রবিবার ০৭ মার্চ ২০২১
Online Edition

ভ্যাকসিন প্রয়োগের মধ্যেও করোনায় বিশ্বে প্রতিদিন রেকর্ড সংখ্যক মৃত্যু

# বিশ্বজুড়ে একদিনে ১৬ হাজার ২৬৯ জনের মৃত্যু # দেশে ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৬ জনের মৃত্যু 

ইবরাহীম খলিল : যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশে পুরোদমে চলছে করোনার ভাইরাস প্রতিরোধী ভ্যাকসিন প্রয়োগ। এরমধ্যেও বিশ্বজুড়ে করোনায় মৃত্যু কমছে না। বরং গত দুইদিন ধরে রেকর্ড সংখ্যক মৃত্যু হচ্ছে। বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যাও। গত ২৪ ঘন্টায় আবারও বিশ্বজুড়ে রেকর্ড সংখ্যক ১৬ হাজার ২৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এনিয়ে পরপর দুইদিন দৈনিক ১৬ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হলো। এ নিয়ে বিশ্বে করোনায় মোট প্রাণহানি ১৯ লাখ ৮৫ হাজার ছাড়ালো। আক্রান্তের সংখ্যাও একদিনে ৭ লাখ ৪০ হাজার। বিশ্বে মোট শনাক্ত রোগী ৯ কোটি ২৭ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি। তবে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৬ কোটি ৬২ লাখ ৮৮ হাজার ১৯ জন। তবে বিশ্বজুড়ে মৃতের সংখ্যা বাড়লেও বাংলাদেশে কমেছে করোনায় মৃতের সংখ্যা। গত ২৪ ঘন্টায় করোনায় ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে ৮১৩ জন। 

গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর নিউ ইয়র্কের নার্স স্যান্ড্র্রা লিন্ডসেকে ফাইজার-বায়োএনটেক ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ দেয়ার মাধ্যমে ভ্যাকসিন প্রদান কার্যক্রম শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি)র প্রতিবেদন বলছে, কেবল যুক্তরাষ্ট্রে এ পর্যন্ত এক কোটিরও বেশি মানুষ করোনার ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ নিয়েছেন। 

মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন বলছে, গত এক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে দৈনিক তিন হাজার তিনশ’ করে মানুষ করোনায় মারা যাচ্ছেন। যা গত নবেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের থেকে ২১৭ শতাংশ বেশি। নতুন বছরের প্রথম ১৩ দিনে দেশটিতে করোনা শনাক্ত হয়েছে ৩০ লাখের বেশি মানুষের। যুক্তরাষ্ট্রে এ মুহুর্তে হাসপাতালে ভর্তি আছে ১৩ লাখের বেশি মানুষ। তবে আশা করা হচ্ছে ভ্যাকসিন কর্মসূচি চালু থাকলে আগামী জুন নাগাদ কমে আসবে করোনার প্রকোপ। দেশটির মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩৩ কোটি। তবে এখন পর্যন্ত শিশুদের জন্য এ ভ্যাকসিন সহজলভ্য করা যায়নি। 

মডার্না ও ফাইজারের তৈরি তিন কোটি ভ্যাকসিন যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলোতে বিতরণ করা হয়েছে। এর তিন ভাগের এক ভাগ এখন পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়েছে। বুধবার জনসন অ্যান্ড জনসন জানিয়েছে, আগামী মার্চে এক ডোজ বিশিষ্ট করোনা ভ্যাকসিন অবমুক্ত করতে কোম্পানিটি কাজ করে যাচ্ছে। জনসন অ্যান্ড জনসনের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. পল স্টোফেলস মঙ্গলবার রয়টার্সকে বলেন, তাদের নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী এই বছরের শেষ নাগাদ তারা একশো কোটি ভ্যাকসিন বিতরণ করতে পারবে।

যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রাজনৈতিক নেতা ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তা তাদের স্থানীয় অধিবাসীদের আরও ভ্যাকসিন দিতে সম্প্রতি সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করেছেন। অনেক জায়গায় ৬৫ বছরের কম বয়সীদেরও ভ্যাকসিন দেয়া হচ্ছে। ক্যালফোর্নিয়া ও নিউ ইয়র্ক তাদের প্রত্যেকের অঙ্গরাজ্যে এই মাসের মধ্যে ১০ লাখ অধিবাসীকে ভ্যাকসিন দেয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে। 

গত বছরের ৮ ডিসেম্বর করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে বায়োনটেক-ফাইজার ভ্যাকসিন দিতে শুরু করে যুক্তরাজ্য। এরপর থেকে লাখ লাখ মানুষকে দেয়া হচ্ছে ভ্যাকসিন। বলা হচ্ছে, ভ্যাকসিন প্রয়োগের পর করোনায় জীবনাবসানের আশঙ্কা থেকে মুক্তি মিলবে অনেকের। কর্তৃপক্ষ বলছে, যুক্তরাজ্যের বেশির ভাগ মানুষ ভ্যাকসিন পাবেন ২০২১ সালে। করোনার টিকা কার্যক্রম শুরু হলেও যুক্তরাজ্যে বাড়ছে মৃত এবং সংক্রমণের হার। ভ্যাকসিনের পাশাপাশি দেশটিতে লকডাউনসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েও নিয়ন্ত্রণে আসছে না করোনা পরিস্থিতি। 

গতকালও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৬শ’র কাছাকাছি মৃত্যু রেকর্ড করে যুক্তরাজ্য। এদিন দেশটিতে এক হাজার ৫৬৪ জনের মৃত্যু দেখেছে দেশটির মানুষ। ব্রিটিশ ভূখ-ে করোনায় একদিনে এতো বিপুল প্রাণহানি এটাই প্রথম। দেশটিতে এখন পর্যন্ত করোনায় সংক্রমিত হয়েছেন ৩২ লাখ ১১ হাজার ৫৭৬ জন। এর মধ্যে মারা গেছে ৮৪ হাজার ৭৬৭ জন। 

আক্রান্তে দ্বিতীয় ও মৃত্যুতে তৃতীয় অবস্থানে থাকা ভারতে এখন পর্যন্ত সংক্রমিত হয়েছেন এক কোটি ৫১ লাখ ২ হাজার ৮৩১ জন এবং মারা গেছেন এক লাখ ৫১ হাজার ৭৬৫ জন। দেশটিতে আগামিকাল শনিবার থেকে করোনার ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু হবে। ভ্যাকসিন প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। প্রাথমিকভাবে আগামী কয়েক মাসে প্রায় ৩ লাখ মানুষকে করোনার ভ্যাকসিন দেয়ার লক্ষ্য ভারত সরকারের। একেকটি কেন্দ্রে প্রতিদিন ভ্যাকসিন পাবেন একশ’ জন। পরবর্তীতে কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়িয়ে ১২ হাজার করার পরিকল্পনা কেন্দ্রীয় সরকারের। দিল্লিকে এখন পর্যন্ত ২ লাখ ৭৪ হাজার ডোজ পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। আগামী কয়েক মাসে ৩০ কোটি মানুষকে ভ্যাকসিন প্রয়োগের লক্ষ্য নিয়েছে ভারত সরকার। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রথমেই ভ্যাকসিন পাবেন তিন কোটি স্বাস্থ্য ও ফ্রন্টলাইন কর্মী। এরপর ২৭ কোটি পঞ্চাশোর্ধ ব্যক্তিদের ভ্যাকসিন দেয়া হবে। এরই মধ্যে সিরাম ইনস্টিটিউটের কোভিশিল্ড এবং ভারত বায়োটেকের কোভ্যাকসিনের প্রথম চালান ভারতের ১২টি শহরে পাঠানো হয়েছে। 

মোট আক্রান্তে তৃতীয় এবং মৃত্যুতে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলে গত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ১৩শ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আর এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে দুই লাখ ৬ হাজার ৯ জনের, সংক্রমিত হয়েছেন ৮২ লাখ ৫৭ হাজার ৪৫৯ জন । দৈনিক প্রাণহানির তালিকায় মেক্সিকো উঠে এসেছে চতুর্থ স্থানে। দেশটিতে গত ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ৩১৪ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আর এখন পর্যন্ত এক লাখ ৩৫ হাজারের বেশি মৃত্যু দেখেছে দেশটির মানুষ। যেখানে সংক্রমিতের সংখ্যা ১৫ লাখ ৫৬ হাজারের বেশি।

লাগামহীন অবস্থা ব্রাজিলের করোনাভাইরাস পরিস্থিতিও। তবুও বিধি-নিষেধ মানতে নারাজ দেশটির সাধারণ নাগরিকরা। এরমধ্যেই দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ২ লাখ ৪ হাজার ছাড়িয়েছে। এছাড়াও মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে জার্মানি, মেক্সিকো, রাশিয়া, ইতালিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। এ অবস্থায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম শুরু হলেও, এ বছরও করোনাভাইরাস থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না।

এ পর্যন্ত ব্যবহারের উপযোগী সিনোভ্যাকের ৩০ লাখ ডোজ টিকা পেয়েছে ইন্দোনেশিয়া। মঙ্গলবার ১২ লাখ ডোজ টিকা সারাদেশে বিতরণ করা হয়েছে। এদিনই দেড় কোটি ডোজ টিকা ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছেছে বলে জানায় সংশ্লিষ্টরা। সিনোভ্যাক, নোভাভ্যাক্স এবং বিশ্ব টিকা কর্মসূচি কোভ্যাক্সের কাছ থেকে ২২ কোটি ৯ লাখ ডোজ টিকা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে জাকার্তা। অ্যাস্ট্রাজেনেকা এবং ফাইজারের কাছ থেকে ৫ কোটি ডোজ টিকা ক্রয়ের জন্য আলোচনা করছে দেশটি।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান বিজ্ঞানী ডা. সৌম্য স্বামীনাথ বলেন, ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্যাকসিন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কিন্তু চলতি বছরই মানুষের মধ্যে হার্ড ইম্যুউনিটি তৈরি হবে না। তাই মানুষকে সামাজিক দূরত্বসহ সব ধরনের সতর্কতা মেনে চলতে হবে। করোনায় এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০ লাখ মানুষ মারা যাওয়ার পাশাপাশি আক্রান্ত হয়েছেন ৯ কোটি ২০ লাখ। 

বাংলাদেশ পরিস্থিতি 

গত ২৪ ঘন্টায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে করোনায় দেশে ৭ হাজার ৮৪৯ জনের প্রাণহানি হলো। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় শনাক্ত হয়েছেন ৮১৩ জন। ফলে দেশে করোনায় শনাক্তের সংখ্যা দাঁড়ালো ৫ লাখ ২৫ হাজার ৭২৩ জন। গতকাল করোনা পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে এ সকল তথ্য জানানো হয়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিক গতকাল বলেছেন, আগামী ২৫ জানুয়ারির মধ্যে দেশে ভ্যাকসিন আসবে। আর সেই ভ্যাকসিন প্রয়োগের জন্য টেকনোলজিস্ট, নার্স, মিডওয়াইফ ও ভলান্টিয়ারসহ ৪২ হাজার কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে বলে জনিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। 

তিনি বলেন, ভ্যাকসিন দেয়ার জন্য ৪২ হাজার কর্মীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। এর মধ্যে টেকনোলজিস্ট, নার্স, মিডওয়াইফ ও ভলান্টিয়ার আছে। ভ্যাকসিন যাতে সুন্দরভাবে দেয়া যায়, সেজন্য একটি অ্যাপস তৈরি করা হচ্ছে। আইসিট মন্ত্রণালয় এটি তৈরি করছে। আমরা তাদেরকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছি। অ্যাপসের মাধ্যমে ভ্যাকসিন প্রার্থী নিবন্ধন করতে পারবেন। 

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, আগামী ২৫/২৬ জানুয়ারির মধ্যে সেরামের মাধ্যমে ভ্যাকসিনের প্রথম লট আসার কথা। ভ্যাকসিন আসলে তা ট্রান্সপোর্ট ও স্টোরেজ করার ব্যবস্থা করেছি। প্রত্যেক জেলায় যে স্টোরেজ ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে ৭ লাখ ডোজের বেশি ভ্যাকসিন রাখা সম্ভব। উপজেলা পর্যায়ের স্টোরেজে আমরা দুই লাখের অধিক ডোজ রাখতে পারবে। তিনি আরও বলেন, আমরা কাদের ভ্যাকসিন দেব, তা আগেও বলেছি। যারা ফ্রন্টলাইনাররা যেমনÍ চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, সাংবাদিক, সেনাবাহিনী, পুলিশ, ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কাররা আগে পাবেন। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিÑ ৫৫ থেকে বেশি বয়স্কদের পর্যায়ক্রমে ভ্যাকসিন দেয়ার চিন্তা ভাবনা করছি।

গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তির তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে মোট ১৯৪টি ল্যাবে অ্যান্টিজেন টেস্টসহ নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ১৬,৬০৮টি। এর মধ্যে ৮১৩ জনের দেহে করোনার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরো জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন আরো ৮২৩ জন। এ নিয়ে মোট সুস্থ রোগীর সংখ্যা দাঁড়ালো ৪ লাখ ৭০ হাজার ৪০৫ জন। গত বছরের ডিসেম্বরে চীনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেলেও বাংলাদেশে ভাইরাসটি শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। ওইদিন তিনজন করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার কথা জানিয়েছিলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এরপর থেকে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত শনাক্তকৃত রোগীর সংখ্যা অনেকটাই সমান্তরাল ছিলো। কিন্তু তারপর থেকে বেড়েই চলছিলো রোগীর সংখ্যা। আর, করোনায় মৃত্যুর হার শুরুতে বৃদ্ধি পাওয়ার পর অনেকটাই কমে এসেছে সে হার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ