শুক্রবার ১৮ জুন ২০২১
Online Edition

সাতক্ষীরায় আম গাছ পরিচর্যায় ব্যস্ত চাষিরা

আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরা: সরকারি পৃষ্টপোষকতা ও আম ফলকে শিল্প হিসাবে গ্রহণ না  করায় চলতি মৌসুমে সম্ভাবনাময় আম উৎপানে ধস নামার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন, বিশেষত ভারতের ফারাক্কা বাঁধের অভিশপ্ত প্রভাবে গ্রীষ্মকালে ৪০-৪২ ডিগ্রি তাপমাত্রা এবং শীতকালে ৪-৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ৩৭% উর্বর জমি মরুভূমিতে পতিত হচ্ছে। তেমনি গরমে আমে ছোট ছোট গুটি ঝরে যায়। ফলে বহুমুখী উপযোগিতা হারাচ্ছে তেমনি স্বাভাবিকভাবে আমের উৎপাদনও কমে আসছে। এদিকে প্রতিবছর  সুযোগ বুঝে বিদেশি ফল আমদানিতে হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। এক সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে যে, বিদেশ থেকে বৈধভাবে যে পরিমাণ ফল আমদানি করা হয়, রপ্তানি করা হয় তার ৬২ ভাগের ১ ভাগ। বাংলাদেশে প্রতি বছর ২৭,৪৬৬ হেক্টর জমি থেকে ৮,৮৯,১৭৬ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হয়  (বিবিএস, ২০১২)।  বিশ্বের প্রধান দশটি আম উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশ  সপ্তম। এবং আগাম জাতের আম উৎপাদনে সাতক্ষীরা জেলা প্রথম।
বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অনেক আগে থেকেই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বিভিন্ন জাতের আম চাষ হলেও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শুরু হয়েছে গত এক দশক ধরে। বৃটিশ ভারতের বাঙালা প্রদেশে তথা বর্তমান বাংলাদেশে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদন হতো।  সে গৌরব বর্তমানে অতীত, আম আমাদের দেশে মৌসুমি অর্থকরী ফল হিসেবে গুরুত্ব পেলেও একে শিল্পজাত পণ্য হিসেবে প্রক্রিয়াজাতকরণের কার্যকর গবেষণা অদ্যাবধি না নেয়ায় হুমকীর মুখে পড়তে যাচ্ছে আম চাষ।
 তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ অধিক জনসংখ্যার ভারে আক্রান্ত। সাধারণ জনগণের অপুষ্টি দূরীকরণে, বেকারত্ব দূরীকরণ তথা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে আম শিল্পের বিকাশ পুরোপুরি ঘটিয়ে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে আমদানি ও রপ্তানির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নার্সারি পর্যায়ে আম চারা উৎপাদন একটি ব্যবসায়, কৃষক পর্যায়ে আম চাষ লাভজনক কৃষি পণ্য, ব্যবসায়ী পর্যায়ে মৌসুমি ব্যবসায় হিসেবে বিবেচিত হলেও আমকে শিল্পের পর্যায়ে ভাবা হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে যে পরিমাণ কোমল পানীয়, বিদেশি জুস, জ্যাম, জেলি ইত্যাদি আমদানি করা হয়; আমকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে তা পণ্যে রূপান্তর করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও সম্ভব।
বিশেজ্ঞরা বলছে যদি দেশে এ জাতীয় পণ্য রপ্তানি করতে না হয় তাহলেই তো দেশের হাজার হাজার  কোটি টাকা দেশেই থাকতো; তদুপরি বিদেশে রপ্তানি করতে পারলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ফলে দেশের আর্থসামাজিক পরিবর্তন ঘটতো।
ফল বিশেজ্ঞরা বলছে, অর্থনৈতিক দিক থেকে আমের অবদান কোনো অংশে কম নয়, আন্তর্জাতিক মানের এই ফলটি শুধু পুষ্টি ও স্বাদের জন্যই বিখ্যাত নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াতে পারে। ইতোমধ্যে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে ফিলিপাইন ও ভারতে। ফিলিপাইন ‘স্পার্জিং’ পদ্ধতিতে বছরের অধিকাংশ সময় আম উৎপাদন করে এবং নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে থাকে। ভারতও একইভাবে আমি রপ্তানি করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশের অবস্থা উল্টো। এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত আমরা আমকে অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে পারিনি।  
গতবছরে সাতক্ষীরায় আগাম জাতের আমের ফলন কম হওয়ায় এবছর আগের ভাগে আম গাছ পরিচর্যায় মাঠে নেমেছে আম চাষিরা। বুধবার শহরে বাগানবাড়ি এলাকায় আম গাছে ওষুধ ছিটাতে দেখা গেছে চাষীদের। তারা জানান, আমে মুকু আসার সময় আগত। এসময় মুকুলে অনেক ধরণের পোকা মাকড় বসে মুকুল নষ্ট করে দেয়। তাই ওষুধ ছিটালে আম গাছে মুকুল ধরে বেশি। সাতক্ষীরার আমের সুনাম রয়েছে দেশ-বিদেশে। ইউরোপ, ডেনমার্ক, ইতালি, সুইডেনসহ বিভিন্ন দেশে সাতক্ষীরার আম রপ্তানি হয়। তবে করোনা ভাইরাসের কারণে গত বছর বছর বিদেশে আম রপ্তানির করতে পারিনি কৃষি বিভাগ। এবছর আম রপ্তানির আশা করছেন তারা।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামারবাড়ি থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, জেলায় আমচাষীর সংখ্যা ১৩ হাজার ১০০ জন। জেলায় চলতি মৌসুমে পাঁচ হাজার ২৯৯টি বাগানে চার হাজারের কিছু ৩শ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হবে। জেলায় গত মৌসুমে প্রায় ৩৫ হাজার মেট্রিকটন আম উৎপাদিত হয়ে ছিল ।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (খামারবাড়ির) উপ পরিচালক নুরুল ইসলাম বলেন, জেলার আমের যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। এ সুনাম ধরে রাখতে কাজ করে যাচ্ছে জেলা কৃষি বিভাগ। তারা চাষীদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে।
জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে পুষ্টির অভাব মেটানো, কর্মসংস্থান তথা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাজারজাতকরণ এবং গুদামজাত করে দীর্ঘমেয়াদি বিপণন প্রক্রিয়া গ্রহণ, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক, বেসরকারি ব্যাংক, অর্থলগ্নী প্রতিষ্ঠানসহ শিল্পোউদ্যোক্তারা এগিয়ে  দেশে এলে আম শিল্পের বিকাশ ঘটবে দাবী সংশ্লিষ্টদের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ