মঙ্গলবার ১৯ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

নির্বাচন ও গণতন্ত্র এখন কাল্পনিক!

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : নির্বাচন, গণতন্ত্র এখন কাল্পনিক মনে হয়। এমন বিশ্লেষণ রাজনীতিবিদসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের। তারা বলছেন, গত এক দশকেরও বেশী সময় ধরে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুপস্থিত। তবে এমন পরিস্থিতিতেও দলীয় বলয়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে বিরাজনীতিকরণের আলামত দেখা যাচ্ছে। তারা মনে করছেন, মানুষ ভোটকেন্দ্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ায় শুধু গণতন্ত্রই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, বরং দল হিসেবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও ক্ষতিগস্ত হচ্ছে। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতার বক্তব্যে সেটাই প্রমাণ হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সর্বত্রই আলোচিত নাম আবদুল কাদের মির্জা। তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই। নোয়াখালীর বসুরহাট পৌরসভার বিদায়ী মেয়র এবং নির্বাচনে দল মনোনীত মেয়র প্রার্থীও। তিনি নিজেই সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে উৎকন্ঠা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বৃহত্তর নোয়াখালীতে তিন-চারটা আসন ছাড়া বাকি আসনে আমাদের এমপিরা দরজা খুঁজে পাবে না পালানোর জন্য’। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে এনে নাগরিকদের ভোটকেন্দ্র মুখী করাই এখন প্রধান কাজ।
সূত্র মতে, দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা যে ভেঙ্গে পড়েছে, তাতে একজন সাধারণ মানুষও বোঝে। যেভাবে নির্বাচন হয়, তাকে তারা মানতে না পারলেও তাদের কিছু করার নেই। কারণ, তাদের ভোট দেয়ার যেমন সুযোগ নেই, তেমনি সরকার ও নির্বাচন কমিশন সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি। ফলে সাধারণ মানুষ নির্বাচনবিমুখ এবং আগ্রহহীন হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশে গণতন্ত্র ও রাজনীতি বলে কিছু থাকবে না। তারা তাকিদ বোধ করছেন, ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি এবং গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ফিরিয়ে আনতে হবে। এজন্য তারা পুরনো ফর্মূলা ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’কেই উপযুক্ত মনে করছেন। এ পদ্ধতি ফিরিয়ে আনার পরামর্শও দিচ্ছেন। সম্প্রতি সুসাশনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত এক ভার্চুয়াল গোলটেবিল বৈঠকে দেশের সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, মানুষ ভোটকেন্দ্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ায় দেশের গণতন্ত্র ক্ষতি হচ্ছে।
গণতন্ত্র ‘কাল্পনিক’ রূপ লাভ করায় উগ্রবাদীদের উত্থান ঘটতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে এনে নাগরিকদের ভোটকেন্দ্রমুখী করতে হবে। একইসঙ্গে তারা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে ‘বিরাজনীতিকরণ কমিশন’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তারা বলেছেন, আগে দেখতাম সামরিক শাসকরা ক্ষমতা দখল করে বিরাজনীতিকরণ করেন, এখন বেসামরিক সরকারও ইসির সহায়তায় রাষ্ট্রকে বিরাজনীতিকরণ করেছে। অন্যদিকে ২০ দলীয় জোটের পাশাপাশি বাম গণতান্ত্রিক জোটও নির্দলীয় তথা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের কথা বলেছে। তাদের এসব বক্তব্য থেকে এটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, দেশের সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোট অনুষ্ঠানের জন্য দলীয় সরকার উপযুক্ত নয়। এর জন্য প্রয়োজন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এ ধরনের সরকারের মাধ্যমে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব এবং মানুষ উৎসবমুখর হয়ে ভোট দিতে যায়, তা একাধিকবার প্রমাণিত হয়েছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের অধীনে যে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু হয় না, তাও প্রমানিত। এতে যেমন ভোটাররা ভোটাধিকার হারিয়েছে, তেমনি গণতন্ত্রও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেনি। এই পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায়, অন্তত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং উৎসবমুখর পরিবেশে মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অনির্বাচিত হলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারই সবচেয়ে বেশি কার্যকর। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা সেটি আমলে নিচ্ছে না। যদিও বিরোধীরা নির্দলীয় সরকারের আমলে নির্বাচনের দাবিতে তাদের আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাংলাদেশের মানুষ ভোটের অধিকারের জন্য দীর্ঘদিন লড়াই করেছে। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরও ভোটের অধিকার এখনো পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি। একটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হচ্ছে নিরপেক্ষ নির্বাচন। আর এর পূর্বশর্ত হচ্ছে দলীয় প্রভাবের বাইরে সুষ্ঠু পরিবেশে সর্বপ্রকার ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে ভোট প্রয়োগের অধিকার। একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রতিষ্ঠার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষকে আন্দোলন করতে হয়েছে। দাবি আদায়ের সংগ্রামে পথে নামতে হয়েছে। কেননা দেখা গেছে ক্ষমতাসীন সরকার তাদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। ফলে গণতন্ত্রকামী মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে এবং শেষ পর্যন্ত বিজয় লাভ করেছে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, দেশে এখন নির্বাচন সংক্রান্ত কিছু আছে এটি তো জনগণ ভুলেই গেছে। এখন তো তারা নিজেরাই সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শংকা প্রকাশ করছে। তিনি বলেন, সম্প্রতির আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই আবদুল কাদের মির্জা অনেক অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। এসব অভিযোগের উদ্দেশ্য যাই হোক, অনেক সত্য বেরিয়ে আসছে। রিজভী বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে খোদ ওবায়দুল কাদের সাহেব জিতবেন কিনা তার আপন ভাই-ই এ প্রশ্ন তুলেছেন। সে বলেছে নির্বাচন নিয়ে টালবাহানা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ ভোট চুরি করছে, লুটপাট করছে। নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেও নিজের জয় নিয়ে শংকিত সে। আওয়ামী লীগকে দেশে দুর্গতির জনক মন্তব্য করে বিএনপির এ নেতা বলেন, জনগণকে ভোটাধিকার বঞ্চিত করে, তাদের বিরুদ্ধে ইউনিফরম পরা সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দিয়ে আর বেশিদিন মানুষের মুখ বন্ধ করে রাখা যাবে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবারই জানা নির্বাচন ও গণতন্ত্র শব্দ দু’টি সমার্থক নয়। তবে নির্বাচন গণতন্ত্রের উত্তরণের একটি অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গ। নির্বাচন অবাধ নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু না হলে গণতন্ত্রের পথ সুগম হয় না। অন্যভাবে বলতে গেলে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান একটি দেশের গণতন্ত্র চর্চার পথকে কণ্টকমুক্ত করে। দুঃখজনক হলেও একটি ঐতিহাসিক সত্য এই যে, বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন এখন সুদুর অতীত। এখান দেশে গণতন্ত্রের চর্চাও নেই। আছে জোর যার মল্লুুক তার নীতি। ২০০১ সালের পর যে তিনটি নির্বাচন হয়েছে সবগুলোই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন। এর মধ্যে ২০১৪ সালে হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বীহীন নির্বাচন আর সর্বশেষটি ছিল ভোটারবিহীন। উপর্যুপরি দু’দুটি প্রতিদ্বন্দ্বীহীন ও ভোটরবিহীন নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগ জনগণকে ভোট-বিমুখ করে ছেড়েছে। এর প্রমাণ ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারির ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পাওয়া গেছে। এভাবেই প্রমাণ হয়েছে যে, এ দেশে দলীয় সরকারের অধীন নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। যে দল ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করবে তাকে গণ-আন্দোলন ব্যতীত ক্ষমতা থেকে হটানো কোনো প্রকারেই সম্ভব নয়।  
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের বলেন, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিয়েছে। জাতীয় পার্টির শাসনামলে দুর্নীতি ছিল না, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ছিল না, ক্ষমতার অপব্যবহার ছিল না। গেল ত্রিশ বছরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শাসনামলের চেয়ে জাতীয় পার্টির শাসনামলে সুশাসন বেশি ছিল। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, বিএনপি এখন সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ডাক-চিৎকার করছে। কিন্তু বিএনপি কি সুষ্ঠু নির্বাচন দিয়েছে কখনো? বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মহাসচিবদ্বয় প্রায়ই বিভিন্ন ইস্যুতে বাহাস করেন। কিন্তু দুই দলই গণতন্ত্রের হাতে হাতকড়া পরিয়ে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক স্বাদ নষ্ট করেছে।
বাংলাদেশে গণতন্ত্র না আসার একমাত্র কারণ আওয়ামী লীগ নয়, বিরোধী দলও সমভাবে দায়ী বলে মন্তব্য করেছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেন, আজ সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে কেন আমি ভোট দেবো? কেন আমার ভোট চাই? এই দেশের মালিক আমরা।আমরা সবাই মিলে এই দেশের মালিক। তাই যদি হয় তাহলে দেশের পরিচালনায়, শাসনে আমাদের বক্তব্য রাখার অধিকার থাকতে হবে। সমালোচনা করার অধিকার থাকতে হবে। জবাবদিহি করার অধিকার থাকতে হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, এ দেশে কোনো নির্বাচন রাজনৈতিক সরকারের আমলে সুষ্ঠু হয়নি। সুতরাং দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে হবে। এটা জোরেশোরে দাবি হওয়া উচিত।
 সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, সরকার চাইলেই শুধু সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। এ সময় তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন, বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা ১৯৯৬ সালে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক ছিলেন। ওনার দ্বারা ১৯৯৬–এর ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হয়েছে আবার ৯৬ সালের জুনের নির্বাচনও হয়েছে। আসলে সরকার চেয়েছিল বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।
সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইন হলো আরপিও। বর্তমান নির্বাচন কমিশন অনেকগুলো পরিবর্তনের কথা বলছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো ইভিএম অন্তর্ভুক্ত করা। তিনি বলেন, ‘হলফনামা, আয়-ব্যয়ের হিসাব-নিকাশ, এগুলোয় কর্ণপাত নেই, কিন্তু ইভিএমের ব্যাপারে অতি উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। আইনকে অস্ত্রে পরিণত করার প্রচেষ্টা কি না জানি না।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচিত সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু, কারচুপিবিহীন ও প্রশ্নহীন নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করা হয়েছিল, সেটি যে নিছক ক্ষমতায় থাকার জন্যই করা হয়েছিল সেটি এখন প্রমাণিত। বিগত দশ বছরে সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে স্থানীয় সব ধরনের নির্বাচনের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। ভোট কেন্দ্র দখল, কারচুপি, জালভোট এমনকি ভোটের আগের রাতে ভোট হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। দেশের যে কোনো নির্বাচন এলেই সাধারণ মানুষ ধরে নেয়, ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত। ক্ষমতাসীন দলের নমিনেশন পাওয়া মানে সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে সিটি মেয়র, পৌর মেয়র, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়ার গ্যারান্টি। ফলে ক্ষমতাসীন দলের নমিনেশন পাওয়ার জন্য প্রার্থীদের যে ভিড় লক্ষ্য করা যায়, ভোট কেন্দ্রে ভোটারদের তার ছিঁটেফোটাও দেখা যায় না। বৃহত্তম বিরোধী দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও ভোটের দিন তাদের কোনো পাত্তা থাকে না। অনেক সময় দিনে দুপুরেই বর্জন করে চলে আসে।
দেশের সচেতন মহল থেকে শুরু করে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা যে ক্ষমতাসীন দলের অধীনে অনুষ্ঠিত সব ধরনের নির্বাচনে অসন্তুষ্ট তা তারা বিভিন্ন সময়ে সভা-সেমিনারে বক্তব্য দিয়ে এবং পত্র-পত্রিকায় কলাম লিখে পরামর্শ দিয়েছেন। এতে ক্ষমতাসীন দলের যে কিছু যায় আসে না, তা নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার কোনো উদ্যোগ না নেয়া থেকেই বোঝা যায়। নির্বাচনে কিছু ভোটার এনে নামকাওয়াস্তে লোক দেখানো ভোটের দৃশ্য দেখানোর মধ্যেই সে সন্তুষ্ট। কে কি বলল, তার আমলে নিচ্ছে না। তার মধ্যে এ প্রবণতা বিদ্যমান, ভোট তো হচ্ছে, মানুষ ভোট দিতে না এলে তার কি করার আছে? সরকারের সাথে তাল মিলিয়ে নির্বাচন কমিশনও একই বক্তব্য দেয়। তার কথা, ভোট কেন্দ্রে ভোটারদের আনার দায়িত্ব তার নয়। তবে সে এটা ভুলে থাকতে চায়, অতীতে দেশের ভোটের চিত্র কেমন ছিল। সেসব ভোটের কোথাও কোথাও অনিয়ম হলেও সেগুলোতে যে বিপুল ভোটারের উপস্থিতি ছিল, তা মনে করতে চায় না। মনে করতে গেলে তার ব্যর্থতা দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। দেশে ভোট কারচুপি, ব্যালট বাক্স ছিনতাই ইত্যাদি এখন নিত্যদিনকার ঘটনা।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ভোটের অধিকারের জন্য দীর্ঘদিন লড়াই করেছে। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরও ভোটের অধিকার এখনো পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি। আমাদের দেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, মানুষ বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে তাদের ভোটের অধিকার আদায়ের চেষ্টা করে যাচ্ছে। বার বার তাদের এই অধিকারের ক্ষেত্রে বাধা এসেছে। এমনকি স্বাধীনতার পর জাতীয় সংসদের প্রথম যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেখানেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে মানুষের ভোটের অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছিল। তিনি বলেন, ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার যে উগ্র মানসিকতা রয়েছে তার ফলে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। ভারতসহ সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশে সংসদ ভেঙে দিয়ে জাতীয় নির্বাচন হয়। তখন তারা আর সংসদ সদস্য হিসেবে বিবেচিত হন না। কিন্তু বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদের ‘(৩) (ক) অনুযায়ী মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে সংসদ-সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে। তবে শর্ত থাকে যে, এই দফার (ক) উপ-দফা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ, উক্ত-দফায় উল্লিখিত মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সংসদ সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করিবেন না।’ সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরও পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত সংসদ সদস্য হিসেবে বহাল রাখার এই অদ্ভুত বিধান পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক দেশে নেই। নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জন্য এর চেয়ে অন্যায্য বিধান আর হতে পারে না।
ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের ছাত্র এম ডি মাইদুল ইসলাম (নয়ন) গণমাধ্যমে মাধ্যমে বলেছেন, বর্তমান সরকার পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় এসে চার বছর অতিক্রম করে এক বছরকে সামনে রেখে জনগণকে ধোঁকায় ফেলে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ক্ষমতায় আসার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল ঘোষণা করেছে। যেটা গণতন্ত্র বিরোধী কাজ। এ সরকার তার বিরোধী দলগুলোকে পরোয়া করে না। বর্তমান সরকার যে অরাজকতা সৃষ্টি করেছে তা অতীতের সমস্ত রেকর্ডকে অতিক্রম করেছে। খুন, গুম, হত্যা, ইভটিজিং, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দুর্নীতি ইত্যাদি কুকর্ম এখন প্রকাশ্যে ঘটছে। আমি বলতে চাই, একটি সুষ্ঠু শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো বিকল্প নেই।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, অবাধ নির্বাচনই ক্ষমতাবদলের একমাত্র বৈধ পথ ও পন্থা। কিন্তু এখন তো সেই সুদুর অতীত। সভা-সমাবেশ, ফেসবুক, ইন্টারনেট, সেলফোন থেকে গ্রামের চা-দোকানের আড্ডা সর্বত্র এক অজানা আশঙ্কাজনিত বিশেষ সতর্কতা। অফিস-আদালতে আতঙ্ক। কে কখন কোথায় কোন কথা কীভাবে বলে বা শুনে বিপদে পড়ে, সে রকম একটি অজানা আশঙ্কায় মানুষ ভীত থাকে। এ রকম একটি পরিবেশ কোনোভাবেই গণতন্ত্র সহায়ক হতে পারে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ