মঙ্গলবার ২৬ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

ভারত থেকে বেশি দামে ভ্যাকসিন কেনায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া

ইবরাহীম খলিল : ভারতের তুলনায় ৪৭ শতাংশ বেশি দামে ভ্যাকসিন কেনার খবরে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে দেশের মানুষের মধ্যে। রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন সুশীল সমাজ থেকে শুরু করে অন্যা পেশার লোকজনও।
বাংলাদেশে অতিরিক্ত দাম দিয়ে করোনার টিকা আমদানির মধ্য দিয়ে লুটপাটের আরেক উৎসব চালানোর প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দেশে ডাকাতির রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, এর সবশেষ নজির অতিরিক্ত দাম দিয়ে করোনার টিকা আমদানি। আর এই আমদানির মধ্য দিয়ে লুটপাটের আরেক উৎসব চালানোর প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।
করোনার ভ্যাকসিন ক্রয় পদ্ধতি, প্রাপ্তি ও বিতরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বিবৃতি দিয়েছেন। গণমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি বলেন, সরকার শুরু থেকেই করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। করোনা পরিস্থিতির শুরুতে মাস্ক ও পিপিই ক্রয়ে ভয়াবহ অনিয়ম-দুর্নীতি, ত্রাণ সামগ্রী বিতরণে অনিয়ম ও আত্মসাতের পর এখন উচ্চমূল্যে করোনার টিকা ক্রয়ের যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, তাতে অস্বচ্ছতা ও অনিয়েমের লক্ষণ বিদ্যমান। বিশ্ব বাজারে অনেক আগেই করোনার ভ্যাকসিন আগমনের খবর প্রচারিত হয়েছে। সে ক্ষেত্রে সরকার দ্রুত ভ্যাকসিন আনার বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। সরকারের বিলম্বে ও উচ্চমূল্যে টিকা ক্রয়ের সিদ্ধান্ত রহস্যজনক।
প্রগতিশীল চিকিৎসক সংগঠনগুলোর জোট ডক্টরস প্লাটফর্ম ফর পিপলস হেলথের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রোজেনিকার দুই ডলার মূল্যের ভ্যাকসিন বাংলাদেশ পাঁচ ডলারে পাচ্ছে। সংগঠনটির দাবি, কোভিড সংক্রমণ প্রতিরোধে এবং জীবন রক্ষায় বিদেশ থেকে ভ্যাকসিন সংগ্রহকে সরকার অগ্রাধিকার ও সর্বোচ্চ গুরুত্ব না দিয়ে এটিকে ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে।
করোনার ভ্যাকসিন ক্রয়, প্রাপ্তি ও বিতরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ( টিআইবি)বিবৃতিতে সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়, করোনার চিকিৎসার কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় কেনাকাটার জন্য স্বাস্থ্য খাতের অবারিত দুর্নীতির ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে প্রযোজ্য আইন ও বিধি যথাযথভাবে অনুসরণের তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম ভ্যাকসিনের দাম বৃদ্ধির ব্যাখ্যায় জানিয়েছেন, ওরা ডোজ প্রতি চার ডলার করে নিচ্ছে আর টিকা আনার খরচ, শুল্ক, ভ্যাট ইত্যাদির খরচের জন্য বেক্সিমকো নেবে ডোজ প্রতি এক ডলার করে। তিনি বলেন, "যখন আমাদের সাথে কথা হয়েছে তখন বলা হয়েছিল ভারতকে ওরা যে দামে বিক্রি করবে আমরাও সেই দামেই পাবো। যে সময়ে আমরা কথা বলেছি সেটা পাঁচ-ছয় মাস আগের কথা। এখন অনেক টিকা বাজারে আসছে কিন্তু সেই সময় আমাদের কাছে এছাড়া আরও কোন বিকল্প ছিল না।
টিকা কিনতে বাংলাদেশের খরচ হচ্ছে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার মতো। আর সেটি পৌঁছে দেয়া ও সংরক্ষণে এক হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। ভারতের তুলনায় ৪৭ শতাংশ বেশি দামে ভ্যাকসিন কেনা হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে গতকাল অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল বলেছেন, ইন্ডিয়া যদি তৈরি করে তাহলে তাদের কস্ট অব প্রোডাকশন তো কম হবেই। তারা যখন বিক্রি করবে ডেফিনেটলি সেলস প্রাইসটা তাদের খরচ, প্রফিট এই দুইটাকে একত্র করে তারা এই কাজটি করবে। তাদের যে খরচ হবে সেই দামে আমরা পাবো, তাদের দেশে যদি তৈরি করা হয় এটা প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না। তবে আমরা দেখব যে আন্তর্জাতিক বাজারে কতো ভ্যাকসিনের দাম এবং আমরা কতো দামে পাচ্ছি সেটা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করব। কারণ এক দেশ ভ্যাকসিন তৈরি করবে না, অনেক দেশ তৈরি করবে। এক দেশ থেকে যদি বেশি দাম বলে আমরা অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা অবশ্যই করব, সেই সুযোগ আমাদের আছে।
সেরাম ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি করোনার টিকা ভারতের চেয়ে প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি দামে কিনছে বাংলাদেশ। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি এই টিকা উৎপাদন করছে। প্রথম অবস্থায় সেরামের কাছ থেকে তিন কোটি টিকা কিনছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ সরকারের একজন কর্মকর্তার বরাতে বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সেরামের কোভিশিল্ড টিকার প্রথম চালান ২৫ জানুয়ারির মধ্যে বাংলাদেশে আসার কথা। টিকা আসলে ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই টিকা দেওয়া শুরু করা হবে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, সেরাম উৎপাদিত টিকা কোভিশিল্ডের প্রতি ডোজ কিনতে বাংলাদেশকে খরচ করতে হচ্ছে ৪ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশী টাকায় এর দাম পড়ে প্রায় ৩৪০ টাকা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনটি সূত্রের কাছ থেকে রয়টার্স এই তথ্য পেয়েছে।
ভারত সরকার সেরামের কাছ থেকে প্রতি ডোজ টিকা কিনছে ২০০ রুপি বা ২.৭২ ডলার দরে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এটি ২৩১ টাকার মতো। এই হিসাবে, বাংলাদেশকে টিকার প্রতি ডোজ কিনতে ভারতের চেয়ে প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে।
সেরাম প্রথম চালানে ভারতকে ১ কোটি ১০ লাখ ডোজ টিকা সরবরাহ করবে। পরিমাণে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান সেরামের কাছে এখন পাঁচ কোটি ডোজ টিকার মজুত রয়েছে।
অ্যাস্ট্রাজেনেকা, গেটস ফাউন্ডেশন ও গ্যাভি ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে ১০০ প্রতিষ্ঠানটি কোটিরও বেশি ডোজ টিকা উৎপাদন করছে বিশ্বের নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য।
এদিকে, বাংলাদেশের বাজারে বেসরকারি পর্যায়ে করোনাভাইরাসের টিকা বিক্রি শুরু করতে যাচ্ছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস। আগামী মাসেই এ কার্যক্রম শুরু হতে পারে বলে আভাস দিয়েছে রয়টার্স। তারা জানিয়েছে, বেসরকারি পর্যায়ে টিকার প্রতি ডোজের দাম পড়বে এক হাজার ১২৫ টাকার (১৩.২৭ ডলার) মতো।
 বেক্সিমকোর চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) রাব্বুর রেজার বরাত দিয়ে মঙ্গলবার তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের টিকাদান কর্মসূচিতে দেওয়ার বাইরে বাজারে বিক্রির জন্য ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে ৩০ লাখ ডোজ করোনাভাইরাসের টিকা কিনছে এই ফার্মাসিউটিক্যালস। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রেজেনেকার এই টিকার প্রতি ডোজের জন্য সেরাম ইনস্টিটিউটকে তাদের দিতে হবে ৮ ডলার করে। এই দাম বাংলাদেশ সরকারকে দেওয়ার জন্য সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে বেক্সিমকো যে টিকা আনছে, তার দামের প্রায় দ্বিগুণ।
বাংলাদেশ সরকারের গণ টিকাদান কর্মসূচির জন্য বছরের প্রথমার্ধে প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ টিকা সরবরাহ করবে বেক্সিমকো। রাব্বুর রেজা রয়টার্সকে বলেছেন, এই মাসের শেষ দিকেই সরকার ও বাজারে বিক্রির জন্য টিকা সরবরাহ শুরু করবে সেরাম ইনস্টিটিউট। প্রতি ব্যক্তিকে করোনাভাইরাসের এই টিকার দুটি ডোজ নিতে হবে। মাঝে কয়েক সপ্তাহের বিরতি দিয়ে দ্বিতীয় ডোজ দেয়া হবে। রাব্বুর রেজার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী মাস থেকেই বাংলাদেশের বাজারে বেক্সিমকো টিকা বিক্রি শুরু করতে পারে। প্রতি ডোজের জন্য দাম রাখা হবে এক হাজার ১২৫ টাকার মতো (১৩.২৭ ডলার) করে। এরইমধ্যে তারা সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে ১০ লাখ ডোজ টিকার জন্য চুক্তি করেছে, এই পরিমাণ আরও ২০ লাখ ডোজ বাড়তে পারে।
ভারত থেকে টিকা এনে বাংলাদেশে সরবরাহের জন্য গত অগাস্টে সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় দেশের ওষুধ খাতের শীর্ষ কোম্পানি বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস।
সেই চুক্তি অনুযায়ী, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস বাংলাদেশে সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত ভ্যাকসিনের ‘এক্সক্লুসিভ ডিস্ট্রিবিউটর’। রেজা বলেন, সেরামের বাইরে বায়োলোজিক্যাল ই ও ভারত বায়োটেকের মতো অপর ভারতীয় টিকা উৎপাদকদের সঙ্গেও প্রাথমিক আলোচনা করেছে বেক্সিমকো। তবে বর্তমানে সেরামই আমাদের অংশীদার এবং তাদের সঙ্গেই আমরা কাজ চালিয়ে যাব। এটাই আমাদের লক্ষ্য, “রয়টার্সকে এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বলেছেন তিনি। বেক্সিমকোর চিফ অপারেটিং অফিসার বলেন, সরকার যদি আরও টিকা চায় তাহলে আমরা অন্যান্য টিকার বিষয়েও আলোচনা করতে পারি যেগুলো নিয়ে সেরাম কাজ করছে, যদি সরকার অ্যাস্ট্রেজেনেকার টিকার বাইরে কোনো টিকা চায়।”
বিশ্বের শীর্ষ টিকা উৎপাদক সেরাম ইনস্টিটিউট ভারত সরকারের কাছে ১০ কোটি ডোজ টিকা বিক্রির পরিকল্পনা করেছে, যেখানে প্রতি ডোজের দাম রাখা হবে ২০০ রুপি (২.৭৩ ডলার) করে। এরপরে আরও দরকার হলে দাম সামান্য বাড়ানো হতে পারে। ভারত সরকার এরইমধ্যে এক কোটি ১০ লাখ ডোজ টিকার জন্য সেরামের সঙ্গে চুক্তি করেছে। নয়াদিল্লির অনুমোদন পেলে ভারতের বাজারে এক হাজার রুপি (১৩.৬৬ ডলার) করে প্রতি ডোজ টিকা বিক্রি করতে চায় সেরাম ইনস্টিটিউট।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ