি। আজও এটি জটিল আকার ধারণ করে আছে। 

অধ্যাপক টাইটাস বলেন, ‘দর্শন হলো জীবন ও জগতের প্রতি এক ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি।’ বিষয়টি ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার, এটা অগ্রাহ্য করা যাবে না। কিন্তু এ দিয়ে কি বোঝা যাবে দর্শন কি? দার্শনিক বাট্রা- রাসেল বলেন, ‘ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যবর্তী একটি অনধিকৃত ভূখন্ড রয়েছে,.. এ অনধিকৃত ভূখন্ডটিই হচ্ছে দর্শন।’ রাসেলে এ বক্তব্য দিয়ে দর্শনকে বোঝানো যাবে না।  বিষয়টি আমরা এভাবে বলতে পারি, দর্শন হলো একটি সমুদ্র, যেখানে বিজ্ঞান, ধর্ম, সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান নামক বিভিন্ন প্রকার মাছ বাস করে।

প্রথমত : আমরা দর্শনের সঠিক সংজ্ঞা জানি না । দর্শন সম্পর্কে অনেকেই মনে করেন যে , ব্যক্তি কিভাবে জীবন ও জগতকে উপলব্ধি করে, তারই ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ  হচ্ছে দর্শন। কানিংহাম তাঁর ‘ Problems of Philosophy  গ্রন্থে বলেছেন, Philosophy, thus grows directly out of life and its needs. Every one who lives, if he lives at all reflectively, is in some degree a Philosopher.  অর্থাৎ ‘জীবন এবং প্রত্যক্ষভাবে জীবনের প্রয়োজন থেকে দর্শনের উদ্ভব। প্রত্যেক ব্যক্তি যিনি নিদেনপক্ষে গভীর চিন্তার মাঝে বাস করেন, তিনি কোনো না কোনো অর্থে দার্শনিক।’ তাঁর  এ বক্তব্য মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। দার্শনিক বলতে যারা যুগে যুগে একজন দুজন করে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছেন। তাঁরা পুরাতন মতবাদকে পাল্টে দিয়ে নতুন মতবাদ দিয়েছেন। এই নতুন কোনো মতবাদই হচ্ছে দর্শন বা দার্শনিক জ্ঞান। এই দার্শনিক জ্ঞানই জীবন ও জগতের  সমস্যার সমাধান দিতে পারে। অধ্যাপক টাইটাস  Problems of Philosophy’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘দর্শন হলো জীবন ও জগতের প্রতি এক ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি।’ টাইটাসের এ বক্তব্য গ্রহণযোগ্য বলে মনে করি না। যেমন পরম সত্য বলতে ‘মানুষ মরণশীল’, এটা কি ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার?    

দ্বিতীয়ত : দার্শনিক চিন্তার প্রকৃতি হচ্ছে শুধু জীবন নিয়েই নয়, এমন কি বিশ্বজগতের কথা এ চিন্তার মধ্যে  রয়েছে।  বিজ্ঞানের জ্ঞান  যেখানে দুর্গম, দর্শনের জ্ঞান সেখানে সহজগম্য। দার্শনিক জ্ঞান জগতের অন্তরালে সত্যকে খুঁজতে চেষ্টা করে। তাই দর্শনের লক্ষ্য থাকে গোটা সত্তার স্বরূপ উদঘাটন করা। মানুষ দার্শনিক জ্ঞানের মাধ্যমে জানতে চায় জীবনের অর্থ ও ভবিষ্যত, বিশ্বের উৎপত্তি, স্রষ্টা, দেশ, কারণ,  আত্মা, মন ইত্যাদি। দর্শন জীবনের উৎস, পরিণতি, আদর্শ এবং জগত ও জীবনের তাৎপর্যপূর্ণ সম্পর্কের জ্ঞান আহরণের চেষ্টা করে। দর্শনের লক্ষ্য হচ্ছে সত্তার অন্তর্নিহিত অর্থ বের করা। মূলত দর্শনের কোনো লক্ষ্য নেই, দর্শনের কাজ হচ্ছে সত্তার অন্তর্নিহিত অর্থ বের করা। বিষয়টিকে আমরা এভাবে বলতে পারি, দর্শনই আমাদের সব কিছু ধারণা দিয়ে থাকে। 

তৃতীয়ত :  দর্শন হলো, ‘বৈজ্ঞানিক  পদ্ধতির মাধ্যমে বিশ্বকে জানার এক প্রচেষ্টা।’ বিজ্ঞানের সঠিক সংজ্ঞা জানি না বলে, এমন কথা বলা হয় যে, ‘বিজ্ঞানের বিজ্ঞান হচ্ছে দর্শন।’ প্যাট্রিক বলেছেন, ‘যে বিশ্বে আমরা বাস করি তাকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সাহায্যে বোঝার প্রচেষ্টাই হচ্ছে দর্শন।’ 

 বিজ্ঞান হচ্ছে বস্তু এবং জ্ঞানের সমন্বয়। বস্তু ছাড়া বিজ্ঞান হতে পারে না, তেমনি জ্ঞান ছাড়া বিজ্ঞান হতে পারে না। কাজেই বিজ্ঞানের সংজ্ঞা এমন হতে পারে, ‘ যে জ্ঞান সরসরি বস্তুর সাথে সম্পৃক্ত অথবা যে জ্ঞান বস্তু মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে সেটাই বিজ্ঞান।’ বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এবং দার্শনিক জ্ঞান  এক নয়। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের লক্ষ্য এক হতে পারে। আর সে ক্ষেত্রটিকে বলা হয় ‘মিশ্র ক্ষেত্র (synthetic grounds)। যেমন, আকাশ অসীম না সসীম, বিশ্বসৃষ্টি, পৃথিবী ধ্বংস ইত্যাদি। এ বিষয়ে বিজ্ঞানীরা যেমন জানার চেষ্টা করেন, তেমনি দার্শনিকরাও জানার চেষ্টা করেন। শুধু বিজ্ঞানীরাই জানবেন এটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। 

চতুর্থত : মূলত দর্শন এমন একটি জ্ঞান যা জীবন ও জগত সম্পর্কে ভাবগত সমস্যার সমাধান দিয়ে থাকে। অধিবিদ্যা, জ্ঞানবিদ্যা ও মানবিদ্যার একটি সমালোচনামূলক বিশ্লেষণই হচ্ছে দর্শন। প্যাট্রিক বলেছেন, ‘ যে বিশ্বে আমরা বাস করি তাকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সাহায্যে বোঝার প্রচেষ্টাই হচ্ছে দর্শন।’ বিজ্ঞানের প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী বিজ্ঞান যে কাজ করে সেটাই হচ্ছে বৈজ্ঞানিক ব্যাপার। দর্শনের উৎপত্তি ব্যাপারে বিজ্ঞানের কোনো ভূমিকা নেই। দার্শনিক চিন্তার শুরু সৃষ্টির শুরু থেকে। বৈজ্ঞানিক চিন্তা শুরু তার অনেক পরে। দর্শন ভাবগত যত বিষয় আছে অর্থাৎ বিমূর্ত বিষয় যেমন জীবন ও জগত সম্পর্কে জানতে সচেষ্ট থাকে। কিন্তু বস্তুজগত এবং জীবনের সকল সমস্যার বিশ্লেষণ এবং এসবের অন্তর্নিহিত সত্য উঘাটন করা দর্শনের একটি প্রাথমিক সমস্যা বলে মনে করা হয়। প্যাট্রিক বলেন যে, ‘দর্শন বস্তু সম্পর্কে পরিপূর্ণ চিন্তার কৌশল অথবা বস্তুকে অদ্যোপান্ত চিন্তা প্রয়াসের অভ্যাস বলে অভিহিত করা যায়।’ 

পঞ্চমত : দর্শন যেহেতু নতুন একটি বিষয়। এর মধ্যে রয়েছে নতুন কোনো তথ্য। এই তথ্যের মধ্যে রয়েছে জীবন ও জগত সম্পর্কে জানার বিষয়। বিজ্ঞানের মধ্যেও রয়েছে বস্তু এবং জীবন সম্পর্কিত বিষয়। বিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয় হচ্ছে উদ্ভিদবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা, প্রাণীবিদ্যা, জীববিদ্যা, কৃষিবিদ্যা অথবা প্রাণীকুল নিয়ে বিশ্লেষণের মাধ্যমে জ্ঞান সরবারহ করে থাকে। বিজ্ঞানের চেষ্টা থাকে বিশ্বের খন্ডিত জ্ঞান উপস্থাপন করা। দর্শন বৈজ্ঞানিক কোনো বিষয়ে তার নিজস্ব গন্ডির মধ্যে নিয়ে আলোচনা করে না, একমাত্র মিশ্রক্ষেত্রে বিষয় ছাড়া। মিশ্রক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের যেমন ভূমিকা রয়েছে, তেমনি দার্শনিকরাও এ বিষয়ে চিন্তা ভাবনা করে থাকে। 

ষষ্ঠত : মানবজীবন ও অভিজ্ঞতার সর্বমুখী বিশ্লেষণ অন্যসব বিষয় থেকে দর্শনকে পৃথক করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বিজ্ঞান ও ধর্মের সাথে দর্শনের কোনো সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায় না। এ প্রসঙ্গে  দার্শনিক রাসেল তাঁর, ‘ History of Western Philosophy গ্রন্থে বলেছেন, ‘.... ‘.... between theology and science there is `no man’s land...this `no man’s land is philosophy. অর্থাৎ ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যবর্তী একটি অনধিকৃত ভূখন্ড রয়েছে .... এ অনধিকৃত ভূখন্ডটিই হচ্ছে দর্শন। এর সারমর্ম হচ্ছে, আমাদের মনে কৌতূহলোদ্দীপক অনেক প্রশ্নর সৃষ্টি হতে পারে, যার উত্তর বিজ্ঞানের পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়। 

সপ্তমত  : বিশ্বপ্রকৃতি হচ্ছে জ্ঞানর ভান্ডার। বিশ্বপ্রকৃতির এ ভান্ডার থেকে জ্ঞান আহরণ করতে হয়। দর্শন যৌক্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বস্তু এবং বিষয়ের অন্তর্নিহিত যাবতীয় সত্যকে প্রকাশ করে। তাছাড়া দর্শন বিভিন্ন ধর্মের মৌলিক সত্যাসত্য বিচার করে এবং ধর্মে ধর্মে সম্প্রীতি রক্ষার নীতি নির্ধারণ করে। দার্শনিক তত্ত্ব আমাদের শুধু জানতে, পড়তে ও জ্ঞান অর্জন করতেই শেখায় না, একই সাথে এর লক্ষ্য  থাকে ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োগের মাধ্যমে জীবন সুন্দর করে তুলতে। 

অষ্টমত  :  টাইটাসের মতে, Philosophy is the logical analysis of language  and the clarification of the meaning of the word and concepts, অর্থাৎ ‘দর্শন হচ্ছে ভাষার যৌক্তিক বিশ্লেষণ এবং শব্দ ও ধারণার অর্থ সুস্পষ্টকরণ’। দর্শনের এ অভিনব স্বরূপটির নাম হচ্ছে ‘বিশ্লেষণ দর্শন’ (analytic philosophy)। ভাষা সম্পর্কে যৌক্তিক বিশ্লেষণ প্রদান করাই হলো এর কাজ। বিশ্লেষণী দর্শনে মনে করা হয় যে, গভীর তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার সহায্যে অমূর্ত সত্তার তাৎপর্য উপলব্ধি করা সম্ভব হয় না। কারণ ভাষার সীমাবদ্ধতা অনুরূপ ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই যৌক্তিক বিশ্লেষণের দ্বারা ভাষা, শব্দ ও ধারণার অর্থ সুস্পষ্ট করা প্রয়োজন হয়। প্রকৃতপক্ষে এ বিশ্লেষণী পদ্ধতিটি দর্শনের স্বরূপ বা প্রকৃতি গঠনের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে দার্শনিকগণ বিশ্লেষণী দর্শনের স্বরূপ ব্যাখ্যায় বিভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন এবং এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতবাদের উদ্ভব হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ