শুক্রবার ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১
Online Edition

অনুমতির নামে রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার অভিযোগ

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জনগণের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থীর পাশাপাশি গণতন্ত্র ও রাজনীতির জন্য অশনিসংকেত বলে মনে করছেন রাজনীতিক বোদ্ধারা। তারা বলছেন, সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া রাজধানীতে সভা সমাবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা সংবিধান ও মৌলিক অধিকার পরিপন্থী। এছাড়া দেশের রাজনীতির জন্য অশনিসংকেতও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুমতির নামে সরকার বিরোধী রাজনীতিকে বিভিন্ন শর্তের বেড়াজালে নিয়ন্ত্রণ করছে। অথচ আওয়ামী লীগ নামে বেনামে যখন তখন সভা সমাবেশ করছে।
জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সংবিধানে অবাধে সভা-সমাবেশ করার অধিকার যে কোনো নাগরিক ও সংগঠনের আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে সংবিধান স্বীকৃত জনগণের এই অধিকার বিভিন্ন সময় কেড়ে নিয়েছে অথবা সংকুচিত বা নিয়ন্ত্রিত করেছে, যা সংবিধানের লংঘন। আবার হঠাৎ করে ডিএমপিকে দিয়ে পূর্বানুমতি ছাড়া রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার আবারও সংবিধান লংঘন করল। অথচ ক্ষমতাসীন দল বা তাদের সমর্থক সংগঠন কোনো পূর্বানুমতি বা শর্ত ছাড়াই যখন তখন রাস্তা বা লোকালয় দখল করে সভা-সমাবেশ করছে। মির্জা ফখরুল বলেন, অনুমতির নামে সরকার রাজনীতিকে বিভিন্ন শর্তের বেড়াজালে আটকে নিয়ন্ত্রণ করছে, জনগণের অধিকার হরণ করছে। রাজনীতির স্বাভাবিক পথ রুদ্ধ ও সংকুচিত করছে। মূলত প্রশাসনকে অপব্যবহার করে জনরোষ ও গণআন্দোলন থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সরকার সংবিধান স্বীকৃত জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ করছে।
সভা সমাবেশ নিষিদ্ধে বাংলাদেশ যুব অধিকার পরিষদ নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। সম্প্রতি দলটির পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সভা-সমাবেশ-মিছিলসহ রাজনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক ধর্মীয় কর্মসূচি সকলের গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অধিকার। এই অধিকারের উপর কোন শর্ত বিধি নিষেধ আরোপ করা স্পষ্টতই অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত। এই নির্দেশনা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে আক্ষরিক অর্থেই আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে একটি পুলিশী রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। জনগণ ও তাদের প্রতিনিধিত্বশীল সভা-সমাবেশকে নির্বিঘ্ন করা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় চলা পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে, অথচ আমরা দেখতে পাচ্ছি পুলিশ সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করছে। সভা-সমাবেশের মতো গণতান্ত্রিক অধিকারকে অনুমোদন-সাপেক্ষ করতে চাইছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অগণতান্ত্রিক ও একব্যক্তির ওপর সমস্ত ক্ষমতা ন্যস্ত করা সংবিধানে জনগণের মৌলিক অধিকারকে ‘আইনের দ্বারা আরোপিত বাধানিষেধ’ ধরনের শর্তের শৃঙ্খলে বেঁধে রেখেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত পুলিশের নির্দেশনাতেও দেখা যাচ্ছে, বিদ্যমান আইনে বৈধ কোনও দল বা গোষ্ঠীর সমাবেশের স্বাধীনতা থাকলেও বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে সভা-সমাবেশের জন্য ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) অধ্যাদেশ অনুসারে ডিএমপি কমিশনারের পূর্বানুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে।
সূত্র মতে, চলতি বছরের শুরু থেকে দেশে করোনাভাইরাসের কারণে সভা সমাবেশ অনেকটা নিষিদ্ধ। বিশেষ করে কোভিড ১৯ এর কারণে রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের কর্মসূচিগুলো ভার্চুায়াল পদ্ধতিতেই সম্পন্ন করছে। যদিও করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় রাজনৈতিক কর্মসূচি কিছুটা শুরু হয়েছে। তবে সরকারের এমন নিষেধাজ্ঞার কারণে সেটিও বন্ধ হয় যাবে বলে মনে করছেন ষংশ্লিষ্টরা।
রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, দেশের সভা সমাবেশর উপর নিষেধাজ্ঞা নতুন কিছু নয়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দীর্ঘ এক দশকেরও বেশী সময়ের শাসনামলে বিরোধীরা ছিল কোণঠাসা। বিশেষ করে প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সভা সমাবেশে ছিল অলিখিত নিষেধাজ্ঞা। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই দেশে এমনকি একধরণের রাজনৈতিক শূন্যতা চলছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে এখন অনেকটা একদলীয় শাসন ও রাজনীতি চলছে। বিরোধী দল বা জোটভুক্ত দলগুলোর রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। একইসাথে রয়েছে সরকারি দল ও তাদের প্রশাসনের হুমকি ধামকি। সাম্প্রতিক সময়ে ডিএমপির এমন নিষেধাজ্ঞার কারণে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে উঠা রাজনৈতিক শূন্যতা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এটি গণতন্ত্রের জন্য বিপদসংকেত। তারা বলছেন, গণতন্ত্রের আশঙ্কাজনক অবনতি ঘটায় সাধারণ মানুষের জীবনযাপনেও মারাত্মক প্রভাব পড়েছে।
দেশের সার্বিক অবস্থার চিত্র তুলে ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, দেশে এমনিতেই গণতন্ত্র নেই। ভোটাধিকার নেই। করোনার কারণে সব কিছুই বন্ধ। এর চেয়ে খারাপ অবস্থা অতীতে ছিল কি না জানা নেই। বলা হচ্ছে দেশ উন্নতি হচ্ছে, কিন্তু এই উন্নতির অন্তরালে মানুষ আর্তনাদ করছে বলে মনে করেন তিনি। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এই শিক্ষাবিদ বলেন, রাষ্ট্রের কোনো মানুষ নিরাপদে নেই। করোনাও আমাদের কিছু শিখিয়ে যেতে পারেনি। এমন অনিরাপদ অবস্থা আমরা ৭১ সালেই দেখেছিলাম। এর বড় উদাহরণ হচ্ছে ধর্ষণ, দুর্নীতির মহোৎসব। এসব অন্যায় রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাবির এক শিক্ষক বলন, দৃশ্যমান দুর্ভিক্ষ না থাকলেও দেশে এখন নীরব দুর্ভিক্ষ চলছে। আজকে দেশে যে রাজনৈতিক অবস্থা বিরাজ করছে, তার চেয়ে খারাপ অবস্থা অতীত ইতিহাসে ছিল কি না আমার জানা নেই। আমরা দুর্ভিক্ষ দেখেছি যে দুর্ভিক্ষে অনেক মানুষ মারা গেছে। কিন্তু আজকে বাংলাদেশে দৃশ্যমান কোনো দুর্ভিক্ষ না থাকলেও নীরব দুর্ভিক্ষ আছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই শিক্ষাবিদ। বলেন, আমরা দেখেছি, ধর্ষণ, দুর্ণীতি ও লুটপাটের সাথে আওয়ামী লীগ নেতা জড়িত বলে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু কোনটিরই বিচার হচ্ছেনা।
চলমান পরিস্থিতিতে সুস্থ রাজনীতি বাদ দিয়ে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব বলে মনে করেন গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেন, জনগণই দেশের মালিক, তাই জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেই সুস্থ রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কামাল হোসেন আরো বলেন, জাতিকে এক ব্যক্তির শাসন থেকে মুক্ত করতে হবে। কারণ, স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বাক-ব্যক্তি-আইনের শাসন থাকে না। দুর্নীতি-দলীয়করণ-লুটপাট-অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্থ করে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাসহ সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে গ্রাস করে থাকে। সমাজ ও সভ্যতাকে ধ্বংস করে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তর এখন পচে গেছে। ধর্ষণ, হত্যা অহরহ ঘটছে। এ ধরনের প্রত্যেকটি ঘটনার বিচার করতে হবে। সেলিম বলেন, দেশে এক ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ধর্ষণ, হত্যা, লুটপাট এখন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এটা কোনোভাবেই সভ্য সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, সরকারের স্বেচ্ছাচারিতার কারণেই বাংলাদেশ আজ এ অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। কোথাও কেউ আজ নিরাপদ নেই। অথচ সরকার মুখে উন্নয়নের ফেনা তুলছে। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে বাংলাদেশ থেকে গণতন্ত্র উঠে গেছে। গণতন্ত্র আর নেই। একদলীয় শাসন এখন একটি ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক শক্তি নয়। আওয়ামী লীগ মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে। কিন্তু তার উল্টোটা বিশ্বাস করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ