রবিবার ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১
Online Edition

মিরপুরে ডিএনসিসির উচ্ছেদ অভিযানে বাধা সংঘর্ষ-ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া 

গতকাল বৃহস্পতিবার মিরপুর-১১ পল্লবীতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান চালায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীর মিরপুর ১১ নম্বরের ৪ নম্বর এভিনিউ এলাকায় অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা করছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। আর এ অভিযানকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে গোটা এলাকা। দফায় দফায় সংঘর্ষ আর ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলছে বিহারি দখলদার, স্থানীয় বাঙালি ও প্রশাসনের মধ্যে। গতকাল বৃহস্পতিবার (২১ জানুয়ারি) সকাল ১১টা থেকে মিরপুর ১১নম্বর বাসস্ট্যান্ড থেকে লালমাটি পলাশ নগরমি সড়কের উভয় পাশে অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা হয়। এর পূর্বে সকাল ১০ টারও আগে থেকে পার্শ্ববর্তী নান্নু মার্কেট এলাকায় বুলডোজার, হ্যামারের মতো ভারী সরঞ্জাম এনে রাখা হয়।

মূলত তখন থেকেই এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করতে শুরু করে। জড়ো হতে থাকেন বিহারি দখলদাররা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ। পরবর্তীতে মেয়র আতিকুল ইসলাম ঘটনাস্থলে এলে স্বাভাবিকভাবে উচ্ছেদ অভিযান শুরুর চেষ্টা করে সিটি করপোরেশন। কিন্তু বিহারিদের বাঁধায় বেশ কয়েক দফা পিছু হটতে হয় উচ্ছেদ অভিযানের দলকে।

এসময় বিহারি, স্থানীয় বাঙালি এবং পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের কর্মীদের মধ্যে বহুমুখী সংঘর্ষ শুরু হয়। দফায় দফায় ইট পাটকেল নিক্ষেপ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। বিহারিদের ছত্রভঙ্গ করতে একশন যেতে হয় পুলিশকে। অভিযানের এক পর্যায়ে ৪ নম্বর এভিনিউয়ের নান্নু মার্কেট মোড় থেকে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে সক্ষম হয় পুলিশ। এ মোড়েই থাকা তিনটি দোকান এবং একটি তিন তলা বাড়ি ভেঙে দেওয়ার মধ্যে দিয়ে শুরু হয় অভিযান। 

এবিষয়ে তাৎক্ষণিক এক ব্রিফিংয়ে মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, এখানে বছরের পর পর কেউ কেউ ৩০ বছর পর্যন্ত জনগণের রাস্তা দখল করে আছেন। বিহারিদের নির্দিষ্ট পিলার পর্যন্ত সীমানা রয়েছে। তারা কিন্তু এটা জানে কিন্তু জেনেও পিলারের বাইরে এসে দখল করেছেন। এটা ৬৮ ফুট চওড়া সড়ক। আমরা তাদের আগেও বলেছিলাম নিজেদের থেকে সরে যেতে। তারা সেটি না করায় আমাদের অভিযানে আসতে হলো।

জনগণের উপকারের জন্য এ অভিযান চলছে দাবি করে আতিক বলেন, এ অভিযান কিন্তু আমার জন্য না, জনগণের জন্য। এই সড়ক তাদের। যারাই দখল করবে তাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযান হবে। এমনকি সড়ক প্রশস্ত করতে জমি অধিগ্রহণ করে হলেও উচ্ছেদ করে সড়ক প্রশস্ত করা হবে।

বেনারসি পল্লীতে উচ্ছেদ, মাথায় হাত কারিগর-ব্যবসায়ীদের

মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনে অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। উচ্ছেদ এলাকার একটি বড় অংশ জুড়ে বিস্তৃত পুরনো বেনারসি পল্লী এলাকা। এদিকে ‘বিয়ের মৌসুমে’ এমন উচ্ছেদের কারণে মাথায় হাত বেনারসি শাড়ি শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগর ও ব্যবসায়ীদের।  

১১ নম্বর বাজারের ঢাল বলে পরিচিত এলাকায় রয়েছে প্রায় অর্ধশত বেনারসি শাড়ির দোকান। মিরপুর-১০ নম্বরের বেনারসি মার্কেট পরিচিত পাওয়ার আগে এটিই ছিল মূল বেনারসি মার্কেট। এছাড়াও মিরপুর ১০ নম্বরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বেনারসি এবং হাতের কাজ করা শাড়ি যায় এই ১১ নম্বর থেকেই।

এদিকে চলছে ‘বিয়ের মৌসুম’। শাড়ি-লেহেঙ্গার ব্যবসায়ীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই সময়ে এমন অভিযানে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে বলে দাবি এখানকার ব্যবসায়ী, কারিগর ও শ্রমিকদের। এসব দোকানে চাকরি করা বা দোকানের জন্য শাড়ি তৈরি করা অত্র এলাকার অনেকেরই বংশগত পেশা। নিজেদের বাড়ি-ঘর, দোকানপাট ভেঙে যেতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন নারী-শিশুরাও।

উচ্ছেদে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া স্থানীয়রা বলছেন, এখানে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ শাড়ির দোকান ও কারচুপির কারখানা আছে। এসব প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভরশীল ছিলেন প্রায় দুই হাজার মানুষ। 

জিয়া সিল্ক হাউজ নামক একটি দোকানের মালিক আমিন উদ্দিন বলেন, করোনার পর বাজারটা আবার চাঙ্গা হচ্ছিল। এই দোকান আমার বাবা শুরু করেছিলেন। এই দোকানের উপর নির্ভর করেই আমাদের পরিবার চলেছে, আমি বড় হয়েছি এবং দোকানে ৬ জন কর্মী কাজ করেন। দোকানে নিয়মিত শাড়ি বানিয়ে দেন এখানকারই অনেক কারিগর। আমরা সবাই একরকম পথে বসে গেলাম। 

সোহেল রানা নামের এখানকার এক কারিগর বলেন, আমি ছোটবেলা থেকে কারচুপির কাজ শিখছি। আমার বাপে মায়েও তাই করত। এখন সব দোকান ভাইঙ্গা দিছে। মানে আমরা বেকার হইয়া গেলাম। কোথায় শাড়ি বানামু আর কোথায় বেচুম? আমরা এখন কী করুম? 

দোকান ভেঙে দেওয়ায় বিভিন্ন খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে পাওনা টাকা উদ্ধারেও বেগ পেতে হবে বলে মনে করছেন এখানকার পাইকারি শাড়ি ব্যবসায়ীরা। 

বাবুল শাড়ী হাউজের কর্ণধার বাবুল মিয়া বলেন, আমাদের ব্যবসা চলে অনেকখানি বাকিতে। কিছু মাল নিলে অর্ধেক টাকা দেয়, আবার পরের বার মাল নিতে আইস্যা আগের টাকার কিছু শোধ করে। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় আমাদের বানানো শাড়ি অথবা ভারত থেকে আমদানি করে আনা শাড়ি যায়। মার্কেটে এমন অনেক টাকা পড়ে আছে। এখন যখন আমরা আর মাল দিতে পারুম না তখন আগের টাকা কেমনে উঠামু? আবার আমাদের কাছ থেকে যারা মাল নিত তাদের এখন শাড়ি দরকার, ওয়েডিং সিজন। তারা অন্যদের কাছ থেকে শাড়ি নেওয়া শুরু করলে আমাদের এই ব্যবসাই শেষ হয়ে যাবে। 

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ