মঙ্গলবার ১৯ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

শীতে ভিন্ন আমেজ পেতে সুন্দরবন ভ্রমণ!

খুলনা অফিস : করোনা ভাইরাসের ধাক্কায় সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন খাতেও ধস নেমেছিল, কিন্তু বর্তমানে আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছে এ শিল্প। কর্মব্যস্ত জীবনে একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে মানুষ শীতেও সুন্দরবনে ছুটছেন। পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের পরিচ্ছন্ন ভ্রমণের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যানবাহন রয়েছে। এ সব যানবাহনে করে প্রকৃতির কাছাকাছি যেতে আমরা যাই সুন্দরবন।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে দীর্ঘদিন সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল। সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর থেকে বনে দর্শনার্থীদের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে বলে জানান বনবিভাগের কর্মকর্তারা। সুন্দরবনের করমজল ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্র, হারবারিয়া, কোকিলমনি, কটকা, হিরন পয়েন্ট ও বঙ্গবন্ধুর চর পর্যটকদের পছন্দের জায়গা। পশুর নদী দিয়ে প্রতিদিন সারি সারি ট্যুরিস্ট বোট ও লঞ্চ সুন্দরবনে আসতে দেখা যায়।

প্রাকৃতিক রহস্যঘেরা সুন্দরবন ভ্রমণ করে বরিশালে কর্মরত বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘এর আগেও বেশ কয়েক বার সুন্দরবনে গিয়েছি। তবে সেটা করমজল পর্যন্ত। সে যাত্রা ছিল বাসে করে যেয়ে মোংলা থেকে ট্রলারে করে করমজলে। কিন্তু এবার লঞ্চে করে তিনদিনব্যাপী সুন্দরবন যাত্রাটা অন্যরকম ছিল। শীতে সুন্দরবনের ভ্রমণ সত্যিই অন্যরকম উপভোগের ব্যাপার।’

সম্প্রতি তিনি সপরিবার সুন্দরবন ভ্রমণ করেছেন। এসময় সুন্দরবনের টাইগার পয়েন্টে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেখা না পেলেও তার পায়ের ছাপের দেখা পেয়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘সুন্দরবনের নাম শুনলে প্রথমেই রয়েল বেঙ্গল টাইগারের কথা মাথায় আসে। সুন্দরবনে গিয়ে সবাই বাঘের দেখা পেতে চায়, কিন্তু খুব কম মানুষেরই সে সৌভাগ্য হয়। আমি বাঘের দেখা না পেলেও তার পায়ের ছাপের দেখা পেয়েছি।’

ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘আমি কখনো ভাবতে পারিনি সুন্দরবন আসলেই এত সুন্দর! হরিণের ছোটাছুটি, পাখির কলকাকলি, বানরের চঞ্চলতা আমাকে বিমোহিত করেছে। বিশেষ করে যখন বনের ভেতর দিয়ে লঞ্চে করে যাওয়া হয় তখন কুমির, হরিণ, বন্য শুকর, পাখি, বানর এবং বনের গাছগাছালি দেখতে খুব অসাধারণ লাগে, যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তাছাড়া, বেলা গড়াতে থাকলে সুন্দনবনের রূপও বদলাতে থাকে— সকালে এক রকম, দুপুরে এবং রাতে দেখতে আরেক রকম।’

উড়া ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলসের সত্ত্বাধিকারী শরিফুল ইসলাম হিরন বলেন, ‘শীতের সুন্দরবন শান্ত। ঝড়-বৃষ্টির কোনো সম্ভাবনা থাকে না। এ কারণে পর্যটকরা ভ্রমণের জন্য এসময়টাই বেছে নেয়। এসময় লঞ্চ কিংবা ট্রলারে চেপে অথবা জালি বোটে নদী ও ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের প্রাকৃতিক শোভা উপভোগ করতে আসেন দেশি-বিদেশি পর্যটকরা। শীত বাড়তে থাকলেও সুন্দরবনে পর্যটকদের ভিড় বেড়েছে।’

তিনি বলেন, ‘স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকরা বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজন নিয়ে সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন, ঘুরে বেড়াচ্ছেন বনসংলগ্ন নদীতে। হরিণ ও বানরের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির পাখি আকর্ষণ করছে পর্যটকদের। সুন্দরবনের করমজল, হাড়বাড়িয়া, হিরণপয়েন্ট, কটকা, কচিখালী ও দুবলার চরে ভ্রমণ করছেন পর্যটকরা। ’

এ উপলক্ষে খুলনা ও মোংলার হোটেল-মোটেলগুলো নতুন সাজে সেজেছে। থার্টিফার্স্ট নাইট ও নতুন বছর বরণ করতে সুন্দরবনে পর্যটকদের আগমন আরও বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রূপসী বাংলা ট্যুরিজমের স্বত্ত্বাধিকারী কাজী মনজুর-উল-আলম বলেন, ‘করোনা ভাইরাসের ধাক্কায় সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন খাতেও ধস নেমেছিল, কিন্তু বর্তমানে আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছে এ শিল্প। কর্মব্যস্ত জীবনে একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে মানুষ শীতেও সুন্দরবনে ছুটছেন। পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের পরিচ্ছন্ন ভ্রমণের জন্য আমাদের রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত টুরিস্ট ভ্যাসেল এম ভি জেরিন। এ ভ্যাসেলে করে প্রকৃতির কাছাকাছি যেতে আমরা যাই সুন্দরবন।’

করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে দীর্ঘদিন সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল। সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর থেকে বনে দর্শনার্থীদের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে বলে জানান বনবিভাগের কর্মকর্তারা।

সুন্দরবনের করমজল ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্র, হারবারিয়া, কোকিলমনি, কটকা, হিরন পয়েন্ট ও বঙ্গবন্ধুর চর পর্যটকদের পছন্দের জায়গা। পশুর নদী দিয়ে প্রতিদিন সারি সারি ট্যুরিস্ট বোট ও লঞ্চ সুন্দরবনে আসতে দেখা যায়।

সুন্দরবনের করমজল পর্যটনকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আজাদ কবির বলেন, ‘সুন্দরবনের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র দেশি পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে। পর্যটকবাহী লঞ্চে করে দর্শনার্থীরা বনের গহীনে প্রবেশ করছেন। তবে করোনার কারণে বিদেশি পর্যটক খুবই কম। করমজলে যারা আসছেন তাদের মধ্যে শিক্ষার্থীই বেশি। ’

যদি একদিনেই সুন্দরবন ভ্রমণ করতে চান, তাহলে করমজল পর্যটনকেন্দ্রে যেতে পারেন। ঢাকার মতিঝিল, আরামবাগ, শ্যামলী, কল্যাণপুর, গাবতলী থেকে গ্রিনলাইন, সোহাগ, হানিফ, ঈগল, এ কে ট্রাভেলসসহ বিভিন্ন এসি/ননএসি বাস সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত খুলনার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এছাড়া, সায়েদাবাদ থেকে সুন্দরবন, পর্যটক, বনফুলসহ বিভিন্ন বাস খুলনা, বাগেরহাট ও মোংলার উদ্দেশে ছেড়ে যায় সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত। খুলনায় ট্রেনে এবং যশোর পর্যন্ত প্লেনে যাওয়া যাবে। পাশাপাশি নৌপথেও আসা যায়। খুলনায় নেমে লোকাল বাসে বাগেরহাট, মোংলা যাওয়া যাবে।

মোংলা থেকে করমজল লঞ্চ বা ট্রলারে মাত্র ৪৫ মিনিটের পথ হওয়ায় দিনে যেয়ে দিনে ফিরে আসার সুবিধা রয়েছে। এছাড়া, ভ্রমণে খরচও তুলনামূলক কম। খুলনার বিআইডব্লিউটিএ’র লঞ্চ ঘাট থেকে সুন্দরবনে যাওয়া যায়।

সুন্দরবন ভ্রমণের জন্য সাধারণত তিনদিন দু’রাতের প্যাকেজ থাকে। তারাই ভ্রমণের অনুমতিসহ সবকিছুর দায়িত্ব নেবে। খুলনা ও মোংলায় এমন শতাধিক ট্যুর অপারেটর রয়েছে। ঢাকাতেও মিলবে। প্যাকেজের আওতায় সুন্দরবনের করমজল, হাড়বাড়িয়া, কটকা, কচিখালী, জামতলা সমুদ্রসৈকত, দুবলারচর, হিরণ পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়। সুযোগ আছে খুলনার কয়রা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও মুন্সিগঞ্জ থেকে যাওয়ার। ভ্রমণ পরিকল্পনা অনুযায়ী আপনিও সময় করে বেড়িয়ে যেতে পারেন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন দেখতে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ