বুধবার ২৫ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

টাকার দরপতন ঠেকাতে ডলার কেনা অব্যাহত রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : ডলার কিনে বাজারে নগদ অর্থ সরবরাহ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ডলারের অবমূল্যায়ন রোধে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০২০-২১ অর্থবছরের (জুলাই-অক্টোবর) প্রথম চার মাসে ৩৬০ কোটি ডলার কিনেছে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের এ নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটি। আর চলতি মাসের ১৯ তারিখ পর্যন্ত মোট ডলার ক্রয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪২০ কোটি ডলার। এদিকে গত চার মাসে স্থানীয় বাজার মুদ্রার সরবরাহ স্থিতিশীলতায় ৩০ হাজার কোটি টাকা নগদ অর্থ ছাড় করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অথচ এর আগের তিন বছরে ব্যাপক চাহিদার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রি করেছে নিয়মিত। অন্যদিকে করোনাকালীন সময়ে ব্যাপক রেমিট্যান্স বেড়েছে। অথচ আগের সময়ের চেয়ে আমদানি কমছে। এ কারণে দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, করোনাভাইরাস মহামারির শুরুর দিকে ধস নামলেও পরে রপ্তানি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার আশঙ্কার বদলে বেড়েছে । আগের সময়ের চেয়ে আমদানি কমছে। অক্টোবর পর্যন্ত চার মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৪৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। রপ্তানিতে এক শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি রয়েছে। অন্যদিকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমদানি কমেছে ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এ সময়ে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে প্রচুর ঋণও এসেছে। আবার বেসরকারি খাতে নেয়া স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানোর কারণে অনেকে আপাতত ঋণ পরিশোধ করছেন না। সব মিলে অধিকাংশ ব্যাংকের হাতে এখন ডলার উদ্বৃত্ত রয়েছে। এছাড়া দেশে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়া ও ডলারের চাহিদা কমে যাওয়ায় বাজারে উদ্বৃত্ত ডলার থেকে যাচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহার করতে না পারায় ব্যাংকগুলোকে বাধ্য হয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ডলার নিয়ে আসছে। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকও তা বাধ্য হয়ে কিনছে। এসব কারণেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চার হাজার কোটি ডলার অতিক্রম করেছে। এতে করে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়ে যাচ্ছে। ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বাংলাদেশে ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রথম চার মাসে ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন (৩৬০ কোটি) মার্কিন ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর চলতি মাসের ১৯ দিনে কিনেছে ৬০ কোটি ডলার। অর্থাৎ ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত ৪২০ কোটি ডলার (৪.৩০ বিলিয়ন) ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। শুধু গত সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবারও ২০ মিলিয়ন  ডলার কিনেছে। এর আগে কখনই এতো কম সময়ে এতো বেশি ডলার কেনেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। আর চলতি বছরের সাড়ে আট মাসে কিনেছে ৫১০ কোটি ডলার।
আন্তঃব্যাংক মুদ্রা বাজারে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা ডলারের ক্রয় মূল্য ছিল ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা। প্রায় এক বছর ধরে টাকা-ডলারের বিনিময় হার প্রায় এই একই জায়গায় স্থির রয়েছে। ২০১৯ সালের ১৫ নভেম্বর টাকা-ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৪ টাকা ৭৫। চলতি বছরের ৩০ জুন শেষে তা কিছুটা বেড়ে ৮৪ টাকা ৯৫ পয়সায় উঠেছিল। কয়েক দিনের মাথায় তা ৮৪ টাকা ৮০ পয়সায় নেমে এসে এখনও সেই দরে লেনদেন হচ্ছে।
এদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে ৩০ হাজার ২৪০ কোটি টাকা নগদ অর্থ ছেড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মহামারি করোনার ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীদের সহায়তায় ও অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে নীতিমালা শিথিলকরণসহ বিভিন্ন উপায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৩৮ হাজার কোটি টাকা বাজারে সরবরাহ করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনা ছাড়া কোনো উপায় নেই। বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় ডলার উদ্বৃত্ত থাকছে। যা না কিনলে ডলারের দাম কমে যাবে। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন প্রবাসীরা। এজন্য তারা রেমিট্যান্স পাঠাতে নিরুৎসাহিত হবেন। এছাড়াও রপ্তারি আয়ও কমে যাবে। তাই বাজার থেকে ডলার কিনতে হচ্ছে। তবে এর নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে, আমদানি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জায়েদ বখত বলেন, এই যে সাম্প্রতিককালে রিজার্ভ রেকর্ডের পর রেকর্ড হচ্ছে, তাতে এই ডলার কেনারও অবদান আছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, বাজার থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনা-বেচা নিয়মিত ব্যাপার। বাজার স্থিতিশীল রাখতে এটি করা হয়। যখন বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়ে যায়, তখন কেনা হয়। আবার যখন ঘাটতি থাকে তথন বিক্রি করা হয়। এখন সরবরাহ বেশি; তাই কেনা হচ্ছে। যখন বাজারে ডলারের প্রয়োজন হবে, তখন বিক্রি করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, করোনার প্রভাব শুরুর আগ পর্যন্ত সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি থাকায় ধারাবাহিকভাবে ডলার বিক্রি করছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তখন প্রায়ই সরকারি মালিকানার কয়েকটি ব্যাংক ডলার কিনতে ধরনা দিচ্ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। তবে চলতি বছরের শুরু থেকে পরিস্থিতি উল্টো হয়ে যায়। জানুয়ারি থেকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৫১০ কোটি ডলার কিনে বাজারে ৪৩ হাজার কোটি টাকার বেশি সরবরাহ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ সময় মাত্র ৪২ কোটি ৮০ লাখ ডলার বিক্রি করে। অন্যদিকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রথম দুই প্রান্তিকে বিভিন্ন ব্যাংকের কাছ থেকে ৮৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার কেনা হয়। এর পর থেকে কোনো ব্যাংক ডলার কেনার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আসেনি। অথচ ২০১৯ সালের চিত্রটা ছিল ঠিক এর বিপরীত। গত বছর বিভিন্ন ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কিনেছিল ১৬২ কোটি ১০ লাখ ডলার। এর আগের বছর ২৩৭ কোটি ১০ লাখ এবং ২০১৭ সালে ১২৩ কোটি ১০ লাখ ডলার কিনেছিল। এ তিন বছরের মধ্যে শুধু ২০১৭ সালের শুরুর দিকে কয়েকটি ব্যাংক সাড়ে চার কোটি ডলার কিনেছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত সাড়ে চার মাসে ১০ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের বেছে ৪২ শতাংশ বেশি। গত বৃহস্পতিবার দিন শেষে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪০ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার।
চলতি অর্থবছরের তিন মাসের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) আমদানি ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতে দেখা যায়, এই তিন মাসে পণ্য আমদানিতে ১২ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে বাংলাদেশ। যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১১ দশমিক ৪৭ শতাংশ কম। এই তিন মাসে ১৩৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বিদেশি ঋণ সহায়তা পেয়েছে বাংলাদেশ, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৫৪ শতাংশ বেশি। এছাড়া প্রতিমাসেই কিছু রফতানি আয় দেশে আসছে। সেই সঙ্গে বিদেশী ঋণ ও বৈদেশিক অনুদান আসছে। সব মিলে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আসছে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড স্থবির থাকায় ওই পরিমাণ ব্যয় হচ্ছে না। ফলে প্রতিটি ব্যাংকের হাতেই বৈদেশিক মুদ্রা উদ্বৃত্ত রয়েছে।
প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী একটি ব্যাংক মূলধনের ১৫ শতাংশের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা নিজেদের কাছে ধরে রাখতে পারে। এর অতিরিক্ত হলেই তাকে বাজারে ডলার বিক্রি করতে হয়।
এ বিষয়ে অর্থনীতির গবেষক জায়েদ বখত জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার না কিনলে বাজারে ডলারের দর কমে যাবে। তখন টাকার মানও কমে যাবে। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক টাকার দরপতন ঠেকাতে বাজার থেকে ডলার কিনে সঠিক কাজটিই করছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ