বৃহস্পতিবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১
Online Edition

সংবাদপত্র প্রসঙ্গে কিছু কথা

আবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন: সংবাদপত্র সমাজের দর্পণ। দর্পণে যেমন নিজের চেহারা দেখা যায়, তেমনি দেশ, জাতি, সমাজ এমনকি সমকালীন বিশ্বের চলমান ঘটনা, জীবনযাত্রা, চিন্তাচেতনা, জাতীয় স্বার্থে দিক নির্দেশনা সংবাদপত্রের পাতায় ছাপা হয়।

সংবাদপত্র পৃথিবীকে মানুষের মুঠোর মধ্যে এনে দিয়েছে। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, মানবাধিকার উন্নয়নে ও নাগরিক অধিকার সংরক্ষণে, গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিতকরণে সাংবাদিক এবং সংবাদপত্রের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। এক কথায় ‘সংবাদপত্র হলো আজকের সমাজের অভিভাবক। এছাড়া সংবাদপত্রকে গণতন্ত্রের মুখপাত্র ধরা হয়। কেননা এখানে পক্ষে বিপক্ষে সকলের সংবাদ স্থান পায়।

সংবাদপত্র এমন একটি দলিল যা যুগ যুগ ধরে সংরক্ষণ করে রাখা যায়। সংবাদপত্র মূলত পাঠকের জন্য, নাগরিকদের সার্বিক দিক নির্দেশনা ও জ্ঞান অর্জনের যত উপায় আছে, তার মধ্যে সংবাদপত্রের স্থান সর্বাগ্রে। সংবাদ সংশ্লিষ্ট মানুষগুলোর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলই সংবাদপত্র। আর পরিশ্রমী লোকগুলোই সাংবাদিক।

আপনি আমি আমরা সবাই সাংবাদিক। যিনি যেখানে যখন যেভাবে থাকেন তিনি তখন সেখান থেকে যে খবর বলতে পারেন তাই সংবাদ। তাই ঐ সময়ের জন্য তিনিই সাংবাদিক। সাংবাদিক আপনি বা আমির মধ্যে লুকায়িত। আমাদের প্রেরণা ও প্রত্যয়ে একজন সংবাদকর্মী নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত করে। সমাজের প্রতিটি মানুষই সাংবাদিক। কারণ তার চারপাশে যা ঘটে তা সে দেখে শোনে। শুধু ব্যবধান সবাই সংবাদপত্রে পাঠায়না, প্রকাশও করেনা।

জনমত গঠনে সাংবাদিক এবং সংবাদপত্রের প্রভাব সবচেয়ে বেশি, তবুও সাংবাদিকতা একটি ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। কেননা সাংবাদিক এবং সংবাদপত্র হচ্ছে গোপনীয়তার শত্রু। যেখানেই সমাজ বিরোধী দুর্নীতিবাজ স্বার্থান্বেষী অশুভ চক্রের ষড়যন্ত্র সেখানেই সাংবাদিক সে সব ফাঁস করে দেয়।

যখন আপনি নিজের পরিবেশ সম্পর্কে দু'কলম লিখবেন তখনই আপনি সাংবাদিক। একজন সাংবাদিক যেখানে থাকবে সেখানকার মাটিও কথা বলবে। বহু মানি অফিসারকে দেখেছি হাসতে হাসতে বলেছেন আপনারাতো আবার সাংবাদিক সব কিছু লেখবেন না কিন্তু,,, আপনাদের সামনে কথা বলতেও ভয় হয়। কথাটা হাসিমূলক না, এটা খুব তাৎপর্যময় ও গুরুত্বপূর্ণ কথা। আপনার চোখ তখন ক্যামেরা হবে। আপনার কলম তখন সত্যের সৈনিক হবে। সমাজের পুল কালভার্ট যেমন আপনার লেখায় নির্মিত হবে তেমনি সমাজের অন্যায়ও বন্ধ হবে। অত্যাচারী লোকগুলো লেজ গুটিয়ে পালাতে বাধ্য হবে। বাল্যবিয়ের কথাই ধরুন, একটু চেষ্টাতেই বেশ সমাধান, শুধু সমাজের কেউ না কেউ প্রশাসনকে বলে দিবে এই ভয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। নারী নির্যাতনও একই রকম। শুধু ধর্ষণটা কমেনি। এর কারণ বহু অভিভাবক ছেলে মেয়েদেরকে বন্ধুদের সাথে মানসিক প্রগ্রেস হওয়ার জন্য আডডা দেয়ার সুযোগ দিয়ে থাকে। আর আড্ডাটা কেমন ওরা কি করে সেই খোঁজ খবরও নেয়না। বিপদ এসে গেলে অভিযোগ করে বন্ধুদের বিরুদ্ধে।

কেন সাংবাদিক হবেন?

এটা প্রত্যেকে নিজেকে প্রশ্ন করলে উত্তরটা ভালো আসবে। আমার জন্যই আমি সাংবাদিক। একজন সাংবাদিক যদি ভাবেন বিপদ থেকে বাঁচার জন্য একটি কার্ডধারী সাংবাদিক হতে চান, তাহলে আপনি বিপদে পড়বেন। কারণ সাদা কাপড়ে ময়লা লাগে বেশি। প্রশাসনের কেউ যদি সাংবাদিকের অপরাধ খুঁজে পায় তাহলে তো হলোই। তবে মনে রাখবেন কার্ডের কারণে আপনার সম্মান যেমন বেশি আপনার শত্রুও বেশি। আরেকজন সাংবাদিকও আপনাকে আটকাতে চাইবে।

আপনার ইচ্ছে যদি হয় এক সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের জন্য আপনি সাংবাদিক হবেন। তাতে আপনিও সুন্দর হয়ে ওঠবেন।

একজন সাংবাদিক ঘরে বাইরে সবখানে সাংবাদিক। আপনার চোখ দশ দিকে দশটি। একটি বই পড়বেন একটি চোখ বৃদ্ধি হবে। একটি সংবাদপত্র পড়বেন দুটি চোখ বেড়ে যাবে। সাংবাদিকতায় আপনার অভিজ্ঞতা আপনার প্রশিক্ষণ। মাঝে মধ্যে বিখ্যাত সাংবাদিকদের জীবনী পড়বেন দেখবেন বিচিত্র অভিজ্ঞতায় তাদের জীবন বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠেছে। এটা এক ধরনের এডভেঞ্চার। এখানে কষ্ট, বিরক্তি, হুমকি যেমনি আছে তেমনি এখানে রোমাঞ্চ আছে। আছে ভ্রমনের মজাও। রাতে বিরাতে ডাক্তারের মতো দৌড়ে পৌঁছতে হয় নির্দিষ্ট স্থানে।

সাংবাদিকতা পেশার গুরুত্ব,

যারা সাংবাদিকতাকে একটি মহান পেশা হিসেবে বিবেচনা করেন, তাদের কাছে এটি মহান আদর্শ বলে বিবেচিত হয়। দল ও দলীয় নেতা ভুল করলে তারা তাও তুলে ধরেন। দলীয় আনুগত্যের চেয়ে দেশপ্রেমকে বড় করে দেখা হয়। পেশা হিসেবে সাংবাদিকতা বর্তমান প্রজন্মের অন্যতম পছন্দের। কারণ সাংবাদিকতার মাঠ এখন অনেক বিস্তৃত। এখানে রয়েছে অনেক সম্মান। সম্মানীও কম নয়। আগে সামান্য পড়াশোনা করলেই সংবাদ প্রেরণের জন্য মনোনীত হতে পারতেন এখন তা সম্ভব নয়। এখন একাডেমিক সনদের পরও সৃজনশীল ব্যক্তিরা টিকে থাকতে পারেন এ পেশাতে। তবে কোনো কোনো পত্রিকা ইচ্ছাকৃতভাবে বেতন ভাতা আটকে রাখলে "কুইনিন জ্বর সারাবে কিন্তু কুইনিন সারাবে কে?”

এখানে পদগুলো পর পর গুরুত্বপূর্ণ। যেমনঃ সম্পাদক, উপ-সম্পাদক, সহকারী সম্পাদক, নগর ও বার্তা সম্পাদক, সাহিত্য ধর্ম ও সৃজনশীল বিভাগীয় সম্পাদক, সিনিয়র রিপোর্টার, বৈদেশিক সংবাদদাতা, মফস্বল সংবাদদাতা, সাব এডিটর, ক্রীড়া সাংবাদিক, চিত্র সাংবাদিক, চীফ মেক আপম্যান এবং প্রুফ রিডার।

একটি ম্যাগাজিন বা পত্রিকা বের করা যে কত কঠিন তা যারা করেছেন তারাই জানেন। বার্ষিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক, পাক্ষিক, সাপ্তাহিক এবং দৈনিক ছাড়াও বিভিন্ন সাময়িকী প্রকাশিত হয়। দৈনিকের মজাই আলাদা, যারা পাঠক তারা রাত পোহাবার সাথে সাথে খবরের কাগজটি হাতে পেতে চান। ঢাকার লোকেরা ভোর হলেই পেপার পেয়ে যান কিন্তু গ্রামের লোকেরা তা পাননা। এক সময় ঢাকায় বিভিন্ন দেয়ালে পেপার লাগিয়ে দেয়া হতো, পাঠক দাঁড়িয়ে পাঠ করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতেন।

একজন সাংবাদিক জাতির বিবেক। শিক্ষক নির্দিষ্ট গন্ডিতে রেখে নির্দিষ্ট বইয়ের আলোকে নির্দিষ্ট বিষয়ের জ্ঞান দান করেন, আর সাংবাদিক সমাজের বিভিন্ন সমস্যা সুবিধাগুলোকে আপনার চোখের সামনে তুলে ধরেন। ভালো সাংবাদিক হতে চাইলে বই পড়তে হবে প্রচুর। যার যত বেশি জ্ঞান তিনি তত বেশি সফল হবেন। যিনি যত বেশি পরিশ্রমী তিনি তত প্রভাবশালী হবেন। একজন মাঠ পর্যায়ের সাংবাদিক মেধার গুণে অফিসের একটি চেয়ার পাওয়াটা অবাকের কিছু নয়।

সাংবাদিকতায় সততা থাকলে শক্তি এসে যোগ হয়। সততা এক ধরনের অস্ত্র। সততা এক ধরনের আলো, এ আলো কাউকে জ্বালিয়ে দেয় কাউকে আলোকিত করে। এ আলো নিভিয়ে দিতে শত্রু তৈরি হয়। সে শত্রুরা সততার কাছে পরাস্ত হয়। যিনি যে এলাকার সাংবাদিক তিনি সেই এলাকার একজন সমালোচকও বটে। তার ভালো কাজে তাঁকে সেই এলাকার সর্বস্তরের লোক সহযোগিতা করবেন এটাই স্বাভাবিক। এসব ঝামেলার কারণে উচ্চশিক্ষিত লোকেরা এ পেশায় আসতে চায়না।

সংবাদপত্রকে অবশ্যই বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করতে হবে। তা না হলে সেই সংবাদ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবেনা। পাঠক আশা করে সঠিক সংবাদ। সংবাদপত্রে এমন কোন সংবাদ প্রকাশ করা যাবেনা, যা জনগণকে বিভ্রান্ত করে। সংবাদপত্র যেমনি দেশের উন্নয়ন কর্মকা-ের খবর সঠিকভাবে তুলে ধরবে। তেমনি কারো দোষ ত্রুটির কারণে যদি জাতি বা দেশের জন্য হয় তখন তাও জাতিকে সংশোধনের লক্ষ্যে তা প্রকাশ করতে হবে, এই প্রত্যাশা সকলের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ