বৃহস্পতিবার ২১ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

আসছে শীত! খেজুর গাছ পরিচর্যায় ব্যস্ত মানিকগঞ্জের গাছিরা

এইচ এম হাসিবুল হাসান, ঘিওর (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা : কয়েক দিন ধরে শীত পড়তে শুরু করেছে। আর শীতের মৌসুম শুরু হতে না হতেই আবহমান গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য খেজুরের রস আহরণে মানিকগঞ্জের প্রতিটি গ্রামে গ্রামে গাছিরা গাছ প্রস্তুত করতে শুরু করেছেন। যারা খেজুরের রস সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বিশেষভাবে গাছ কাটায় পারদর্শী স্থানীয় ভাষায় তাদেরকে গাছি বলা হয়। এ গাছিরা হাতে দা নিয়ে ও কোমরে দড়ি বেঁধে নিপুণ হাতে গাছ চাঁচাছোলা ও নলি বসানোর কাজ করছেন। কয়েক দিন পরই গাছিদের মাঝে খেজুর গাছ কাটার ধুম পড়ে যাবে। শীত মৌসুম এলেই জেলার সর্বত্র শীত উদযাপনের নতুন আয়োজন শুরু হয়। খেজুরের রস আহরণ ও গুড় তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন এ অঞ্চলের গাছিরা। তাদের মুখে ফুটে ওঠে রসালো হাসি।

শীতের দিন মানেই গ্রামাঞ্চলে খেজুর রস ও নলেন গুড়ের ম-ম গন্ধ। শীতের সকালে খেজুরের তাজা রস যে কতটা তৃপ্তিকর তা বলে বোঝানো যায় না। আর খেজুর রসের পিঠা এবং পায়েসতো খুবই মজাদার। এ কারণে শীত মৌসুমের শুরুতেই গ্রামাঞ্চলে খেজুর রসের ক্ষির, পায়েস ও পিঠে খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। প্রতিদিনই কোনো না কোনো বাড়িতে খেজুর রসের তৈরি খাদ্যের আয়োজন চলে। শীতের সকালে বাড়ির উঠানে বসে সূর্যের তাপ নিতে নিতে খেজুরের মিষ্টি রস যে পান করেছে, তার স্বাদ কোনো দিন সে ভুলতে পারবে না। শুধু খেজুরের রসই নয় এর থেকে তৈরি হয় সুস্বাদু পাটালি, গুড় ও প্রাকৃতিক ভিনেগার। খেজুর গুড় বাঙালির সাংস্কৃতিক একটা অঙ্গ। নলেন গুড় ছাড়া আমাদের শীতকালীন উৎসব ভাবাই যায় না। স্থানীয়রা বলছেন, আর মাত্র কয়েক দিন পরই গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হবে। রস থেকে গুড় তৈরির পর্ব শুরু হয়ে চলবে প্রায় মাঘ মাস পর্যন্ত। হেমন্তের প্রথমে বাজারগুলোতে উঠতে শুরু করবে সুস্বাদু খেজুরের পাটালি ও গুড়। অবহেলায় বেড়ে ওঠা খেজুরের গাছের কদর এখন অনেক বেশি।

ঘিওর উপজেলার গোলাপনগর গ্রামের মোঃ সফিজ উদ্দিন। প্রায় ৪২ বছর যাবত খেজুর গাছ কাটার কাজ করেন। তার বাবা মৃত শহিমুদ্দিন এ পেশার সাথে জরিত ছিল । মূলত পৈতিক সূত্রে রস সংগ্রহের কাজ করেন। প্রথমে তার বাবার সাথে কাজ শুরু করেন। বাবার কাছ থেকেই তিনি কাজটি শিখেছেন। তার বাবা মারা যাবার পরে এলাকার গাছি হিসাবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। চলতি বছরে তিন মাসের জন্য সফিজ উদ্দিন প্রায় ২০টি খেজুর গাছ অগ্রিম টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছে। এছাড়া ভাগে আছে আরো ২০/২৫টি খেজুর গাছ। গাছের অপ্রয়োজনীয় ডালপালা ও লতাপাতা ঝেড়ে ফেলার পরে গাছের বুক চিড়ে সাদা ছাল বের করার কাজ ইতোমধ্যেই শেষ করেছেন। আগামী সপ্তাহ থেকে পুরোদমে খেজুর রস সংগ্রহের কাজ শুরু হবে। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে গেছে। পরিকল্পিতভাবে খেজুর গাছের আবাদ করা প্রয়োজন।

কুঠিবাড়ি গ্রামের ফরিদ জানান, এ বছর প্রায় ৩০টি গাছ রস সংগ্রহের জন্য তৈরি করছেন। আগামী সপ্তাহ থেকেই খেজুর রস সংগ্রহের কাজ শুরু হবে। যারা খেজুর রসের পাগল তারা শহর থেকে গ্রামে ছুটে আসবে। এই সময়ে রস আহরণকারী গাছিদের প্রাণ ভরে উঠবে আনন্দে। যদিও আগের মতো সেই রমরমা অবস্থা আর নেই। তবে মানিকগঞ্জের ৭টি উপজেলাতে কমবেশি খেজুরের গাছ রয়েছে। সারা বছর অযতœ অবহেলায় পরে থাকে। শীতের সময় এদের কদর বেড়ে যায়। রস জাল দেবার পরে গুড় তৈরি করে বিভিন্ন হাট বাজারে বিক্রি করা হয়। প্রতি কেজি খাঁটি গুড় ৪শ’৫০ টাকা তেকে ৬শ’ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা হয়ে থাকে। জেলার হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা হাজারীগুড় দেশ বিদেশে রপ্তানি করা হয়ে থাকে। এছাড়া দৌলতপুর, শিবালয়, সাটুরিয়া, সিংগাইরে প্রচুর পরিমাণে খেজুর গুড় তৈরি হয়। তবে এ সময়ে এক শ্রেণীর অসাধু গুড় ব্যবসায়ীরা চিনি, রং এবং মোকামি গুড় দিয়ে কৃত্তিম উপায়ে বিভিন্ন উপকরনের সাহায্যে খেজুর গুড় তৈরি করে হাট বাজারে বিক্রি করেন। এছাড়া আগের মতো খেজুর গাছ আর নেই। প্রতিদিন ইটভাটায় জ্বালানির কাজে নিধন হচ্ছে এলাকার শত শত খেজুর গাছ। ফলে জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এরপরেও গাছিরা তাদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কেবল গুড়, সুস্বাদু খাবার ও শুধু রসনা তৃপ্তির সুমিষ্ট রসের জন্যই নয়, আমাদের জীবনের প্রয়োজনে, পরিবেশ-প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় আমাদেরকে খেজুর গাছ বাঁচিয়ে রাখতে হবে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, সারাদেশে পরিকল্পিতভাবে খেজুর গাছ রোপণ করা দরকার। তাহলে শীত মৌসুমে উপাদেয় রস দেশীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে আমাদের বিরাট ভূমিকা রাখতে পারবে। সরকারি উদ্যোগে বেশি করে খেজুর গাছ রোপণ করতে বন বিভাগকে দায়িত্ব দেয়া দরকার। খেজুরের ঐতিহ্য ধরে রাখতে গবেষণার প্রয়োজন। দেশী চারার পাশাপাশি পরীক্ষামূলোকভাবে আরব দেশীয় খেজুরের চারাও রোপণ করা প্রয়োজন বলে তিনি জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ