বৃহস্পতিবার ২৮ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

নতুন বছরে খেলাপি ঋণ সিঙ্গেল ডিজিটে আনার চ্যালেঞ্জ নিয়েছে জনতা ব্যাংক

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : জনতা ব্যাংকের সুনাম নষ্ট হয়েছিল মূলত অতিমাত্রায় খেলাপি ঋণের কারণে। ধীরে ধীরে সে বদনাম ঘুচতে শুরু করেছে। ২১ হাজার কোটি টাকা খেলাপি থাকা ব্যাংকটিতে আদায় প্রক্রিয়া জোরদার করায় ক্রমান্বয়ে কমে আসছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। অন্যদিকে বাড়ছে পরিচালন মুনাফা। বাড়ছে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানোর পরিমাণ। এতে বুঝা যাচ্ছে ব্যাংকটির প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ফিরে এসেছে। জনগণের এ আস্থার মূল্যায়ন জনতা ব্যাংক করবে। করোনাকালীন সময়েও ব্যাংকের সমস্ত কার্যক্রম চলমান ছিল এখনো আছে। ব্যাংকে সর্বত্র তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। নতুন বছরে খেলাপি ঋণ সিঙ্গেল ডিজিটে আনার চ্যালেঞ্জ নিয়েছে জনতা ব্যাংক। এ লক্ষ্যে একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কঠোর পরিশ্রমের ফসল হিসাবে জনতা ব্যাংককে বিশ^মানের না হলেও গ্লোবাল ব্যাংকিংয়ের সমস্ত প্রক্রিয়া ফুলফিল করতে পারবো। রাষ্ট্রায়ত্ত মালিকানাধীন জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আব্দুছ ছালাম আজাদ জনতা ব্যাংকের বিভিন্ন বিষয় ও তার স্বপ্নের কথা এভাবে ব্যক্ত করেন।
এমডি বলেন, নতুন বছরে আমরা এসএমই খাতে ঋণ দেয়ার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করেছি। এ ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত যে সকল প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে তা বাস্তবায়ন করবে জনতা ব্যাংক। গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করতেই আমরা এসএমই খাতে ঋণ দেয়াকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। এছাড়া প্রতিবছর ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স আসার পরিমাণ বাড়ছে। জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে আসার পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত বছর প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার রেমিট্যান্স এসেছে জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে। ২০২১ সালে প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক রেমিট্যান্স জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে ১০ হাজার কোটি টাকায় উন্নিত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, জনতা ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের বড় সফলতা হলো ঋণ কেলেংকারির সাথে যারা জড়িত ছিল এমন ২৫০ জন কর্মকর্ত-কর্মচারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এই একশানের কারণে বিগত দুই বছরে ঋণ সংক্রান্ত কোনো স্ক্যান্ডল হয়নি। ফোর্স ঋণের কোনো সুযোগ নেই। কেননা এখন সবাই সচেনত হয়ে গেছে। সকলে জেনে গেছে যে, অন্যায় করলেই শাস্তি পেতে হবে। ব্যাংকের সকল কর্মকর্ত-কর্মচারিকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়েছে। বর্তমান বোর্ড অব ডিরেক্টর’সদের মধ্যে চমৎকার বোঝাপড়া রয়েছে। করোনা মধ্যেও নিয়মিত বোর্ড মিটিং হয়েছে। ঋণ দেয়াসহ প্রত্যেকটি বিষয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়।
জনতা ব্যাংক অবশ্যই সফল হবে। কেননা আমাদের রয়েছে দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তা। বর্তমানে জনতা ব্যাংকের ১৩ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারির মধ্যে ৮ হাজারের বেশি ইয়ং জনশক্তি। তাদের মেধা ও কর্মদক্ষতা কাজে লাগিয়ে আগামি দিনে জনতা ব্যাংক সামনের দিকে এগিয়ে নিতে চাই।      
২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণের খেলাপি ঘোষণা না করার যে নির্দেশনা ছিল ২০২১ সালে তার প্রভাব পড়বে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে আব্দুছ ছালাম আজাদ বলেন, অবশ্যই কিছুটা প্রভাব তো পড়বেই। খেলাপির পরিমাণ কিছুটা বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। কেননা কিস্তি পরিশোধে টাকার পরিমাণ বেড়ে যাবে অর্থাৎ ডাবল চাপ পড়বে। এ ক্ষেত্রে আমার পরামর্শ হলো গ্রাহকরা কিস্তির মাধ্যমে যে ঋণ পরিশোধ করবে এই কিস্তিরও কিস্তি করে দেয়া। এটা করলে গ্রাহকরা তাদের ব্যবসা ভালোমতো চালিয়ে নিতে পারবে।  
জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুছ ছালাম আজাদও মনে করেন, খেলাপি ঋণ বাড়ার জন্য দায়ী অ্যানন টেক্স ও ক্রিসেন্ট গ্রুপ। তবে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, অ্যানন টেক্স তাদের ঋণ নিয়মিত রাখার কথা দিয়েছে। চলতি মাসেই তারা তাদের ঋণের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ দিয়ে দেবে। এ সংক্রান্ত সমস্ত কাগজপত্র রেডি করা হয়েছে। ২০২১ সালে অ্যানন টেক্স ও ক্রিসেন্ট গ্রুপসহ সকলের ঋণ নিয়মিত রাখার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর শেষে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। চলতি ২০২১ এর জানুয়ারিতে ৪ হাজার কোটি টাকা আদায় হবে। এতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে ৯ হাজারের কিছু বেশি থাকবে। ২০২১ সালে ডিসেম্বর পর্যন্ত তা ৬ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হবে। খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনাকে আমরা চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিয়েছি।   
তিনি বলেন, করোনা ভাইরাসের কারনে বিশ্বের সকল প্রতিষ্ঠানই কম বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব বিবেচনায় বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতির চাকা অনেকটা সচল রয়েছে। বছরের শেষে জনতা ব্যাংক পরিচালন মুনাফা, রেমিট্যান্স বৃদ্ধিসহ অনেক সূচকেই সফলতা দেখিয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালি করতে ২০২১ সালে আমরা বড় ঋন বিতরণের চেয়ে ছোট ছোট বা এসএমই ঋণ দেয়াকেই প্রাধান্য দিচ্ছি। এসএমই ঋণ বিতরণের জন্য ভাল গ্রহীতা খুঁজছি। ২০২১ সালও ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য চ্যালেঞ্জিং হবে। কেননা করোনার মহামারি এখনো চলমান। তবে গত বছরের তুলনায় ভীতি কমে যাওয়ায় ক্ষুদ্র ব্যবসায় গতি পাবে। সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারলে ব্যাংক ব্যবস্থাও গতিশীল হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে নতুন নতুন ব্যাংকিং সেবা এবং প্রোডাক্ট নিয়ে গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় সার্ভিস নিশ্চিত করতেও জনতা ব্যাংক নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। একইসঙ্গে ব্যাংকের মুনাফা ঠিক রাখতে আমরা আমাদের এমপ্লয়ীদের চাঙ্গা রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছি। নিরাপত্তা বজায় রেখে গ্রাহককে ব্যাংকিং সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছি। গ্রাহকের জন্য ইন্টারনেট ব্যাংকিং, এটিএম বুথ, ডেবিট কার্ড এবং অনলাইন সেবার মাধ্যমে সময়োপযোগী ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করেছি। এছাড়াও আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুসরণ করে কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছি। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামনে কেমন হতে পারে এমন প্রশ্নর উত্তরে তিনি জানান, পরিস্থিতি সামনে একটু স্লো বা ডাউন হতে পারে। তবে আমাদের ফরেন রেমিট্যান্স কিছুটা গ্রোথ আছে। এটা একটা ভাল সংবাদ। তবে খেলাপী ঋণগুলো আমরা যতো দ্রুত সম্ভব নিয়মিত করার চেষ্টা করছি।
খেলাপি ঋণে জর্জরিত ছিল জনতা ব্যাংক। ধীরে ধীরে তা কমতে শুরু করেছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৬ কোটি টাকা। ২০২১ এর জানুয়ারিতে চার হাজার টাকার বেশি আদায় হবে বলে জানান জনতা ব্যাংকের এমডি। এতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯ হাজারের ঘরে নেমে আসবে। বছর শেষে খেলাটি ঋণ ৬ হাজার কোটিতে নামিয়ে আনবেন এমন পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা। ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২০ এই তিন বছরে উঠা-নামার মধ্যে ছিল খেলাপি ঋণ। তবে করোনা পরিস্থিতিতে দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ কাজে লাগিয়েছে ব্যাংকটি। এছাড়া কিছু ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের শুরুতে পুরো ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ১০ বছর পর অর্থাৎ ২০১৯ সালে শুধু জনতা ব্যাংকেই খেলাপির পরিমাণ দাঁড়ায় ২১ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের জুন শেষে বিতরণ করা ঋণের ২২ শতাংশ ছিল খেলাপি ঋণ। এক বছর পর অর্থাৎ ২০১৯ সালের জুন শেষে মোট বিতরণ করা ঋণের ৪৩ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়ে। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ১৪ হাজারের ঘরে থাকলেও ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকে হিসাব জমা দেয়ার সময় দশ হাজারের নিচে নেমে আসবে বলে জানান জনতা ব্যাংকের এই শীর্ষ কর্মকর্তা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ