রবিবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ৬ বছরে দেড় হাজার মানুষের মৃত্যু

নাছির উদ্দিন শোয়েব: পুলিশের হাতে নিহত ব্যক্তিদের পরিবার দীর্ঘ দিনেও বিচার পাচ্ছে না বলে অভিযোগ আছে। আটকের পর হেফাজতে বা বন্দুকযুদ্ধে নিহত ব্যক্তির স্বজনেরা অনেক সময় থানায় মামলাও করতে পারে না। পুলিশ মামলা নিতে চায় না। আদালতে মামলা করা হলেও বিচার পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানায়, গত ৬ বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে দেড় হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে মাত্র একটি মামলার বিচার হয়েছে।
সিলেটে পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনে রায়হান আহমদের মৃত্যুর ঘটনায় ১২ দিনেও অভিযুক্ত বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (বরখাস্ত) এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া গ্রেফতার হয়নি। সাময়িক বরখাস্তকৃত কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাসকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এর আগে এ ঘটনায় তিন পুলিশ সদস্য আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দিয়েছেন। পুলিশ হেফাজতে রায়হানের মৃত্যুর ঘটনার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে।
রায়হান হত্যার ঘটনার অগ্রভাগে থাকা বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া দেশ থেকে পালিয়েছে কিনা এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেনি তদন্ত সংস্থা। ঘটনার পর থেকে বরখাস্ত ও প্রত্যাহার হওয়া দুই এএসআই ও চার কনস্টেবল পুলিশের পাহারায় সিলেট পুলিশ লাইন্সে রয়েছেন। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবি আই) ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটনের জন্য ইতোমধ্যে কাষ্টঘর এলাকার সুইপার কলোনির সুলাই লালসহ দুই জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। আর মূল হোতা এসআই আকবরসহ জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবিতে উত্তাল রয়েছে সিলেট।
জানা গেছে, নগরীর বন্দরবাজার ফাঁড়ি ইনচার্জ আকবর হোসেনের নেতৃত্বে এ নির্যাতন চালানো হয়। ইতিমধ্যে সাত পুলিশ সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য মিলেছে। এ ঘটনায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি)। আকবরসহ ৪ পুলিশকে সাময়িক বরখাস্ত এবং ৩ জনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। রায়হানের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে এসএমপির উপকমিশনার (ডিসি-উত্তর) আজবাহার আলী শেখের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়।
গত ১০ অক্টোবর দিবাগত মধ্যরাতে রায়হানকে তুলে নিয়ে সিলেট মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি থানাধীন বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ করে তার পরিবার। সকালে তিনি মারা যান। নির্যাতন করার সময় তৌহিদ মিয়া নামে এক পুলিশ সদস্যের মোবাইল থেকে রায়হানের পরিবারের কাছে ফোন দিয়ে টাকা চাওয়া হয়। পরিবারের সদস্যরা সকালে ফাঁড়ি থেকে হাসপাতালে গিয়ে রায়হানের লাশ শনাক্ত করেন। ঘটনার শুরুতে ওই ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা ছিনতাইকারী সন্দেহে নগরের কাস্টঘর এলাকায় গণপিটুনিতে রায়হান নিহত হয়েছেন বলে প্রচার চালান।
বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী ২০১৪ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে প্রাণ গেছে ১ হাজার ৫৫৭ জনের। আর চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ সংখ্যা ছুঁয়েছে ২১৬ তে। আসকের জরিপে বলা হয়, এর মধ্যে বিচার হয়েছে মাত্র একটির। সম্প্রতি পুলিশি হেফাজতে সিলেটসহ বেশ কয়েকটি জেলায় মৃত্যুর ঘটনায় সমালোচনার ঝড় উঠে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তদন্তে অবহেলার কারণেই বারবার ঘটছে এমন ঘটনা। পুনরাবৃত্তি রুখতে দরকার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।
জানা গেছে, পুরান ঢাকার স্বর্ণের দোকানের কর্মচারী রাজিব কর পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন কোতোয়ালি থানার গোয়ালনগরে। অভিযোগ, ২০১৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে তাকে বাসা থেকে তুলে নেয় কোতোয়ালি থানা পুলিশের তিনজন কর্মকর্তা। সঙ্গে নিয়ে যায় ঘরে থাকা ২৮ ভরি স্বর্ণ আর নগদ প্রায় আড়াই লাখ টাকা। জমি বিক্রি করে নিজেই ব্যবসা করার জন্য এই স্বর্ণ কিনেছিল রাজিব। রাজিব করের দাবি কোনো অভিযোগ ছাড়াই তাকে তুলে নেয় তৎকালীন কোতোয়ালি থানার এসআই জলিল, মিজান আর এএসআই ফরিদ ভূইয়া। থানায় নিয়ে চলে অমানুসিক অ শারীরিক নির্যাতন। রাজিব গণমাধ্যমকে বলেন, তারা এমনভাবে নির্যাতন করে যে, আমার হাতের নখও তুলে দেন। আমি তাদের কাছে জানতে চাই, আমার অপরাধ কী?  যদি অপরাধ করে থাকি তাহলে আমাকে কোর্টে চালান করে দেন। ভুক্তভোগী জানান, গত প্রায় দুই বছরে পুলিশের সদর দফতর ডিএমপিসহ কয়েক জায়গায় অভিযোগ করেও মেলেনি প্রতিকার। নির্যাতনের ফলে কর্মক্ষমতাও হারিয়েছেন তিনি। এ বিষয়ে অভিযুক্ত এসআই জলিলের সঙ্গে একটি গণমাধ্যম থেকে যোগাযোগ করা হলে অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
এদিকে ২০১৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনে ইরানি ক্যাম্পে বিল্লাল নামে এক ব্যক্তির গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান থেকে জনি নামে এক যুবকককে তুলে নিয়ে থানায় হেফাজতে হত্যার অভিযোগ ওঠে। সাড়ে ছয় বছর আগে থানায় নিয়ে গাড়িচালক ইশতিয়াক হোসেন জনিকে পিটিয়ে হত্যা মামলাটির রায়ে হয় গত ১০ সেপ্টেম্বর। রায়ে পল্লবী থানার তিন পুলিশ সদস্যকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত। রায়ে বলা হয়েছে, পল্লবী থানার এসআই জাহিদুর রহমান খান, এএসআই রাশেদুল ইসলাম, এএসআই কামরুজ্জামান মিন্টুকে যাবজ্জীবন সাজা খাটার পাশাপাশি এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দিতে হবে, যা দিতে না পারলে আরো ছয় মাস জেল খাটতে হবে তাদের। অর্থদণ্ড ছাড়াও নিহতের পরিবারকে দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে আসামিদের প্রত্যেককে। ক্ষতিপূরণের এই টাকা আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে পরিবারকে দিতে হবে এবং ক্ষতিপূরণ না দিলে আপিল করা যাবে না। ঢাকার মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েস আলোচিত এ মামলায় রায় ঘোষণা করেন। এ মামলার বাকি দুই আসামি পুলিশের ‘সোর্স’ রাসেল ও সুমনকে সাত বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। বিচারক বলেছেন, ২০১৩ সালের নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে কোনো মামলায় দেশে এটাই প্রথম রায়। আর তিন পুলিশ সদস্যকে যে শাস্তি দেয়া হয়েছে, এ আইনে সেটাই সর্বোচ্চ সাজা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ