সোমবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

ইয়া নবী সালাম আলাইকা ইয়া রাসুল সালাম আলাইকা

মিয়া হোসেন : মানবতার মুুক্তির দিশারী মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অতুলনীয়, অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। দুনিয়া জুড়ে মানুষ আজ নৈতিক অধঃপতনের অতল গহব্বরে নিমজ্জিত। যৌন বিকৃতি, সমকামিতা, ড্রাগ, এলকোহল, পরিবার ব্যবস্থায় ধস, শ্রেণী বৈষম্যসহ নানা রকম অবক্ষয়ের করাল গ্রাসে পতিত গোটা মানব জাতি। এই অধঃপতন থেকে মানব জাতির পরিত্রাণের একমাত্র পথ হচ্ছে রাসূল (সা.) এর আনীত জীবন বিধানের দিকে ফিরে আসা। হযরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন অসাধারন বিনয়ী, পরোপকারী, সদালাপী ইত্যাদি সকল প্রকার মহৎ গুণে গুণান্বিত অনুপম চরিত্রের অধিকারী। শৈশবকাল থেকে মহানবী (সা.) এর জীবনে এক দুর্লভ ব্যক্তিত্বের চিহ্ন পরিস্ফুটিত হয়। মহানবী (সা.) ছিলেন অত্যন্ত দয়ার্দ্য হৃদয় ও ন্যায় পরায়ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। বুখারী শরিফে হযরত আনাস (রা.)  বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বীর বাহাদুর। অতএব ঝঞ্জা বিক্ষুব্ধ এই সমাজে রাসূলের আদর্শ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল অশান্তির দাবানল থেকে মুক্তি লাভ সম্ভব। কাফেররাও তার আদর্শের কাছে মাথানত করেছিল। তারা জানতো মহানবী (সা.) এর নেতৃত্বের কারনে তাদের নেতৃত্ব ধুলোয় মিশে যাবে। তাই তারা সর্ব শক্তি দিয়ে রাসূল (সা.) এর বিরোধিতা করেছিল। পরিণামে তাদের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটেছিল। রাসূল (সা.) এর চরিত্র মাহত্নের অত্যুজ্জল আলোকমালায় উদ্ভাসিত হয়েছিল আরব বিশ্ব তথা সারাজাহান। নব্য জাহেলিয়াতের ঘন ঘোর অন্ধকার দ্রবীভূত করে প্রভাত সূর্যের সোনালী কিরণের সুষমা ছড়াতে। তাই মহানবীর নৈতিক শিক্ষার বিকল্প নেই।
মুহাম্মদ (সা.) দানশীলতা, উদারতা ও বদান্যতায় ছিলেন সর্বোচ্চ উদাহরণ। জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রা.)  থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট কিছু চাওয়া হলে তিনি না বলতেন না। আনাছ বিন মালেক (রা.)  বলেন, রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট কিছু চাওয়া হলে তিনি দিয়ে দিতেন। এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট চাইল, তিনি তাকে দুই পাল ছাগলের মধ্য থেকে এক পাল দিয়ে দিলেন, সে লোক নিজ গোত্রে এসে বলল, হে গোত্রের লোকেরা! তোমরা মুসলমান হয়ে যাও, কেননা “মোহাম্মদ এমন ব্যক্তির ন্যায় দান করে যে দারিদ্রের ভয় করে না”। (মুসলিম-৪২৭৫)
রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বদান্যতার ব্যাপারে আব্বাস (রা.)  এর উক্তিই যথেষ্ট। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মানুষের মাঝে অধিকতর দানশীল। তিনি রমজান মাসে অধিক দান করতেন-যখন জিবরাইল তাঁর নিকট ওহি নিয়ে আসতেন, তাঁকে কোরআন শিক্ষা দিতেন। নিঃসন্দেহে রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুক্ত বায়ুর চেয়ে অধিক দানশীল ছিলেন। (মুক্ত বায়ুর তুলনায় রাসূলের দানশীলতা অধিক-এ তুলনার মর্মার্থ হচ্ছে, বায়ু মুক্ত হলেও তার যেমন কিছু কিছু দুর্বলতা থাকে-যেমন সে পৌঁছতে পারে না আবদ্ধ ঘরে-রাসূলের দানশীলতার তেমন কোন প্রতিবন্ধকতা নেই। তার দানশীলতা  পৌছেঁ যেত সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে।) ( বুখারী-৩২৯০)
সহনশীলতায় ও ক্রোধ সংবরণে রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সবোর্চ্চ আদর্শ। কখনো তাঁর পক্ষ হতে মন্দ কথন ও কর্ম প্রকাশ পায়নি, নির্যাতন-অবিচারের শিকার হলেও কখনো প্রতিশোধ নেননি। কখনো কাউকে প্রহার করেননি। আয়েশা (রা.)  বলেন, রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে-আল্লাহর নিষিদ্ধ সীমা-রেখা লংঘন না হলে-কখনো নিজের প্রতি জুলুম-নির্যাতনের কোন প্রতিশোধ নিতে আমি দেখিনি। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা ব্যতীত তিনি কখনো কোন কিছুকে স্বীয় হস্ত দ্বারা প্রহার করেননি। এবং তিনি কখনো কোন সেবক বা স্ত্রী কে প্রহার করেননি। (মুসলিম-৪২৯৬)
রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সহনশীলতার সমর্থনে কয়েকটি ঘটনা নিম্নে উল্লেখ করা হলো, উহুদ যুদ্ধে রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মুখন্ডল আঘাত প্রাপ্ত হল, কয়েকটি দাঁত ভেঙে গেল, মাথায় পরিধেয় শিরস্তাণ খন্ড-বিখন্ড হল, তারপরেও তিনি কোরাইশদের বিরুদ্ধে বদ-দোআ করেননি। বরং তিনি বলেছেন, হে আল্লাহ! আমার জাতিকে ক্ষমা কর, কেননা তারা জানে না। (মুসলিম-৩২১৮)
জনৈক বেদুইন রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চাদর শক্তভাবে টান দিলে তাঁর গলায় দাগ হয়ে গেল। তিনি বললেন, আল্লাহর যে সব মাল তোমার কাছে আছে আমার এই দু উটের উপর আমার জন্য তা তুলে দাও। কেননা তুমি আমার জন্য তোমার সম্পদ ও  তোমার পিতা-মাতার সম্পদ তুলে দেবে না। রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথে আচরণে সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, তিনি শুধু বললেন, সম্পদ হচ্ছে আল্লাহর, আমি তাঁর বান্দা। হে বেদুইন ! তোমার কাছ থেকে আমার সাথে কৃত অনাচারের কেসাস নেয়া হবে। বেদুইন বলল: না, নবিজী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : কেন? সে বলল, কেননা, তুমি তো খারাপের প্রতিশোধ খারাপ দিয়ে নাও না। একথা শুনে রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসলেন, এবং এক উটের উপর গম অন্য উটের উপর খেজুর বহন করে দেয়ার আদেশ প্রদান করলেন। (আবু দাউদ-৪১৪৫)
প্রতিশোধ নেয়ার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সীমালংঘন কারীকে মার্জনা করা একটি উদারণ ও মহৎগুণ। রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিম্নোক্ত আল্লাহর আদেশ মান্য করত: এ-গুণে সর্বাপেক্ষা গুণানি¡ত ছিলেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, তুমি ক্ষমাপরায়ণতা অবলম্বন কর, সৎ কর্মের আদেশ দাও অজ্ঞদেরকে এড়িয়ে চলো। (সুরা আরাফ: ১১৯)
রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক ক্ষমা প্রদর্শনের অনেক ঘটনাবলির বিবরণ বিশুদ্ধ সূত্রে বণিত আছে। তিনি যখন মক্কা বিজয় করলেন, কোরাইশের বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিবর্গকে তাঁর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় নতশীরে উপবিষ্ট পেলেন। তিনি তাদেরকে বললেন : হে কোরাইশগণ ! তোমাদের সাথে এখন আমার আচরণের ধরন সম্পর্কে তোমাদের ধারণা কি ? তারা বলল : আপনি উদার মনস্ক ভাই ও উদার মনস্ক ভাইয়ের ছেলে। রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যাও, তোমরা মুক্ত। তিনি তাঁর ও সাহাবায়ে কেরামের বিরুদ্ধে ঘটানো সমস্ত অপরাধসমূহ ক্ষমা করে দিলেন।
রাসূলকে হত্যার উদ্দেশ্যে এক লোক আসল, কিন্তু তা ফাঁস হয়ে গেল। সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল ! এই লোক আপনাকে হত্যা করার মনস্থ করেছে, এ-কথা শুনে লোকটি ভীত হয়ে অস্থির হয়ে পড়ল। রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ভয় করো না, ভয় করো না, যদিও তুমি আমাকে হত্যা করার ইচ্ছা করেছ কিন্তু তুমি আমাকে হত্যা করতে পারবে না।
কেননা আল্লাহ তাআলা তাঁকে অবহিত করেছেন যে, তিনি তাঁকে মানুষের কাছ থেকে রক্ষা করবেন। রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ক্ষমা করে দিলেন-অথচ সে তাঁকে হত্যা করার মনস্থ করেছিল।
সাহসিকতা, নির্ভীকতা, যথা-সময়ে উদ্যাগ গ্রহণ রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিশেষ গুণ ছিল। তাঁর সাহিসকতা বড় বড় বীরদের নিকট অবিসংবাদিতভাবে স¡ীকৃত। আলি ইবনে আবুতালিব (র:) বলতেন, যুদ্ধ যখন প্রচ- রূপ নিত, প্রবলভাবে ক্রোধানি¡ত হওয়ার ফলে চোখ রক্তিম বর্ণ ধারণ করত তখন আমরা (তীর-তরবারির আঘাত থেকে বাঁচার জন্য) রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রক্ষা-কবচ হিসেবে গ্রহণ করতাম। ইমরান ইবনে হাছিন (র:) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন বাহিনীর মুখোমুখী হলে প্রথম আঘাতকারী হতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহসিকতার একটি নমুনা নীচে উল্লেখ করা হল।
এক রাত্রে মদিনার এক প্রান্তে কারো চিৎকারের আওয়ায শোনা গেল। কিছু মানুষ আওয়াজের দিকে অগ্রসর হলো, কিন্তু দেখা গেল রাসূলুল্লাহ (সা.) একাই আওয়াজের উৎসস্থলে তাদের আগে গিয়ে  পৌছঁলেন। বরঞ্চ তিনি যখন অবস্থা দেখে ফিরছিলেন তখন তাদের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হলো। তিনি ছিলেন আবু তালহার অসজ্জিত ঘোড়ার উপরে। তরবারি ছিল তাঁর স্কন্ধে। আবু তালহা বলতে লাগলেন,  রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বাপেক্ষা সুন্দর, সর্বাপেক্ষা দানশীল, সর্বাপেক্ষা সাহসী। (বুখারী-২৬০৮)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ