রবিবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকারের কোনো কর্মকৌশলই কাজে আসছে না

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান: গত ছয় মাসে খেলাপি ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ১২ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রতি বছরই বেঁধে দেওয়া হয় খেলাপি ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা। আর প্রতি বছরই এ লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয় ব্যাংক। ২০১৩ সাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত কোনো বছরই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ঋণখেলাপিদের থেকে অর্থ আদায়ের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। আবার চলতি বছরে বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে খেলাপি ঋণ আদায়ে প্রায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক। ঋণখেলাপিদের কাছে এক প্রকার জিম্মি হয়ে পড়েছে ব্যাংকিং খাত। এখন পর্যন্ত খেলাপি ঋণ আদায়ে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তার কোনোটিই কাজ দেয়নি। বরং খেলাপিদের নানাভাবে উৎসাহিত করা হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা।
জানা যায়, ঋণ নিতে হলে গ্রহীতাকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রথমেই সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে একটি অ্যাকাউন্ট (হিসাব) খুলতে হয়। এরপর জামানত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) ছাড়পত্র এবং গ্রাহকের ব্যবসার অস্তিত্ব, ধরন ও ঋণপ্রাপ্তির যোগ্যতা যাচাই করা হয়। ঋণপ্রস্তাব যথাযথ হলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ঋণ অনুমোদনের জন্য পরিচালনা পর্ষদের কাছে সুপারিশ করেন। পর্ষদ সভায় এটি যাচাই করা হয়। সব প্রক্রিয়া শেষ করে একজন গ্রাহকের ঋণ পেতে কয়েক মাস সময় লেগে যায়। এত নিয়মের পরও ঋণ কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন ব্যাংকে বেশ কয়েকটি ঋণ অনুমোদনে বিস্ময়করভাবে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে। দ্রুত ঋণ হস্তান্তরের অবিশ্বাস্য ঘটনাও ঘটেছে। এরপর ঋণের সেই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তেই বেরিয়ে এসেছে বেসিক ব্যাংকের তথ্য-প্রমাণ। দুদকের তদন্তেও তা উঠে এসেছে। এরপর হলমার্ক কেলেংকারিসহ আরও অনেক কোম্পানির জাল-জালিয়াতির বিস্ময়কর প্রমাণ পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও দুদক। সে হিসেবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়ার কথা। কিন্তু সে ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্প্রতি প্রকাশিত পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে খেলাপি ঋণ আদায়ে প্রায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক। এ সময়ের মধ্যে দুটি ব্যাংক আদায় করেছে ১ দশমিক ৯৪ এবং ৩ দশমিক ২৮ শতাংশ ঋণ। অপর দুই ব্যাংকের অর্জন মাত্র শূন্য দশমিক ২৪ এবং শূন্য দশমিক ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি ব্যাংকগুলো।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপিদের তালিকায় রয়েছে দেশের বড় বড় শিল্প গ্রুপ। তাদের মধ্যে মেসার্স টিঅ্যান্ড ব্রাদার্স গ্রুপ, মেসার্স হলমার্ক গ্রুপ, মডার্ন স্টিল মিলস লিমিটেড, মেসার্স ফেয়ার ট্রেড ফেব্রিক্স লিমিটেড, মেসার্স রহিম গ্রুপ, এননটেক্স গ্রুপ, ক্রিসেন্ট গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, থার্মেক্স গ্রুপ ও মুন গ্রুপ অন্যতম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংককে ২০২০ সালে শীর্ষ ২০ খেলাপি থেকে ২৫০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু ছয় মাসে আদায় হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা; যা বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১ দশমিক ৯৪ শতাংশ। তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ব্যাংকটির মোট খেলাপির ৯০ শতাংশই মন্দমানের খেলাপি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ছয় মাসে মাত্র শূন্য দশমিক ২৪ শতাংশ খেলাপি ঋণ আদায় করতে পেরেছে জনতা ব্যাংক। বছরব্যাপী শীর্ষ ২০ খেলাপি থেকে এক হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও প্রথম ছয় মাসে মাত্র দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা আদায় করেছে ব্যাংকটি। আর ২০০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা আদায় হয়েছে অগ্রণী ব্যাংকের; যা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৩ দশমিক ২৮ শতাংশ। বছরব্যাপী রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩৫০ কোটি টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র ১ কোটি ৬৩ লাখ; যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার শূন্য দশমিক ৪৭ শতাংশ।
২০২০ সালের মধ্যে সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের খেলাপি কমানোর লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে ২৫ শতাংশ। সে অনুযায়ী, প্রথম ছয় মাসে অন্তত সাড়ে ১২ শতাংশ খেলাপি কমানোর কথা ছিল ব্যাংকগুলোর। কিন্তু সেই লক্ষ্য কোনো ব্যাংকই অর্জন করতে পারেনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছরের শুরু থেকেই সব গ্রাহককে খেলাপির খাতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিশেষ সুবিধায় পুনঃতফসিল করা হচ্ছে খেলাপি ঋণ। এতে করে এমনিতেই ব্যাংকগুলোর খেলাপির পরিমাণ কমে আসছে। তারপরও খেলাপি ঋণ কমানোর লক্ষ্য পূরণ করতে পারছে না কোনো ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ জানান, শীর্ষ ৮০ ঋণখেলাপির কাছে রীতিমতো জিম্মি হয়ে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক। খেলাপি ঋণ আদায়ে এই শীর্ষ খেলাপিদের বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করা উচিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকিং খাতে নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেই ঝুঁকি তৈরি করছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ঋণ পুনঃতফসিল, ঋণ অবলোপন ইত্যাদির মাধ্যমে ঋণখেলাপির দায় থেকে মুক্ত থেকেছেন। কিন্তু এর মাধ্যমে খেলাপি ঋণ সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান আসেনি, বরং তা ঋণ আদায় প্রক্রিয়াকে আরও প্রলম্বিত করেছে। তাই খেলাপি ঋণ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। ঋণখেলাপিরা যত বড় প্রভাবশালীই হোন, তাদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, বড় গ্রাহকের অনুকূলে ৩ হাজার ১৮০ কোটি টাকার ‘ফোর্সড লোন’ তৈরি করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক। উল্লেখ্য, ব্যাংকে আগের ঋণ পরিশোধে গ্রাহকের নামে নতুন ঋণ সৃষ্টি করাকে ‘ফোর্সড লোন’ বলা হয়। বৈদেশিক বাণিজ্যে আমদানি-রফতানি উভয় ক্ষেত্রে ফোর্সড লোনের ব্যবহার রয়েছে। অধিকাংশ ফোর্সড লোনে অনিয়ম হয়। গ্রাহক খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে টাকা আদায়ের সুযোগ থাকে না। এক পর্যায়ে এসব ফোর্সড লোন খেলাপিতে পরিণত হয়। পরে ঋণ অবলোপন করে মূল হিসাব থেকে তা সরিয়ে নেয়া হয়।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নানা অনিয়মের কারণে বৈদেশিক বাণিজ্য থেকে ছিটকে পড়ছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। সংস্থাটি বলছে, একসময় দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য (আমদানি-রপ্তানি) সেবা প্রদানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকই ছিল চালকের আসনে। কিন্তু ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতায় এ স্থান দখলে নিয়েছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। ২০১৮ সালে দেশের মোট রপ্তানির মাত্র ৭ শতাংশ হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মাধ্যমে। বছরটিতে রপ্তানি বাণিজ্যের ৭৪ শতাংশই সম্পন্ন হয়েছে বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এখনও আমাদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের তিন-চতুর্থাংশই সম্পন্ন হচ্ছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে।
দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছিলেন, ‘ব্যাংকের টাকা জনগণের টাকা, এ টাকা নিলে ফেরত দিতে হবে। দেশের জনগণের টাকা বেহাত হোক বা ফেরত না আসুক, এটি চাইতে পারি না। সরকারি বা বেসরকারি যে ব্যাংক থেকেই ঋণ নেয়া হোক না কেন, ঋণের অর্থ ফেরত দিতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এর কোনো প্রভাব নেই।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, প্রতি বছরই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি বার্ষিক চুক্তি হয়। সামনাসামনি বৈঠকে নির্ধারণ করে দেওয়া হয় আসন্ন বছরের কর্মপরিকল্পনা। আমানত সংগ্রহ, ঋণ বিতরণ, খেলাপি ঋণ হ্রাস, লোকসানি শাখা কমানো, শীর্ষ ২০ খেলাপি থেকে আদায়, ঋণ পুনঃতফসিলসহ বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু ব্যাংকগুলো তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে কি না- বছর শেষে সে বিষয়ে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয় না। প্রতিবছরই ব্যাংকগুলো ব্যর্থ হয় আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন করে লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়। এভাবেই চলছে। শীর্ষ ঋণখেলাপিদের কাছে ব্যাংকগুলো কিছুটা জিম্মিও বলা যায়। আবার ব্যাংকের ভেতরে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের লোক আছেন। এসব লোক খেলাপিদের পক্ষ নিয়ে কাজ করেন। তাই খেলাপিরা বাইরে থেকে দাপট দেখান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ