সোমবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

কৃষকরা রেকর্ড কিস্তি পরিশোধ করলেও থেমে নেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মামলা

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : করোনার মধ্যে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রেকর্ড ৬ হাজার ২৭৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকার কিস্তি পরিশোধ করেছে কৃষকরা। যা মোট কৃষি ঋণের ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। আগের অর্থবছরে স্বাভাবিক পরিস্থিতির একই সময়ে কৃষকরা কিস্তি দিয়েছিল ৪ হাজার ৩৭৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। গত বছরের তুলনায় এবার কৃষকরা ২ হাজার কোটি টাকা বেশি ফেরত দিয়েছেন। রেকর্ড কিস্তি পরিশোধের পরও তাদের বিরুদ্ধে থেমে নেই মামলা করার প্রবণতা। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনাও মানা হচ্ছে না। এ পর্যন্ত কৃষকের বিরুদ্ধে ৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ৪৯১ কোটি টাকা পাওনার বিপরীতে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪৯৮টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আদালত থেকে ওয়ারেন্ট জারি হয়েছে ১৩ হাজার ৬৪১ জন কৃষকের বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি মামলা দিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। কৃষকের বিরুদ্ধে এই ব্যাংক মামলা করেছে ৭১ হাজার ৬১৩টি, এর বিপরীতে অর্থ জড়িত ২৫৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এসব মামলার কারণে ৪ হাজার ৩০১ কৃষকের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি হয়েছে। আর ব্যাংকটির মামলায় প্রায় সাড়ে চার হাজার কৃষক ওয়ারেন্ট মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। মামলা দায়েরের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক। প্রায় ১২৫ কোটি টাকা পাওনার অনুকূলে ২৩ হাজার ৮৯৮ কৃষকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আর ওয়ারেন্ট জারি হয়েছে ২ হাজার ৮৩৭ কৃষকের বিরুদ্ধে। তৃতীয় অবস্থানে আছে অগ্রণী ব্যাংক। এই ব্যাংক ১৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা পাওনার অনুকূলে ২০ হাজার ৩৪৬ কৃষকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আর ওয়ারেন্ট বের হয়েছে ১ হাজার ৫৮৯ কৃষকের বিরুদ্ধে।
সোনালী ব্যাংকের মামলার সংখ্যা ১৩ হাজার ৮৩৮টি, এর বিপরীতে অর্থ পাওনা প্রায় ৪৪ কোটি টাকা। এসব মামলায় ওয়ারেন্ট বের হয়েছে ৮১৯ কৃষকের বিরুদ্ধে। আর রূপালী ব্যাংকের পক্ষ থেকে কৃষকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয় ৩ হাজার ৫০৩টি। এসব মামলার অনুকূলে অর্থ জড়িত ৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। পাশাপাশি এই মামলার কারণে ওয়ারেন্ট জারি হয়েছে ৩৬৯ কৃষকের বিরুদ্ধে।
এদিকে করোনাকালীন সময়ে কৃষকরা রেকর্ড কিস্তি পরিশোধ করলেও তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রবণতা অব্যহত রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক করোনাকালীন সময়ে মামলা করতে নিষেধ করলেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো তা মানছে না। শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই ৪৫ কৃষকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। খাদ্য উৎপাদনের জন্য নেয়া ঋণের অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় কৃষকের বিরুদ্ধে এ ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এর আগে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দেয়া দেড় লাখ মামলায় এখনও ঝুলে আছে অনেক কৃষক। এর মধ্যে ওয়ারেন্ট মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে প্রায় ১৪ হাজার কৃষক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। স¤প্রতি ওই প্রতিবেদনটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, করোনার মধ্যেও চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ছয় হাজার ২৭৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ফেরত দিয়েছেন কৃষকরা। যা মোট কৃষি ঋণের ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। আগের বছরে স্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে কৃষকরা চার হাজার ৩৭৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা ফেরত দিয়েছেন। গত বছরের তুলনায় এবার কৃষরা ২ হাজার কোটি টাকা বেশি ফেরত দিয়েছেন। মহামারির কারণে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করার সুবিধা দেয়া হলেও কৃষকরা সেই সুবিধা নিচ্ছে না। করোনার সময়ও ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেছেন তারা। এরপরও তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া উচিত হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান জানান, কৃষকরা ব্যাংক থেকে টাকা নিলে সেই টাকা ফেরত দেয়। এটা তাদের বৈশিষ্ট্য। এছাড়া ঋণের কিস্তি ফেরত না দিলে কোনও সমস্যা হবে না এমন খবর হয়তো অনেক কৃষক জানেনই না। ফলে কৃষকরা সমস্যার মধ্যে থাকলেও তাদের টাকা ফেরত দেওয়ার প্রবণতার কারণে আদায় বেড়েছে। আরেকটি কারণে ব্যাংকের কৃষি ঋণ আদায় বাড়তে পারে। সেটা হলো নতুন ঋণ দেওয়ার সময়ই কৃষকদেরকে আগের নেয়া টাকা পরিশোধ করানো হয় বা কেটে রাখা হয়। এবার যেহেতু কৃষকদের মধ্যে বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, সেহেতু আদায়ও বেশি হয়েছে। তিনি বলেন, করোনাকালে যেসব কৃষক টাকা ফেরত দিচ্ছেন তাদেরকে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া উচিত। আর যেসব ব্যবসায়ী টাকা নিয়ে ফেরত দিতে চান না অথবা ফেরত দেওয়ার জন্য সময় চান তাদের কোনও প্রণোদনা দেয়া উচিত নয়।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, করোনার মধ্যে কৃষিখাতের উৎপাদন ও সরবরাহ প্রক্রিয়া সচল থাকায় কৃষক সময় মতো কিস্তি ফেরত দিয়েছেন। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কৃষিখাতে ব্যাংকগুলোর পুঞ্জীভূত ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ৪২ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ চার হাজার ৯০৯ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ১১.১৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংকগুলো কৃষিখাতে ঋণ বিতরণ করেছে চার হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা। এই অংক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৩২ শতাংশ বেশি। গতবছর একই সময়ে ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছিল তিন হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা। উল্লেখ্য, ২০১৯-২০ অর্থবছরে কৃষকদের জন্য ২৪ হাজার ১২৪ কোটি টাকা ঋণ বরাদ্দ রেখেছিল ব্যাংকগুলো। কিন্তু অর্থবছরে শেষে এ খাতের ঋণ বিতরণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২২ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা।
জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক এক প্রজ্ঞাপন জারি করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে কৃষকের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা না করে আপস বা সমঝোতার মাধ্যমে ঋণ আদায়ের পরামর্শ দেয়। একই সঙ্গে কৃষি ঋণ আদায়ে তদারকি জোরদার এবং প্রয়োজনে আলাদা সেল গঠনের পরামর্শ দেয়া হয়। কিন্তু এসব পরামর্শ মানছে না অনেক ব্যাংক।
অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে (করোনাকালীন) ৩৬ লাখ টাকা আদায়ের জন্য ৪৫টি মামলা দেয়া হয়। এর মধ্যে সাড়ে চার লাখ টাকা আদায়ের জন্য অগ্রণী ব্যাংক মামলা দিয়েছে ৯টি, রূপালী ব্যাংক ২৬ লাখ টাকার বিপরীতে মামলা দিয়েছে ২৮টি। এছাড়া ১ লাখ ২০ হাজার টাকার জন্য রাজশাহী কৃষি ব্যাংক মামলা করেছে ৩টি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, সরকার চায় কৃষকের বিরুদ্ধে যাতে সার্টিফিকেট মামলা না হয়। এ কারণে একটি প্রজ্ঞাপনও জারি করে ব্যাংকগুলোকে জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী হোসেন প্রধানিয়া জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো কৃষকের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হচ্ছে না। কৃষকদের বুঝিয়ে তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করার কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, কৃষকের ভেতর এখনও সততা আছে। ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে ফেরত দেয়ার মানসিকতা আছে। যদি টাকা ফেরত না দিতে পারে তাহলে প্রকৃতপক্ষে সে সমস্যাগ্রস্ত। আমাদের ব্যাংকে সেভাবে নির্দেশনা দেয়া আছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ