শনিবার ০৫ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

আমাদের পৃথিবীটা কোনদিকে যাচ্ছে

পৃথিবীটা আসলে কোনদিকে যাচ্ছে? বড় বড় রাষ্ট্রগুলো যে পথে চলছে, তাতো শান্তির পথ নয়। সংকটের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে, সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে মারণাস্ত্রের প্রতিযোগিতাও। শুধু অস্ত্রের সংখ্যাই যে বাড়ছে তা নয়, বাড়ছে ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষমতাও। যে সভ্যতায় মানুষ ও জনপদ ধ্বংসের এত আগ্রহ, সেই সভ্যতাকে কি মানবিক সভ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা যায়? মানুষ তো দুটি বিশ্বযুদ্ধ দেখেছে, তার ফলাফল কি মানুষ ভুলে গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞই তো মানুষকে শান্তির কথা ভাবতে অনুপ্রাণিত করেছিল। সে কারণেই  ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জাতিসংঘ। এরপর ৭৫টি বছর কেটে গেছে, কিন্তু জাতিসংঘ তার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি। বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পরাশক্তি। পরাশক্তির দাম্ভিক ও অমানবিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে জাতিসংঘ পরিণত হয়েছে একটি ভীরু সংস্থায়। কিন্তু মানুষ তো চায় জাতিসংঘ তার নৈতিক কর্তৃত্ব প্রয়োগ করুক। এ পথে বিরাজমান বাধা দৃশ্যমান। সে বাধা দূর করার কাজই এখন মানবজাতির প্রধান কাজ হিসেবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বিশ্ববাতাবরণে তেমন উদ্যোগ তো এখনও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। অবশ্য মানবতাবাদী চিন্তাশীল মানুষরা শান্তির পক্ষে, নৈতিক কর্তৃত্বে বলীয়ান জাতিসংঘের পক্ষে কথা বলছেন, দিকনির্দেশনাও দিচ্ছেন। কিন্তু বিশ্বের বড় বড় দেশগুলোর রাজনীতিবিদরা চলছেন ভিন্ন পথে। উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা তো অনেকের  সঙ্গত ও স্বাভাবিক চিন্তা-ভাবনার ক্ষমতাও হরণ করে নিয়েছে।
এমন বিশ্ব পরিস্থিতিতে ২৬ অক্টোবর হিন্দুস্তান টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চীন ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের দিনক্ষণ নির্ধারণ করে ফেলেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আর এমন দাবি করেছেন বিজেপি নেতা স্বতন্ত্র দেব সিং। লাদাখ সীমান্তে চীনের সঙ্গে ভারতের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই এমন বার্তা দিলেন উত্তর প্রদেশের বিজেপি প্রধান স্বতন্ত্র দেব সিং। তিনি বলেন, রামমন্দির প্রতিষ্ঠার ও ৩৭০ ধারা বাতিলের মতোই পাকিস্তান ও চীনের বিরুদ্ধে ভারত কবে যুদ্ধ ঘোষণা করবে তার নির্দিষ্ট দিনক্ষণ ভেবে রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী। উত্তর প্রদেশের মতো একটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের বিজেপি প্রধানের যুদ্ধের বার্তাতে বেশ ভয়ঙ্কর বলে মনে হলো। তবে ভারত প্রকাশ্যে যে নীতির কথা বলে থাকে, তার সাথে স্বতন্ত্র দেব সিং এর বার্তা বেশ সাংঘর্ষিক। মানুষ এখন কোনটা বিশ্বাস করবে? এদিকে ২৫ অক্টোবর দেশটির কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, চীনের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধে ইতি টানতে আগ্রহী দিল্লী। তবে একই সঙ্গে ভারতের এক ইঞ্চি জমিও কেউ কেড়ে নিতে পারবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি। উভয়ের বক্তব্যে মাত্রার কিছু তারতম্য লক্ষ্য করা গেলেও সেখানে শান্তির বার্তা নেই, আছে  যুদ্ধের হুমকি। আর রামমন্দির প্রতিষ্ঠা ও কাশ্মীরে ৩৭- ধারা বাতিলে মোদি সরকার যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, তা কোনোভাবে উদাহরণ নয়। বিশ্বের কোথাও এখন ভালো উদাহরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি তো বেশ ভয়াবহ। এদিকে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে। লক্ষ্য বেসিক এক্সচেঞ্জ অ্যান্ড কো-অপারেশন তথা বেকা চুক্তি, যার লক্ষ্য চীন। এমন পরিস্থিতিতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন যেন একটি নতুন কথাই বলে ফেললেন। এটি কি তাঁর বস্তুনিষ্ঠ কোনো বিশ্লেষণ, নাকি কোনো ক্ষোভের প্রকাশ? আর বর্তমান সভ্যতায়তো রাজনৈতিক কারণেও অনেকে অনেক কিছু বলে ফেলেন। ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে বিশ্বনেতাদের বোলচাল বোঝা বেশ মুশকিল।
মস্কো থেকে রয়টার্স পরিবেশিত খবরে বলা হয়, গত ২২ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেছেন- যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোয় সিদ্ধান্ত নিত, সেই যুগ অতীত হয়ে গেছে। এখন চীন ও জার্মানি পরাশক্তি হওয়ার পথে এগোচ্ছে। ভালদাই ডিসকাশন ক্লাবের এক বৈঠকে তিনি আরো ইঙ্গিত দেন, বৈশি^ক পরিমণ্ডলে যেখানে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ক্ষয়ে যাচ্ছে, সেখানে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেইজিং ও বার্লিন পরাশক্তির মর্যাদা অর্জনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ভিডিও লিঙ্কের মাধ্যমে অংশ নেয়া এ বৈঠকে প্রেসিডেন্ট পুতিন আরো বলেন, আন্তর্জাতিক সমস্যায় যদি ওয়াশিংটন মস্কোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় প্রস্তুত না থাকে, তবে রাশিয়া তা নিয়ে অন্যান্য দেশের সঙ্গে আলোচনা করতে তৈরি আছে।
সাবেক পরাশক্তিদের ক্ষয় এবং নতুন পরাশক্তির অভ্যুদয় প্রসঙ্গে পুতিন যে মন্তব্য করেছেন তা অনেকটাই দৃশ্যমান। আর সাবেক পরাশক্তিদের চালচিত্রও বিশ্ববাসীর অজানা নয়। আপন স্বার্থে তারা হাত মিলায়, আবার হাত গুটিয়েও নেয়। সেখানে ন্যায় কিংবা সুনীতির কোনো মূল্য নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে এখন পুতিনের কণ্ঠে কিছুটা ক্ষোভ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তার সাথে হয়তো স্বার্থের কোনো বিষয় জড়িয়ে আছে।
পুতিন বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোয় সিদ্ধান্ত নিত, সেই যুগ অতীত হয়েছে গেছে।’ প্রশ্ন জাগে, তাদের সিদ্ধান্তে বিশ্ববাসীর কি কোনো কল্যাণ হয়েছে, নাকি সংকটের মাত্রা আরো বেড়েছে? অন্য বিষয় বাদ দিয়ে যদি শুধু মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতি বিবেচনায় আনা হয়, তাহলে দেখা যাবে সেখানেও তাঁরা মন্দ উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন এবং কুড়িয়েছেন মানুষের অভিশাপ। মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে একটি জরিপ পরিচালনা করেছে গবেষণা সংস্থা ‘আরব সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি স্টাডিজ’। আরব বিশ্বের ১৩টি রাষ্ট্রে পরিচালিত ওই জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৫৮ শতাংশই মনে করেন, অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় তুরস্কের মধ্যপ্রাচ্য নীতি আরব স্বার্থের পক্ষে। তুরস্কের পর চীন ও জার্মানির মধ্যপ্রাচ্য নীতির প্রতি আরবদের মনোভাব সবচেয়ে ইতিবাচক। চীনের নীতির প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেন ৫৫ শতাংশ, আর জার্মানির নীতির পক্ষে সমর্থন প্রকাশ করেন ৫২ শতাংশ উত্তরদাতা। এমন চিত্র থেকে উপলব্ধি করা যায়, বিগত সময়ে দুই পরাশক্তি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাতে মানুষ সন্তুষ্ট নয়। আর মধ্যপ্রাচ্যেরু বিষয়টাতো খুবই স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য-নীতির ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি অসন্তুষ্ট আরববিশ্বের জনগণ। জরিপে সেই বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রশ্ন জাগে, বছরের পর বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া কেমন ভূমিকা পালন করে আসছে? ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া এবং ফিলিস্তিনে ধ্বংসযজ্ঞের জন্য দায়ি কারা? নারী-শিশুসহ লক্ষ লক্ষ মানুষ অভিবাসী হলো কাদের জন্য? সভ্যতার কাঠগড়ায় একসময় দাঁড়াতে হবে পরাশক্তিকে। এখন হয়তো তাদের রাজনীতি, অর্থনীতি, অস্ত্রব্যবসা ভালোই চলছে কিন্তু সময় চিরদিন একভাবে যায় না, পরিবর্তন আসে। এ কারণেই হয়তো পুতিন বলেছেন, বেইজিং ও বার্লিন পরাশক্তির মর্যাদা অর্জনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কিন্তু এখানেও সমস্যার সমাধান নেই। কারণ উগ্র জাতীয়তাবাদ ও স্বার্থান্ধতার কারণে কোনো একক রাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখা যায় না। তাই প্রয়োজন এক শক্তিশালী জাতিসংঘ। যার লক্ষ্য হবে মানুষের বসবাস উপযোগী এক সুন্দর পৃথিবী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ