বৃহস্পতিবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

নারী নির্যাতন বন্ধে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামের অনুশাসন ও নৈতিক শিক্ষার চর্চা

গতকাল রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সম্মিলিত ইসলামী দলসমূহের উদ্যোগে আয়োজিত ‘নারী নির্যাতন যুগে যুগে : কারণ ও প্রতিকার’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয় -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : সম্মিলিত ইসলামী দলসমূহের উদ্যোগে আয়োজিত নারী নির্যাতন: কারণ ও প্রতিকার শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে দেশের বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদগণ বলেছেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামের অনুশাসন ও নৈতিক শিক্ষার চর্চায় পারে নারী নির্যাতন বন্ধ করতে। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে চুপচাপ বসে থাকলে হবে না। তথাকথিত সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে, তবেই নারী নির্যাতন বন্ধ হবে। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সাংবাদিক ভাই ও বোনেরাও প্রতিবাদ করুন। নারী নির্যাতন বন্ধ করতে হবে আইনের প্রয়োগ করতে হবে, এবং আইন দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
গতকাল রোববার বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে সম্মিলিত ইসলামী দলসমূহের উদ্যোগে আয়োজিত নারী নির্যাতন: কারণ ও প্রতিকার শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান আলোচকের বক্তব্যে ইসলামীচিন্তাবিদগণ এইসব কথা বলেন। গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। মাওলানা আবু তাহের জিহাদী আল কাসেমীর সভাপতিত্বে বৈঠকে বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান শাইখ সাইয়্যেদ মাওলানা কামালুদ্দীন জাফরী, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আব্দুর রউফ, সম্মিলিত ইসলামী দলসমূহের মহাসচিব মাওলানা জাফরুল্লাহ খান, সম্মিলিত ইসলামী দলসমূহের সমন্বয়ক ড. মুফতি মাওলানা খলীলুর রহমান মাদানী, নিউ নেশন পত্রিকার সাবেক সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার, আইম্মাহ পরিষদের মাওলানা মহিউদ্দিন রব্বানী, জাতীয় ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা ফিরোজী, মীরেরসরাই পীর সাহেব মাওলানা আব্দুল মুমিন নাসিরী, প্রফেসর ড. আ.ন.ম রফিকুর রহমান মাদানী, সম্মিলিত ইসলামী দলসমূহের প্রচার সম্পাদক মুফতি মাওলানা ফখরুল ইসলাম, অধ্যাপক মাওলানা নুরুল আমিন, মাওলানা কামরুল ইসলাম, ড. মাওলানা হাবিবুর রহমান, অধ্যক্ষ মাওলানা মোশাররফ হোসাইন, মাওলানা মাহমুদুল হাসান, আমীর আলী হাওলাদার, মাওলানা আবুল কাসেম কাসেমী, ছারছীনার ছোট পীর মাওলানা আরিফ বিল্লাহ সিদ্দীকী, মাওলানা ইয়ামীন হোসাইন আজমি, নাসির উদ্দিন হেলালী, মাওলানা জহিরুল ইসলাম, মাওলানা শফিক বিন বাহাউদ্দীন, মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা ফখরুদ্দীন আহমাদ, ড. আবুল কালাম আযাদ বাশার, বাংলাদেশ ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা লুৎফর রহমান, মাওলানা বেলায়েত হোসেন ফিরোজী, ইসলামী ঐক্যজোটের সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা শওকত আমিন, খতমে নবুওয়াত আন্দোলনের সভাপতি হাজী শামসুল হক, এডভোকেট খাইরুল আহসান, হাফেজ মাওলানা আবু বকর সিদ্দীকি, হাফেজ মাওলানা কামরুল ইসলাম বরিশাল, ড. মাওলানা হাবিবুর রহমান,  মাওলানা কামরুল হাসান শাহীন, মাওলানা জহিরুল ইসলাম জাবেরী, ইয়ামিন হোসাইন আযমী, মুহাদ্দিস মাহমুদুল হাসান, শায়খ জামাল উদ্দীন, মাওলানা সালেহ সিদ্দিকী প্রমুখ। এছাড়াও গোলটেবিল বৈঠকে সম্মিলিত ইসলামী দল সমূহের নেতৃবৃন্দসহ দেশ বরেণ্য শীর্ষ উলামায়ে কেরাম ও বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীগণ উপস্থিত ছিলেন।
শাইখ সাইয়্যেদ মাওলানা কামালুদ্দীন জাফরী বলেন- নারী উন্নয়নের নামে নারী উন্নয়ন নীতিমালায় কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী সকল ধারা বাতিল করে নারীর মর্যাদা এবং অধিকার সংরক্ষণে কুরআন-হাদীসের শিক্ষাসমূহ জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের অনিবার্য দাবি। দেশব্যাপী গণধর্ষণের মহামারি ও পাশবিকতার মহাউৎসব বন্ধ করতে কার্যকরী আইন করে অপরাধীদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। সকল ধরণের মাদকদ্রব্য, অশ্লীল ছায়াছবি ও এর অবাধ-প্রাপ্তি বন্ধ করতে হবে। পর্ণগ্রাফি ও অশ্লীল টিভি সিরিয়ালের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
মাওলানা কামালুদ্দীন জাফরী বলেন, আল কোরআনে কারিমে নারীর প্রতি অত্যন্ত সম্মান দেখিয়ে নারী নির্যাতনকারীকে ঘৃণ্য অপরাধী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যেসব কারণে নারীরা সমাজে নির্যাতিত হয়, সেসব থেকে বিরত থাকতে মুসলমানদের আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন। নারী নির্যাতনকারীকে প্রতিরোধ করার কথাও আলেমরা বলে থাকেন। দেশে নারী নির্যাতনের ঘটনা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এসবের মূলে রয়েছে নারীর প্রতি মমত্ববোধ, সম্মানবেধ, সম্প্রীতি ও ভালোবাসার অভাব। এ কারণে নির্যাতনের শিকার হতে হয় নারীকে।
সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আব্দুর রউফ বলেন, কুরআনে বর্ণিত আইনই নারীর মর্যাদা রক্ষা করতে পারে। ধর্ষক ও ব্যাভিচারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলে নারী নির্যাতন ও সহিংসতা অটোম্যাটিক কমতে বাধ্য।
সম্মিলিত ইসলামী দলসমূহের মহাসচিব মাওলানা জাফরুল্লাহ খান বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা ও খুন-গুম বন্ধের সমন্বিত কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। নারীর প্রতি সহিংসতা, ব্যভিচার ও ধর্ষণ প্রতিরোধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। নারীর অশ্লীল উপস্থাপনা ও পণ্য হিসাবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ইসলামি জীবনদর্শনে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন প্রতিরোধে পবিত্র কোরানের সুরা আন নুর-এ আল্লাহ তায়ালা যে সুন্দরতম সামাজিক বিধিবিধান দিয়েছেন, তা অত্যন্ত কার্যকর ও ফলপ্রসূ। আল্লাহ নির্দেশিত এসব বিধান যথাযথভাবে কার্যকর হলে নারী নির্যাতন চিরতরে বন্ধ হবে এবং মানবজীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠিত হবে। সুতরাং নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ইসলামের সামাজিক বিধিবিধানের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার করতে সমাজের ধর্মীয় নেতাদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
ড. মুফতি মাওলানা খলীলুর রহমান মাদানী বলেন, অপরাধী যে দলেরই হোক সকলের জন্য আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করেতে হবে। দেশব্যাপী গণধর্ষণের মহামারি ও পাশবিকতার মহাউৎসব বন্ধ করতে কার্যকরী ব্যবস্থা ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সন্ত্রাসী, মাদকাসক্ত, ধর্ষক, নিপীড়ক ও খুনীদের কোন ধর্ম নেই। যুগে যুগে বিভিন্ন ধর্মে নারীকে লক্ষীনি, পদ্মীনি, রাক্ষসী, অপেয়া বিভিন্ন নামে সীমাহীন হেয় করেছে এবং সতীদাহ প্রথা চালু করে নারী জাতির চিরস্বাধীনতা হরণ করেছে। বর্বর জাহিলী যুগে মেয়ে শিশুকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো, নারীদের হাটে-বাজারে পশুর মতো বিক্রি করা হতো, দাসী হিসেবে ব্যবহার  করা  হতো। ইসলামিক বিধানই নারীর জাতির এ অমানবিক অবস্থা থেকে উদ্ধার করে। তাই আজও নারীর প্রতি সকল ধরনের সহিংসতা বন্ধে ইসলামী বিধানের কোনো বিকল্প নেই।   
তিনি আরও বলেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়েই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নানা উপায়ে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন চলছে। ধর্ষণ, নারী পাচার, এসিড নিক্ষেপ, যৌতুকের জন্য নির্যাতন, রাস্তাঘাটে উত্ত্যক্তের শিকারসহ নানা উপায়ে নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে। ইসলাম পরিপন্থী এসব লোমহর্ষক নির্যাতন বন্ধের উপায় খুঁজে বের করে সমস্যার সমাধানে ধর্মপ্রাণ মুসলমান জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে চেষ্টা চালানো খুবই জরুরি।
নিউ নেশন পত্রিকার সাবেক সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ ও ন্যায্য অধিকার আদায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। নারী নির্যাতন বন্ধে অভিভাবক মহলের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করা দরকার। সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে যে, নারী-পুরুষ মিলে যে ঘর-সংসার, বহু ঘর নিয়ে যে মুসলিম সমাজ, সেখানে প্রত্যেকেরই গুরুত্ব, মর্যাদা, অধিকার ও ভূমিকা রয়েছে। পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের সর্বত্র ইসলামের নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে।
প্রবন্ধকার আ.ফ.ম খালিদ হোসেন বলেন- নারী নির্যাতন বিগত এক বছরের জাতীয় দৈনিক খুললে যে খবরটি সবচেয়ে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও হতাশা তৈরি করে তা হলো ধর্ষণ ও বলাৎকারের বীভৎস ঘটনাপরম্পরা। দেশ যেন ধর্ষকদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। কোমলমতি শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না যৌন সহিংসতার হাত থেকে। এই প্রবণতার ধারাবাহিকতায় যুক্ত হয়েছে কয়েকটি বিভৎস চাঞ্চল্যকর ঘটনা। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ২৫ তারিখ সিলেটের এমসি কলেজ কম্পাউন্ডে নববধূকে গণধর্ষণের ঘটনা ভাইরাল হওয়া ভিডিও বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রশাসনযন্ত্রের অবস্থান ভুক্তভোগীদের পক্ষে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে থাকতে হবে। নচেৎ দেশের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করবে।
সভাপতির বক্তব্যে মাওলানা জিহাদী বলেন- নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ ও সকল ধরণের অনৈতিক কর্মকান্ড বন্ধ করতে মাদকমুক্ত সমাজ চাই। নারী উন্নয়ন নীতিমালা’১০ এর কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী ধারাসমূহ বাতিল করতে হবে। নারীর মর্যাদা এবং অধিকার সংরক্ষণে কুরআন-হাদীসের শিক্ষাসমূহ জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
শীর্ষ ইসলামী নেতৃবৃন্দ বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধের সমন্বিত কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ ও সকল ধরণের অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের বিকল্প নেই। নারী উন্নয়নের নামে নারী উন্নয়ন নীতিমালায় কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী সকল ধারা বাতিল করে নারীর মর্যাদা এবং অধিকার সংরক্ষণে কুরআন-হাদীসের শিক্ষাসমূহ জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের অনিবার্য দাবি। অপরাধী যেই হোক সকলের জন্য আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও অপরাধমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে দলমত নির্বিশেষে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা ঈমানী দাবি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ