বৃহস্পতিবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১
Online Edition

স্বাধীনতা অন্বেষণে সম্পাদক কাজী নজরুল ইসলাম

মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন: সংবাদপত্রের ইতিহাস একেবারে নতুন নয়। মধ্যযুগের শেষের দিকে ইউরোপে এর গোড়াপত্তন হলেও প্রাচীন সমাজে এর অস্তিত্ব ছিল বলে কেউ কেউ মনে করেন। তবে অস্টাদশ শতাব্দীতে বৃটেনে এর ব্যাপকতা ছিল যেকোন সময়ের চেয়ে চোখে পড়ার মত। এসব পত্রিকা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিকড় ছড়ানো অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে ছিল সোচ্চার। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের বিষয়েও ছিল তাদের অন্যতম অগ্রণী ভূমিকা।

রাজনৈতিক চিন্তাচেতনা থেকে শুরু করে সাহিত্য বিকাশ ও গণজাগরণ সৃষ্টির ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের ভূমিকা কোন সময়ই উপেক্ষণীয় নয়। জনগণকে দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ ও বিপ্লবী জাগরণ তৈরি এবং যে কোন আন্দোলনে সাধারণ জনতাকে সম্পৃক্ত করতে সংবাদপত্রের রয়েছে সোনালী অতীত। 

বৃটিশ আমলে এদেশেও পত্রিকা ও সাময়িকী ধীরে ধীরে পথচলা শুরু করে। প্রথমে বৃটিশরা তাদের চিন্তাচেতনাকে ছড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশে প্রকাশিত হতো। ধীরে ধীরে এদেশের বিবেকবান মানুষ বৃটিশ বিরোধী বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের অংশ হিসাবে বেশ কয়েকটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। 

অবিভক্ত বাংলায় কাঙ্গাল হরিনাথ, শেরে বাংলা আবুল কাসেম ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, মুজাফ্ফর আহমদ, কাজী নজরুল ইসলাম, মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন,  তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াসহ বেশ কয়েকজন খ্যাতিমান সাংবাদিক ও রাজনৈতিক এবং সাহিত্যিকও দেশের মুক্তির জন্য অসংখ পত্রিকা প্রকাশ করেন। এদের মধ্যে কাঙ্গাল হরিনাথ ও কাজী নজরুল ইসলাম সাংবাদিকতার মাধ্যমে বিপ্লবী ধারার সূচনা করলেন। 

কাজী নজরুল ইসলাম মোট চারটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন। প্রথমত, দৈনিক নবযুগ,; দ্বিতীয়ত, অর্ধ-সাপ্তাহিক ধূমকেতু; তৃতীয়ত, সাপ্তাহিক লাঙল এবং সর্বশেষ, দৈনিক নবযুগ (নবপর্যায়)।

‘নবযুগ’ পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতা জগতে কাজী নজরুল ইসলাম প্রবেশ করেন। এ পত্রিকার মাধ্যমে “অত্যাচারী বিদেশী শাসক, দেশীয় তোষামদকারী ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে শক্তিশালী ও শাণিত সম্পাদকীয় লিখে শাসকদের ভিত কাঁপিয়ে তোলেন।”১ ১৯১৭ সালে রাশিয়ার বিপ্লব, কামাল আতাতুর্ক-এর  নেতৃত্বে তুর্কী বিপ্লব এবং সেসময়ে আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা সংগামের ফলে তিনি অনুপ্রাণিত হন এবং সংবাদপত্র গণমানুষের চিত্তে নাড়া দিতে পারে বলেই তাঁর এমন উদ্যোগ। বারবার নিষিদ্ধ হবার পরও তিনি একমাত্র সম্পাদক সাহসীকতার সাথে বৃটিশ রুখে দেয়ার শপথ নেন। “বাঙালির আর্থ-সামাজিক, মানবিক বিপর্যয়ে গভীরভাবে মর্মাহত নজরুল মানসে বাঙালির পরাধীনতা থেকে মুক্তির দ্যোতনা ক্রিয়াশীল ছিল। তিনি শোষণের শৃঙ্খল ভাঙার প্রত্যয়ে যেমন অগ্নিঝরা কবিতা লিখেছেন তেমনি সাংবাদিকতার মাধ্যমে গণমানুষকে একত্রিত করতে সম্পাদকীয় লিখেছেন।”১  

নজরুলের সাংবাদিক যুগের পরিচয় দিতে গিয়ে আতোয়ার রহমান লিখেছেন, 

“সাংবাদিকতার জগতে নজরুলের আবির্ভাব উপমহাদেশের এক ক্রান্তির যুগে। প্রথম মহাযুদ্ধের কুম্ভীপাকে পড়ে ইংরেজ সরকার প্রাণ বাঁচানোর জন্য যেসব মধুর বাণী উচ্চারণ করেছিলো, সংকট কাটাবার পর তা ভুলতে তাদের বেশি সময় লাগেনি, - তাদের গোত্রের লাগবার কথাও নয়। কিন্তু শ্রোতার কি উপায়? তার পক্ষে তো নিজের কানকে অবিশ্বাস করবার উপায় ছিলো না। দেশের বিশিষ্ট রাজনীতিকরা তাই পথের নির্দেশ চান নিজেদের বিশ্বান আর বিবেকের কাছে। অন্য দিকে, উনবিংশ শতকের শেষ ভাগে শিবনাথ শাস্ত্রী প্রমুখ প্রতিনিধিরা ‘ইংরেজের চাকরি করবো না’ ইত্যাদি বলে যে আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন, নানান ঘাট পেরিয়ে প্রথম মহাযুদ্ধের পর তা রূপ নেয় উদ্দাম জোয়ারের। তলে তলে কখন আয়োজন শেষ হয়, সবার তা জানবার কথা নয়। কিন্তু হাল শতকের সিকি ভাগ পেরুনোর আগেই দেখা যায়, দেশ গুপ্ত সমিতিতে প্রায় গেছে আর সেসব সমিতি দেশমায়ের পরাধীনতায় ব্যথিত। অথচ সাদা চোখে তাদের দেখা যায় না। যদিও তাদের কথা কানে আসে সহজেই  এবং বোমার  আওয়াজ হয়ে, পরাধীনতার বন্ধন মোচনের সংকল্প নিয়ে। নিষ্প্রয়োজনের উপস্থিতিতে বেদানার্ত এবং তাকে বাতিল করবার অভিলাষে বিদ্রোহী, নজরুলের পক্ষে সেই আওয়াজ শুনে নিশ্চুপ থাকা এমনিতেই সম্ভব ছিলো না। তার ওপর, ঠিক সেই সময়েই তিনি ফিরেছেন যুদ্ধ থেকে। পল্টনে নাম লেখানো থাকলেও যুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নজরুলের ছিল না। কিন্তু অভিজ্ঞতা অর্জনের প্রস্তুতিতে রক্তে যে চাঞ্চল্য জাগে, পল্টন ভেঙে গেলেও তা প্রশমিত হয়নি। আগেই তার খানিকটা আত্মপ্রকাশ করতে শরু করেছিলো সাহিত্যে। এবার বাকিটুকু দেখা দেখা যায় সাংবাদিকতায়।”২ 

 বৃটিশ ভারতে কোন জাত সাংবাদিকও কাজী নজরুল ইসলামের প্রতিভা ও সাহসিকতার কাছে ছিলেন নগণ্য। এ প্রসঙ্গে তাঁর দীর্ঘ দিনের সহযোগী ও ‘নবযুগ’ পত্রিকার অন্যতম উদ্যোক্তা এবং সম্পাদক মুজাফ্ফর আহমদের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য (এ পত্রিকার স্বত্বাধিকারী ছিলেন শেরে বাংলা একে ফজলুল হক।)। তাঁর মতে, 

“নিশ্চয়ই নজরুলের জোরালো লেখার গুণে প্রথম দিনেই কাগজ জনপ্রিয়তা লাভ করল। . . . দৈনিক কাগজে লেখার অভিজ্ঞতা আমাদের একজনেরও ছিলনা। নজরুল ইসলাম কোন দিন কোন দৈনিক কাগজের অফিসেও ঢোকেনি। তবু সে বড় বড় সংবাদগুলো পড়ে সেগুলোকে খুব সংক্ষিপ্তকারে নিজের ভাষায় লিখে ফেলতে লাগল। তা না হলে কাগজে সংবাদেও স্থান হয় না। নজরুলকে বড় বড় সংবাদের সংক্ষেপণ করতে দেখে আমরা আশ্চর্য হয়ে যেতাম। ঝানু সাংবাদিকরাও এই কৌশল আয়ত্ত করতে হিমশিম খেয়ে যান। তারপরে নজরুলের দেয়া হেডিংয়ের জন্যও ‘নবযুগ’ জনপ্রিয়তা লাভ করে।”১

কাজী নজরুল ইসলাম জানতেন যেকোন সমাজে উচ্চ শ্রেণির প্রতিনিধিরা যেকোন সমাজে নির্লিপ্ত। তারা রূপ পাল্টিয়ে সহজে শাসক শ্রেণির সান্নিধ্য লাভ করে। অন্যদিকে বৃটিশ ভারতে মধ্যবিত্ত সমাজ ইংরেজদের সাথে মিশে নিজেদের স্বার্থচরিতার্থ করার কাজে ব্যস্ত ছিল। ফলে স্বাধীনতা আন্দোলনের ফল আসছিলনা। এ বিষয়টি কাজী নজরুল ইসলামের দৃষ্টিতে ধরা পড়ে। যার ফলে ‘নবযুগ’ পত্রিকায় একের পর এক অগ্নিঝরা সম্পাদকীয় লিখেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ডায়ারের স্মৃতিস্তম্ভ, আবার তোরা মানুষ হ, নবযুগ, দেশ গেছে দুঃখ নাই, মুহাজিরিন হত্যার জন্য দায়ী কে?, বাংলা সাহিত্যে মুসলামান, উপেক্ষিত শক্তির উদ্বোধন, শ্যাম রাখি না কুল রাখি, সত্য শিক্ষা, জাতীয় শিক্ষা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি।

 ‘নবযুগ’ পত্রিকায় তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ “ধর্মঘট” প্রকাশ করেন। এ পত্রিকা মূলত কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের বঞ্চনার ইতিহাসকে সামনে এনে তাদের নায্য অধিকার আদাদের দাবি তুলেন। এ দাবির মাধ্যমে সমাজের প্রকৃত মানুষদের ঐক্যবদ্ধ করে তোলার কাজটি করেন এবং দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে প্রকৃত রাস্তায় চালিত করেন। 

তিনি ‘ধর্মঘট’ প্রবন্ধে কৃষক-শ্রমিককে সচেতন করার জন্য লিখেন, 

“নিজেরা ‘মজা-সে’ ভোগের মধ্যে থাকিয়া কুলি-মজুরের আবেদন নিবেদনকে বুটের ঠোক্কর লাগাইতেছেন। সবার অন্তরে একটা বিদ্রোহের ভাব আত্ম-সম্মানের স্থূল সংস্করণ রূপে নিদ্রিত থাকে, যেটা খোঁচা খাইয়া খাইয়া জর্জরিত না হইলে মরণকামড় কামড়াইতে আসে না। কিন্তু ইহাতে এই মনুষ্যত্বহীন ভোগ-বিলাসী কর্তার দল ভয়ানক রুষ্ঠ হইয়া উঠেন, তাঁহারা তখনও বুঝিতে পারেন না যে, এ অভাগাদের বেদনার বোঝা নেহাত অসহ্য হওয়াতেই তাহাদের এ-বিদ্রোহের মাথা ঝাঁকাননি। উন্নত আমেরিকা-ইউরোপেই ইহার প্রথম প্রচলন। সেখানে এখন লোকমদের উপরই শাসন প্রতিষ্ঠিত, এই গণতন্ত্র বা ডেমক্রেসিই সে দেশে সর্বেসর্বা; তাই শ্রমজীবী দলেরও ক্ষমতা সেখানে অসীম।”৩ 

পত্রিকায় এমন কড়া শব্দ লেখার ফলে বৃটিশ কুনজরে পড়ে পত্রিকা প্রকাশনে  নিষিদ্ধ হয়। 

উক্ত পত্রিকার অন্য একটি সম্পাদকীয়তে নজরুল বৃটিশ বিরোধী বিদ্রোহের যে সুর বাজিয়েছিলেন, তাও উল্লেখযোগ্য। নজরুল লিখলেন, 

“আজ যখন সমস্ত বিশ্ব মুক্তির জন্য, শৃঙ্খল ছিড়িবার জন্য উন্মাদের মত সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করিতেছে, স্বাধীনতা যুদ্ধের হোমানলে আবাল বৃদ্ধ-বণিতা দলে দলে আসিয়া নিজের হৃৎপি- উপড়াইয়া দিতেছে. . . তখনও, মুক্তির সেই, যুগান্তরের নবযুগেও, আমরা কিনা পলে পলে দাসত্বের মনুষ্যত্বহীন আত্মসম্মানশূন্য ঘৃণ্য কাপুরুষের মত অধোদিকেই গড়াইয়া চলিতেছি। ... বড়ই দুঃখ বুকে বজ্র হানো প্রভু, যদ্দিনে না ভাঙছে মোহ-ভার। ... দেশের পক্ষ হইতে আহ্বান আসিয়াছে। . . . দেশ তোমার বলিদান চাহিয়াছে. . . তোমার যতটুকু শক্তি আছে প্রয়োগ কর. . . তোমার বিবেকের কাছে অগাধ শান্তি পাইবে।. . . অন্যে জাহান্নামে যাইবে বলিয়া কি তুমিও তার পিছু পিছু সেখানে যাইবে?”২

পূর্বেই উল্লেখ করেছি উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা যখন ব্যক্তি তথা শ্রেণি স্বার্থের জন্য দেশ মাতৃকার কথা ভুলে গেছে এবং তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় নিম্ন আয়ের মানুষদের বিদেশীরা শোষণ করেছে। তাই এসব শোষিত মানুষের পক্ষে কথা বলার মানুষ ছিলনা। কিন্তু কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন ব্যতিক্রম। সাহিত্য ও সংগীতের মাধ্যমে যেমন জনসচেতনা  তৈরি করছিলেন তেমনি পত্রিকার মাধ্যমেও। বিশেষ করে পত্রিকার আবেদন অন্য কিছুর চেয়ে একটু বেশি ছিল। 

‘উপেক্ষিত শক্তির উদ্বোধন’ শীর্ষক সম্পাদকীয়তে নজরুল আরো ঝাঁঝালো বাণী উচ্চারণ করেন। তিনি লিখলেন, 

“এই হতভাগাদিগকে ... অবহেলা করিয়া চলিয়াছি বলিয়াই আমাদের এত অধঃপতন; তাই আমাদের দেশে জনশক্তি বা গণতন্ত্র  গঠিত হইতে পারিতেছে না . . . যা একবার আমাদের এই জনশক্তিকে উদ্বুদ্ধ করিতে পারো, তাহাদিগকেও মানুষ বলিয়া, ভাই বলিয়া, ভাই বলিয়া, কোল দিবার উদারতা থাকে. . . তাহা হইলে দেখিবে, তুমি শত বৎসর ধরিয়া প্রাণপণে চেষ্টা সত্ত্বেও যে কাজ করিতে পারিতেছে না, এক দিনে সে কাজ সম্পন্ন হইবে।”৪

নজরুল যখন ‘নবযুগ’ সম্পাদনা করেন, তখন অবিভক্ত ভারতে বৃটিশ বিরোধী নানা আন্দোলন চলছিল। বিশেষ করে মুসলিম নেতাদের ডাকে খেলাফত আন্দোলন। এ আন্দোলনের তীব্রতার কারণে বৃটিশ রাজ সিংহাসন প্রায় ভেঙে পরছিল। ঠিক সে সময়ে বৃটিশ ডাকাতদের আক্রমণের তীব্রতা এতো বেশি ছিল যে অনেক মুসলিম নেতা বৃটিশ নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে স্বেচ্ছায় আফগানিস্তানে নির্বাসিত হয়েছিলেন। এসব মুহাজিরদের উপর বৃটিশ সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনে বহু মুহাজির নিহত হন। এই হত্যাকা-ের বিরুদ্ধে ‘নবযুগ’ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে জোরালো প্রতিবাদ করেন। তিনি লিখলেন, “মুজাহিরিন হত্যার জন্য দায়ী কে?”১৪ সংবাদের শিরোনাম রচনাতেও নজরুলের বিশেষত্ব উল্লেখযোগ্য। ইরাকের রাজা ফয়সুলের বিরুদ্ধে বৃটিশ সা¤্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সংবাদের শিরোনাম লেখেন রবীন্দ্রনাথের গানের কলি ব্যবহার করে। ‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার/পরণসখা ফয়সুল হে আমরা।’ নবযুগে লেখা নজরুলের অসাধারণ একুশটি সম্পাদকীয় প্রবন্ধ পরে ‘যুগবাণী’ নামে বইয়ের আকারে ছাপা হয়।১৫

উপরোক্ত সম্পাদকীয়তে তিনি যা লিখেছেন তা আজও স্বাধীন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এদেশে আজ বৃটিশ বা পাকিস্তানিরা শাসন না করলেও উচ্চবিত্ত ও আমলাদের চাপে কৃষক-শ্রমিক পিষ্ট। স্বাধীনদেশে মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণা নজরুলের এসব বিপ্লবী ভাষা হতে পারে। 

ঔপরিবেশিক শাসনের চাপে একপর্যায়ে ‘নবযুগ’ পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়। পত্রিকা বন্ধ হলে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও মুজাফ্ফর আহমদ তেমন আগ্রাসনের শিকার না হলেও কাজী নজরুল ইসলাম নানামুখী ষড়যন্ত্র ও  নির্যাতনের শিকার হোন। কিন্তু তিনি থেমে থাকার পাত্র নন। ফলশ্রুতিতে সাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’ প্রকাশ করেন। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার প্রকাশনা সম্পর্কে রাজীব হুমায়ূন বললেন, 

“’নবযুগ’-এর মাধ্যমে ‘নবযুগ’ আনতে চেয়েছিলেন, আকরাম খাঁন ‘সেবক’-এর মাধ্যমে দেশের সেবা করতে চেয়েছিলেন নজরুণ। ‘সেবক’-এর ব্যবহারে দারুণ ব্যাথিত হলেন তিনি। মনে মনে ভাবলেন আবার পত্রিকা বের করবেন - দৈনিক, সাপ্তাহিক, অর্ধ সাপ্তাহিক যাই হোক। বন্ধু মুজাফ্ফর আহমদকে মনের কথাটি জানালেন। বললেন, অসহযোগ টসহযোগ দিয়ে হবে না। এই ভীরু জাতীকে জাগাতে হলে আঘাত করতে হবে - প্রবল আঘাত। দেশের নেতারা দূরবীন লাগিয়ে ‘স্বরাজ’এর স্বপ্ন দেখছেন। আমি স্বরাজ টরাজ বুঝি না। আমি বুঝি দেশের এক ইঞ্চি ভূমিও বিদেশীদের দখলে থাকতে পারবে না - আমার পত্রিকায় আমি এসব কথা বলব - আর পত্রিকার নাম দেব ‘ধূমকেতু’। মুজাফ্ফর আহমদ যথারীতি বন্ধু নজরুলকে উৎসাহিত করলেন। সাংবাদিকতার আকাশে ধূমকেতু উঠেছিল ১৯২২ সালের ১১ আগস্ট রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাণী নিয়ে। কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু/আয় চলে আয়রে ধূমকেতু আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু/দুর্দিনের ওই দুর্গশিরে/উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন। প্রায় দশ বছর পর নজরুল নিজেই লিখেছেন, ‘ধূমকেতুর আদি উদয় স্মৃতি’। তখন নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধের সক্রিয় ধূলোট উৎসব পুরা-মাত্রায় জমিয়া উঠিয়াছে। কারাগারে লোক আর ধরে না. . . পুলিশের পায়ে ধরিলেও সে আজ মারে না. . . দেশের নেতা, হবু নেতা সকলে যখন বড় বড় দূরবীণ লাগাইয়া স্বরাজের উদয় তারা খুঁজিতেছিলেন তখন আমার উপর শিবঠাকুরের আদেশ হল, এই আনন্দ রজনীকে শঙ্কাকুল করিয়া তুলিতে। আমরা  হাতে তিনি তুলিয়ে দিলেন, ‘ধূমকেতু’র ভয়াল নিশানা।

‘শ্রীঘ্রই প্রলয়ংকর ধূমকেতু দেখা দিবে হূঁশিয়ার হউন।’ প্রলয়ংকর ধূমকেতু আসিতেছে - খবরদার। এ ধরনের বিজ্ঞাপন বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছিল, নজরুল সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’র আবির্ভাব ঘটল রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাণী নিয়ে। প্রথম সংখ্যায় নজরুল লিখলেন, 

‘আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু/এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু।’ অর্ধ সাপ্তাহিক ধূমকেতুর প্রথম সম্পাদকীয় -সারথির পথে খবর, মাভৈ বাণীর ভরসা নিয়ে জয় প্রলয়ঙ্কর বলে, ‘ধূমকেতুকে রথ করে  আমার আজ নতুন পথের যাত্রা শুরু হলো। আমার কর্ণধার আমি। . . . দেশের যারা শত্রু, দেশের যা কিছু মিথ্যা, ভ-ামি, মেকী, তা দূর করতে ‘ধূমকেতু’ হবে আগুনের সমার্জনী। . . . ‘ধূমকেতু’ কোনো সাম্প্রদায়িক কাগজ নয়। মনুষ্য ধর্মই সবচেয়ে বড় ধর্ম। প্রথম সংখ্যায় বাণী পাঠিয়েছেন অমর কথা শিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কল্যাণীয়েষুঃ তোমাদের কাগজের দীর্ঘজীবন কামনা করিয়া তোমাকে একটি মাত্র আর্শীবাদ করি, যেন শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে নির্ভয়ে সত্যকথা বলিতে পার। তারপর ভগবান তোমার কাগজের ভার আপনি বহন করিবেন। ১২ আগস্ট অনেকের হাতে ‘ধূমকেতু’ দেখা গেল।”৫

 মুক্তিকামী মানুষের কাছে নজরুলের এ চড়া মেজাজ বেশ গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠল। এর প্রমাণ মেলে পত্রিকার সংখ্যার কাটতি দেখে। এ সম্পর্কে আবদুল আজি আল-আমানের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বললেন, “দেশের রাজনৈতিক আবহাওয়ার যখন একটা মন্থরতা এসেছিল, কেমন যেন একটা চুপ চুপ ভাব সকল উন্মাদনা ও উত্তেজনাকে গ্রাস করতে চাইছিল। কিন্তু দেশের অগণিত জনগণ সেটা চাইছিলেন না। হঠাৎ তাঁরা সবিস্ময়ে, ‘ধূমকেতু’র পৃষ্ঠায় অনুভব করলেন বহুযুগ বঞ্চিত সেই উত্তাল উত্তেজনা নির্গমনের বহির্মুখী বেদ। তাই আবির্ভাবের সঙ্গে সরঙ্গই ’ধূমকেতু’ তাঁদের হৃদয় জয় করে নিল।”৬

অতি অল্প সময়ে ‘ধূমকেতু’ সবার কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠে শোষিত মানুষের মুক্তি বাণী উচ্চারিত হবার কারণে। এ জনপ্রিয়তা দেখে অচিন্তকুমার সেনগুপ্ত লিখেছেন, 

“সপ্তাহান্তে বিকাল বেলা আরো অনেকের সঙ্গে জগুবাবুর বাজারের মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকি। হকার কতক্ষণে ‘ধূমকেত’র বা-িল নিয়ে আসে। হুড়োহুড়ি কাড়াকাড়ি পড়ে যায় কাগজের জন্য। কালির বদলে রক্ত ডুবিয়ে লেখা সেই সব সম্পাদকীয় প্রবন্ধ। . . . শুনেছি স্বদেশী যুগের ‘সন্ধ্যাতে’ ব্রহ্মবান্ধব এমনি ভাষাতেই লিখতেন। সে কী কশা, কী দাহ! একবার পড়ে বা শুধু একজনকে পড়িয়ে শান্ত করার মতো সে লেখা  নয়। যেমন গদ্য তেমনি কবিতা। সব ভাঙ্গার গান, প্রলয়বিলয়ের মঙ্গলাচরণ।৭

কাজী নজরুল ইসলাম আপাদমস্তক একজন স্বাধীনতাকামী লড়াকু সাহিত্যিক ও সাংবাদিক। ‘নবযুগ’ পত্রিকার মাধ্যমে জনসচেতনতা সৃষ্টির কাজ করেছেন এবং মানুষের চিন্তা চেতনার অসারতার কারণ নিরূপণের কাজ করেছেন। কিন্তু ‘ধূমকেতু’ সরাসরি স্বাধীনতার জন্য কাজ করেছে। ‘ধূমকেত’র সম্পাদকীয়তে তিনি ‘ভারত-বর্ষের’ পূর্ণ স্বাধীনতা দাবি করে বললেন, 

“সর্বপ্রথম ‘ধূমকেতু’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। স্বরাজ-টরাজ বুঝিনা, কেননা ও কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম ক’রে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশীর অধীন থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসনভার সমস্ত থাকবে ভারতীয়দের হাতে। তাতে কোন বিদেশীর মোড়লী করবার অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না। যাঁরা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এ-দেশে মোড়লী ক’রে দেশকে শ্মশান- ভূমিতে পরিণত করছেন, তাঁদের পাততাড়ী গুটিয়ে, বোঁচকা-পুঁটলি বেঁধে সাগর-পারে পাড়ি দিতে হবে। প্রার্থনা বা আবেদন নিবেদন করলে তাঁরা শুনবেন না। তাঁদের অতটুকু সুবদ্ধি হয়নি এখনো। আমাদেরো এই প্রার্থনা করার, ভিক্ষা করার কূটবুদ্ধিটুকু দূর করতে হবে।

পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হলে সকলের আগে আমাদের বিদ্রোহ করতে হবে। আর বিদ্রোহ করতে হ’লে -সকলের আগে আপনাকে চিনতে হবে। বুক ফুলিয়ে বলতে হবে, ‘আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারো কুর্ণিশ’। বলতে হবে, যে যায় সে, আমার হয়নি লয়।”৮

‘ধূমকেতু’তে নজরুলের উল্লেখযোগ্য সম্পাদকীয়গুলো হলো: রুদ্রমঙ্গল, ক্ষুদিরামের মা, আমি সৈনিক, ধূমকেতু, জাগরণী, রক্তাম্বর, ধারিনী মা, মোর্হরম, কামাল পাশা, আনন্দময়ীর আগমনে ইত্যাদি। সবগুলিতে ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে ক্রমাগত আঘাত এবং জনসচেতনতা তৈরি ছিল মূল লক্ষ্য। অন্য একটি সম্পাদকীয়তে তিনি ভারবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতা দাবি করেই ক্ষান্ত হননি। তিনি সশস্ত্র সংগ্রামেরও ডাক দিয়ে লিখেছেন, 

“তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নাই যে ভীষণ আঁধারে নিজের বুকের আগুন জ্বেলে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়?. . . যে বলতে পারে, ‘আমি আছি; সব মরে গেলেও আমি বেঁচে আছি; যতক্ষণ আমার প্রাণে ক্ষীণ রক্তধারা বয়ে যাবে ততক্ষণ আমি তা দেশের জন্য পাত করব।’ ওগো তরুণ, ভিক্ষা দাও, তোমার কাঁচা প্রাণ ভিক্ষা দাও।”২

অধ্যাপক লায়লা জামান নজরুলের ‘ধূমকেত’ পত্রিকার সম্পাদকীয় মূল্যায়ন করে লিখেলেন, “জাগো আমার হৃদয়ের সৈনিক, জাগো। বিশ্বময় রণডঙ্কা বেজে উঠেছে। বিশ্বময় কোটি কোটি প্রাণকে নীচে চেপে রাখবার শেষ চেষ্টা চ’লছে। দেশে দেশে পীড়িতের ক্রন্দন গুমরে গুমরে উঠছে কোটি কোটি চোখের জল জমাট হ’য়ে গেছে। ওঠো, আমার সুপ্ত সেনা, তুমি তোমার তপ্তশ্বাস নিয়ে ওঠো, বুকে তোমার প্রাণের আগুন জ্বালিয়ে দাও।”৯

একের পর এক সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক দিয়ে ‘ধূমকেতু’কে নিষিদ্ধ করে নজরুলকে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হলো। কিন্তু,

“ব্যর্থ হয়নি নজরুলের আহ্বান। স্বাধীন হয়েছে ভারতবর্ষ - জেল থেকে বের হয়ে আরো বেশি প্রতিবাদী হয়ে উঠলেন। জড়িয়ে পড়েন সক্রিয় সক্রিয় রাজনীতিতে। যুক্ত হলেন ‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ-সম্প্রদায়’ দলে। ১৯২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর এ পার্টির মুখপাত্র হিসেবে নজরুল ইসলামের পরিচালনায় এবং শ্রী মণিভূষণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদনায়  বের হলো ‘লাঙ্গল’ পত্রিকা। এখানেও নজরুলের সংগ্রামী ও সাংবাদিক প্রতিভা দেখতে পাই।’১০

‘ধূমকেতু’ প্রকাশের আড়াই মাসের মাথায় ১৯২২ সালের ৬ নভেম্বর ‘ধূমকেতু’ বন্ধের জন্য বৃটিশ বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়লো। গ্রেফপ্তারি পরোয়ানা জারি হলো ‘ধূমকেতু’র সম্পাদক কাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। প্রকাশক মুহম্মদ আফজালুল হককেও গ্রেপ্তার করা হলো।

কিন্তু নজরুলকে সে সময়ে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি কেননা তিনি বিহারে ছিলেন। পূর্ববঙ্গের মানুষ তাঁর জন্য উদ্বিগ্ন ছিলেন বলে তারা নজরুলকে পূর্ববঙ্গে আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু অবশেষে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেখান থেকে হুগলী জেলে আনা হলে রাজনৈতিক বন্দীদের উপর অমানবিক নির্যাতন দেখে তিনি অনশন শুরু করলেন। অনশন ভাঙার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে আহ্বান জানিয়ে লিখলেন, “অনশন ত্যাগ-করো- আমাদের সাহিত্য তোমাকে চায়।’১৬

চ-ীদাসের বিখ্যাত বাণী ও দর্শন “সবার উপর মানুষ সত্য/তাহার উপরে নাই।” শীর্ষক স্লোগন দিয়ে ১লা পৌষ ১৩৩২ বঙ্গাব্দে ‘লাঙল’ বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়, যা আর্বিভাব সংখ্যা হিসাবে স্বীকৃত। এখানে ‘লাঙল’ একাশের উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয় এভাবে, 

“যেখানে দিন দুপুরে ফেরিওয়ালি মাথায় ক’রে মাটি বিক্রি করে, সেই আজব শহর কলিকাতায় “লাঙল” চালাবার দুঃসাহস যারা করে, তাদের সকলেই নিশ্চিত পাগল মনে করছেন। কিন্তু এই পাষাণ শহরেই আমরা “লাঙল” নিয়ে বেরুলাম। এই পাষাণের বুক চিরে আমরা সোনা ফলাতে চাই। ব্রহ্মপুত্র ¯্রােত হিমালয়ে আটকে গেলে হলধর লাঙলের আঘাতে  পাহার চিরে সেই ¯্রােতকে ধারায় নামিয়ে ছিলেন। সেই জল কত প্রান্তর শ্যামল ক’রে তৃষিত কন্ঠের পিপাসা সিটিয়ে বাঙালা দেশকে বাঁচিয়ে রেখেছে। “লাঙলবন্ধ” আজ বাংলার তীর্থ। মহাত্মাগণের আন্দোলন আজ নেতাদের পাষাণ-পারি-পাশ্বিকে আটকে গেছে-তাই আজ আবার হলধরের ডাক দিয়েছে।

পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রয়োজনে শহরের সৃষ্টি হয়ে পল্লীমুখী বাংলার সভ্যতা ও সাধনা লোপ পেতে বসেছে। শাসন এবং শোষণের সহায়তার যন্ত্রস্বরূপে ভদ্র-সম্প্রদায় আত্মবিক্রয় ক’রে শহরে উঠে এসেছেন। গ্রামের আনন্দ উৎসব রোগ-শোকের চাপে লুপ্ত হয়ে গেছে। শহরের বেকার বাঙালি আজ বুঝছে গ্রাম ছেড়ে এসে তার কি নিরুপায় অবস্থাই হয়েছে। জমিদার আর গ্রামের সকল কর্মেও প্রাণস্বরূপে উপস্থিত নন- তিনি শহরে এসে বাস করে মদ-মাংস মেয়ে-মানুষ-মোটর মামলা এই পঞ্চমকারের সাধনায় নিযুক্ত আছেন। নায়েব গোমস্তার অত্যাচারে প্রজার প্রাণ ওষ্ঠাগত। মহাজনের হাতে জমির স্বত্ব চলে যাচ্ছে। গৃহহীন ভূমিহীন লক্ষ লোক সমাজের অভিশাপ নিয়ে শহরের দিকে ছুটছে - কলকারখানায় কতক ঢুকে নিজেদের সর্বনাশ করছে -আর কতক নানা হীন উপায়ে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা চালাচ্ছে। দেশে চুরি, ডাকাতি ও বলাৎকারের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

. . . 

এই “স্বরাজ’টা এখন হলে পাবে কে? যারা পাবে তারা নিজের হাতে যেটুকু দেয়ার ক্ষমতা এখনই আছে, তা সকলকে দিচ্ছে কি? আমরা স্বরাজের মামলা  আর এটর্নি দিয়ে করতে চাই না- এবার নিজেরাই বুঝতে হবে। মথুরার লীলা ঢের দেখেছি- আমাদের দেবতা যিনি তাঁকে বৃন্দাবনের শ্যামল মাঠে ফিরিয়ে আনতে চলেছি, তিনি বেণু বাজিয়ে সকলকে পাগল করেন। যদি সেই দেবতার আবাহনে কেউ  বাধা দেন, তবে আমাদের হলধর ঠাকুর তাঁকে রাখবেন না- লঙালের আঘাতে তাকে মরতেই হবে।

“লাঙল” চালিয়ে যিনি সীতাকে লাভ করেছিলেন, সেই জনক আমাদের গুরু। যিনি জনক তিনিই ঋষি। তিনিই সমাজের শ্রেষ্ঠ। আজ নব-জনকের নতুন-দর্শনে আমাদের জ্ঞানলাভ করতে হবে। ডিস্টিবিউটর হিসাবে জনকয়েক ভদ্রলোকের স্থান সমাজে আছে। ডাক্তারি, শিক্ষকতা, প্রভৃতির দ্বারা সমাজের সেবা করার জন্য লোকেরও প্রয়োজন আছে। কবি, চিত্রকর, শিল্পী হিসাবেও ¯্রষ্টার স্থান আছে। কিন্তু পরের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়ার ব্যবসাটা লোপ পাওয়া দরকার। শরীরের মধ্যস্থল বেশী স্ফীত হয়ে গেলে শরীরটা অচল হয়ে পড়বে। দুম্বার লেজ শরীর অপেক্ষা বড় হ’লে তখন লেজের মাংস খেলে দুম্বারই উপকার।

হিন্দুর বর্ণ-বিভাগ বিজ্ঞান সম্মত প্রণালীর উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল প্রতিযোগিতাকে এড়িয়ে শ্রমবিভাগনীতি মেনে পুরুষানুক্রম একই চর্চা করে সমাজের ক্রমোন্নোতি এই পদ্ধতির মূলে ছিল। এখন কিন্তু তাল গাছবিহীন তাল পুকুর হয়ে দাঁড়িয়েছে এই বর্ণ-বিভাগ।”১৪

‘লাঙল’-ও বিশেষ সংখ্যায় নজরুল লিখলেন, “ব্রাহ্মণ পাদরির রাজত্ব গিয়াছে। গুরু-পুরোহিত, খলিফা, পোপ নির্বংশ প্রায়। ক্ষত্রৈ স¤্রাট ও সাম্রাজ্য সব ধসে পড়েছে। রাজা আছেন নামে মাত্র। আমেরিকা, ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশে এখন বৈশ্যের রাজত্ব। এবার শুদ্রের পালা। এবার সমাজের প্রয়োজনে শুদ্রে নয়- শুদ্রের প্রয়োজনে সমাজ চলবে। হিন্দু-মুসলমান সমস্যা , ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণ সমস্যা সব লাঙলের ফালের মুখে লোপ পাবে। তাই আমরা সব লাঙলের জয় গান আরম্ভ করলাম। লাঙল নবযুগের নব দেবতা। জয় লাঙলের জয় -জয় লাঙলের দেবতার জয়।”২

‘লাঙলে’র সাফল্য সম্পর্কে আবু হেনা আবদুল আউয়াল লিখেছেন, 

“কাজী নজরুল ইসলাম পরিচালিত লাঙল এদেশের রাজনীতি ও সাংবাদিকতার জগতে এক নবযুগের সূচনা করে। এ পত্রিকার মাধ্যমে নজরুল বা লাঙল গোষ্ঠী কৃষক শ্রমিক তথা সর্বহার শ্রেণীর জাগরণ ও মুক্তির মন্ত্র প্রচার করেন যাতে করে তারা সমসাময়িক রাশিয়ার মতো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারে। বস্তুতঃ কমিউনিস্ট ভাবাদর্শ প্রচারে ও জনপ্রিয়করণে লাঙল পালন করেছে ঐতিহাসিক ভূমিক। কমিউনিষ্ট নেতা কর্মীরা যা করতে পারেননি নজরুল তাঁর পরিচালিত লাঙলের মাধ্যমে তার চেয়ে অনেক বেশি করেছেন।”১১

‘লাঙল’-এর পর ১৯৪১ সালের অক্টোবরে নজরুল আবার যুক্ত হলেন ‘নবযুগ’ পত্রিকা। এ কে ফজরলুল হক আবুল মনসুর আহমদকে দায়িত্ব দিতে চাইলেও তিনি নেননি। না নিয়ে নজরুলতে দিেিলন দু’টি কারণে। কারণগুলো “আমার নিজের একটা রাজনীতির জীবন ছিল। সেটা নষ্ট করতে  আমি প্রস্তুত ছিলাম না। দ্বিতীয়ত, যে উদ্দেশ্য প্রচারের জন্য হক সাহেব ‘নবযুগ’ বাহির করিলেন, সে উদ্দেশ্যের সহিত আমার পূর্ণ সহানুভূতি থাকলেও হক সাহেবের মতের স্থিরতায় আমার আস্থা ছিল না।”১২

‘নবযুগ’ নবপর্যায়ও ছিল নজরুলের শাণিত আঘাত। ‘ঈদের চাঁদ’, ‘আগুনের ফুলকি ছোটে’, ‘শ্রমিক মজুর’, ‘নারী’, ‘নবযুগের সাধনা’, ‘বাঙালির বাঙলা’, ‘আমার সুন্দর’ প্রভৃতি সম্পাদকীয় লিখলেন। ‘নবযুগ’ তৎকালীন প্রতিক্রিয়াশীলের বিরুদ্ধে ছিল বজ্রকন্ঠ। এ প্রসঙ্গে মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর লিখলেন, 

“নজরুলের সাংবাদিক ব্যক্তিত্ব কোন আলাদা সত্ত্বা ছিল না। তা ছিল তাঁর কবি ব্যক্তিত্বেরই সম্প্রসারিত রূপ। সেটাই প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর সাংবাদিক ব্যক্তিত্বে। সেজন্য নজরুল যখন যে কাগজেই কাজ করেছেন সেখানেই নজরুলের কবি সত্ত্বাই সবকিছু ছাপিয়ে প্রখরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

নজরুল যে আগাগোড়াই রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু নজরুলের কবিতা বা সাংবাদিকতায় কোন ক্ষেত্রে রাজনীতি উচ্চকন্ঠ-এ নিয়ে নানা মত আছে। অনেকের ধারণা, সংবাদপত্রের সংস্পর্শে এসে নজরুলের রাজনৈতিক চরিত্র স্পষ্টতা পেয়েছে। এই ধারণা যথার্থ নয়। বরং বলা যায়, রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনা স্পষ্টতরভাবে প্রকাশের  জন্যেই নজরুল সাংবাদিতকাকে পেশা হিসাবে নিয়েছিলেন। 

নজরুলের সাংবাদিক জীবনের বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করতে গেলে প্রধানত চারটি বিষয় আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়। যেমন, নির্ভীকতা, দেশপ্রেম, নীতিজ্ঞান ও মর্যাদাবোধ, এবং সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য আপোসহীন মনোভাব।

উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যসমূহ ছিল বলেই সাংবাদিক হিসেবে যথেষ্ট পূর্ব-অভিজ্ঞতার অভাব সত্ত্বেও নজরুল সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে  মৌলিক প্রতিভার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছিলেন, যা তাঁর সমসাময়িক অন্য কোন মুসলমান সাংবাদিকের পক্ষে সম্ভব হয়নি।”১৩

সামগ্রিকভাবে নজরুলের সম্পাদকীয-এর মূল্যায়ন করে বীরেন মুখার্জী যা বললেন তা প্রণিধানযোগ্য। তার মতে, 

“কবিতা, প্রবন্ধ, হাস্যকৌতুক ইত্যাদি মধ্য দিয়ে একদিকে শাসক শ্রেণির অত্যাচার, অবিচার ও শোষণ এবং অপরদিকে হিন্দু-মুসলমান সমাজের জড়তা, দুর্নীতি ও ভন্ডামির বিরুদ্ধেও কলম ধরেন নজরুল। সম্পাদকীয় প্রবন্ধ হিসাবে ধূমকেতুর প্রবন্ধগুলো অতিমাত্রায় কাব্য-গুণান্বিত। এগুলোতে আবেগের তুলনায় বিচার-বিশ্লেষণের উপস্থিতি কম হলেও দেশের যৌবন-রক্তে এইসব দুঃসাহসী ও নির্ভীক প্রবন্ধ যে আবেগ ও উদ্দীপনার অগ্নি সঞ্চার করেছিলেন তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। সংবাদের হেডিং প্রণয়নে মাঝে মাঝে রঙ্গ-ব্যঙ্গের ছোট ছোট কবিতা ও প্যারোডির ব্যবহারের ফলে সংবাদগুলো হতো উপভোগ্য ও সর্মস্পর্শী। কথ্যভাষায় আরবী, ফারসী, দেশী শব্দে নিপুণপ্রয়োগে সেগুলো হতে তীক্ষè ও প্রাণবন্ত। নিঃসন্দেহে বলা যায়, সাংবাদিক জীবনের নিষ্ঠা, কর্তব্যজ্ঞান, নির্ভীকতা ইত্যাদি মদগুণের দুর্লভ সমাবেশ ঘটেছিল নজরুলের মধ্যে। নবযুগ ও ধুমকেতু ছাড়াও স্বরাজ পার্টির মুখপাত্র ‘লাঙল’ ও ‘গণবানী’ পত্রিকায় নজরুল সাংবাদিকতা করেছেন। এরপর নজরুল দীর্ঘদিন পত্রিকা সম্পাদনা থেকে নিজেকে বিরত রাখেন। চল্লিশের দশকে অবিভক্ত বাংলার প্রধান পুরুষ একে ফজলুল হক ‘নবপর্যাযে নবযুগ’  প্রকাশ করলেও অনেক পীড়াপীড়ি ও আার্থিক সঙ্কটের কারণে নজরুল এ পত্রিকায় সাংবাদিকতা করতে সম্মত হন। ‘নবযুগ’ দিয়ে তার সাংবাদিকতা জীবনের শুরু হয় আবার এই ‘নবপর্যায়ে নবযুগ’ পত্রিকার মাধ্যমেই তার সাংবাদিকতার পরিসমাপ্তি ঘটে।”১

পরিশেষে একথা বলা যায় নজরুল তাঁর বহু প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন সাহিত্যে, রাজনীতি এবং সাংবাদিকতায়। কিন্তু তিনি ধ্যান-জ্ঞান সব ব্যয় করেছেন স্বাধীনতার জন্য। মানব মুক্তি তাঁর মূলমন্ত্র। কিন্তু আজ সাংবাদিকতা বহু দূরে তার লক্ষ্য থেকে। নজরুলের শাণিত সম্পাদকীয় আমাদের কর্ণগোচর হউক এটাই প্রত্যাশা। 

তথ্যসূত্র: 

১. বীরেন মুখার্জী, “কাজী নজরুলের সম্পাদকসত্তা”, দৈনিক জনকন্ঠ, ২৬ আগস্ট, ২০১৬, https://rb.gy/30akz0

২. আতোয়ার রহমান, নজরুল বর্ণালী, নজরুল ইনটিটিউট, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৪।

৩. কাজী নজরুল ইসলাম ‘ধর্মঘট’, নজরুল রচনাবলী, বাংলা একাডেমি, ঢাকা। 

৪. কাজী নজরুল ইসলাম, ‘উপেক্ষিত শক্তির উদ্বোধন’ , নজরুল রচনাবলী, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।

৫. ড. রাজীব হুমায়ূন, ‘নজরুলের লেখার গল্প, শেখার গল্প’, আগামী প্রকাশনী , ঢাকা।

৬. আবদুল আজি আল-আমান, ধূমকেতুর নজরুল , কোলকাতা। 

৭. অচিন্তকুমার সেনগুপ্ত, ‘কল্লোলযুগ’। 

৮. প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায়, ‘সাংবাদিক নজরুল’, কোলকাতা।

৯. লায়লা জামান, ‘নজরুলের অস্বাক্ষরিত রচনা’, সাহিত্য পত্রিকা, নজরুল জন্মশতবার্ষিক সংখ্যা, বিয়াল্লিশ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, কার্তিক ১৪০৫, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

১০. রাশেদুল আনাম, ‘সাংবাদিক আনাম’, নজরুল ইন্সটিটিউট পত্রিকা আটাশতম সংকলন, সম্পাদক রশীদ হায়দার, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা, জুন ২০১০: ১৩০-১৪০।

১১. আবু হেনা আবদুল আউয়াল, ‘নজরুলের সাংবাদিকতা’, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। 

১২. আবুল মনসুর আহমদ, আত্মকথা।

১৩. মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর, ‘কবি নজরুলের সাংবাদিক জীবন’, মুক্তধারা, ঢাকা। 

১৪. কাজী নজরুল ইসলাম, লাঙাল, শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ-সম্প্রদায় মুখপাত্র, নজরুলের লাঙল, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা, মে ২০০১: ৩-৪

১৫. ঊাবুল ভট্রাচার্য, ‘কাজী নজরুল ইসলাম : কবি ও সাংবাদিক’, https://bit.ly/3saRbFL

১৬. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘কাজীর কবিতা’, কাজী নজরুল ইসলাম জন্মশতবার্ষিকী স্মারকগ্রন্থ, আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত, এ্যাডর্নপাবলিকেশন, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০০১। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ