সোমবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

স্বপ্নের পদ্মা সেতু : দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির নতুন অবির্ভাব 

আব্দুর রাজ্জাক রানা: স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ধারাবাহিকভাবে উন্নয়নবঞ্চিত হয় খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চল। দেশের অপরাপর বিভাগীয় শহরগুলোর উন্নয়ন ধারাবাহিকতায় চরমভাবে ছিটকে পড়ে এ অঞ্চল। একপেশে উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনৈতিক আশির্বাদপুষ্ট উন্নয়নের ঘেরাটোপে খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চল হারিয়ে যায়। ক্রমেই খুলনার আর্থ-সামাজিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। শিল্প নগরীর ঐতিহ্য বিলুপ্ত হয়। দ্রুত বৃহৎ শিল্পগুলো বন্ধ হতে হতে খুলনা কার্যত একটি মৃতনগরীতে পরিণত হয়। এর ফলে খুলনার শিল্পের প্রাণস্পন্দন পুরোপুরিভাবেই বন্ধ হয়ে যায়। ঘটনাগুলো ঘটতে থাকে রাজনীতিকদের চোখের সামনে। লক্ষ মানুষ কর্মচ্যুত হয়। বন্দর এবং শিল্পনির্ভর অর্থনীতি মুখ থুবরে পড়ে। আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে চরম মন্দা দেখা দেয়। ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিল্পায়ন সকল কিছুতে এক চরম বিপর্যস্ত অবস্থার সৃষ্টি হয়। কিন্তু আশার কথা, এখন ক্রমেই অবস্থা পালটাচ্ছে। স্বপ্নের পদ্মা সেতুকে নিয়ে মানুষ আবার আশায় বুক বাঁধছে। দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। যোগাযোগ নেটওয়ার্ক সহজ ও সাশ্রয়ী হচ্ছে। খুলনা শিল্পের রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠার আবহ তৈরি হচ্ছে। এখন শুধু দরকার টার্গেট নির্ধারণপূর্বক বাস্তবসম্মত কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ ও স্বচ্ছতার সাথে তা বাস্তবায়ন।

পদ্মা বহুমুখী সেতুর রূপকল্প এখন বাস্তব। আগামী বছরের মাঝামাঝি সেতুটি খুলে দেয়ার পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত। সেতুর রেলপথও খুলে যাবে ঐ বছরের শেষের দিকে। মূলত দক্ষিণাঞ্চলের সাথে রাজধানী ঢাকাসহ মধ্যাঞ্চলের সরাসরি যোগাযোগের বন্ধন রচনা করেছে এ সেতু। পদ্মার প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা দূর করে এখন রচিত হয়েছে এগিয়ে যাওয়ার মহাসড়ক। এখন প্রশ্ন-এরপর কী, হোয়াট নেক্সট? পদ্মাসেতুর পরে কী?

এ বিষয়ে একটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া উচিত যে, পদ্মা সেতু শুধু একটি সেতুই নয়, এটি কার্যত বৈষম্যের জনপদ দক্ষিণাঞ্চলের মৌলিক উন্নয়নের সূতিকাগার যাকে প্রবহমান নদীর ‘মূল স্রোত’ বলা যায়। এ মূল স্রোতকে বেগবান রাখতে ‘আন্ত¯্রােতের’ আবির্ভাব ঘটাতে হবে। অর্থাৎ আন্তস্রোত হিসেবে আরও কিছু সহযোগী প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। তা’ হলে মূল স্রোতের স্থায়িত্ব এবং কার্যকারিতা নিশ্চিত হবে। অর্থাৎ পদ্মাসেতুর সবচেয়ে ভাল ফল (Optimum Result) পেতে হলে আরও কিছু প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। যেগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে ‘নতুন খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চল’ আর্বিভাব ঘটবে। উন্নয়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। ব্যবসা-বাণিজ্যে-শিল্পে-বিনিয়োগে-যাতায়াতে-যোগাযোগে এক নতুন যুগের সূচনা হবে। সার্বিক অর্থে দক্ষিণাঞ্চল পরিণত হবে আধুনিক বাংলাদেশের একটি বিকাশমান জনপদে।

পদ্মাসেতু প্রকল্পের সম্ভাব্যতা নিরীক্ষায় মোংলা বন্দর কার্যকরে এ সেতুর যৌক্তিকতা কি মাত্রায় হবে তা’ নির্ধারণে দেখা গিয়েছিল-পদ্মানদীতে সেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে মোংলার সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা গেলে বন্দর ব্যবহারের উপযোগিতা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। সে বিবেচনায় পদ্মাসেতু বাস্তবায়নের সমান্তরালে মোংলা পোর্টের সাথে রেল এবং সড়ক যোগাযোগ সহজ, সাশ্রয়ী এবং নির্বিঘœ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে রেলপথ নির্মিত হচ্ছে, রাজধানী ঢাকা হতে মাওয়া হয়ে ভাঙ্গা পর্যন্ত আন্তর্জাতিকমানের ও খুবই ব্যয়বহুল এবং উচ্চমানের সড়ক নির্মিত হয়েছে। কিন্তু ফরিদপুরের ভাঙ্গা হতে মোংলা পর্যন্ত মহাসড়কটি ৪ লেনে উন্নীতকরণের কাজ এখনও হাতে নেয়া হয়নি। যেটি খুব জরুরী এখনই। কারণ পদ্মাসেতু চালু হওয়ার পরপরই বিদ্যমান এ সড়কে যানবাহনের চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে অল্প সময়ের মধ্যেই। সে কারণে গাড়ির ভবিষ্যতের চাপ সামলাতে এবং পোর্টের চাহিদা বিবেচনায় এ প্রকল্পের কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরী। যার ফলে এই বন্দরের ব্যবহার বাড়বে। ফলশ্রুতিতে খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের সামাজিক এবং আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে এই সেতু বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর চেয়েও বেশি ভূমিকা রাখবে।

খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের সমন্বিত উন্নয়নে পদ্মাসেতুর ভূমিকা অগ্রগন্য হলেও এর সাথে ওতপ্রোতভাবে খুলনায় পাইপলাইনে গ্যাস এবং খানজাহান আলী বিমান বন্দর প্রকল্প দুইটির বাস্তবায়ন জড়িত। কারণ পাইপ লাইনে গ্যাস সরবরাহ প্রকল্পটির মাধ্যমে খুলনাঞ্চলে ব্যাপকভাবে গ্যাস সরবরাহের কার্যক্রম শুরু হলে সাশ্রীয় জ্বালানীর সুবিধা গ্রহণ করে এখানে বিদ্যমান শিল্পগুলোতে আবার প্রাণের সঞ্চার হবে। একই সাথে গ্যাসনির্ভর নতুন নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র, পাটশিল্প, বস্ত্রশিল্প, পোশাকশিল্প, সিরামিকসহ নানা ধরনের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের প্রসার হবে। শিল্পের শহর খুলনা আবার হারানো যৌবন ফিরে পাবে।

খুলনাঞ্চলে খানজাহান আলী বিমান বন্দর প্রকল্প বাস্তবায়নের গুরুত্ব অসীম। খুলনায় বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানো, মোংলা ইপিজেড, মোংলা সমুদ্র বন্দর এবং বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের পর্যটন শিল্পের প্রসারসহ রাজধানী ঢাকা ও বাণিজ্য নগরী চট্টগ্রামের সাথে সহজ যোগাযোগ সৃষ্টির জন্য খুলনার খানজাহান আলী বিমান বন্দর প্রকল্পটি খুলনার সমন্বিত উন্নয়নের অন্যতম সূচক। কারণ সহজ উন্নয়ন অবকাঠামো বর্তমান বিশ্বের প্রধান অগ্রাধিকার। দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই উন্নয়নের পশ্চাদভূমি হিসেবে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিস্থাপন উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে মনে করলে খুলনায় বিমানবন্দর প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। মোংলা পোর্টকে পদ্মাসেতুর মাধ্যমে ‘সড়ক পথে’ ও খানজাহান আলী বিমান বন্দরের মাধ্যমে ‘আকাশ পথে’ সরাসরি সংযুক্ত করতে পারলে এবং পোর্টের চলমান নাব্যতা সংকট নিয়মিত ব্যবস্থাপনায় আনা গেলে খুলনাঞ্চলে মোংলাপোর্টকেন্দ্রিক সমন্বিত যোগাযোগ নেটওয়ার্ক নিশ্চিত সম্ভব হবে। কারণ পদ্মাসেতু এবং মোংলা পোর্ট-এ দুটি স্থাপনা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে চমক দেখাতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমনি অবস্থায় দূরদর্শী পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তবায়নের ‘সেনাপতি’ খুঁজে পাওয়া গেলে বৈষম্যের জনপদে ‘নতুন খুলনার’ আর্বিভাব হবে।

বাস্তবায়নাধীন পদ্মাসেতুর কারণে দীর্ঘকালের উন্নয়নবঞ্চিত খুলনার সামনে এখন অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধির সুর্বণ সুযোগ হাতছানি দিচ্ছে। এ কারণে পদ্মাসেতুর পাশাপাশি শিল্পকারখানায় ব্যাপকভাবে পাইপ লাইনে গ্যাস সরবরাহ এবং বিমান বন্দর প্রকল্প দু’টিও বাস্তবায়ন এখন জরুরী হয়ে পড়েছে। এ কারণে সরকারের নীতিনির্ধারক মহল, খুলনাঞ্চলের রাজনীতিক এবং সুশীলসমাজসহ খুলনার সুষম উন্নয়নে বিশ্বাসী নেতৃবৃন্দকে ‘ভবিষ্যত খুলনা’ সাজাতে এখনই সুদূরপ্রসারী এবং সময়োপযোগী উন্নয়ন ভাবনায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।

সেতু বিভাগের সাবেক সচিব ও বর্তমানে জার্মানিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, এনডিসি তিনি তার এক প্রবন্ধে প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করেছেন, তিনি ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেতু বিভাগের সচিব পদে যোগদান করেন এবং উন্নয়ন সহযোগী, প্যানেল অব এক্সপার্টস, ডিজাইন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং পদ্মা সেতু প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে সেতু প্রকল্পের প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক কাজ যেমন-ডিজাইন প্রণয়ন, প্রিকোয়ালিফিকেশন দলিলপত্র ও টেন্ডার ডকুমেন্টস প্রস্তুত, উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর, জমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের পুনর্বাসনের জন্য পুনর্বাসন এলাকা স্থাপন ইত্যাদি কাজ এগিয়ে নিয়ে যান।

২০১১ সালের জুলাই-আগস্টে উন্নয়ন সহযোগী বিশ্বব্যাংক (লিড পার্টনার) প্রকল্পে কথিত দুর্নীতির অভিযোগ তোলে এবং সেপ্টেম্বর থেকে প্রকল্পের কাজ স্থগিত করে দেয়। সেপ্টেম্বরে বিশ্বব্যাংকের একজন ভাইস প্রেসিডেন্টসহ একটি প্রতিনিধি দল মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করলে প্রধানমন্ত্রী তাদের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিতে বলেন।

পানি অনেক দূর গড়ায়। বিশ্বব্যাংক কানাডীয় প্রতিষ্ঠান এসএনসি লাভালিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করে কানাডীয় রয়াল মাউন্টেড পুলিশের (আরসিএমপি) কাছে নালিশ করে। পরে তদন্ত করে আরসিএমপি কানাডীয় আদালতে মামলা করে।

২০১২ সালের ২৮ জুন বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রবার্ট জয়েলিক পদ্মা সেতুর ঋণ চুক্তি বাতিল করলে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীও প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ায়।

বিশ্বব্যাংককে পদ্মা সেতু প্রকল্পে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সরকার বিশ্বব্যাংকের কঠিন শর্তে রাজি হয়ে যায়। সেতু সচিব অর্থাৎ আমাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয় এবং যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে পদত্যাগ করানো হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত শুরু করে এবং বিশ্বব্যাংক নিয়োজিত তিন সদস্যবিশিষ্ট শক্তিশালী আইনজ্ঞ প্যানেলের চাপে কতিপয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করে।

বিশ্বব্যাংক দুদকের কাজে সন্তুষ্ট হয় না। তারা সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সাবেক প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমানের বিরুদ্ধেও মামলা করতে বলে। দুদক আমাকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠায়। সরকার আমাকে চাকুরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে। ৪০ দিন কারাভোগের পর আমি জামিনে মুক্ত হই।

কিন্তু বিশ্বব্যাংক প্রতিশ্রুতি মতো পদ্মা সেতুর কাজে ফিরে আসেনি। বিশ্বব্যাংকের গড়িমসির কারণে ২০১৩ সালের ৩১ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের ঋণ প্রত্যাখ্যান করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন। ২০১৫ সালে পদ্মা সেতুর কাজের উদ্বোধন এবং ২০১৭ সালে নদীর বুকে পদ্মা সেতুর প্রথম স্প্যান স্থাপিত হয়।

সর্বশেষ স্প্যানটি গত ১০ ডিসেম্বর বসানোর পর এখন বাকি রয়েছে সড়ক ও রেললাইন বসিয়ে রোড ও রেল ভায়াডাক্টগুলোর সঙ্গে সেতু সংযুক্তকরণ এবং যানবাহন চলাচলের উপযোগী করা। আশা করা যাচ্ছে, ২০২১ সালের মধ্যে যাবতীয় কাজ শেষ করে ২০২২ সালের প্রথমদিকে বা মাঝামাঝি সময়ে সেতুটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণের আত্মবিশ্বাসী সিদ্ধান্ত এবং তা বাস্তবায়নের সাফল্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয় এবং বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়।

বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের টানাপোড়েন, ঋণ স্থগিত ও দীর্ঘসূত্রতার ফলে পদ্মা সেতুর বাস্তব কাজ কয়েক বছর পিছিয়ে যায়। যেখানে ২০১৪ সালে পদ্মা সেতু নির্মাণ সমাপ্ত হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এ কাজ শেষ হবে ২০২১ সালে। কাজ শুরু ও শেষ করতে বিলম্ব এবং টেন্ডার প্রক্রিয়া সমাপ্তির পর সেতুর সর্বশেষ প্রাক্কলিত ব্যয় দাঁড়ায় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সব প্রকল্পেই ব্যয় বেশি হয়। কারণ নির্মাণসামগ্রী, যন্ত্রপাতি ও অভিজ্ঞ কারিগরি বিশেষজ্ঞ সেবা বিদেশ থেকে আমদানি ও ধার করতে হয়।

পদ্মা সেতু নির্মিত হলে বাংলাদেশে এর অর্থনৈতিক প্রভাব কী হবে, এ বিষয়ে সেতুর ডিজাইন পরামর্শক মনসেল-এইকম ২০১০ সালে এক বিশ্লেষণে বা স্টাডি রিপোর্টে সেতুর বেনিফিট-কস্ট রেশিও (বিসিআর) ১ দশমিক ৭ এবং ইকোনমিক ইন্টারনাল রেট অব রিটার্ন (ইআইআরআর) ১৮ শতাংশ উল্লেখ করে।

সেতু নির্মাণ ব্যয় যুক্ত হয়ে বিসিআর ২ দশমিক ১ এবং ইআইআরআর দাঁড়াবে ২২ শতাংশ। এর অর্থ হল, এ সেতু নির্মাণ অর্থনৈতিক বিবেচনায় লাভজনক হবে। দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ দূরত্ব ২ থেকে ৪ ঘণ্টা কমে যাবে।

রাজধানীর সঙ্গে সরাসরি সংযোগ সহজ হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে, কাঁচামাল সরবরাহ সহজলভ্য হবে এবং শিল্পায়নের প্রসার ঘটবে, অর্থাৎ ছোট-বড় নানা শিল্প গড়ে উঠবে এবং কৃষির উন্নয়ন হবে।

ডিজাইন পরামর্শক ছাড়াও বিশ্বব্যাংকের স্বাধীন পরামর্শক এবং সেতু বিভাগ নিয়োজিত পরামর্শক প্রতিষ্ঠানও সেতু নির্মাণের অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করেছে। এসব সমীক্ষা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সেতু নির্মাণের অর্থনৈতিক প্রভাবে দক্ষিণাঞ্চলের বার্ষিক জিডিপি ২ শতাংশ এবং দেশের সার্বিক জিডিপি ১ শতাংশের অধিক হারে বাড়বে।

আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, এ সেতু নির্মাণের ফলে দেশের সমন্বিত যোগাযোগ কাঠামোর উন্নতি হবে। দেশের দক্ষিণাঞ্চল ট্রান্স-এশিয়ান হাইওয়ে (এন-৮) ও ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে। ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সংযোগ স্থাপিত হবে।

সেতুর উভয় পাড়ে অর্থনৈতিক অঞ্চল, হাইটেক পার্ক ও প্রাইভেট শিল্পনগরী গড়ে উঠবে। বিনিয়োগ বাড়বে এবং বাড়বে কর্মসংস্থান। মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দর সচল হবে। পর্যটনশিল্পের প্রসার ঘটবে এবং দক্ষিণ বাংলার কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবন, ষাট গম্বুজ মসজিদ, টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর মাজার, মাওয়া ও জাজিরা পাড়ের রিসোর্টসহ নতুন পুরনো পর্যটনকেন্দ্র দেশি-বিদেশি পর্যটকদের পদভারে মুখরিত হবে।

বর্তমানে ২০১০ সালের হিসাব অনুযায়ী পদ্মা নদী পার হয়ে যেখানে ১২ হাজার যান চলাচল করে, সেখানে সেতু খুলে দিলেই যান চলাচল দ্বিগুণ হতে পারে এবং প্রতিবছর যানবাহন ৭-৮ শতাংশ বেড়ে ২০৫০ সালে ৬৭ হাজার যানবাহন চলবে।

এ ধরনের পর্যবেক্ষণ আমরা বিশ্বাসযোগ্য ধরে নিতে পারি। কারণ, আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখছি যমুনা বঙ্গবন্ধু সেতুর অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে যানবাহন বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ভোগ-চাহিদা বৃদ্ধির যে প্রাক্কলন করা হয়েছিল, বাস্তবে প্রসার ঘটেছে এর চেয়ে আরও বেশি।

পদ্মা সেতুতে যানবাহন চলাচলে টোল হার নির্ধারণের আগেই বিতর্ক শুরু হয়েছে যে, জনগণের করের অর্থে নির্মিত সেতুর উপর দিয়ে যান চলাচলে টোল দিতে হবে কেন? আমার মতে, এটি একটি অহেতুক বিতর্ক। বিশ্বের সব দেশেই ব্রিজ, হাইওয়ে, টানেল ইত্যাদিতে যান চলাচলে টোল দিতে হয়।

যে উৎস থেকেই অর্থ সংগ্রহ করে ব্যয় নির্বাহ করা হোক না কেন, নির্মাণ ব্যয় পরিশোধ বা ফেরত দেয়ার বিষয় প্রণিধানযোগ্য। এছাড়া স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় তো আছেই। বাংলাদেশেও বড় বড় সেতু ও মহাসড়কে টোল প্রদানের প্রথা চালু রয়েছে।

পদ্মা সেতু নির্মাণের ব্যয় নির্বাহের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ২৯ হাজার ৯০০ কোটি টাকার ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে সেতু বিভাগ। ১ শতাংশ সুদসহ এ ঋণ ৩৫ বছরে ১৪০ কিস্তিতে শোধ করতে হবে। কাজেই এমন হারে টোল নির্ধারণ করতে হবে, যাতে টোলের টাকায় ঋণ পরিশোধ ও সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ করা যায়। টোলের পরিমাণ বর্তমানে ফেরি পারাপারের ব্যয়ের তুলনায় ৫০ শতাংশ বাড়ালে যে উপার্জন হবে, তাতে নিয়মিত নির্ধারিত কিস্তি পরিশোধ সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা।

এ সেতুর দৈর্ঘ্য যমুনা বঙ্গবন্ধু সেতুর দ্বিগুণ। কাজেই টোল হার স্বাভাবিকভাবেই তুলনামূলক বেশি হবে। অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্বাস যে, পদ্মা সেতু সচল হলে দেশের সার্বিক দারিদ্র্য সূচক কমবে। মানুষের আয়-রোজগার বাড়বে। যোগাযোগ উন্নয়নসহ দেশের মানুষের সার্বিক স্বাচ্ছন্দ্য বাড়বে, মানব উন্নয়ন সূচকের অগ্রগতি হবে। যানবাহনের টোল প্রদান ও টোল আয়ও এ প্রবৃদ্ধিতে যুক্ত হবে।

অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়া, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের মর্যাদা অর্জনে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য যে খাতগুলো থেকে সবচেয় বেশি মুনাফা অর্জন করা সম্ভব এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর জন্য উপযুক্ত প্রতিটি শিল্প দ্রুত চিহ্নিত করতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তারা। সেতুটির নির্মাণ কাজ ২০১৪ সালের নভেম্বরে শুরু হয় এবং যানবাহন চলাচল বা জনসাধারণের এটি ২০২২ সালে উন্মুক্ত করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলাকে সরাসরি সংযুক্ত করবে রাজধানীর সাথে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, পদ্মা সেতু অবশ্যই দেশের জন্য একটি অর্জন কারণ এটি দেশের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত হচ্ছে।

বিশিষ্ট এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘এ সেতুর মাধ্যমে বাংলাদেশ তার শেষ বাধা অতিক্রম করবে এবং একীভূত দেশে পরিণত হবে। এটি অবশ্যই আমাদের জন্য এক বড় অর্জন। এ সেতুর সড়ক ও রেল লাইনের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণাঞ্চল এবং অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। উৎপাদক এবং ভোক্তাদের জন্য পণ্যের ন্যায্যমূল্যও নিশ্চিত হবে।’

অধ্যাপক মোস্তাফিজুর আরও জানান, সেতুটি দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এছাড়াও এর মাধ্যমে ভারত, নেপাল এবং ভুটানের সাথে একটি সংযোগ তৈরি হতে পারে।

‘পদ্মা সেতুর সুবিধা পাওয়ার জন্য এখন আমাদের যথাযথ কৌশল গ্রহণ করতে হবে। আমরা যদি এর সুবিধাগুলো কাজে না লাগাতে পারি তাহলে কেবল সেতু তৈরি করে কোনো লাভ নেই। আমাদের এখন সেখানে অর্থনীতি-ভিত্তিক শিল্পের ওপর জোর দিতে হবে। শিগগিরই এ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে,’ বলেন তিনি। মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, সেতুটির নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে কর্মসংস্থানের একটি চাহিদা সৃষ্টি হবে। সেই চাহিদা মেটাতে দক্ষ জনবল তৈরিতে সরকারের জোর দেয়া উচিত। ‘এখন জেলাগুলোতে মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সেবা দেয়ার বিষয়টি সরকারকে চিন্তা করতে হবে, যেখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে,’ বলেন তিনি।

বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক কাঠামো বিবেচনায় পদ্মা সেতু বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়িয়ে তুলতে সহায়তা করবে। তবে, অঞ্চলগুলোতে এখনই সঠিক কৌশল গ্রহণ করা গেলে এ প্রবৃদ্ধি পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।’

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের (পিইবি) চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ জানান, সেতুটি নির্মাণকালে ইতোমধ্যে কিছু অস্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। তবে একটি বড় অঞ্চল হওয়ায়, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আরও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য এখন যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণের সময় এসেছে।

তিনি বলেন, ‘দ্রুত সুবিধা পেতে চাইলে, সঠিক পরিকল্পনাও আমাদের দ্রুত সময়ের মধ্যে নিতে হবে। বেসরকারি অংশীদারদের সাথে নিয়ে সরকারকে জেলাগুলোতে কৃষি-ভিত্তিক বিভিন্ন শিল্পের ওপর জোর দেয়া উচিত। শিল্পগুলোর জন্য সঠিক স্থান চিহ্নিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।’

এ অর্থনীতিবিদ বলেন, আরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে ক্ষুদ্র ব্যবসাকে বেশি অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং সরকারের উচিত ছোট ব্যবসা থেকেও পণ্য ক্রয় করা।

ড. মাসরুর বলেন, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে অর্থনৈতিক সুবিধা কী কী সরকারকে তা এখন খুঁজে বের করতে হবে। পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হলে দেশের সব অঞ্চলের মধ্যেই একটি দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হবে।

‘এখন অঞ্চলগুলোতে রফতানিমুখী কৃষি-ভিত্তিক পণ্যগুলোর জন্য জোন চিহ্নিত করা যেতে পারে। দেশে কৃষিপণ্যের জন্য উপযুক্ত কোল্ড স্টোরেজ হাউস নেই। তাই কৃষিপণ্যের বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ অর্জন করতে উপযুক্ত স্থান বেছে নেয়াসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত,’ বলেন তিনি।

তিনি বলেন, সরকারের উচিত যথাযথভাবে বাজার বিশ্লেষণ এবং ব্যবধানগুলো দূর করা। সঠিক পরিকল্পনা ও কৌশল না থাকায় যমুনা সেতু নির্মাণের পরেও দেশের উত্তরাঞ্চল শিল্পায়িত হতে পারেনি। ‘সুতরাং, এখন পদ্মা সেতু সঠিকভাবে ব্যবহারের জন্য দেশের দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে,’ পরামর্শ দেন অর্থনীতিবিদ মাসরুর রিয়াজ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়, পদ্মা সেতু চালুর পর থেকে বছরে গড়ে যানবাহন চলাচল করবে প্রায় ৩৫ হাজার। এ থেকে রাজস্ব আয় হবে ৮২২ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৩৯ হাজারে দাঁড়াবে। রাজস্ব আয় হবে প্রায় হাজার কোটি টাকা। ২০৩০ সালে তা আরও বেড়ে ৫৮ হাজারে যানবাহন চলবে।

রাজস্ব আয় হবে ১ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা। ২০৩৫ সালে তা আরও বেড়ে ৬৬ হাজার যানবাহন এবং রাজস্ব আয় হবে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি। এভাবে ২০৫০ সালে যানবাহনের সংখ্যা বাড়বে ৭৬ হাজার। রাজস্ব আয় বাড়বে ১ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান বলেন, পদ্মা সেতুর সংযোগ শুধু যাতায়াতের বিষয় নয়, এটা আমাদের সক্ষমতাকে প্রমাণ করে। বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, বাংলার মানুষকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না। পদ্মা সেতুর সব স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেটা প্রমাণ করে দিয়েছেন। কোনো ষড়যন্ত্র পদ্মা সেতুর নির্মাণে বাধা হতে পারেনি। এ সেতুর মাধ্যমে উত্তর ও পূর্বের মানুষের সঙ্গে দক্ষিণের মানুষের যোগাযোগ স্থাপন হবে। একই সঙ্গে খুলনা দক্ষিণাঞ্চলের রাজধানী হিসেবে গড়ে উঠবে।

তিনি বলেন, সব প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নিজস্ব অর্থে এ সেতু নির্মাণ প্রধানমন্ত্রীর সাহস, দৃঢ়তা, মনোবল, দূরদর্শীতা ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণেই সম্ভব হয়েছে। স্বপ্নের পদ্মা সেতু আজ বাস্তবে রূপলাভ করতে পেরেছে।  পদ্মা সেতু উন্নয়নের মাইল ফলক যা এদেশের মানুষের কাছে নতুন প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

খুলনাঞ্চলের ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, পদ্মা সেতু হলে সুন্দরবনে পর্যটক বেশি আসবে। হোটেল ব্যবসা জমজমাট হবে। এ অঞ্চল নতুন শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হবে। অনেক তৈরি পোশাক কারখানা গড়ে উঠবে। আবাসন ব্যবসা দ্রুত বিস্তার পাবে। এসব ব্যবসার পাশাপাশি অন্যান্য ব্যবসাও গড়ে উঠবে।

খুলনা চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি কাজি আমিনুল হক বলেন, পদ্মা সেতু চালু হলে খুলনাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। নতুন নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে। পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলার গতিশীলতা বাড়বে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা অল্প সময়ের মধ্যে পণ্য পরিবহন করে মোংলাবন্দরের মাধ্যমে রফতানি ও আমদানি করতে উৎসাহিত হবেন। পদ্মা সেতু নির্মাণের পর পায়রা বন্দরের গুরুত্বও বাড়বে। প্রয়োজনীয় আধুনিকায়ন করা হলে পদ্মা সেতুর মাধ্যমে এ বন্দরও এক বৃহত্তম বন্দরে রূপান্তরিত হবে। এমনকি ভূটান, পূর্ব নেপাল ও ভারতের দক্ষিণ-পূর্ব প্রদেশের জন্য পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে ভূমিকা রাখবে। 

পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গত ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেতুর মূল নির্মাণ কাজ ৯১ শতাংশ এবং প্রকল্পের সামগ্রিক নির্মাণ কাজ ৮২.৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। সম্পূর্ণ নির্মাণ কাজ শেষ হবে ২০২২ সালে।’ শফিকুল বলেন, পদ্মা সেতু এশিয়ান হাইওয়ে এবং ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সাথে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পদ্মা সেতুর মাধ্যমে অর্থনীতিতে সরাসরি তিন ধরনের সুবিধা রয়েছে। প্রথমত, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন হবে। এতে ওই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য বিস্তার লাভ করবে। বিনিয়োগ বাড়বে।

দ্বিতীয়ত, কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন। তাদের উৎপাদিত পচনশীল পণ্য সরাসরি ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থানে পাঠাতে পারবেন। এতে পণ্যের ভালো দাম পাওয়া যাবে।

তৃতীয়ত, এ সেতুর ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার হবে। বিশেষ করে ভারতের বাণিজ্য বাড়াতে মোংলা বন্দর ব্যবহার করা যাবে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের উন্নয়নের জন্য পদ্মা সেতুর গুরুত্ব অপরিসীম। এ সেতু নির্মিত হলে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার দূরত্ব অনেকাংশে কমে যাবে, যা দেশের অভ্যন্তরে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে সাহায্য করবে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

এডিবির সমীক্ষা বলছে, পদ্মা সেতু দিয়ে ২০২২ সালে যে ২৪ হাজার যানবাহন চলবে, তার মধ্যে বাস চলবে ৮ হাজার ২৩৮টি, ট্রাক ১০ হাজার ২৪৪টি, মাইক্রোবাস ও ব্যক্তিগত গাড়ি চলবে ৫ হাজারের বেশি। সমীক্ষায় আরও প্রাক্কলন করা হয়েছে, ২০২৫ সালে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে দিনে যানবাহন চলাচল বেড়ে দাঁড়াবে ২৭ হাজার ৮০০টি। ২০৩০ সালে হবে ৩৬ হাজার ৭৮৫। ২০৪০ সালে দিনে যানবাহন চলাচল বেড়ে দাঁড়াবে ৫১ হাজার ৮০৭টি। পাশাপাশি জাইকার সমীক্ষামতে, পদ্মা সেতুর মাধ্যমে দেশের ১ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধি পেয়ে আঞ্চলিক জিডিপি বৃদ্ধি দাঁড়াবে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে। দক্ষিণবঙ্গে শিল্পায়নের গতি ব্যাপক বেড়ে যাবে। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রয়োজনীয় অসামান্য অবকাঠামোগুলোর একটি। ধীরে ধীরে স্বপ্নের পদ্মা সেতু বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দুই স্তরবিশিষ্ট পদ্মা বহুমুখী সেতুর প্রায় ৬৩ শতাংশ নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। পদ্মা সেতু নির্মাণ শেষ হলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের এবং দক্ষিণ পশ্চিমের জনগণের অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গ্রামীণ উন্নয়নশীল এলাকার বিশাল জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক উন্নয়ন, জীবনমানের উন্নয়ন ও জ্ঞান-মনোভাবের ব্যাপক পরিবর্তনে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির বিকল্প নেই। স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালু হলে এর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হবে দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার। পদ্মার ওপারে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ১৬ জেলা, ঢাকা বিভাগের ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, রাজবাড়ী, পোপালগঞ্জসহ মোট ২১ জেলার ৩ কোটি মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে। বদলে যাব দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার অর্থনৈতিক চিত্র। ইতোমধ্যেই এ অঞ্চলে বেসরকারি বিনিয়োগ শুরু হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা জাজিরা প্রান্ত থেকে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে ঘিরে এবং আশপাশের এলাকায় জমি কিনতে শুরু করেছেন। ফলে জমির দাম অনেকটাই বেড়ে গেছে।

পদ্মা সেতুর ওপারে সংযোগ সড়ক থেকে ভাঙ্গা উপজেলার তিনদিকে তিনটি রাস্তা চলে গেছে। এর একটি বরিশাল, একটি খুলনা অংশে, আরেকটি রাজবাড়ী, যশোর, বেনাপোলে। এ তিনটি সড়ক যুক্ত হবে মোংলা, পায়রা সমুদ্রবন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে। ফলে তিন বন্দর দিয়েই আমদানি পণ্য দ্রুত ঢাকাসহ শিল্পাঞ্চলগুলোয় প্রবেশ করতে পারবে।

এতে রফতানি পণ্যের লিড টাইম (ব্যাক টু ব্যাক এলসির আওতায় কাঁচামাল আমদানি করে তা দিয়ে পণ্য তৈরির পর রফতানি করতে যে সময় লাগে) কমে যাবে। ফলে দ্রুত ব্যবসার রিটার্ন বা মুনাফা পাওয়া যাবে। এতে অর্থের চলাচল বাড়বে। অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে যুক্ত হবে বহুমুখী খাত। সেতুর মাওয়া অংশ থেকে ঢাকা, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করবে। এভাবে সারা দেশে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

এদিকে পদ্মাসেতুর দুই পাড়ে কৌতুহলী মানুষের ভিড় বেড়েছে। ঘনকুয়াশায় সূর্যের দেখা না মিললেও সকাল থেকেই পদ্মা পাড়ে দেখা গেছে হাজারো দর্শনার্থীর ভিড়। উপলক্ষ্য দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো পদ্মাসেতু নিজ চোখে দেখা। পরিবার-পরিজন নিয়েও বেড়াতে যাচ্ছেন অনেকে। এর আগেও পদ্মা পাড়ে সেতু দেখতে এসেছেন ঢাকাসহ আশপাশের জেলার অনেক মানুষ। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুর পূর্ণ অবকাঠামো দৃশ্যমান হওয়ায় পর থেকে উৎসাহ বেড়েছে মানুষের মধ্যে। তার সাথে শীতের আমেজ মিলিয়ে পদ্মা সেতু দেখতে অন্যসময়ের থেকে আরো বেশি মানুষ জড়ো হয়েছে পদ্মা পাড়ে। সকাল থেকেই পদ্মা সেতুর কাছাকাছি আসতে থাকেন দর্শনার্থীরা। তাদের মধ্যে মুন্সিগঞ্জ, মাদারীপুর ও ফরিদেপুরে মানুষই বেশী। তবে মুন্সিগঞ্জের ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক দিয়ে আসতে দেখা গেছে রাজধানী ঢাকাসহ অন্য এলাকার মানুষদেরও। ফরিদপুর এলাকা থেকেও আসছেন অনেকে। এতে করে গাড়ির চাপ বেড়েছে দেশের প্রথম এক্সপ্রেস ওয়েতে। পদ্মার দুই পাড়ের সেতু এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, দর্শনার্থীদের মধ্যে উৎসব-আমেজ বিরাজ করছে। অনেকেই পদ্মাসেতু পেছনে রেখে ছবি তুলছেন। তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, পদ্মা সেতু দেখতেই এসেছেন তারা। সেতু নিয়ে আগামীর নানা সম্ভাবনারও কথা জানান কেউ কেউ। স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন দর্শনার্থীরা।

উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালের ২৩ জুন যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতুর উদ্বোধন করা হয়। সে সময়েই দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগের সুবিধার জন্য পদ্মায় সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। ১৯৯৮ থেকে ২০০০ এ সময়ে পূর্বসম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়। এরপর ২০০১ সালে জাপানিদের সহায়তায় সম্ভাব্যতা যাচাই হয়। ২০০৪ সালের জুলাইয়ে জাপানের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকার সুপারিশ মেনে মাওয়া-জাজিরার মধ্যে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্মা সেতুর নকশা প্রণয়নে পরামর্শ প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত করে। মহাজোট সরকার শপথ নিয়েই তাদের নিয়োগ দেয়। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার সেতু করার চূড়ান্ত নকশা করা হয়। নতুন নকশায় নিচে চলবে রেল এবং উপরে মোটরগাড়ি। এতে অর্থায়নের কথা ছিল এডিবি, criar loja virtual জাইকা ও বিশ্বব্যাংকের। কিন্তু দুর্নীতির ধোয়া তুলে একে একে সবাই অর্থায়ন থেকে ফিরে যায়। তবে দমেনি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন সরকার। ২০১৩ সালের ৪ মে নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর তিনি মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের মূল পাইলিং কাজের উদ্বোধন করেন। 

মূল পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের (এমবিইসি) সাথে চুক্তিবদ্ধ হয় সরকার। পদ্মা সেতুর প্রস্থ হবে ৭২ ফুট এবং দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। এ সেতুর ভায়াডাক্ট ৩ দশমিক ১৮ কিলোমিটার এবং দুই প্রান্তে (জাজিরা ও মাওয়া) সংযোগ সড়ক ১৪ কিলোমিটার। পানির স্তর থেকে পদ্মা সেতুর উচ্চতা ৬০ ফুট। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) নির্বাহী কমিটি ২০০৭ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্পের অনুমোদন দেয়, যার আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। তবে পরবর্তীতে সেতুর অবকাঠামো নির্মাণ, নদী শাসন, সংযোগ সড়ক, ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন, কর্মীদের বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন খাতে খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় কয়েক দফায় ব্যয় সংশোধনের পর সর্বশেষ ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ