রবিবার ০৭ মার্চ ২০২১
Online Edition

জঙ্গীবাদের ভুল বুঝে ফিরে এল ওরা নয়জন অশ্রুসজল নয়নে বরণ

স্টাফ রিপোর্টার: ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পড়েতেই সিলেটের তরুণ শাওন মুনতাহা ইবনে শওকত জড়িয়ে পড়েছিলেন উগ্রবাদী এক সংগঠনে। পরে ডাক্তার স্ত্রী নুসরাত আলী জুহিকেও সেই জালে জড়িয়ে নেন। সংগঠনের নির্দেশে চার বছর আগে দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে পরিবার থেকেও আলাদা হয়ে যান। কিন্তু সে সবই যে ‘ভুল’ ছিল, এখন তা বুঝতে পারছেন তারা। সমাজের মূল ধারায়, স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আশা নিয়ে শাওন ও জুহির সঙ্গে আরও সাত তরুণ-তরুণী গতকাল বৃহস্পতিবার আত্মসমর্পণ করেছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ও আইজিপির কাছে।

গ্রেপ্তার করে শাস্তির পথে না গিয়ে এখন তাদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সাহায্য করা হবে বলে জানিয়েছে র‌্যাব, যারা দীর্ঘদিন ধরে এই তরুণ-তরুণীদের উগ্রবাদী কর্মকা-ের ওপর নজর রাখছিল।

র‌্যাব তাদের এই কর্মসূচিকে বলছে ‘ডি-র‌্যাডিকালাইজেশন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রাম’। ঢাকায় র‌্যাব সদর দপ্তরে আয়োজিত আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে জানানো হয়, পেশার ধরণ অনুযায়ী এই তরুণ-তরুণীদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

উগ্রবাদের অন্ধকার জগতে জড়িয়ে পড়া এবং সেখান থেকে বেরিয়ে আসার গল্প অনুষ্ঠানে সবাইকে শোনান শাওন মুনতাহা ইবনে শওকত। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন ‘ধর্মীয় ব্যাখ্যায়’ আকৃষ্ট হয়ে ২০০৯ সালে তিনি হিযবুত তাহরীর যুক্ত হন। কয়েকজন বন্ধুকেও ওই সংগঠনে যুক্ত হতে উৎসাহ দেন। ২০১১ সালে মেডিকেল ছাত্রী জুহির সাথে বিয়ে হয় শাওনের। স্বামীর উৎসাহে জুহিও একসময় ওই সংগঠনে যোগ দেন। 

শাওন বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের নাশকতার কাজে তারা জড়াননি। ২০১৬ সালের পর থেকে সংগঠন থেকে তাদের বলা হয়, পরিবার থেকে আলাদা হয়ে যেতে হবে। সে অনুযায়ী ২০১৭ সালে দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে তারা ঢাকার এসে থাকতে শুরু করেন। “বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর ... আমার স্ত্রী একজন চিকিৎসক, কিন্তু এভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে থাকতে তার জীবনে অশান্তি আর গ্লানি নেমে আসে। এক কথায় আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবন বলতে কিছু ছিল না। তাছাড়া আমার দুই শিশু সন্তানের ভবিষ্যত...।”

শাওন বলেন, “একটা সময় আমি আমার ভুল বুঝতে পারি। বুঝতে পারি, আমি ধর্মীয় অপব্যাখ্যার শিকার। আমার ভেতরে নতুন করে বোধোদয় হয়। তখন পরিবারের সাথে আলোচনা করি, নতুন করে বেঁচে থাকার কথা বলি...তারপর এখানে আসা।”

নিজে একজন ব্যাংকার ছিলেন জানিয়ে শওকত বলেন, তার ছেলে কীভাবে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে গেল, তিনি তা বুঝতেও পারেননি। কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বলেন, “কারো সন্তান যাতে এভাবে জঙ্গিবাদে না জড়ায়, সবাইকে এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে।”

অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে একে একে আত্মসমর্পণ করেন আবিদা জান্নাত আসমা (১৮), মোহাম্মদ হোসেন (২৩), মো. সাইফুল্লাহ (৩৭), সাইফুল ইসলাম (৩১), আবদুল্লাহ আল মামুন (২৬), মো.সাইদুর রহমান (২২) ও আবদুর রহমান সোহেল (২৮)। হাতে ফুল তুলে দিয়ে তাদের আবার সমাজের মূল ধারায় স্বাগত জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল।

আসমার মা শাহিনা সুলতানা বলেন, “আমার মেয়ে মেধাবী ছিল। ভাবতাম, সে অনেক কিছু করবে সমাজের, অনেক বড় অফিসার হবে। কিন্তু কীভাবে যে কি...। এখন আমার মেয়ের জন্য আপনারা দোয়া করবেন।” ২০১৯ সালে এসএসসি পাস করার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক তরুণের সঙ্গে পরিচয়ের পর বিয়ে করে ফেলেন এই কিশোরী। সেই তরুণের মাধ্যমেই জড়িয়ে পড়েন জঙ্গিবাদে। এরপর সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিঃসঙ্গ জীবনের যে কষ্ট, সে কথা তুলে ধরে আসমা বলেন, “আমি ভুল করে এ পথে এসেছিলাম। ভুল বুঝতে পেরে আত্মসমর্পণ করেছি। আশা করছি আমার স্বামীও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে।”

র‌্যাবের আয়োজনে এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘নব দিগন্তের পথে'। এ বাহিনীর অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার তার স্বাগত বক্তব্যে ‘ডি-র‌্যাডিকালাইজেশন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রাম’ এর প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একজন জঙ্গি হওয়ার আগে কোনো একটি সংগঠনের প্রতি সহমর্মিতা দেখায়, পরে সমর্থক হয়ে ওঠে। তারপর যে সক্রিয় হয়ে বিভিন্ন কার্যকলাপে অংশ নেয়, তার ভেতরে উগ্রবাদের ধারণা পোক্ত হতে থাকে। এক পর্যায়ে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা অস্বাভাবিক জীবন যাপন শুরু করে। “এ অবস্থায় তাদের মস্তিকে যে ধারণা বা মতবাদ বসে আছে, সেটা অস্ত্র দিয়ে নির্মূল করা যায় না। সেখান থেকে তাদের বুঝিয়ে বের করে আনা ছাড়া বিকল্প নেই। আর সেজন্য র‌্যাব ডি-র‌্যাডিকালাইজেশন না এই পুনর্বাসন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।”

আত্মসমর্পণ করা এই তরুণ-তরুণীদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। তাদের কেউ ডাক্তার, কেউ আইটি বিশেষজ্ঞ, কেউ ছাত্র। কিন্তু তারা জেএমবি বা আনসার আল ইসলামের মত নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে পুরনো একটি মামলা রয়েছে, বাকিদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই বলে জানান র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক।

ওই নয় তরুণ-তরুণীর ওপর দীর্ঘদিন ধরে নজরদাবি চালানোর কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “জঙ্গি সেজেই তাদের সাথে মিশে পরে নজরদারিতে এনে তাদের পথটি যে ভুল, তা তাদের বোঝানো হয়েছে। তাদের আলোর পথে ফিরিয়ে আনার এটা প্রথম ধাপ।”

আর এ কাজে সবার সহযোগিতা চেয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, “র‌্যাব এক্ষেত্রে মাত্র ২৫.৭ ভাগ করতে পারে, বাকিটা অন্যদের করতে হবে। আমরা তাদের জঙ্গী থেকে পৃথক করতে চাই।” যারা আত্মসমর্পণ করেছেন, তাদের মধ্যে মামুনকে ফার্মেসি, সাইফুল্লাহ ও সোহেলকে গাভী, সাইদুর, হাসান ও সাইফুলকে ট্রাক্টর দিয়ে পুনর্বাসন করা হচ্ছে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়। অনুষ্ঠানে র‌্যাবের এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার প্রশংসা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ