বৃহস্পতিবার ০৪ মার্চ ২০২১
Online Edition

কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে মনোমুগ্ধকর লাল কাঁকড়ার চর

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান, কুয়াকাটা থেকে ফিরে: অপার সৌন্দর্যের লীলাভুমি সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটা প্রায় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য অবলোকন করা যায়। এছাড়া শুটকি পল্লী, লেম্বুর চর, লাল কাঁকড়ার চর, ফাতরার চর, সুন্দরবনের সৌন্দর্য্যও আকর্ষণীয়। কলাপাড়ায় গঙ্গামতি পর্যটনপল্লী ঘেঁষা দীর্ঘ সৈকতে রয়েছে লাল কাকড়ার নয়নাভিরাম বিচরণ। এ জন্য গঙ্গামতির খ্যাতি রয়েছে লাল কাঁকড়ার চর হিসেবে নামকরণের। গঙ্গামতি সৈকত ছাড়াও কুয়াকাটার খাজুরা থেকে খালগোড়া পর্যন্ত আন্ধারমানিক মোহনার বেলাভূমে লাল কাঁকড়ার বিচরণ চোখে পড়ে। নতুন সৃষ্ট, কুয়াকাটার অদূরে চরবিজয় রয়েছে লাল কাঁকড়ার বিচরণভূমি। সে এক অপূর্ব বিরল দৃশ্য। চোখ জুড়ানো দৃশ্যে বিমোহিত হয় পর্যটকরা। পরিবেশবিদরা বলছেন, প্রকৃতিকে চুপি চুপি দেখতে হয়।

কাঁকড়ার চরে ভোরে বা সকালে গেলে লাল কাঁকড়ার দেখা পাওয়া টা কষ্টকর। সূর্যের তাপে বালু উত্তপ্ত হয়ে গেলে কাঁকড়া রা বাইরে বের হয়ে আসে। তাই, সকাল ১১ টার দিকে গেলেই সহজে লাল কাঁকড়ার দৌড়া দৌড়ি উপভোগ করতে পারেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে আপনার উপস্থিতি যেন কোন ভাবেই টের না পায় পেলেই গর্তে চলে যায় । এই লাল কাকঁড়ার চরে আপনাকে বাইকে করে যেতে হবে, সকাল ৭ টার পর থেকে বেলা ১২ পর্যন্ত হাজার হাজার লাল কাকঁড়া দেখতে পাবেন এখানে। এছাড়া বিকালের সময়েও দেখা মিলবে লাল কাঁকড়ার। ভাটার সময় পানি কিছুটা নেমে গেলে অসংখ্য লাল কাঁকড়া মিছিল নিয়ে ছুটে চলে। এঁকেবেঁকে পুরো বেলাভূমিতে যেন তারা আলপনা আঁকছে। কুয়াকাটা ও গঙ্গামতি সৈকতে এখন এ দৃশ্য নিত্যদিনের। যেন দীর্ঘদিন পর ‘বেদখল’ হয়ে যাওয়া বেলাভূমি পুনরুদ্ধার করেছে কাঁকড়ার দল। কুয়াকাটা থেকে লেবুতলা বিচে মটরবাইকে করে যেতে হয়। এর পাশেই লাল কাঁকড়ার চর। এখান থেকে সুন্দরভাবে দেখে আসুন অপরুপ সূর্যাস্ত। আর মূল সৈকত থেকে পশ্চিম দিকে ফাতরার চরে গিয়ে দেখা মিলবে নয়নাভিরাম সূর্যদ্বয়। দুপুর-রাতের খাওয়ার সময় কোরাল, বাইম ট্রাই করতে পারেন অথবা সাগর পাড় থেকে লাক্ষা, কাঁকড়া কিনে হোটেলে দিলে তারাই রান্না করে দিবেন।

জানা গেছে, কাঁকড়া আর্থ্রোপোডা পর্বের একটি ক্রাস্টাসিয় প্রাণী। লাল কাঁকড়া এটার একটি প্রজাতি। এ পর্যন্ত কাঁকড়ার ৬,৭৯৩টি প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে। সদা সতর্ক লাল কাঁকড়ার বিচরণদৃশ্য দূর থেকেই কিছুটা অবলোকন করা যায়। এটি সাইজে খুবই ছোট্ট। এরা কোন কিছুর শব্দ পেলেই নিমিষেই ভোঁদৌড়ে গর্তে ঢুকে পড়ে। বর্তমানে কুয়াকাটায় লাল কাঁকড়ার বিচরণ এলাকা ক্রমশ কমে যাচ্ছে, এ জন্য পরিবেশ কর্মীরা জানান, স্পট এবং এরিয়া নির্দিষ্টকরণ করা প্রয়োজন লাল কাঁকড়া দেখার জন্য। নইলে মনলোভা এ দৃশ্যসহ জীববৈচিত্র্য পরিবেশ-প্রতিবেশ সব হারিয়ে ফেলবো আমরা।

যখন সাগরে ভাঁটা থাকে তখন সৈকতের পরিধি বৃদ্ধি পায়। তখন লাল কাকড়া বালুর নিচের বাসা (গর্ত) থেকে বের হয়ে আসে। বিচরণ করে। দৌড়াদৌড়ি করে। বালু থেকে মাটি আলাদা করে। যেন আলপনায় ঢেকে দেয় সৈকতের বেলাভূমি। খেলতে থাকে একে অপরের সঙ্গে। ওদের স্বকীয়তায় বিচরণ করে নির্দিষ্ট এরিয়া জুড়ে। যেখানে একটু মানুষের পদচারণা কম। কোলাহলমুক্ত, সেখানেই লাল কাঁকড়ার বহর দেখা যায়। প্রায় এক/দেড় শ’ মিটার দূর থেকে লাল কাঁকড়ার দল চোখে পড়ে। এরপর পর্যটক দর্শনার্থী যখন ৩০-৪০ মিটার কাছে চলে আসে তখন লাল কাঁকড়ার দল জীবন বাঁচাতে ভোঁ-দৌড় দেয়। কোনো কোনো পর্যটক-দর্শনার্থী হাতে ধরার জন্য লাল কাঁকড়া ধাওয়া করেন। এতে পায়ের তলে পিস্ট হয়ে কাঁকড়া মারা পড়ে। আবার বাইক চলাচলের কারণেও ধ্বংস হচ্ছে লাল কাঁকড়াসহ বিভিন্ন ছোট ছোট প্রাণী। আবার কাঁকড়ার আবাসস্থল নষ্ট হয়ে যায়।

কুয়াকাটায় আসা পর্যটক দর্শনার্থী থেকে শুরু করে স্থানীয় পিকনিক পার্টির সদস্যরা লাল কাঁকড়া ধরতে উম্মুখ হয়ে যান। উম্মাদনা চালান একটি লাল কাকড়া ধরতে। ধাওয়া করেন লাল কাকড়ার সারিবদ্ধ দলকে। কখনও বালুর আঘাতে কাঁকড়া গুরুতর জখম হয়ে অঙ্গহানি ঘটছে। কেউ ধরতে গিয়ে মেরে ফেলছে। কেউবা ওদের আবাস বেলাভূমের গর্ত নষ্ট করে দিচ্ছেন। এখন লাল কাঁকড়ার জন্য বেঁচে থাকা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। লাল কাঁকড়ার বিচরণ দেখতে কিংবা এদের গতিপ্রকৃতি, ভোঁ দৌড় দেখতে বিজ্ঞান ও পরিবেশসম্মত পদ্ধতি অবলম্বন করার সময় এসে গেছে। নইলে লাল কাঁকড়ার বিচরণ ভূমি হারিয়ে লাল কাঁকড়াও হারিয়ে যাবে। 

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সারাদেশে জনসমাগম বন্ধের সঙ্গে ফাঁকা হয়ে যায় পর্যটন কেন্দ্রগুলোও। এই অবস্থায় কক্সবাজারে জনশূন্য সৈকতের কাছে যেমন ডলফিনের অবাধ বিচরণ দেখা গেছে, তেমনি কুয়াকাটা ও গঙ্গামতি পয়েন্টে চলেছে লাল কাঁকড়ার নয়নাভিরাম মিছিল।

স্থানীয় জেলেরা জানান, লাল কাঁকড়া ধরতে গিয়ে হাতে বালু নিয়ে ওদের শরীরে সজোরে ছিটিয়ে দিলে দৌড়ের সময় চিৎ হয়ে পড়ে যায়। তখন কাঁকড়াটি অসহায় হয়ে থাকে। হাতে ধরা যায়। এভাবে অনেক কাঁকড়া মারা পড়ে। তখন অনিরাপদ ভেবে ওই স্পট থেকে লাল কাঁকড়া বিতাড়িত হয়ে অন্য চরে আবাস গড়ে। সৈকতজুড়ে ভাড়াটে কিংবা ব্যক্তিগত মোটর সাইকেল চলাচল এতো বেড়ে গেছে যে লাল কাঁকড়া মারা পড়ছে। এসব জেলের মন্তব্য, দূর থেকে বাইনোকুলারসহ যেকোন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে লাল কাঁকড়ার বিচরণ দেখা উচিৎ। নইলে লাল কাঁকড়া হারিয়ে যাবে। এমন সতর্কতা সংবলিত সাইনবোর্ড লটাকানো প্রয়োজন। লাল কাঁকড়ার চর বিচরণে পর্যটক-দর্শনার্থীসহ সাধারণ মানুষের করনীয় বিষয় সংবলিত সাইনবোর্ড দেয়া যেতে পারে। এটির বাস্তবায়ন করতে এখনই উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন পরিবশকর্মীরা। তারা বলছেন, কুয়াকাটার পরিবেশ প্রতিবেশসহ জীব-বৈচিত্র্য রক্ষায় বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। যে স্পট পর্যটকের কাছে এখন যে কারণে আকর্ষণীয় সেই জীব-বৈচিত্র্য ও পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা করা প্রয়োজন।

দেশবরেণ্য পরিবেশবিদরা জানান, লাল কাঁকড়ার কাজ হচ্ছে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করা। ওরা আলপনার মতো করে বীচে। বালু থেকে মাটিকে আলাদা করতেই এমনটি করছে লাল কাকড়া। এক্ষেত্রে লাল কাঁকড়ার বিচরণ ক্ষেত্র অবলোকনে ইকোট্যুরিজম করতে হবে। পর্যটক-দর্শনার্থীকে এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে। নির্দেশনা সংবলিত সাইনবোর্ড দেয়া যেতে পারে। বনবিভাগকে এ জন্য দায়িত্ব নিতে হবে। পর্যটককে বোঝাতে হবে আপনি এঁদের (কাঁকড়া) প্রতি সদয় হোন। প্রকৃতিকে চুপি চুপি দেখতে হয়। সচেতন করার বিকল্প নেই। 

স্থানীয় বনবিভাগ কর্মকর্তারা জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট জোন করে দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে। প্রতিবেশ-পরিবেশসহ জীব-বৈচিত্র্য রক্ষায় সকল পদক্ষেপ নেয়া হবে।

কুয়াকাটা সমূদ্র সৈকত পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটা পৌরসভা ও লতাচাপলী ইউনিয়নের সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত। উপজেলা সদর (কলাপাড়া ফেরিঘাট) থেকে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত বাসে, মোটরসাইকেল যোগে কিংবা কার নিয়ে যেতে পারবেন আপনার ইচ্ছে মতো। পটুয়াখালী জেলা সদর থেকে কুয়াকাটার দূরত্ব ৭০ কিলোমিটার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ