রবিবার ১১ এপ্রিল ২০২১
Online Edition

২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ৩০ লাখ মানুষ বাস্তুভিটা ছাড়তে বাধ্য হবে

* জলবায়ু পরির্তনের হুমকির মুখে ৫৩ লাখ মানুষ -বিশ্বব্যাংক
মুহাম্মদ নূরে আলম : বাংলাদেশে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ঝুঁকির মুখে উপকূলীয় অঞ্চলের ১৯টি জেলার মানুষ। উপকূলীয়  সবুজ বেষ্টনী সৃজন করা হয়েছে ১০ টি জেলায়। দেশের উপকূলীয় সীমানার ৭১১ থেকে ৭১৬ কি.মি দীর্ঘ। দেশে বর্তমানে কতটি স্লাইকোন সেন্টার আছে ১ হাজার ৮৪১টি। মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা আগামী ৩০ বছরে ৭ গুণ বেড়ে যাবে। আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের আরো ৩০ লাখ মানুষ তাদের বাস্তুভিটা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন। আন্তর্জাতিক সংস্থা অ্যাকশন এইড এবং ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক সাউথ এশিয়া তাদের এক যৌথ জরিপ শেষে সদ্য প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করেছে।
এদিকে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের ৫৩ লাখ মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হবেন সরাসরি, জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পানি, মাটি ও ফসলের ওপর। উপকূলীয় মানুষ হারাবেন বাসস্থান, বাড়বে পানীয় জলের সংকটও। তাই জলবায়ু পরিবর্তন প্রভাব মোকাবিলায় ২০১০ সাল থেকে সাংগঠনিকভাবে কাজ করছে বাংলাদেশ। এই খাতে ব্যয় করা হচ্ছে জিডিপির শতকরা একভাগ। কিন্তু এই অর্থ ব্যয় আর প্রকল্প নিয়ে এরই মধ্যে দুর্নীতি এবং অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠেছে। খোদ অর্থমন্ত্রী বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি মোকাবিলায় গঠিত তহবিলের অর্থ ব্যবহারে আমাদের সক্ষমতার অভাব রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশে বর্তমান উপকূলীয় এলাকার ৪৩ লাখ মানুষ সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হবেন। আর ২০৫০ সালে এই হতভাগ্য মানুষের সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৩ লাখে। উপকূলীয় এলাকায় ৩ মিটার জলোচ্ছ্বাসে এখন ২০ লাখ মানুষ এর শিকার হন। এর চেয়ে বেশি জলোচ্ছ্বাস হলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা আরো ৬০ ভাগ বেড়ে হবে ৩২ লাখ।  জানা গেছে, ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২০ সেন্টিমিটার বেড়ে যাবে।  শুধু তাই নয়, তীব্র জোয়ারের সময় বাতাসের গতি এবং জমির ক্ষয় বেড়ে যাবে আরো ১০ ভাগ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম এবং বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় দারিদ্র্য হার সবচেয়ে বেশি।  ১৯টি উপকূলীয় জেলায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমপক্ষে এক কোটি ১৮ লাখ।
আন্তর্জাতিক সংস্থা অ্যাকশন এইড এবং ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক সাউথ এশিয়ার গবেষণার ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ ও ভয়াবহ প্রভাবে ২০৫০ সাল নাগাদ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষকে বাস্তুভিটা ছেড়ে দিতে হবে। ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক সদ্য সমাপ্ত অপর এক গবেষণার ফলাফলে বলেছে, বাংলাদেশের ২ কোটিরও বেশি মানুষ ইতোমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে নিদারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে করোনাকালীন সময়ে ৪ দফার বন্যায় জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্তদের পরিস্থিতি ছিল নিদারুণ দুঃখ-কষ্টের।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে বিশ্লেষণ করেছেন জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ এবং ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক সাউথ এশিয়ার প্রধান ড. আতিক রহমান। বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে বাংলাদেশের মানুষের জীবন-যাপন এবং অর্থনীতির ওপরেও ভবিষ্যতে নেতিবাচক আরো প্রভাব পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এরইমধ্যে এক কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র বসতি গড়তে বাধ্য হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ধারা অব্যাহত থাকলে এই সংখ্যা তিন গুণের বেশি হতে পারে বলে গবেষকরা সতর্ক করেছেন।
অ্যাকশন এইড ইন্টারন্যাশনাল ও ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক সাউথ এশিয়ার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদী ভাঙন এবং খরাপ্রবণ এলাকায় শস্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ২০৫০ সাল নাগাদ এই অঞ্চলের প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষ তাদের ঘর-বাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হতে পারে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ের মতো আকস্মিক দুর্যোগে যারা বাস্তুচ্যুত হবেন, তাদের এই প্রক্ষেপণে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আর সে কারণেই এটা প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে কম বলে মনে করছেন অ্যাকশন এইডের গ্লোবাল লিড অন ক্লাইমেট চেঞ্জ হারজিৎ সিং। পরিস্থিতি বড় ধরনের বিপর্যয়ের দিকে যেতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
অ্যাকশন এইডের গ্লোবাল লিড অন ক্লাইমেট চেঞ্জ হারজিৎ সিং গণমাধ্যমকে  বলেন, অনেকে কাজের সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে নিজ নিজ দেশের শহরগুলোর দিকে যাবেন। তাদের অধিকাংশের ঠাঁই হবে বস্তিতে। সেখানে সীমিত নাগরিক সেবা পাওয়ার পাশাপাশি রিকশা চালানো, নির্মাণ শ্রমিক বা পোশাক কারখানায় কাজ করার মতো কোনো কাজ করতে হবে তাদের। বিশ্ব নেতারা এখনও এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সক্রিয় হচ্ছেন না বলে মন্তব্য করেন তিনি। উচ্চ হারে কার্বন নিঃসরণকারী ধনী দেশগুলোর প্রতি দূষণ কমানোর প্রচেষ্টা বৃদ্ধির আহ্বান জানান তিনি। সেই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা তৈরি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে তহবিল যোগানোরও আহ্বান জানান হারজিৎ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার লক্ষ্য অর্জন করা গেলে ২০৫০ সাল নাগাদ ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হওয়া মানুষের সংখ্যা অর্ধেক কমে যেতে পারে। ২০১৮ সালে বিশ্ব ব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের এই ধারা চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ সাব-সাহারা আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও ল্যাতিন আমেরিকার ১৪ কোটির বেশি মানুষ নিজেদের দেশের মধ্যে অভিবাসী হতে পারে। নতুন প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারতে সবচেয়ে বেশি মানুষ অভিবাসী হওয়ার আভাস দেওয়া হয়েছে, সাড়ে চার কোটির বেশি। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আগে গত বছরের ৯ মে ভোলার চরফ্যাশনের ঢালচর থেকে ট্রলারে উপজেলার মূল ভূখণ্ডে আসছে মানুষ। ঘর্ণিঝড় আম্পানের আগে গত ৯ মে ভোলার চরফ্যাশনের ঢালচর থেকে ট্রলারে উপজেলার মূল ভূখণ্ডে আসছে মানুষ। তবে বাংলাদেশেই অভিবাসন সবচেয়ে বেশি বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে, বর্তমানের তুলনায় তা সাত গুণ হতে পারে।
প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর প্রতি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নাগরিকদের বাস্তুচ্যুত হওয়ার এই প্রকিয়ার আরও খারাপ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে অভিবাসী হতে বাধ্য হওয়া মানুষের সংখ্যা কমিয়ে আনতে এখনই পদক্ষেপ গ্রহণের গুরুত্ব অনুধাবনের অনুরোধ করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের নগদ অর্থ ও কাজ দিয়ে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার এবং শহরের অভিবাসী শ্রমিক যাদের অনেকে কোভিড-১৯ মহামারীতে কাজ হারিয়েছেন তাদের প্রয়োজনীয় সেবার মান্নোয়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
জলবায়ু অভিবাসনের লাগাম টানতে কৃষির উন্নয়নে নজর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে মাটি যাতে ভালো থাকে, আরও কার্যকরভাবে পানির বন্দোবস্ত করা হয়, নতুন শস্য উৎপাদন করা যায় এবং উৎপাদিত পণ্য বিক্রির সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ও অর্থ উপার্জনের অন্যান্য উপায় বের করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মানুষ যখন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাবে তখন মাটি নিরাপদ ও উর্বর কি না, জমির মালিকানা নিশ্চিত হয়েছে কি না এবং তাদের ঘরবাড়ি তৈরির টাকা-পয়সা আছে কি না সে বিষয়গুলো কর্তৃপক্ষকে দেখতে হবে। ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক সাউথ এশিয়ার পরিচালক সঞ্জয় ভাষিত গণমাধ্যমকে বলেন, জলবায়ু অভিবাসন মোকাবেলার ক্ষেত্রে দারিদ্র্য ও বৈষম্যের বিষয়গুলোও সামাল দিতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ার নেতাদের অবশ্যই এক্ষেত্রে সহায়ক শক্তিগুলোর সঙ্গে যোগ দিতে হবে এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের সুরক্ষায় পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, এক বিবৃতিতে বলেন তিনি।
উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় টর্নেডোর ঘটনা ঘটে ১৯৮৯ সালে।  সেবছরের ২৬ এপ্রিল মানিকগঞ্চ জেলার দৌলতপুর এবং সাটুরিয়া এলাকার উপর দিয়ে বয়ে যায় প্রলয়ংকরী টর্নেডো।  এতে প্রাণ হারায় ১,৩০০ মানুষ। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৫ লাখ গরিব মানুষ, যাঁদের মধ্যে ১৪ লাখ চরম দরিদ্র তাঁরা লবণাক্ত পানির কারণে পানীয় জল ও শুকনা মৌসুমে চাষাবাদের জন্য পনি সংকটে আছেন।  তার সঙ্গে পানির চরিত্রও পরিবর্তন হয়ে গেছে, বদলে গেছে পরিবেশ ও প্রাণ বৈচিত্র্য।  ২০৫০ সাল নাগাদ নাকি পানির এই লবণাক্ততা আরো বাড়বে।  ৫২ লাখ গরিব মানুষ তখন এর নেতিবাচক প্রভাবের শিকার হবেন, যাঁদের মধ্যে ৩২ লাখ মানুষ চরম দরিদ্র অবস্থার মধ্যে থাকবেন।  বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় চার কোটি ৩২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ ভাগ।  আশঙ্কার বিষয় হলো, এর মধ্যে চরম দরিদ্র দুই কোটি ৪৪ লাখ মানুষ তাঁদের মৌলিক প্রয়োজন খাদ্যের চাহিদা মিটাতে পারেন না। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় এলাকায় বন্যা, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার এই দুর্ভোগ আরো বাড়বে বলে মনে করে ক্লাইমেট প্রজেকশন অফ দ্য ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা। বলা বাহুল্য, জলবায়ু পরিবর্তন উপকূলীয় এলাকার গরিব মানুষের জীবনধারণের জন্য চরম হুমকি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফান্ড নিয়ে নয়-ছয়ের অভিযোগ উঠেছে বরংবার। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবি-র অভিযোগ, জলবায়ু তহবিলের টাকা সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় হচ্ছে। পারমাণবিক শক্তি, নবায়নযোগ্য এনার্জি ও সবুজ এনার্জি এক কাতারে ফেলে কার্বন গ্যাসমুক্ত জ্বালানি হিসেবে দেখানো হয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে যে, ঋণ নেয়া ৫৫টি এনজিও-র কোনো অস্তিত্ব নেই। এছাড়া ১০টি নামসর্বস্ব, ১৩টি রাজনৈতিক বিবেচনায় এবং মাত্র ১৭টি এনজিও ঠিকমতো কাজই করছে। এখানেই শেষ নয়।  জলবায়ু তহবিলের অর্থায়ন নিয়ে রাজনীতিকরণ ও দুর্নীতি হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছে টিআইবি।  টাকা পাওয়া ১৩টি এনজিও-র নির্বাহী অথবা পরিচালনা পর্ষদ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।  তাই রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে প্রকল্প পেয়েছে ৯টি এনজিও।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ