রবিবার ১১ এপ্রিল ২০২১
Online Edition

দেশের সব ব্যাংক মিলে গত বছর এক লাখ কোটি টাকার ঋণও বিতরণ করতে পারেনি

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান: দেশের সব ব্যাংক মিলে ২০২০ সালে এক লাখ কোটি টাকার ঋণও বিতরণ করতে পারেনি। এটা আগের বছরের একই সময়ে বিতরণকৃত ঋণের চেয়ে ১০ ভাগের একভাগ। বর্তমানে দেশে ৬০টিরও বেশি তফসিলি ব্যাংক কার্যক্রম চালাচ্ছে। ২০১৯ সালের নবেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর বেসরকারি খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ৩৫ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা। ২০২০ সালের নভেম্বর শেষে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ২০ হাজার ৯০২ কোটি টাকায়। অর্থাৎ গত এক বছরে বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করেছে ৮৫ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের নভেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ২১ শতাংশ। যা বিগত যে কোনও সময়ের চেয়ে কম। ব্যাংক কর্মকর্তারা এই প্রবৃদ্ধিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি বলছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
জানা গেছে, ২০০৯-১০ অর্থবছর শেষে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ২৪ শতাংশের বেশি। এরপর তা সব সময়ই ১০ শতাংশের বেশি ছিল। এমনকি ২৫ শতাংশও ছাড়িয়ে গিয়েছিল এক বছর। বেসরকারি খাতে কম ঋণের মানে হলো- বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পায়ন কমে যাওয়া। এতে কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের আয়ও কমে। মহামারি করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকার সোয়া লাখ কোটি টাকার যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল, তার ওপর ভর করে জুলাই-সেপ্টেম্বরে দেশে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধিতে গতি এসেছিল। কিন্তু গত অক্টোবরে তা ৮ দশমিক ৬১ শতাংশে নেমে আসে। অবশ্য প্রণোদনায় ভর করে নতুন অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৯ দশমিক ২০ শতাংশ হয়। আগস্টে তা আরও বেড়ে ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশে এবং সেপ্টেম্বরে ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশে ওঠে। কিন্তু অক্টোবরে এই প্রবৃদ্ধি কমে আবার ৮ দশমিক ৬১ শতাংশে নেমে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, নবেম্বরে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ২১ শতাংশ। আগের অর্থবছরের নবেম্বরে হয়েছিল ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ। মহামারির ধাক্কায় ২০১৯-২০ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি কমে ৮ দশমিক ৬১ শতাংশে নেমে আসে।
ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, করোনাকালে বিনিয়োগ হচ্ছে না বলেই ঋণ বিতরণ কম। এ ছাড়া ব্যাংকও এখন দেখেশুনে ঋণ দিচ্ছে। ফেরত আসার নিশ্চয়তা আছে এমন খাতেই ঋণ দেয়া হচ্ছে।
২০২০ সালের নবেম্বর শেষে দেশে মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ ৪৪ হাজার ৬৮৮ কোটি ৮০ লাখ টাকায়। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে বিতরণ করা ঋণ ১১ লাখ ২০ হাজার ৯০২ কোটি টাকা। সরকার নিয়েছে এক লাখ ৯৩ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের নভেম্বর শেষে মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ছিল ১২ লাখ ১৬ হাজার ২০২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। যার মধ্যে বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ৩৫ হাজার ৮১৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা। সরকারের ঋণ ছিল এক লাখ ৫৩ হাজার ৪৩৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এই হিসাবে গত নভেম্বর শেষে অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এর মধ্যে সরকারি ঋণের ২৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ, আর বেসরকারি খাতে ৮ দশমিক ২১ শতাংশ। ফলে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমেছে সরকারি খাতেও। নভেম্বর শেষে সরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৯৩ হাজার ১৪৬ কোটি টাকায়। যা গত বছরের নভেম্বরের চেয়ে ২৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেশি। যদিও ২০১৯-২০ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ছিল ৫৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। গত অর্থবছরের মুদ্রানীতিতেও এই একই লক্ষ্যমাত্রা ধরা ছিল। তবে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর জানান, বিনিয়োগ না থাকায় বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ হচ্ছে না বললেই চলে। জুলাইয়ের আগে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই বলে মনে করেন তিনি। তিনি উল্লেখ করেন, এই অবস্থায় কেউ বিনিয়োগে যেতেও চায় না। এ কারণে প্রণোদনার ঋণ ছাড়া ব্যাংকগুলো এখন অন্য কোনও ঋণ বিতরণ করছে না। প্রণোদনার কারণে মাঝে কয়েক মাস বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি বাড়লেও এখন তা আবার কমে এসেছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক বছরে দেশের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় ঋণ বাড়লেও বিদেশি ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ কমেছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বিদেশি ব্যাংকগুলোর দেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৪ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা, যা ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে কমে হয়েছে ৩৩ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা। অবশ্য ৯ মাসে ইসলামি ব্যাংকগুলোর ঋণ ২ লাখ ৩৯ হাজার ৫৬ কোটি থেকে বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ৫৯ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। গত ৯ মাসে ব্যবসা-বাণিজ্যে দেয়া ঋণ ৩ লাখ ৩০ হাজার ৭৫০ কোটি থেকে বেড়ে হয়েছে ৩ লাখ ৬১ হাজার ২৩২ কোটি টাকা। চলতি মূলধন ঋণ ২ লাখ ১৮ হাজার ৬ কোটি থেকে বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ২৭ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। আর ভোক্তা ঋণ ৭০ হাজার ৯৭০ কোটি থেকে বেড়ে হয়েছে ৭২ হাজার ৩২১ কোটি টাকা। তবে ঋণ কমেছে কৃষি, মৎস্য ও বনায়ন খাতে। একইভাবে মেয়াদী ঋণও কমেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ