সোমবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

বাড়িতে টর্চার সেলে লোকজনকে ধরে এনে নির্যাতন চালাতো হাজি সেলিমের ছেলে

# কাউন্সিলর থেকে ইরফান সেলিম বরখাস্ত
# সহযোগী দিপু রিমান্ডে
# ওয়াকিটকি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ : বাসায় কন্ট্রোল রুম- র‌্যাব

নাছির উদ্দিন শোয়েব : নাম মোহাম্মদ ইরফান সেলিম হলেও স্থানীয়রা তাকে চিনতো শাহজাদা সেলিম নামে। বাবা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালি নেতা, সংসদ সদস্য হাজি সেলিম। পুরান ঢাকায় এই পরিবারটির দোর্দন্ড প্রতাপ। ইরফান সেলিম নিজেও ওয়ার্ড কাউন্সিলর। রয়েছে তার বিশাল বাহিনী। বাড়িতে গোপন টর্চার সেল। হাজী সেলিমের বাসায় গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিসহ অত্যাধুনিক কন্ট্রোল রুম। কন্ট্রোল রুমে রয়েছে আধুনিক ভিপিএস (ভার্চুয়াল প্রাইভেট সার্ভার)। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবহৃত অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সরঞ্জাম ব্যবহার করে পুরান ঢাকা এলাকা ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং করতো শাহজাদা বাহিনী। শাহজাদা বাহিনী চষে বেড়াতো পুরান ঢাকা এলাকায়। পুরো এলাকা তাদের ভয়ে থাকতো তটস্থ। এ বাহিনীর অপকর্ম এবং চাঁদাবাজির বিষয়ে কেউ কখনো মুখ খুলতে সাহস পায় না।
রোববার রাতে রাজধানীর কলাবাগান এলাকায় নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তাকে মারধরের ঘটনায় সংসদ সদস্য হাজি সেলিমের ছেলে  ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কাউন্সিলর ইরফান সেলিম ও তার দেহরক্ষী মো. জাহিদকে গ্রেফতারের পর এক বছরের কারাদন্ড দিয়েছেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। বর্তমাানে তারা কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন। এদিকে ইরফান সেলিমের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। পুলিশ বলছে, নৌবাহিনীর কর্মকর্তাকে মারধর ও হত্যার হুমকির মামলায় ইরফান সেলিমকে সাতদিনের রিমান্ডে চাওয়া হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কাউন্সিলর পদ থেকে বরখাস্ত হচ্ছেন ইরফান সেলিম। ইরফান সেলিমের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এবি সিদ্দিক দিপুকে গ্রেফতারের পর রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। এ মামলায় এজাহারভুক্ত মোট চার আসামীকেই গ্রেফতার করা হয়েছে। অজ্ঞাত অন্য আসামীদের খোঁজ নেয়া হচ্ছে। র‌্যাব জানিয়েছে, ইরফান সেলিমের বিরুদ্ধে অস্ত্রসহ অন্যান্য আইনে মামলা হবে। পুলিশ বলছে, হাজী সেলিমের ছেলের বিরুদ্ধে প্রভাবমুক্ত তদন্ত হবে।   
র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ  জানিয়েছেন, ‘সোমবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাজি সেলিমের চকবাজারের ২৬ দেবীদাস লেনের বাসায় ৮ ঘন্টা অভিযানে বাসা থেকে বিভিন্ন ধরনের ৩৮টি ওয়াকিটকি সেট ও মূল স্টেশন বা কন্ট্রোল রুম জব্দ করা হয়েছে। যেগুলো এলাকা নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাÐে ব্যবহার করতেন বলে আমাদের কাছে অভিযোগ আছে। মূলত নিরাপত্তা বাহিনী এগুলো ব্যবহার করে থাকে। তবে অভিযানের সময় ইরফানের কাছে জানতে চাইলে তিনি তার ব্যবসায়িক কাজে এটা ব্যবহার করতেন বলে আমাদের জানিয়েছেন।’ র‌্যাব কর্মকর্তা আশিক বিল্লাহ বলেন, ‘কন্ট্রোল রুম থেকে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তিনটি ভেরি হাইসিকিউরিটি সেট (ভিএইচএস) উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। এটা ওয়াকিটকির একটি আধুনিক সংস্করণ। র‌্যাব জানায়, রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের (ভিভিআইপি) নিরাপত্তায় নিয়োজিত এলিট বাহিনীর কাছে যেসব সরঞ্জাম থাকে, সেরকম সরঞ্জাম পাওয়া গেছে এখানে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ফাঁকি দিয়ে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষায় এই কন্ট্রোল রুম ব্যবহার করা হতো বলে র‌্যাবের ধারণা। বিদেশি অস্ত্র, হ্যান্ড কাফ ও মদও জব্দ করেছে র‌্যাব। র‌্যাব জানায়, চকবাজারের হাজি সেলিমের মালিকানাধীন মদীনা আশিক টাওয়ারের ১৪ তলায় টর্চার সেলের সন্ধান পাওয়া গেছে। গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর সোমবার রাতেই মদীনা আশিক টাওয়ারে হাজী সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিমের নিজস্ব টর্চার সেলে অভিযান চালানো হয়। ইরফানের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার পর ইরফানের বাড়ির কাছাকাছি জায়গা মদীনা আশিক টাওয়ারের ১৪ তলার একটি রুমে অভিযান চালায় র‌্যাব। ভবনের একটি ফ্ল্যাটকে টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করতেন ইরফান। কেউ কথার বাইরে গেলেই তাকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করা হতো। তার বিরুদ্ধে দুটি নিয়মিত মামলা করবে র‌্যাব। একটা অস্ত্র আইনে, আরেকটা মাদক আইনে। র‌্যাবের ধারণা এই ওয়ার্লেস নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চাঁদাবাজি সন্ত্রাস ও জিম্মি করাসহ নানা অবৈধকাজে তার ক্যাডার বাহিনীর মাধ্যমে তারা উদ্ধার হওয়া ৩৮টি ওয়াকিটকি ব্যবহার করতো। যেখানে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও প্রতিপক্ষকে চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে জিম্মি করে টর্চার করা হতো বলে ধারণা করছে র‌্যাব। ওয়াকিটকি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পুরনো ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকার ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত তারা এই নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করতে পারতো। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা চাঁদাবাজি করতো। বাড়িটি শক্তিশালী সিসিক্যামেরাভুক্ত থাকার পরও তারা ওয়ার্লেস নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতো।
এদিকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার মোহাম্মদ মামুন গতকাল মঙ্গলবার গণমাধ্যমকে বলেন, ইরফান ও জাহিদকে সোমবার রাতে কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠায় র‌্যাব। দুজনকে রাত ১২টার পর কারাগারে নিয়ে আসেন র‌্যাবের সদস্যরা। ডেপুটি জেলার জানান, ইরফান ও জাহিদকে কারাগারের সাধারণ সেলের কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। সাধারণ আসামিদের যেভাবে রাখা হয়, সেভাবেই আছেন এ দু’জন।
ইরফানকে ৭ দিনের রিমান্ডে চেয়েছে পুলিশ: নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তাকে মারধর ও হত্যার হুমকির মামলায় ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিমকে সাতদিনের রিমান্ডে চেয়েছে পুলিশ। ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর হাকিম আসাদুজ্জামান নূরের আদালতে বুধবার এ আবেদনের বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ধানমন্ডি এলাকায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিষয়টি জানান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকরাম আলি মিয়া। তিনি জানান, সাজাপ্রাপ্ত ইরফান সেলিম ও জাহিদকে নৌবাহিনীর কর্মকর্তাকে মারধরের ঘটনায় পুনগ্রেফতার দেখিয়ে সাতদিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করা হবে।  ওসি আরও বলেন, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এই মামলায় অজ্ঞাত আরও ২-৩ আসামিকে চিহ্নিত করা হবে।
কাউন্সিলর ইরফান সেলিম বরখাস্ত : ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৩০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইরফান সেলিমকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার রাতে তাকে বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে আদেশ জারি করা হয়। নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তাকে মারধর এবং বাড়ি তল্লাশির পর র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত কারাদণ্ড দেয়ায় ইরফানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ইরফান সেলিম ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের পুত্র এবং নোয়াখালীর সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরীর জামাতা। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, কাউন্সিলর ইরফান সেলিমের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা ও তার স্ত্রীর ওপর হামলার অভিযোগে ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে। এছাড়া বিদেশি মদ সেবনের দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে এক বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও এক মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন। ইতিমধ্যে কারাগারে রয়েছেন তিনি। অবৈধ ওয়াকিটকি রাখা ও ব্যবহারের দায়ে ইরফান ভ্রাম্যমাণ আদালতে ৬ মাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন বলেও আদেশে উল্লেখ করা হয়।
ইরফানের সহযোগী দিপু রিমান্ডে: ইরফান সেলিমের সহযোগী এ বি সিদ্দিক ওরফে দিপুকে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন আদালত। হাজি সেলিমের গাড়ি থেকে নেমে নৌবাহিনীর কর্মকর্তাকে মারধরের ঘটনার মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এই রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে। পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট সত্যব্রত শিকদার রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে ধানমন্ডি থানার পুলিশ এ বি সিদ্দিকীকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার আবেদন করে। আদালত উভয় পক্ষের শুনানি নিয়ে তিন দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দেন। রাষ্ট্রপক্ষের শুনানি করেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের প্রধান সরকারি কৌঁসুলি আবদুল্লাহ আবু। সোমবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে টাঙ্গাইল থেকে গ্রেফতার করা হয় এ বি সিদ্দিককে। তিনি হাজি সেলিমের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান মদিনা গ্রুপের প্রটোকল অফিসার। একই মামলায় গ্রেফতার গাড়িচালক মিজানুর রহমানকে এদিন এক দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দেন আদালত। আর মামলার অপর আসামি হাজী সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিম ও তাঁর দেহরক্ষী জাহিদ কারাগারে আছেন।
পুলিশ বলছে প্রভাবমুক্ত তদন্ত হবে: ইরফান সেলিমের বিরুদ্ধে নৌবাহিনীর কর্মকর্তাকে মারধরের মামলাটির তদন্ত ‘প্রভাবমুক্ত’ভাবে করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ঢাকার পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম। আলোচিত এই ঘটনা নিয়ে গতকাল এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, নিঃসন্দেহে এই মামলা প্রভাবমুক্তভাবে তদন্ত করা হবে। এখানে প্রভাব খাটানোর চেষ্টাও কেউ করবে না। একজন অপরাধীকে যেভাবে বিচারের আওতায় আনা দরকার, একইভাবে তাকেও আনা হবে।
ইরফানের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ: নৌবাহিনীর কর্মকর্তাকে মারধরের ঘটনায় ইরফান সেলিমসহ চার জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা হত্যাচেষ্টা মামলাটি তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। আগামী ৩০ নভেম্বর প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সোমবার বিকালে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলার এজাহার পৌঁছালে বিচারক আবু সুফিয়ান মোহাম্মদ নোমান এই আদেশ দেন। আদালতের সংশ্লিষ্ট থানার সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। মামলায় আসামীরা হলেন- ইরফান সেলিম, তার বডিগার্ড মোহাম্মদ জাহিদ, হাজী সেলিমের মদিনা গ্রুপের প্রটোকল অফিসার এবি সিদ্দিক দিপু এবং গাড়িচালক মিজানুর রহমান।
অস্ত্রসহ অন্যান্য আইনে মামলা হবে -র‌্যাব ডিজি : র‌্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেছেন, ইরফান সেলিমকে ইতোমধ্যে মাদক মামলায় সাজা দেওয়া হয়েছে। অবৈধ অস্ত্র, মাদক, ইলেকট্রিক ডিভাইসসহ বিভিন্ন মালামাল পাওয়া যায় তার বাসায়। এসব বিষয়েও তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে টুঙ্গিপাড়ায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ