শুক্রবার ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১
Online Edition

মামলা-হুলিয়া দিয়ে গণতন্ত্রের আন্দোলন দমানো যাবে না

গতকাল বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে বিএনপি ঢাকা মহানগর দক্ষিণের উদ্যোগে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানার প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার: মামলা-হুলিয়া দিয়ে গণতন্ত্রের কোনো আন্দোলন দমানো যাবে না বলে হুশিয়ারি দিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল বুধবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মহানগর বিএনপির উদ্যোগে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দায়ের করা ‘ভুয়া-বানোয়াট-মিথ্যা’ রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার পরোয়ানা জারির প্রতিবাদে আয়োজিত এক মানববন্ধনে বিএনপি মহাসচিব এই হুঁশিয়ারি দেন। এতে সহস্রাধিক নেতা-কর্মী তারেক রহমানের প্রতিকৃতি নিয়ে সমবেত হয়। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির পাশাপাশি সারাদেশে জেলা ও মহানগরে একযোগে এই কর্মসূচি পালন করেছে বিএনপি।
মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেলের সভাপতিত্বে ও দক্ষিণের কাজী আবুল বাশার ও উত্তরের আবদুল আলীম নকির পরিচালনায় সমাবেশে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, আবদুস সালাম, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, কেন্দ্রীয় নেতা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, নাজিম উদ্দিন আলম, মীর সরফত আলী সপু, আজিজুল বারী হেলাল, শিরিন সুলতানা, আবদুস সালাম আজাদ, শহিদুল ইসলাম, শামীমুর রহমান শামীম, মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ, যুব দলের সাইফুল ইসলাম নিরব, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, স্বেচ্ছাসেবক দলের আবদুল কাদির ভুঁইয়া জুয়েল, মহিলা দলের সুলতানা আহমেদ, কৃষক দলের হাসান জাফির তুহিন, জাসাসের হেলাল খান, ছ্ত্রাদলের ফজলুল রহমান খোকন, ইকবাল হোসেন শ্যামল প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, আজকে তারেক রহমান সাহেবের বিরুদ্ধে যে মিথ্যা মামলা দেয়া হয়েছে এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে তা নতুন কোনো ঘটনা নয়। এদেশে গণতন্ত্রকে ধবংস করার জন্য এই সরকার অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে প্রায় ১২ বছর ধরে এখানে অত্যাচার-নিপীড়ন-নির্যাতনের একটা স্টিমরোলার চালিয়ে যাচ্ছে। তারা মনে করছে যে, এই অত্যাচার-নির্যাতন-মামলা-হুলিয়া দিয়ে এদেশের মানুষকে দমন করে রাখা যাবে, কিন্তু তা সম্ভব নয়। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, তারেক রহমান সাহেব একা নন। এই দেশের ১৬ কোটি স্বাধীনতাকামী, গণতন্ত্রকামী মানুষ আজকে তার(তারেক রহমান) সঙ্গে আছে। সুতরাং এই মিথ্যা মামলা দিয়ে, হুলিয়া দিয়ে গণতন্ত্রের কোনো আন্দোলনকে দমন করা যাবে না।
মির্জা ফখরুল বলেন, এই সরকার গণবিরোধী সরকার, এই সরকার জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এরা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধবংস করে দিচ্ছে।এজন্যে এখন এই সরকারকে সরানোর সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আজকে বাংলাদেশের সমস্ত গণতন্ত্রকামী মানুষ, দেশপ্রেমিক মানুষ তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এদেরকে পরাজিত করতে হবে। আসুন আজকে এই সমাবেশের মধ্য দিয়ে আমরা জনগণের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেই যে, এখন  সময় এসেছে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হবার, সময় এসেছে আজকে প্রতিবাদ করবার, সময় এসেছে আজকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সত্যের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে লড়াই করবার। আসুন আমরা সবাই সেই লড়াইয়ে অংশ গ্রহণ করি।
সরকারের প্রতি আহবান রেখে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমাদের দেশনায়ক তারেক রহমান যার বিরুদ্ধে মিথ্যা ম্মালার হুলিয়া দেয়া হয়েছে তার সমস্ত মামলার হুলিয়া তুলে নিতে হবে, ৩৫ লক্ষ মানুষের বিরুদ্ধে যে মামলা দেয়া হয়েছে সেসব মামলা তুলে নিতে হবে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে যে মিথ্যা মামলায় আটক করে রাখা হয়েছে তাকে মুক্তি দিতে হবে এবং সকল আটককৃত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে মুক্তি দিতে হবে।
মির্জা ফখরুল বলেন, আজকে তারেক রহমান সাহেবকে এতো ভয় কেনো? ভয়ের একটাই কারণ তারেক রহমান সাহেব এদেশের মানুষের যে রাজনীতি সেই রাজনীতির পতাকা তুলে ধরেছেন। সেই পতাকা নিয়ে এসেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্টে জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে এবং সেই পতাকাকে তুলে ধরেছিলেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্রকে রক্ষা করবার মধ্য দিয়ে। আজকে সেজন্যই এতো ভয় তাদের তারেক রহমানকে নিয়ে। বাংলাদেশের মানুষ সংগ্রামী মানুষ, বাংলাদেশের মানুষ যুদ্ধ করে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রের জন্য বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে সংগ্রাম করেছে এবং বাংলাদেশের মানুষ প্রয়োজনে তাদের বুকের রক্ত দিয়েও গণতন্ত্রকে রক্ষা করবে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, আপনারা (সরকার) তো বিচার বিভাগকে শেষ করে দিয়েছেন। এই বিচার বিভাগের আর কোনো মর্যাদা আপনারা রাখেননি। তারেক রহমান সাহেবকে একটা মামলাতে পুরোপুরিভাবে নির্দোষ ও খালাস দেয়া হয়েছিলো। পরবর্তিকালে আবার সেই মামলাকে আপনারা হাইকোর্টে নিয়ে সাজা দেবার ব্যবস্থা করেছেন। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সম্পূর্ণ মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে তাকে আপনারা সাজা দেবার ব্যবস্থা করেছেন। দেশে কোনো আইনের শাসন এখন নেই।
ভ্যাকসিন প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আপনারা চুরি এবং লুটপাট করে একটা ডাকাতির রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন এই বাংলাদেশে। এই যে কোবিড-১৯ আজকে এতো বড় ভায়াবহ একটি মহামারী, এই মহামারীতে আপনারা লুটপাট বন্ধ করেননি। আরো কিভাবে লুটপাট করবেন-এখন ভ্যাকসিন আমদানির মধ্য দিয়ে লুটপাটের ষড়যন্ত্র করছেন। যেখানে ভ্যাকসিন ভারতে বিক্রি করছে ২ টাকা ৪০ পয়সা করে, সেখানে আপনারা বিক্রি করবেন ৫ টাকা করে বাংলাদেশের মানুষের কাছে। অর্থাৎ এই টাকা সম্পূর্ণ আপনারা নিয়ে যাবেন।
গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, আমাদের বুঝতে হবে, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এটা শেষ কথা নয়। আমরা যদি গণতন্ত্র উদ্ধার করতে পারি হামলা-মামলা-হুলিয়া কোনো কিছুই থাকবে না, আমরা যদি গণতন্ত্র উদ্ধার করতে চাই, তাহলে অবশ্যই গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, যার হাতে গণতন্ত্র গুম হয়েছে, খুন হয়েছে সেই সরকারকে আমাদেরকে বিতাড়িত করতে হবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে। আর তাকে যদি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত করতে পারি তাহলে দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী যে শক্তি, সেই শক্তি একটি আশা পাবে, প্রত্যাশা পাবে। যে স্বাধীনতার সুফল যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা এবং আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সব কিছুই একটি নিয়মের মধ্যে আসবে।
তিনি বলেন, আজকে আদালত বলুন, বিচার বিভাগ বলুন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী বলুন, যত বাহিনী আছে সব বাহিনী একজনের হাতে মুঠায়। এই কর্তৃত্ববাদী সরকার ভিন দেশীদের দাসত্ব গ্রহণ করে আজকে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করা এবং দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে দেশটাকে আগের মতো তলাবিহীন ঝুড়ি বানানোর একটি পাঁয়তারা চলছে। তাই আমাদের একটি-দুইটি মামলার প্রতিবাদ করে ক্ষান্ত হলে চলবে না, একটি সমাবেশের মধ্য দিয়ে আত্মতৃপ্তি প্রকাশ করলে চলবে না। জনগণ প্রস্তুত আছে। আমাদের কথার চেয়ে কাজ দরকার বেশি। জনগণ চায় আমরা রাস্তায় নামি। জনগণ আমাদের সাথে নামবে। সুতরাং এই মুহূর্ত থেকে আমাদের প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। সেকারণে দলকে ঐক্যবদ্ধ করার মধ্য দিয়ে পাড়ায়-মহল্লা-গ্রাম-গঞ্জে যে যেখানে আছেন তাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করুন। ঐক্যের ডাক দিয়ে বলুন-‘এক দফা এক দাবি, হাসিনা তুই কবে যাবি’।
দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, প্রধানমন্ত্রী আপনাকে বলি, বিএনপি আপনাকে উৎখাত করতে চায় না। দেশের মানুষ আপনাকে চায় না। এদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তাকে ঠেকাবেন কি করে? তারেক রহমান তো পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী-এটা মনে রাখেন না কেনো? এই দেশে বাংলাদেশীরা থাকবে, এই দেশে মুক্তিযোদ্ধারা থাকবে, এদেশে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার সৈনিকরা থাকবে। এর বাইরে কোনো দেশের দালাল-টালাল থাকবে না। তিনি বলেন, তারেক রহমান সাহেব প্রতিহিংসা করেন না। তিনি অত্যন্ত জ্ঞানী-গুনি একজন মানুষ। ইতিমধ্যে ব্যারিস্টারি পাস করেছেন। আইনের ওপরে তিনি বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের লোক। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন, তারেক রহমান না হওয়ার কি আছে? দিন তারিখ দেবো না। তবে এই বছরের ভেতরে আপনি...পেছনে বলছিলো ঘুছাতে পারেন, কোনো অসুবিধা নাই। তারেক রহমান এদেশে আসবে। গণতন্ত্রের জন্য আসবে, স্বাধীনতার জন্য আসবে, কৃষকদের জন্য আসবে, শ্রমিকের জন্য আসবে, মেহনতি মানুষের জন্য আসবে। ঠেকাবেন কিভাবে? এই সব মামলা-টামলা করে লাভ নেই। আমাদের পার্টি যখন ডাকবে- যে যেখানে থাকবেন যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে আমরা রাস্তায় নেমে আসবো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যে, স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্যে।”
আমান উল্লাহ আমান বলেন, এই প্রতিবাদ সভা থেকে আমরা বলতে চাই, অবৈধ প্রধানমন্ত্রী, ভোট ডাকাতির প্রধানমন্ত্রী এবং জনগণের মুখে মুখে চোর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবিলম্বে তুমি(শেখ হাসিনা) ক্ষমতা হস্তান্তর করো, নিরপেক্ষ সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করো।তারপরে বাংলাদেশে নির্বাচন হবে। যদি তুমি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করো, নব্বইয়ের আন্দোলনের চেতনায় বাংলাদেশে আরেকটি গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করার মধ্য দিয়ে হাসিনাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে আমরা অবশ্যই সরাবো ইনশাল্লাহ।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান, জিয়া পরিবারের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর এতো প্রতিহিংসা কেনো? উনার প্রতিহিংসা থামবে না। বাজ পাথির মতো, ঈগলের মতো প্রতিহিংসার পাখা উনার ঝটপট ঝটপট করে সবসময়। আরে ভাই, এতো গুম করলাম, এতো খুন করলাম, এতো বিচারবর্হিভুত হত্যা, এতো মামলা তারপরেও বিএনপির নেতারা পিঁপড়ার গর্তের মধ্য থেকে যেমন পিঁপড়া লাখে লাখে দাঁড়ায়, বিএনপির নেতা-কর্মীরা গর্তের ভেতরে থেকে কি করে লাখে লাখে বের হয়? মামলা-গুম-খুনে দমানো যাবে না বিএনপিকে।
মামলা বিএনপি নেতাকর্মীদের গলার মালা বলে মন্তব্য করে সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, মামলা হচ্ছে আমাদের গলার মালা। বেগম খালেদা জিয়া থেকে শুরু করে তারেক রহমানের নামে এই মামলা আমরা ফুলের মালা হিসেবে বরণ করে নিয়েছি। যতদিন বেঁচে থাকব এই মামলা গলার মালা হিসেবে রাখব। যতক্ষণ পর্যন্ত না আওয়ামী লীগের গলায় ফেরত দিতে না পারব, ততদিন পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে। তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ভাই বললেন নির্বাচন নিয়ে টালবাহানা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ ভোট চুরি করছে, লুটপাট করছে। অপরদিকে সাঈদ খোকন বলে তাপস চোর। আর তাপস বলে সাঈদ খোকন ডাকাত। এই যে নতুন নতুন বিশেষণ যোগ হচ্ছে, এগুলো তো আমরা করছি না। খোদ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই করছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ