সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

রোগের টিকা আবিষ্কারের ইতিকথা

এইচ এম আব্দুর রহিম : পৃথিবীর শুরু থেকে হিংসা, সংঘাত ও যুদ্ধের কবলে পড়ে মানুষের হাতে মানুষ মরেছে অসংখ্য। মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ায় আয়োজন সে তুলনায় নিরাপদ পৃথিবী গড়ার চেষ্টা খুব অল্প। অন্যকে ঘায়েল, জবর- দখল ও সাম্রাজ্য বিস্তারের খায়েশে আধুনিক বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে নানা রকম মারণাস্ত্র তৈরীর চেষ্টা শেষ নেই। বলা যায় ‘অস্ত্র শিল্প’বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও লাভজনক ব্যবসা। সে তুলনায় মানুষ বাঁচাবার উদ্যোগ কই। আদিকাল থেকে মহামারি আর মড়কে যে কোটি কোটি মানুষ মারা যাচ্ছে তা ঠেকাতে পারছে না বিজ্ঞান। আল্লাহর ইচ্ছায় মাত্র দুটি রোগ পৃথিবী থেকে বিদায় দেওয়া গেছে। টিকার ইতিহাস মাত্র আড়াইশ বছরের। সেই টিকা নিয়ে চলছে নানা রাজনীতি। দেহে এন্টিবড়ি তৈরি করে ইমিউনিটি বা রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে যে জৈব-রাসায়নিক মিশ্রণ  তাকে ভ্যাকসিন বা টিকা বলে।
এ প্রতিষেধক জৈব পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়। কোনো সংক্রামক ব্যাধির জীবাণু (ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া)দেহে প্রবেশ করলে শরীরের প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তাকে এন্টিজেন বা বহিরাগত হিসেবে চি‎িহ্নত করে। এই এন্টিজেনকে ধ্বংস করার জন্য রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ‘ইমিউন সিস্টেম’এ্যন্টিবডি তৈরী করা শুরু করে। এ্যন্টিবডি জীবাণুকে ধ্বংস করতে সাহায্য করে। ইতিহাস মারফত জানা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব ৪২৯ অব্দে স্পার্টানদের সঙ্গে গ্রিকদের যুদ্ধের সময় এথেন্সে একটি মহামারি ছড়িয়ে পড়ে। অনেকের ধারণা এটি ছিল প্লেগ মহামারি। এ মহামারিতে বহু সৈন্য ও সাধারণ মানুষ আক্রান্ত হয় এবং মারা যায়। জীবাণু ধ্বংসের এই পদ্ধতি ধীরগতির হয় বলে আক্রান্ত দেহ কে সাধারণ অবস্থায় জীবানুর কাছে হার মানতে হয়। হার না মেনে দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বিপুল পরিমাণ এন্টিবডি তৈরি করার সুযোগ পেলে জীবাণু কে হারিয়ে দেহকে সুস্থ্য করে তুলতে সক্ষম  হয়। এমন কি দ্বিতীয় বার আক্রান্ত হলে ভয় থাকে না। এন্টিজন কে ধ্বংস করার পূর্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে জীবাণুর হাত থেকে আক্রান্ত দেহ কে রক্ষা করতে পারে। ফলে জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়ে উতরে যেতে পারলে কোন ভয় নেই। কিন্তু সেই উতরে যাওয়া সম্ভব হয় না বলে মহামারিতে কোটি কোটি প্রাণ চলে যায়। এই ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত আল্লাহর ইচ্ছায় রক্ষা কবচ হিসাবে টিকিয়ে রাখছে ভ্যাকসিন বা টিকা। টিকা দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কে শিখিয়ে দেয় কিভাবে দ্রুত র্নিদিষ্ট জীবাণু টিকে ধ্বংস করতে হয়। এতে অসুস্থ হতে হয় না। ফলে দেহে সংক্রামক ঢোকার আগে থেকেই রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রস্তÍত হয়ে থাকে লড়াই করার জন্য। পৃথিবীতে বর্তমানে দুই ডজনের বেশী রোগের টিকা চালু রয়েছে। নানা রোগের প্রতিষেধক হিসাবে এসব টিকা ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে জাতি সংঘের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী। বিশ্বে টিকা বানাতে ১৭৩ টি উদ্যোগ চলছে। ১৪০টি টিকার এখনো মানব দেহে পরীক্ষা শুরু হয়নি। একে বলা হয় প্রিক্লিনিকাল ট্রায়াল। বিজ্ঞানিরা এসব টিকা নিয়ে গবেষণা করছেন। পশু বা প্রাণীর ওপর প্রয়োগ করে কার্যকারিতা যাচাই করছেন। বর্তমানে পৃথিবীতে দুই ডজনের মত ঠিকা আছে । নানা রোগের প্রতিষেধক হিসাবে এসব টিকা ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু টিকার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত দুটি রোগ কে নির্মৃূল করা সম্ভব হয়েছে। গুটি বসন্ত ও গবাদি পশুর বিশেষ রোগ রাইন্ডারপেস্ট থেকে পৃথিবীমুক্ত বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষণা দিয়েছে। সংস্থাটির তথ্য মতে,টিকা দানের মাধ্যমে প্রতি বছর অন্তত ২০ থেকে ৩০লাখ শিশুর প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। মাত্র দুটি রোগকে নির্মূল করা গেলেও কয়েক ডজন রোগ দূরীকরণ ও নিয়ন্ত্রণে অসামান্য অবদান রাখছে টিকা। অন্তত দশ বছর বিশ্বের কোথাও একটি রোগের দেখা পাওয়া না গেলেও সেটা র্নিমূল হয়েছে বলে ধরা হয়। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট রোগটির জীবাণুর আধার(রির্জাভার) একমাত্র গবেষণা কাজে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত থাকা ছাড়া এর অস্তিত্ব পৃথিবীর কোথাও থাকতে পারবে না। আবার বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থার ছয়টি মগাদেশীয় অঞ্চলের চারটিতে ১০ বছর যাবৎ কোন রোগে আক্রান্ত না হলে রোগটি “দুর হয়েছে” ধরা হয়। বিশ্বের এক অঞ্চলে এ রোগের অস্তিত্ব না থাকলে ও অন্য অঞ্চলে থাকতে পারে। অন্য দিকে টিকার মাধ্যমে একটি রোগ কে কোন অঞ্চল থেকে নির্মূল দুর করা সম্ভব না হলে যদিও আল্লাহর ইচ্ছায় প্রতিরোধ করা করা সম্ভব হয় তবে তাকে পরিভাষায় বলে ‘নিয়ন্ত্রণ’করা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এ সংজ্ঞা অনুযায়ী টিকা প্রয়োগ করে প্রতি বছর ৬০ লাখ মৃত্যু ঠেকানো হচ্ছে।
টিকার আগের অধ্যায় : টিকা আবিষ্কারের আগের অধ্যায়টি ছিল ভয়ঙ্কর। রোগের প্রতি অবৈজ্ঞানিক ধ্যান ধারণা মানুষ কে আরো অসহায় করে তুলে ছিল। ঐতিহাসিক সুত্র বলে,মহামারি নিয়ে মানুষের মনে নানা কুসংস্কার কাজ করত। অনেক অঞ্চলে রোগের জন্য নারীদের দায়ী করা হত। মনে করা হত নারীরা অপায়া। খারাপাত্মা তাদের উপর ভর করে মড়ক ছড়িয়ে দেয়।এ বিশ্বাসের কারণে বহু নারীকে নিগ্রহের শিকার হতে হয়েছে। কোথাও কোথাও দাবী করা হয়েছে অবিশ্বাসী দেব-দেবীদের ফল।তাদের সন্তষ্ট করার জন্য মড়ক চলা অবস্থায় ও দেব-দেবীদের পূজা অর্চনা করত মানব ইতিহাস মারফতে জানা যায়,খ্রীষ্টপূর্ব ৪২৯ অব্দে স্পাটানদের সঙ্গে গ্রিকদের যুদ্ধের সময় এথেন্সে একটি মহামারি ছড়িয়ে পড়ে। অনেকের ধারণা এটা ছিল প্লেগ মহামারি।এ মহা মারিতে বহু সৈন্য সাধারণ মানুষ আক্রান্ত হয় এবং মারা যায়।ঐতিহাসিক থুসিতাস এ মহামারির চাক্ষুস সাক্ষী। তিনি একটি বিষয় লক্ষ্য করেন। একবার যে ব্যক্তি মহামারিতে আক্রান্ত হচ্ছে বেঁচে থাকলে তিনি আর এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে না। তখন আবিষ্কার করা না গেলেও আধুনিক টিকা মূলত এ চিন্তা থেকেই আবিস্কিত হয়েছে। আস্তে আস্তে চিকিৎসকরা ধারণা দিতে থাকেন মহামারি থেকে বাঁচতে কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। আক্রান্তদের আলাদা করে রাখতে হবে। অবশ্য আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টিনের ধারণা ১৪০০ সালের দিককার। এর আগে ১০০০ সালের দিকে চীনে ভাইরিওলেশনের ধারণা আবিষ্কত হয়। এটিকে টিকার আদি রুপ বলা যায়।
গুটি বসন্ত ও এডওর্য়াড জেনারের প্রথম টিকা আবিষ্কার : বৃটিশ চিকিৎসক এডওয়ার্ড জেনারকে আধুনিক টিকার প্রথম  আবিষ্কারক ধরা হয়। ১৭৯৬সালে তিনিই প্রথম গুটি বসন্তের কার্যকর  টিকা আবিষ্কার করেন। এ জন্য তাকে ‘ফাদার অব ইমিউনোলজি’ বলা হয়। তরুণ এই চিকিৎসক পড়া শুনা শেষ করে একনিষ্ঠ গবেষণা ও অবহেলিত জনপদের সেবা করার মনো বাসনা নিয়ে গ্রামে চলে যান। শুরু করেন খামারিদের চিকিৎসা সেবা। থেমে থেমে গুটি বসন্ত হয়ে অসংখ্য লোক মারা যাচ্ছিল। গুটি বসন্ত থেকে রেহাই পেতে ছোট বেলায় জেনার ও ভাইরিওলেশান চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহন করে ছিলেন। চিকিৎসা হওয়ার পর তিনি ও তার রোগীদের ভ্যারিওলেশ সম্পন্ন করে ছিলেন। গ্রামীণ এলাকায় চিকিৎসা দিতে গিয়ে দেখতে পেলেন যে,খামারিরা গোবসন্তে আক্রান্ত হলে তাদের সামান্য ফুসকুড়ি দেখা দেয়। জেনার এও লক্ষ্য করলেন,এতে করে খামারি ও গোয়ালিনীরা  আর মরণব্যধি গুটি বসন্তে আক্রান্ত হচ্ছে না। এডওর্য়াড জেনার তার ভ্যাকসিনের প্রথম প্রয়োগ করেছেন। জেনার বিষয়টি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।এক পর্যায়ে ১৭৯৬সালে সারা নেলমস নামের এক তরুণ গোয়ালিনীর গায়ের গোবসন্তের তাজা ক্ষত থেকে জেনার টিকার উপাদান সংগ্রহ করেন। এ উপাদান সংগ্রহ করে তৈরী টিকা সর্বপ্রথম জেমস ফিপস নামের আট (বা তেরো)বছর বয়সি এক শিশুর গায়ে পুশ করেন। ফলাফল ইতিবাচক আসে। জুলাই মাসে দ্বিতীয় ধাপে টিকা দেন জিনার। জেনার এ পরীক্ষা অব্যাহত রাখেন এবং আশানুযায়ী ফল পান। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে সংক্রমক রোগ প্রতিরোধ টিকার বুনিয়াদ এভাবেই গড়ে দেন এই চিকিৎসা বিজ্ঞানী। এরপর যত রোগের টিকা তৈরি হয়েছে এটিকে অনুসরণ করা হয়েছে। ১৭৯৮ সালে জেনারের গবেষণা পত্র প্রকাশ হওয়ার পর তা ব্যাপক গ্রহণ যোগ্যতা পায়। রাজ পরিবারের এই টিকা নিজেরা  গ্রহণ করে এবং আজীবন পেনশানের ব্যবস্থা করে। রাজা তৃতীয় র্জজ তাকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করেন। যে  গুটি বসন্তে আক্রান্ত হয়ে আঠার শতকে প্রতিবছর  শুধু ইউরোপ জুড়ে চার লাখ লোক মারা যেত সেই ভয়ঙ্কর রোগ মহামারি নির্মূল হয়েছে বলে ১৯৮০ সালে ঘোষণা দেয় বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থা। খ্রিষ্টপূর্ব ১৫৭০ অব্দ থেকে দুর্দান্ত প্রতাপে বহু রাজা বাদশাহ ও শহর নগর ধ্বংস করে দিয়ে ১৯৮০ সালে  এসে পরাজিত হতে হয় প্রাণঘাতি ঘুটি বসন্ত কে।
লুই পাস্তুরের জীবাণু ও তার প্রতিষ্ঠান : ফ্রান্সের ডোলেতে  ১৮২২ সালে লুই পাস্তুরের জম্ম।এই রসায়ন বিজ্ঞানি ১৮৮৫ সালে জলাতংকের টিকা আবিষ্কার করেন। কিন্তু এই ফরাসি বিজ্ঞানিকে স্মরণ হয় সম্ভবত তার জীবানু নিয়ে ব্যাপক গবেষণাও যুগান্তকারী ফলাফল সৃষ্টির জন্য। তার গবেষণার ফলে রেশম পোকার মড়ক দূরিকরণে আবিষ্কার হয়। লুই পাস্তুর মহামারি রোগের মূল মড়কের মূল ঘটক জীবাণু নিয়ে গবেষণা করেএর চরিত্র আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়। ফল ও দ্রব্যের পচনের পেছনে যে রয়েছে জীবাণু তা তিনি সামনে আনেন। খাদ্যকে জীবাণু মুক্ত রাখার যে পদ্ধতিকে  আমরা ‘পাস্তুরিতকরণ’ বলিসে পদ্ধতিটিরও ধারণা দিয়ে ছিলেন লুই পাস্তুর। ১৮৮৭ সালে লুই পাস্তুর প্রতিষ্ঠা করেন একটি বিশেষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান। পাস্তুর ইনস্টিটিউট’ বিশ্বের সমকালিন বিজ্ঞানিদের প্রধান আগ্রহ কেন্দ্র হয়ে উঠে। একটি সূত্র বলছে,এ প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানিদের হাত ধরে ডিপথেরিয়া, টিটেনাস, যক্ষ¥া, পরিমাইলিটিস, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ফীত জ্বর এবং প্লেগের মত ঘাতক রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কিত হয়েছে। অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ ১০ বিজ্ঞানি নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। ১৭৯৬ সালে এডওয়ার্ড  জেনার ডে বালকের শরীরে প্রথম ভ্যাকসিন প্রয়োগ করেন তার বাহুতে। জীবাণু নিয়ে পাস্তÍরের গবেষণার সুত্র ধরে পরবর্তীতে কলেরা ও প্লেগের মতো ভয়ঙ্কর দুটি সংক্রামক রোগের টিকা আবিষ্কার করেণ। ওয়াল্ডেমার হফকিন। কোটি কোটি মানুষ কে মৃত্যুর মুখে ফেলা ঘাতক এই রোগ দুটির লাগাম টেনে ধরাসম্ভব হয়।
 কলেরা ও প্লেগের টিকা আবিষ্কার : ইউক্রেনের ওদেসায় জম্ম ওয়াল্ডে মার হফকিনের(১৮৬০-১৯৩০)অণুজীব বিজ্ঞানি লুই পাস্তÍরের গবেষণা গারে কাজের সুযোগ পেলে কলেরার টিকা উদ্ভাবনের জন্য পূর্ণ মনোযোগ দেন। খরগোশের উপর কলেরার টিকার পরক্সি করে আগ্রহ জাগানিয়া ফলাফল পেলেন।১৮৯২ সালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রথমবার নিজের উপর কলেরার টিকার পরীক্ষা চলানোর সাহস করেন। ফলাফল ইতিবাচক। সামান্য পার্শ্বতিক্রিয়া ছাড়া বিস্ময়কর সাফল্যের দেখা পেলেন। এবার স্বেচ্ছাসেবক দলের মধ্যে পরীক্ষা চালালেন। কিন্তু টিকার কার্যকারিতা নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরো প্রয়োজন পরীক্ষা নিরিক্ষার। এ জন্য দরকার মানব দেহ।
ভারত বর্ষে ওয়াল্ডেমার হফকিনের আগমন:-কলেরায় তখন এশিয়া ইউরুপের টাল মাটাল অবস্থা। ভারতে লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে কলেরায়।
হফকিন স্থির করলেন টিকার কার্যকারিতা আরো ভালভাবে বুঝার জন্য। ভারত বর্ষে টিকার ব্যবহার করবেন।প্যারিসে বৃটিশ রাষ্ট্রদূতের সাহায্যে তার এ চিন্তা বাস্তবায়নের সুযোগ পেলেন। ১৮৯৩ সালে পা রাখলেন কলিকাতায়।এখানকার দারিদ্র অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ কলেরার জন্য উর্বর ক্ষেত্র হিসাবে কাজ করছিল। প্যারিসে বৃটিশ রাষ্ট্রদূতের সাহায্যে তার এ চিন্তা বাস্তবায়নের সুযোগ পেলেন। অসচেতনতা ছিলই। হফকিন তার সহকর্মীদের নিয়ে আগানোর চেষ্টা করলেন। হফকিনের টিকা উতরে গেল। কলেরা নিয়ন্ত্রণে আনার দুঃসাধ্য কাজটি সাধন হলো অবশেষে।
 চিকিৎসায় নোবেল পুরস্কার : ডিপথেরিয়া চিকিৎসার প্রতিষেধক সিরাম থেরাপি উদ্ভাবন করে ১৯০১ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন জার্মান বিজ্ঞানি এডরফ এমিল পন বেহরিং (১৮৫৪-১৯১৭) ডিপথেরিয়া এন্টিটোক্সিন আবিষ্কার করে চিকিৎসা বিজ্ঞানে তিনিই প্রথম নোবেল পুরুস্কার অর্জন করেন।
 পোলিও ও ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা : আমাদের দেশে সব শিশুকে পোলিও টিকা দেয়া হয়। ফলে এ নামটির সাথে আমরা সবাই পরিচিত। পোলিও মানুষ কে পক্ষাঘাত গ্রস্থ করতে পারে। হতে পারে মৃত্যু ও। সাধারণত এ রোগ হলে এক পা শুকিয়ে যায়। এই রোগের টিকা আবিষ্কার আগে অসংখ্য লোক মারা গেছে।১৯৫৫ সালে মার্কিণ বিজ্ঞানি জোনাস এডোয়ার্ড সল্ক (১৯১৪-১৯৯৫)পোলিওর প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কার করে আল্লাহর ইচ্ছায় বহুপ্রাণ বাঁচিয় দিয়েছে।
করোনা টিকা স্পুটনিক-৫ : ২০১৯ সালের শেষ দিকে চীনের উহান শহর থেকে কোভিড-১৯ বা করোনা নামে যে মহামারিটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে তাতে হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে দেশে দেশে। জীবাণুর কাছে মানুষের জীবন জীবিকা যখন হেরে যাচ্ছে তখন গত আগস্ট মাসের ১১ তারিখ রুশ প্রেসিডেন্ট ব্লাদিমির পুতিন জানালেন রাশিয়া করোনার টিকা ইতিমধ্যে আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় স্পুটনিক-৫’নামের এই টিকা উদ্ভাবন করেছে দেশটির ‘গামালেয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট’। গণ মাধ্যমকে পুতিন বলেছেন ‘আমি জানি এই টিকা পুরোটা  কার্যকর। এর প্রতিরোধ ক্ষমতা টেকসই। পুতিন একথা বলেছেন টিকা তার মেয়ে কে দেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিজ্ঞানিরা মনে করছেন রাশিয়া যথাযথ নিয়ম না মেনে তাড়াহুড়া করে এ টিকা ছেড়েছে। তাই এর কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। সংক্রামক রোগ বিষয়ের মার্কিণ  বিশেষজ্ঞ এ্যন্টনি ফসি বলেছে, এই টিকা নিরাপদ এবং এর কার্যকারিতা প্রমাণিত। তবে এ নিয়ে আমার প্রবল সন্দেহ রয়েছে। টিকা হাতে পাওয়া আর তা নিরাপদ ও কার্যকর বলে প্রমাণ করা দুটি ভিন্ন জিনিস।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘টিকার জাতীয়বাদ’ বন্ধ করার আহবান জানিয়েছে বলেছে,‘করোনা ভাইরাস হতে প্রত্যেকে নিরাপদ না হলে কেউ নিরাপদ নয়।’ এই ভাইরাসের সফল কোন টিকা তৈরী হলে বর্তমানে সেটাই হলো সবচেয়ে কাঙ্খিত ও দামী উপহার। এটা শুধু মানুষের জীবন বাঁচাবে তা নয়.মহা মারির কারণে সারা বিশ্বে যে অচল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে এটি তার অবসান ঘটাবে।
“কোভিড-১৯ নিয়ে এতটা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পিছনে কারণ হলো বিশ্বের সুপার পাওয়ার বা ক্ষমতাশালী দেশ গুলো এটি কে দেখছে তারে বৈজ্ঞানিক শৌর্য বীর্যের প্রতীক হিসাবে।এর মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার বৈধতা পাওয়া যাবে”।                     
  করোনা ভাইরাসের টিকা তৈরিতে সারা বিশ্বে দুশোর মতো গবেষণা চলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে প্রায় অর্ধডজন গবেষণা পৌঁছে গেছে পরীক্ষার একেবারে শেষ পর্যায়।এসব গবেষণা তিনটি চলছে চীনে,একটি যুক্তরাজ্যে, একটি যুক্তরাষ্ট্রে এবং আর একটি চলছে জার্মানির ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ প্রচেষ্টায়। সাধারণ একটি টিকা তৈরী করতে কয়েক বছর সময় লেগে যায়। কিন্তু বর্তমানে এসব দেশ গবেষণার  গতি বাড়িয়ে দিয়েছে।এখন রাশিয়ার পক্ষ থেকে স্পটনিক নামের একটি টিকা তৈরীর ঘোষণা দেওয়ার পর অনেকের মধ্যে প্রশ্ন তৈরী হযেছে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার কোন শর্ট কাট অবলন্বন করা হয়েছে কিনা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও প্রায় অভিন্ন কথা বলেছে। পুতিন টিকাটির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ হওয়ার আগে এর কার্যকারিতা নিয়ে গণমাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে বসেছেন। অথচ পশ্চিমা সুত্র জানাচ্ছে দুই হাজারের বেশী লোকের ওপর শেষ ধাপের পরীক্ষা এখনো বাকি। বিশ্ব সংস্থার মতে এ পর্যন্ত ২৫টি রোগের টিকা আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মাঝে কলেরা, প্লেগ, এ্যনথ্র্যাক্স, হাম, রুবেল, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ডিপথেরিয়া, মাম্পস, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস এ এবং বি, টাইফয়েড, পোলিও, জলাতঙ্ক, ইত্যাদি রোগ রয়েছে। প্রতিটি রোগের টিকা আবিষ্কারের ইতিহাস আলোচনার সুযোগ এখানে নেই। কিন্তু মহামারি ও মড়কের হাত থেকে বাঁচার জন্য টিকার কোন বিকল্প নেই। এ কথা মানা ছাড়া উপায় নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে,প্রতি বছর টিকার মাধ্যমে আড়াই মিলিয়ন মৃত্যু প্রতিরোধ হয়। এখনো বহু রোগের টিকা আবিস্কিত করতে পারছে না বিজ্ঞানীরা। জিকা ভাইরাসের সংক্রমণের তিয়াত্তর বছর হতে চলল। এখনও এর টিকা উৎপাদন করা সম্ভব হয়নি। সার্স, মার্স বা এইওডর মতো ঘাতক ব্যাধির টিকা এখনো অধরাই রয়ে গেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ