শনিবার ০৫ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

লাইসেন্সের আড়ালে অবৈধ অস্ত্র

পুলিশ এবং গোয়েন্দা সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, সাধারণ পিস্তল ও রাইফেল ধরনের অস্ত্র আমদানির অনুমতি নিয়ে দেশে এমন অনেক অস্ত্র নিয়ে আসা এবং সেগুলো গোপনে বিক্রি করা হচ্ছে, যেসব অস্ত্র অত্যন্ত ভয়ংকর। এসব অস্ত্রের কোনো কোনোটি এমনকি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছেও নেই। উদাহরণ হিসেবে রিপোর্টে ‘উজি’ পিস্তলের নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, অত্যাধুনিক এ অস্ত্রের ম্যাগাজিনের ধারণ ক্ষমতা ২০ রাউন্ড। অর্থাৎ এই পিস্তল দিয়ে একই সময়ে পরপর ২০টি গুলি করা সম্ভব। অন্যদিকে প্রচলিত সাধারণ পিস্তলের ধারণ ক্ষমতা ছয় থেকে নয়টি বুলেট। আর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে রয়েছে সর্বোচ্চ ১৫ রাউন্ডের পিস্তল। 

এ তথ্যটির মধ্য দিয়েই অত্যাধুনিক ‘উজি’ পিস্তল কতটা মারাত্মক সে সম্পর্কে ধারণা করা যায়। প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ১৯৪০-এর দশকে ইসরাইলী সেনাবাহিনীতে কর্মরত মেজর উজিয়েল গালের নকশা অনুযায়ী তৈরি এবং তারই নামানুসারে নামকরণ করা ‘উজি’ পিস্তল ওপেন বোল্ট ও ব্লোব্যাক পরিবারভুক্ত একটি অস্ত্র। কিন্তু একে পিস্তলের মতো হাতের মুঠোয় নিয়ে চালানো যায়। সে কারণে একে ‘মেশিন’ গানের মতো ‘মেশিন পিস্তল’ও বলা হয়। অন্য যে কোনো পিস্তলের তুলনায় প্রতি মিনিটে গুলির সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় এর চাহিদা ও জনপ্রিয়তাও অনেক বেশি। অমন একটি ভয়ংকর পিস্তলই দেশের কালো বাজারে দিব্যি বিক্রি করা হচ্ছে। 

এই ‘উজি’ পিস্তলের ক্রেতা প্রধানত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো দ্বিতীয় তথ্যটি হলো, এক ও দোনলা বন্দুক এবং ২২ বোর রাইফেলের মতো ব্যাপকভাবে প্রচলিত বিভিন্ন অস্ত্র আমদানির অনুমতি নিয়ে ব্যবসায়ী নামধারী কিছু ব্যক্তি এসব ভয়ংকর অস্ত্র আমদানি করে থাকে বলে পুলিশ প্রমাণ পেয়েছে। সন্ত্রাসীরা চাঁদাবাজি এবং খুন ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধমূলক কর্মকান্ডে এগুলো ব্যবহার করে চলেছে। দায়িত্বশীল পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিক্রি ও লেনদেন বন্ধের পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের এখনই প্রতিহত না করা গেলে উজি ধরনের অস্ত্রগুলো সারাদেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরিণতিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তো ক্ষুণœ হবেই, বিপন্ন হতে পারে এমনকি দেশের সার্বভৌমত্বও। এজন্যই উজি ধরনের অস্ত্রের ব্যাপারে কাল বিলম্ব না করে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

বলার অপেক্ষা রাখে না, পরিস্থিতি এরই মধ্যে অত্যন্ত আশংকাজনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এর কারণ পর্যালোচনায় দেখা যাবে, ঘুষের বিনিময়ে কি না সেটা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বটে, তবে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা অস্ত্র আমদানির অনুমতি দিয়েই নিজেদের দায়িত্ব শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করেন। ওই অনুমতি পত্রের আড়ালে আসলে কোন ধরনের অস্ত্র আমদানি করা হচ্ছে সে বিষয়ে তাদের করণীয় কর্তব্য পালন করেন না। প্রায় কোনো ক্ষেত্রেই আমদানির পর অনুসন্ধান করে দেখেন না, সত্যিই অনুমতি পত্রে উল্লেখিত এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক অস্ত্র আমদানি করা হয়েছে কি না। এমন অবস্থার সুযোগ নিয়েই ব্যবসায়ী নামের গোষ্ঠীর লোকজন তৎপর হয়ে ওঠে। তারা বিমান ও নৌ বন্দর এবং কাস্টমসসহ বিভিন্ন বিভাগের সংশ্লিষ্ট সকলকে ঘুষ দিয়ে, কখনো আবার ভয়ভীতি দেখিয়ে অস্ত্রের চালান খালাস করে নেয়। সেসব অস্ত্রই তারা কালোবাজারে চড়া দামে বিক্রি করেÑ যার প্রধান ক্রেতা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। তাদের অনেকেরই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক থাকে। ফলে কখনো ধরা পড়ে গেলে রাজনৈতিক দলের প্রভাব খাটিয়ে তারা মুক্তি পেয়ে যায়। সেই সাথে বাধাহীনভাবে চলতে থাকে অস্ত্রের ব্যবসা।

আমরা মনে করি, সরকারের উচিত র‌্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে তৎপর করে তোলা এবং এমন আয়োজন নিশ্চিত করা, যাতে ‘উজি’ ধরনের তো বটেই, কোনো ধরনের বেআইনি অস্ত্রই দেশের বাজারে বিক্রি হতে না পারে। এ উদ্দেশ্যে এমন সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন, যাতে এক ধরনের অস্ত্রের জন্য লাইসেন্স নিয়ে কারো পক্ষেই অন্য কোনো ধরনের অস্ত্র আমদানি করা এবং সেগুলোকে কালোবাজারে বিক্রি করা সম্ভব না হয়। আমরা আশা করতে চাই, খুন ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ দমনের পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে দেশের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে সরকার অস্ত্রের ব্যাপারে সামান্যও ছাড় দেবে না। ছাড় দেয়া চলবে না অস্ত্র ব্যবসায়ী নামের বিশেষ গোষ্ঠীর লোকজনকেও।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ