রবিবার ০৭ মার্চ ২০২১
Online Edition

ঢাকার আকাশে রঙিন ঘুড়ির মেলা

মুহাম্মদ নূরে আলম: দিনভর আকাশভরা রঙিন ঘুড়ির ওড়াউড়ি, পিঠাপুলি আর শীতের রাতের কুয়াশা উপেক্ষা করে বর্ণিল আলোকসজ্জা, আতশবাজি, ফানুস আর তরুণদের উচ্ছ্বাস, প্রতি বছর সাকরাইন এ পুরান ঢাকার এ চিত্র আমাদের সবার পরিচিত। রাজধানী ঢাকায় এক প্রাণোচ্ছ্বল ও বর্ণিল নগরীর চিত্র তুলে ধরে সাকরাইন ফেস্টিভ্যাল। ঘুড়ি উৎসব নামেও পরিচিত এ ফেস্টিভ্যালটি সব মানুষকে এক করে বন্ধুত্বের প্রতীক হয়ে আসে। পৌষ মাসের শেষ দিন হওয়ায় দিনটি পৌষ সংক্রান্তি নামেও পরিচিত। পহেলা মাঘের পড়ন্ত বিকেলে ঘুড়ি উড়িয়ে আতশবাজি ও মশাল প্রজ্বালন এবং নানা ঐতিহ্যবাহী আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি নেচে-গেয়ে পুরান ঢাকার বাসিন্দারা উদযাপন করে সাকরাইন উৎসব। পুরান ঢাকার নারিন্দা, তাঁতীবাজার, পাতলাখান লেন, লক্ষ্মীবাজার, ফরিদাবাদ, ফরাশগঞ্জ, সূত্রাপুর, শাঁখারীবাজার, লালবাগ, হাজারিবাগ, ডালপট্টি, ধূপখোলা, সদরঘাট, গোয়ালনগর, স্বামীবাগ, গেন্ডারিয়া, বংশাল, সূত্রাপুরসহ নানা স্থানের প্রতিটি বাসার ছাদে ছাদে উদযাপিত হয় উৎসবের কার্যক্রম এবং আশপাশের অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ে সাকরাইন উৎসবের উন্মাদনায়।

পৌষসংক্রান্তিতে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রচলন বহু আগের, সেই মুঘল আমল থেকে। বলা হয়ে থাকেÑ ১৭৪০ সালে নায়েব-ই-নাজিম নওয়াজেশ মোহাম্মদ খানের আমলে এই ঘুড়ি উৎসবের সূচনা। পুরান ঢাকার অধিবাসীরা আজও এটি উদযাপন করে আসছেন। সাকরাইনে নতুন ধানের চালের পিঠা-পুলি খেয়ে, ঘুড়ি উড়িয়ে আনন্দ-উৎসব করার রেওয়াজ। গতকাল বৃহস্পতিবার শীতও যেন মøান করতে পারেনি সাকরাইন উৎসবের এই আনন্দ। সকাল থেকেই নানান রঙের বাহারি ঘুড়িতে ছেয়ে যায় নীল আকাশ। চক্ষুদার, ভোয়াদার, পানদার, কথাদার, মালাদার, পঙ্খী, পঙ্খীরাজ, চলনদার, পেটিদার, পাংদার, প্রজাপতি, দাপস, চিল, কচ্ছপ, মাছলেঞ্জাসহ বিভিন্ন নামের ঘুড়িগুলো উড্ডয়নের সময় দর্শক-শ্রোতাদের মাঝে ফুটে ওঠে আনন্দ আর উচ্ছ্বাস। বিভিন্ন নামের নানা আকৃতির ঘুড়ি কেনাবেচায়ও ছিল ধুম। সুতায় মাঞ্জা দেয়ার পর্ব তারা আগেই সেরে রেখেছিল। ভোরবেলা কুয়াশার আবছায়াতেই ছাদে ছাদে শুরু হয় ঘুড়ি ওড়ানো। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে উৎসবের জৌলুস। পাল্লা দিয়ে চলে ঘুড়ির কাটা-কাটি খেলা। সন্ধ্যায় আধুনিক সাউন্ড সিস্টেমের সঙ্গে চলে আগুন নিয়ে খেলা, আতশবাজি আর ফানুসে নতুন এক রূপ নেয় রাতের আকাশ। 

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর গেন্ডারিয়ার ধূপখোলা মাঠে ঢাকা সাংবাদিক ফোরাম আয়োজিত ঘুড়ি উৎসবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। পুরান ঢাকার সংস্কৃতির অংশ ঘুড়ি উৎসব আয়োজনের জন্য ঢাকা সাংবাদিক ফোরামকে ধন্যবাদ জানান তথ্যমন্ত্রী। আকাশ সংস্কৃতির থাবায় অনেক সংস্কৃতি হুমকির মুখে উল্লেখ করে দেশীয় ঐতিহ্য ধরে রাখতে আবহমান বাংলার সংস্কৃতি ধারণ ও লালনের ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছেন তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ। 

ঘুড়ি উৎসব ঢাকাবাসীর মনে আনন্দ-উল্লাস সৃষ্টি করেছে বলে জানিয়েছেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন। গতকাল বৃহস্পতিবার ৮ আসনের ১১ ও ১২নং ওয়ার্ডের ঘুড়ি উৎসব উদ্বোধনকালে তিনি একথা জানান।

ফেস্টিভ্যালের সঙ্গে আনন্দের রং ছড়িয়ে অংশগ্রহণকারীদের উৎসাহ বাড়িয়ে তোলার লক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে ঢাকাবাসী। সাকরাইনকে আরো উৎসবমুখর করে তুলে সবাইকে অংশগ্রহণে উৎসাহী করতে পুরান ঢাকায় ঘুড়ি উপহার দিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন।

সাকরাইন সাধারণত ঢাকার দক্ষিণাঞ্চলে উদযাপিত হয়ে থাকে। বিকেলের দিকে অঞ্চলটির প্রতিটি বাড়ির ছাদ থেকে উড়তে থাকে শত শত ঘুড়ি, যা রূপ নেয় ঘুড়ি কাটাকুটি খেলায়। অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের ঘুড়ি দিয়ে অন্যের ঘুড়ি কেটে ফেলার চেষ্টা করে, যে আগে ঘুড়ি কাটতে পারে সে-ই হয় বিজয়ী। ঘুড়ি খেলা শেষে রাত নামলে বর্ণাঢ্য আতশবাজি দিনের আলোর মতো মাতিয়ে তোলে পুরান ঢাকার আকাশকে। শুধু তাই নয়, আগুন নিয়ে খেলা করাসহ বিভিন্ন পেশায় দক্ষ শিল্পীরা তাদের প্রতিভা দিয়ে জড়ো হওয়া মানুষদের বিনোদন দিয়ে থাকেন। সঙ্গে সমান তালে চলতে থাকে গান-বাজনার আর উদ্দাম নাচ।

ঢাকাবাসী সংগঠনের উদ্যোগে হাজারীবাগের ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড টেকনোলজির মাঠে সাকরাইন ও পৌষসংক্রান্তি উৎসবের আয়োজন করা হয়। এতে অংশ নেনথ স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হামিদ সাজু, ঘুড়ি ফেডারেশনের নেতা আবদুল বারেক সোনা মিয়া, ঢাকা ফাউন্ডেশনের সভাপতি মনির হোসেন মিন্টু ও সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ শুকুর সালেক। এতে যোগ দিয়েছে অর্ধ শতাধিক শিশু-কিশোরও।

নীলাকাশে নানা রঙের ঘুড়ির উড্ডয়নের সঙ্গে ছাদে ছাদে টেপ রেকর্ডার বাজিয়ে নাচ-গানের পরিবেশন এ আয়োজনকে করে তোলে প্রাণবন্ত। এ উপলক্ষে পুরান ঢাকার প্রতিটি বাসায় আয়োজন করা হয় নানা ধরনের মুখরোচক রান্নাবান্না। উৎসবের সঙ্গে রসনাবিলাস ভিন্ন এক আবহ তৈরি করে পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের মাঝে। ঘুড়ি ও নাটাইগুলো পুড়িয়ে ফেলার মধ্য দিয়ে শেষ হয় পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের ঐতিহ্যবাহী এই প্রিয় উৎসব। প্রতি বছরের মাঘ মাসের প্রথম দিন ঐতিহ্যবাহী এই সাকরাইন উৎসব উদযাপন করে থাকে পুরান ঢাকার বাসিন্দারা।

পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে এ আয়োজনের সহযোগিতায় মায়ার টিম ছিল নারিন্দা সরকারি হাইস্কুল এবং লক্ষ্মীবাজার শহীদ সহরাওয়ার্দী কলেজ প্রাঙ্গণে। নাগরিক জীবনের ব্যস্ততায় আমাদের খুব কম সময়ই মেলে মুক্ত আকাশ পানে তাকিয়ে তার সৌন্দর্য উপভোগ করার। নীল আকাশের বিশালতা আজ নগরীর উঁচু উঁচু অট্টালিকার ভিড়ে অনুধাবন করার উপায় নেই। 

এতে কেবল স্থানীয়রাই নয়, নগরীর অনেক এলাকা থেকে ঘুড়ি উৎসবে যোগ দিতে আসেন বিভিন্ন বয়সীরা। দক্ষিণখান থেকে আসা বদিউল হক দেওয়ান বলেন, আয়োজনে দিনের বেলায় ওড়ানো হয় ঘুড়ি, সন্ধ্যায় চলে আতশবাজি। সবমিলে এ যেন এক অন্যরকম উৎসব। ঘুড়ি উৎসব দেখতে উত্তরা থেকে এসেছিলেন বহ্নিÑ সন্ধ্যায় আতশবাজির ঝলকানির সঙ্গে মুখ থেকে আগুন বের করার দৃশ্যটি সবচেয়ে আকর্ষণীয়। এর আগে আমি ভিডিওতে দেখেছিলাম। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বশরীরে উপস্থিত হয়েছি এটি দেখার জন্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ