মঙ্গলবার ১৯ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে সাদা পাথরের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হাজারো পর্যটক

কবির আহমদ, কোম্পানীগঞ্জ (সিলেট) থেকে ফিরে : সিলেটের সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত প্রকৃতিকন্যা জাফলং ও বিছানাকান্দির পরেই কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চোখধাঁধানো সাদা পাথর মুগ্ধ করছে লাখো পর্যটককে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক আসেন সাদা পাথরের সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে। নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে স্বচ্ছ পানির ধলাই নদ। এলাকাটি দেখতে অনেকটা ব-দ্বীপের মতো। শান্ত পাহাড়, সঙ্গে মিশেছে আকাশের নীল। আকাশে ছোপ ছোপ শুভ্র মেঘ। আর চারদিকে পাথর আর পাথর। সব পাথর সাদা রঙা। হঠাৎ করে মনে হতে পারে, পাথরের রাজ্যে চলে এলাম নাকি! যেন প্রকৃতির স্বর্গরাজ্য। সেই সাদা পাথরের স্বচ্ছ পানিতে অনেকে হৈ-হুল্লুড় করে গোসল করছেন।
জানা যায়, পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টি বহুল এলাকা চেরাপুঞ্জির অবস্থান ভারতের পাহাড়ী রাজ্য মেঘালয়ে। মনোরম এ রাজ্য থেকে নেমে এসেছে ধলাই নদী। বর্ষাকালে চেরাপুঞ্জির বৃষ্টির পানি এই নদীতে পাহাড়ী ঢলের সৃষ্টি করে। গ্রীষ্মকালে অনেকে ধলাই নদীকে মরানদী হিসাবে অভিহিত করলেও বর্ষায় নদীটি পানিতে টইটুম্বুর করে। ধলাইয়ের উৎসমুখে পাঁচ একর জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে সাদা সাদা পাথর। ওপারে উঁচু পাহাড়ে ঘেরা সবুজের মায়াজাল। সেখান থেকে নেমে আসা ঝরনার অশান্ত শীতল পানির অস্থির বেগে বয়ে চলা। যতোদূর চোখ যায় দু’দিকে কেবল সাদা পাথর, মাঝখানে স্বচ্ছ নীল পানি আর পাহাড়ে মেঘের আলিঙ্গন। সব মিলিয়ে অদ্ভুত এক সৌন্দর্যের ক্যানভাস। সাদা পাথর এলাকায় প্রতিদিন শতাধিক নৌকা চলাচল করে। বিভাগীয় শহর সিলেট থেকে সাদা পাথরের দূরত্ব মাত্র ৩৩ কিলোমিটার।
গত শনিবার সরেজমিন সাদাপাথর পর্যটন স্পটে গেলে দেখা যায়, বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ ও শিশুসহ ভ্রমণ পিপাসু শতশত মানুষের ভিড়। ফেরিঘাট থেকে নৌকা ভাড়া করে মূল গন্তব্য সাদাপাথরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু। নৌকা যতো সামনে এগোয়, মুগ্ধতা ততই বাড়তে থাকে। ধলাই নদের স্বচ্ছ নীল পানিতে নৌকা চলতে চলতে চোখে পড়ে মেঘালয়ের আকাশছোঁয়া পাহাড়। মনে হচ্ছিল আকাশে হেলানো উঁচু উঁচু পাহাড়ের সারি। নৌকায় করে ঘুরে বেড়ানোর সময় চোখে পড়ে শ্রমজীবীদের কর্মকাণ্ড। তাদের এই কর্মকাণ্ড পুরো পাথরকে ঘিরে। চারপাশের চোখধাঁধানো সব দৃশ্য দেখতে দেখতে ২০-২৫ মিনিটের মধ্যে নৌকে পৌঁছে যাবে নদীর উৎসমুখে। তীরে ভেড়ে নৌকা। তীরে নামতেই চোখে আটকে যায় পাথরের স্তুপে। পাথরগুলো সব সাদা। ছোট, মাঝারি, বোল্ডার আকৃতির পাথর। সাদার মধ্যে নিকষ কালো পাথরও আছে। কোনোটি খয়েরি। যেন পুরো এলাকাজুড়ে পাথরের বিছানা।
পাথর মাড়িয়ে ঝরনার আবাহন। কোথাও হাঁটু সমান, আবার কোথাও কোমর পানি। কোথাও তারও অনেক বেশি। পাথরের ওপর দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে তৃষ্ণার্ত ধলাইয়ের মুখে। পাথরের ওপর দিয়ে প্রবল বেগে বয়ে চলা পানির কলকল শব্দে যেন পাগল করা ছন্দ। সাদা পাথর ঘুরে দেখতে এসেছেন কুমিল্লার জাউতলা এলাকার সালাম-তানিয়া নবদম্পতি। তারা বলেন, সিলেটে এমন সুন্দর সুন্দর স্থানগুলো পড়ে আছে জানা ছিলো না। এক কথায় সাদাপাথর অসাধারণ একটি পর্যটন স্পট। পানি আর পাথরের এমন খেলা উপভোগ না করলে ঘুরাঘুরির অপূর্ণতা থেকেই যেত। সত্যিই মনোরম এ সৌন্দর্য উপভোগ করার মতো। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ দম্পতি জানান, সাদাপাথরে মানসমম্মত কোনো রেস্টুরেন্ট নেই। যেগুলো আছে সেগুলোতে চড়া দাম। পর্যটক দেখলে নৌকার মাঝিরা ভাড়া বাড়িয়ে দেন। তারা বলেন, পর্যটকদের সুবিধার্থে সেখানে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো দরকার।
সাদাপাথর ধলাই নদীতে অবস্থিত। এই নদী বাংলাদেশ অংশে প্রবেশ করে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে চারপাশ ঘুরে আবার মিলিত হয়েছে। এ নদীর পানির সাথে ভারতের খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে প্রচুর পাথর নেমে আসে। পাথর উত্তোলনকে সহজ করতে ১৯৬৪-১৯৬৯ সাল পর্যন্ত সময়কালে সোয়া দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে প্রকল্প। রোপওয়ের জন্য নির্মাণ করা হয় ১২০টি এক্সেক্যাভেশন প্লান্ট। ভোলাগঞ্জ থেকে সোয়া ১১ মাইল দীর্ঘ এই রোপওয়ে ছাতক পর্যন্ত। এক্সেক্যাভেশন প্লান্টের সাহায্যে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত পাথর উত্তোলন করা হলেও পর্যাপ্ত লোকবল ও বিকল ইঞ্জিনের কারণে ১২ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে রোপওয়ের টাওয়ারগুলো কালের স্মৃতিচিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছে। রোপওয়ে বন্ধ হলেও এখনো থেমে নেই পাথর উত্তোলন। স্থানীয়রা এ পাথর উত্তোলনকে তাদের জীবিকার উৎস হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ১০নং ঘাট থেকে সাদাপাথর যাওয়ার সময় পাথর তোলা কিংবা ছোট নৌকায় পাথর বহন করে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য চোখে পড়বে। তবে বর্তমানে পাথর উত্তোলন আগের চেয়ে অনেকটা কম রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ