মঙ্গলবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২
Online Edition

সংস্কারের অভাবে খুলনার শত বছরের পুরানো বনরানী ও বনকন্যা জাহাজ দু’টি এখন অচল

খুলনা অফিস : ১১২ বছরের বনরানী ও ১১৮ বছরের বনকন্যার সচল করতে শিপইয়ার্ডের কাছ থেকে ব্যয় প্রাক্কলন করে সংস্কারের প্রস্তাব ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল। এরপর আর অগ্রগতি হয়নি।  মূল কাঠামো ধরে জাহাজ দু’টি সংস্কার বা পুননির্মাণ করা গেলে নতুন প্রজন্ম একটি ইতিহাসের সাক্ষী হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বনরানীর চেয়েও করুণ অবস্থা ‘বনকন্যা’র। কন্যার বয়স ৬ বছর বেশি। ১৯০২ সালে ওই খিদিরপুরেই তৈরি হয়েছিল ‘বনকন্যা’। এটি বিকল অবস্থায় পড়ে আছে ২০১১ সাল থেকে। বনরানীর ইঞ্জিন দু’টি সচল থাকলেও বনকন্যার সবকিছুই অচল। ১৯০৮ সালে কলকাতার খিদিরপুর ডকইয়ার্ডে তৈরি হয়েছিল ‘বনরানী’। ১১২ বছরের জীবনকালে এই জলযানে ভ্রমণ করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী, বৃটেনের প্রিন্স, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতসহ অসংখ্য গুণীমানুষ। ওই সময়কার সবচেয়ে বিলাশবহুল জলযানটি এখন অবহেলায় পড়ে আছে খুলনা মহানগরীর ফরেস্টঘাটে। সংস্কারের অভাবে এর বিভিন্ন অংশ ক্ষয়ে যাছে।
বনবিভাগ থেকে জানা গেছে, জলযান দু’টি সচল করতে খুলনা শিপইয়ার্ড থেকে ব্যয় প্রাক্কলন চেয়েছিল বনবিভাগ। দু’টি জাহাজ সংস্কারের জন্য সাড়ে ৩ কোটি টাকা করে ৭ কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে জানিয়েছিল শিপইয়ার্ড। এই প্রস্তাব ঢাকায় পাঠানো হয় ২০১৮ সালে। তারপর আর গতি হয়নি। অবহেলায় পড়ে আছে বহু ইতিহাসের দুই সাক্ষী।
ফরেস্টঘাটে ঘুরে দেখা হলো শতবছরের পুরাতন দুই যান। বনরানীতে গিয়ে দেখা গেছে, লোহার তৈরি পাটাতনে মরচে ধরে নষ্ট হয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে ছাদের সিলিং খুলে পড়ছে। শতবছর পরেও সেগুন কাঠের তৈরি জানালা, ফার্নিচার এখনও অক্ষত।
লঞ্চের কেবিনের ভেতরে গিয়ে দেখা গেছে, বিছানা, তোষক ও লেপ ইঁদুরে কেটে নষ্ট করে ফেলেছে। তবে পিতলের তৈরি লাইট, সুইচসহ বিভিন্ন ফিটিং এখনও আগের মতোই রয়েছে। বৃটিশ আমলে ব্যবহার করা তৈজসপত্রে লেগে আছে ঐতিহ্যের ছোঁয়া ।
বনরানীর লকবই ও পুরাতন কিছু কাগজ ঘেটে দেখা গেল, ১৯০৮ সালে তৈরির সময় এর নাম ছিলো ‘ হেরিয়ার’। এটি নির্মাণে তৎকালীন ৫২ হাজার ৯৪৭ টাকা ব্যয় হয়েছিলো। সেই সময় স্টিম ইঞ্জিন চালিত লঞ্চটির ক্ষমতা ছিলো ৩৫৪ অশ্বশক্তি বিশিষ্ট। ১৯৬২ সালে স্টিম ইঞ্জিনের পরিবর্তে দু’টি ডয়েটস ডিজেল ইঞ্জিন এবং ২০০৪ সালে পাল্টে দু’টি দাইও ইঞ্জিন স্থাপন করা হয়। এর প্রতিটি ইঞ্জিন ২০০ অশ্বশক্তি সম্পন্ন। স্বাধীনতার পর হেরিয়ারের পরিবর্তে লঞ্চটির নাম দেওয়া হয় এম এল বনরানী।
বনরানীর লস্কর মো. হারুন মোল্লা ও মাস্টার আবু জাফর জানান, ২০১৬ সালে শেষ চালানো হয়েছিল। এরপর খারাপ হতে থাকলে আর মেরামত করা হয়নি। বর্তমানে ইঞ্জিন ছাড়া সবকিছুই অচল। লঞ্চের সম্পূর্ণ অবকাঠামো পরিবর্তনের বিকল্প নেই। এই লঞ্চে এমন অনেক কিছু আছে-যা’ দেশের অন্য কোনো লঞ্চের নেই। সবকিছুতেই একটি রাজকীয় ভাব রয়েছে।
বনকন্যার মাস্টার সদর উদ্দিন জানান, ২০১১ সাল থেকে ঘাটে পড়ে আছে। পরের কিছুদিন ইঞ্জিন ভালো ছিলো। এখন সবকিছুই নষ্ট।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের সদ্য বিদায়ী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বশির আল মামুন বলেন, শিপইয়ার্ডের কাছ থেকে ব্যয় প্রাক্কলন করে সংস্কারের প্রস্তাব ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল। এরপর আর অগ্রগতি হয়নি। তিনি বলেন, ১০০ বছরের পুরাতন যে কোনো স্থাপনারই প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য আছে। বনরানীর বয়স ১১২ বছর, বনকন্যার ১১৮ বছর। মূল কাঠামো ধরে জাহাজ দু’টি সংস্কার বা পুননির্মাণ করা গেলে নতুন প্রজন্ম একটি ইতিহাসের সাক্ষী হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ