শনিবার ২৮ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

দিল্লী-ওয়াশিংটন চুক্তি

সমগ্র বিশ্ব যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করছে এবং দেশটিতে প্রচারণাসহ নির্বাচনী তৎপরতাও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, ঠিক তেমন এক পরিস্থিতিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপার গত মঙ্গলবার দু’দিনের সফরে ভারতে এসেছিলেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগের এই সফরকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি অভূতপূর্ব ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কারণ, মার্কিন দুই মন্ত্রী শুধু ‘টু প্লাস টু’ নামে পরিচিতি অর্জনকারী তিনটি বৈঠকেই অংশ নেননি, ভারতের সঙ্গে পাঁচটি পৃথক চুক্তিও স্বাক্ষর করেছেন। এক কথায় চুক্তিগুলোকে ‘বেকা’ বা ‘বেসিক এক্সচেঞ্জ অ্যান্ড কোঅপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট’ বলা হয়েছে।
এই ‘বেকা’ প্রসঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা যেমন চলছিল তেমনি ভারত এতে স্বাক্ষর করতে সম্মত হবে কি না তা নিয়েও গভীর সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছিল। কারণ, আন্তর্জাতিক কূটনীতির অঙ্গনে চুক্তিটিকে দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চীন বিরোধী সামরিক জোট গঠনের প্রচেষ্টা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। বলা হয়েছে, কমিউনিস্ট রাষ্ট্র চীনকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার প্রধান উদ্দেশ্য নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশকে ‘বেকা’য় যুক্ত করতে চাচ্ছে। উল্লেখযোগ্য দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান প্রথম থেকেই ‘বেকা’য় স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এসেছে। অন্যদিকে প্রকাশ্যে বিরোধিতা না করলেও এবং অস্বীকৃতি না জানালেও ভারত এতদিন চুক্তি স্বাক্ষর করা থেকে সুকৌশলে বিরত থেকেছে। কিন্তু বিগত কয়েক মাসে লাদাখসহ বিভিন্ন সীমান্তে চীনের সঙ্গে বিক্ষিপ্ত যুদ্ধ এবং বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে কাশ্মীর প্রশ্নে তীব্র উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতকে তার সিদ্ধান্ত পাল্টাতে হয়েছে। এজন্যই মোদী সরকার মার্কিন দুই প্রভাবশালী মন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ভারতে নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ভারতীয় ভোটারদের নিজের পক্ষে টেনে আনার কৌশল হিসেবে ঠিক এ সময়কেই বেছে নিয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপারকে দিল্লি সফরে পাঠিয়েছেন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে ‘টু প্লাস টু’ নামের তিন দফা বৈঠক শেষে তারা ‘বেকা’র আড়ালে মোট পাঁচটি পৃথক চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন।
চুক্তি স্বাক্ষরশেষে বিস্তারিত না জানালেও দু’দেশের চার মন্ত্রী এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ভারত ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় জোট ‘বেকা’য় যোগ দিতে সম্মত হয়েছে। সে কারণে যে কোনো যুদ্ধে পাশে দাঁড়ানোসহ ভারতকে পূর্ণ সামরিক সহযোগিতা দেবে যুক্তরাষ্ট্র। দিল্লির হায়দরাবাদ হাউজে অনুষ্ঠিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন মন্ত্রীরা আরো জানিয়েছেন, অ্যাপাচে হেলিকপ্টার এবং ড্রোন ও রাইফেলসহ অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র দেয়া ছাড়াও উপগ্রহের মাধ্যমে প্রাপ্ত গোয়েন্দা তথ্য দিয়েও ভারতকে সহযোগিতা করা হবে। এভাবে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা বিস্তৃত করার সিদ্ধান্তও জানানো হয়েছে সংবাদ সম্মেলনে। এতে সরাসরি চীনের  বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা না বলা হলেও মার্কিন মন্ত্রীরা অভিযোগ করেছেন, চীন এই অঞ্চলে শান্তি ও স্বাধীনতার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে চলেছে। এ ব্যাপারে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র এক সঙ্গে চীনকে প্রতিহত করবে। সংবাদ সম্মেলনে চীনকে গণতন্ত্রের জন্য বিপদজনক হুমকি হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে চীনের পক্ষ থেকে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও ঠান্ডা যুদ্ধের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি।
বলার অপেক্ষা রাখে না, চীনের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় কঠোর মনোভাবের প্রকাশ না ঘটলেও ‘বেকা’কে চীন সঙ্গত কারণেই দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক জোট হিসেবে বিবেচনায় নিয়েছে। ঠান্ডা যুদ্ধের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার মধ্য দিয়ে চীন প্রকারান্তরে একথাও জানিয়ে দিয়েছে যে, ভারতকে সঙ্গে নিয়ে চীন বিরোধী যে কোনো প্রচেষ্টার সমুচিত জবাব দিতে দেশটি প্রস্তুত রয়েছে। এমন সম্ভাবনা ও আশংকার পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা মনে করি, মার্কিন নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য কিছুটা ইতিবাচক হলেও ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘বেকা’ চুক্তি বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠতে পারে- যার অশুভ পরিণতি থেকে ভারত তো বটেই, বাংলাদেশও রক্ষা পাবে না। সম্ভাবনার এ দৃষ্টিকোণ থেকেই ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিটিকে আমরা সমর্থনযোগ্য মনে করি না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ