সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

প্রয়োজন নির্মল বায়ুর

জান্নাতুল মাওয়া নাজ : মানুষ, উদ্ভিদ এবং জীবজন্তু সবকিছুর বেঁচে থাকার জন্য সুস্থ পরিবেশ প্রয়োজন। পরিবেশ আমাদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার শক্তি জোগায়। সুস্থ পরিবেশের ব্যত্যয় মানুষ এবং পশুপাখির মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে। বর্তমানে সময়ের বহুল আলোচিত একটি বিষয় হচ্ছে বায়ুদূষণ। মানুষ প্রকৃতির উপর হাত দিয়ে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে ফেলেছে এবং বায়ুকে দূষিত করেছে। এখন সমগ্র বিশ্বেও বায়ুমন্ডল এত দূষিত যে, পূর্বের অদূষণ অবস্থা ফিরিয়ে আনতে মানবজাতি সচেষ্ট না হলে আগামী কুড়ি বছরের পর আমাদের এ রূপ-রস-গন্ধে ভরপুর পৃথিবী বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।
আমাদের বায়ুমন্ডল যেসব গ্যাসীয় উপাদান সমন্বয়ে গঠিত তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন। বায়ুমন্ডলে নাইট্রোজেন ও অক্সিজেনের পরিমাণ যথাক্রমে ৭৮.০৯% ও ২০.৯৫%। উভয় গ্যাসের সম্মিলিত পরিমাণ ৯৯% এর অধিক। অবশিষ্ট ১% এর কিছু কম যেসব গ্যাসীয় উপাদান সমন্বয়ে গঠিত তা হলো আর্গন ০.৯৩% ও কার্বন-ডাইঅক্সাইড ০.০৩%। তা ছাড়া বায়ুমন্ডলে অতি সামান্য অংশ হিসেবে নিয়ন, হিলিয়াম, মিথেন, ক্রিপটন, হাইড্রোজেন, জেনন ও ওজোনের উপস্থিতি রয়েছে।
বায়ুমন্ডলের নিম্নভাগে অঞ্চল ভেদে বিভিন্ন মাত্রার জলীয়বাষ্পের উপস্থিতি রয়েছে। সাধারণত বৃষ্টিপ্রবণ এলাকায় জলীয়বাষ্পের উপস্থিতি শতভাগ। যেসব অঞ্চলে বৃষ্টির পরিমাণ কম সেসব অঞ্চলে তুলনামূলক হারে জলীয়বাষ্পের পরিমাণও কম। বাতাসে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকলে মানুষের শরীর থেকে নিগর্ত পানি যেটিকে ঘাম বলা হয় তা সহজে শুকায় না। এ কারণে বাতাসের জলীয়বাষ্পের আধিক্যের কারণে ঘাম না শুকানো মানুষের জন্য অস্বস্তিদায়ক। বায়ুমন্ডলের নিম্নভাগে ধুলাবালির উপস্থিতি বায়ুমন্ডলকে দূষিত করে তোলে। এক পরিসংখ্যান মতে, আমেরিকার কল-কারখানাগুলো বছরে ২ লক্ষ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড, ৯ লক্ষ টন সালফার ডাই-অক্সাইড, ৩ লক্ষ টন নাইট্রোজেন অক্সাইড, ১ লক্ষ টন হাইড্রোকার্বন এবং ৩ লক্ষ টন অন্যান্য অপজাত দ্রব্য বায়ুমন্ডলে ছেড়ে দেয়। সে দেশের প্রায় ১০ কোটি মোটর গাড়ী বছরে ৬ কোটি টন কার্বন মনোক্সাইড, ১ লক্ষ টন সালফার ডাই-অক্সাইড, ৬ লক্ষ টন নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড এবং ১২ লক্ষ টন অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থ বায়ুমন্ডলে ঘুরে বেড়ায়।
কল-কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া কুন্ডলিতে প্রায় ৫ হাজারের মত বিষাক্ত পদার্থ আছে। ঢাকার বায়ুমন্ডলে এ রকম প্রায় ৬ শত বিষাক্ত পদার্থ আছে। বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন গবেষণার প্রতিবেদন মতে, ঢাকা এবং আশপাশ এলাকার বায়ুতে ৬ টন ধূলিকণা, ১১৫ টন সালফার অক্সাইড, ৪৫০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড, ৭৫ টন নাইট্রোজেন অক্সাইড এবং ১৫০ টনের মত হাইড্রোকার্বন মিশে আছে। এছাড়াও অন্যান্য আরো ধূলিকণা আছে। শুধু ঢাকা কেন, সারাদেশের কোন শহরেই বিশুদ্ধ বায়ু পাওয়ার স্থান প্রায় নেই। দেশের সবগুলো শহরের বায়ুমন্ডলে আছে বিষাক্ত কণিকা ও গ্যাস।
বাংলাদেশের বায়ুমন্ডল দূষিত হওয়ার অন্যতম কারণ হলো ক্রমাগত বনাঞ্চল উজাড়। অস্বাভাবিক হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সচেতনতার অভাব এবং বনাঞ্চল সৃষ্টির ব্যাপারে আšতরিকতা ও দেশপ্রেমের অভাব। এছাড়া আইন প্রয়োগে কঠোরতা অবলম্বন না করা এবং লাগামহীন দুর্নীতিই বনাঞ্চল উজাড়ের মূল কারণ। বনাঞ্চল সংকুচিত হওয়ার ফলে বায়ু মন্ডলে ধূলিকণার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এর ফলে বৃষ্টিপাত হ্রাস পাচ্ছে। এছাড়া অরণ্যরাজি ধ্বংসের ফলে মাটির স্বাভাবিক গঠন প্রকৃতিতে ব্যাঘাত সৃষ্টির ফলে বায়ুমন্ডলে অধিক কার্বন-ডাই-অক্সাইড মিশ্রিত হচ্ছে।
বায়ুমন্ডলে অনিষ্টকারী আরও দুটি হলো রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক দ্রব্য। পৃথিবীতে রাসায়নিক সারের উৎপাদন প্রতিবছর বেড়েই চলছে। ফলে বায়ুমন্ডলের নাইট্রোজেন যৌগের পরিমাণ অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। ডিডিটি এবং অন্যান্য কীটনাশক দ্রব্য পানি ও বাতাসকে বিষাক্ত করছে। এ দ্রব্যগুলো অপরিকল্পিতভাবে কৃষিক্ষেত্রে প্রয়োগের ফলে বায়ু দূষিত হয় এবং ফলে জীবজগৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। এসব প্রয়োগের ফলে পৃথিবীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারিয়ে এক বিরাট বিপদ ডেকে আনতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করছেন। বিষাক্ত কীটনাশক দূষণের অংশবিশেষ আমাদের খাদ্য, পানি এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের সময় বাতাসের সঙ্গে মিশে আজকাল নানা ধরনের অসনাক্ত রোগ দেখা দিচ্ছে। ক্যান্সার, হাঁপানি এবং হৃদযন্ত্রের বেশীর ভাগ রোগ, ব্রঙ্কাইটিস, মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণও এ রোগের মধ্যে পড়ে।
মানুষসহ পৃথিবীর অপরাপর প্রাণিকুলের জীবনধারণের জন্য অক্সিজেন অপরিহার্য। মানুষ প্রতিনিয়ত তার চতুর্পাশের বায়ুমন্ডল থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করছে ও কার্বন-ডাইঅক্সাইড ত্যাগ করছে। অক্সিজেন ছাড়া একজন মানুষের পক্ষে ৩-৪ মিনিটের অধিক বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। যেকোনো জীবšত প্রাণীর জন্য নাইট্রোজেন অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রাণীর দেহে প্রোটিন গঠনে সহায়তা করে। মানুষের দেহের ত্বক ও চুলের গঠনে নাটট্রোজেনের অনন্য ভূমিকা রয়েছে। আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন আমরা উদ্ভিদ থেকে পাই। অপর দিকে উদ্ভিদ মাটির সাথে সংমিশ্রিত ব্যাকটেরিয়া থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে। মানুষ প্রতিনিয়ত অক্সিজেন গ্রহণ ও কার্বন-ডাইঅক্সাইড ত্যাগের কারণে বায়ুমন্ডলে অক্সিজেন ও কার্বন-ডাইঅক্সাইডের যে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটছে তার ভারসাম্য উদ্ভিদেও কার্বন-ডাইঅক্সাইড গ্রহণ ও অক্সিজেন ত্যাগের মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবে রক্ষিত হয়ে চলছে। এ কারণে পৃথিবীর ভূ-ভাগে ন্যূনতম চার ভাগের এক ভাগ বনাঞ্চল থাকার আবশ্যকতা রয়েছে। পৃথিবীর স¤পদশালী ও জনবসতি কম এমন দেশগুলো এ হার বজায় রাখতে পারলেও দরিদ্র ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর পক্ষে এটি সম্ভব হয়ে ওঠে না। আর এ কারণেই আমাদের দেশে বনাঞ্চলের পরিমাণ কাক্সিক্ষত পরিমাণের চেয়ে অনেক নিচে।
পৃথিবীর যেকোনো দেশের গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চল ও শিল্পাঞ্চল ঘনবসতি ও কোলাহলপূর্ণ হওয়ায় বায়ুদূষণ অধিক। এসব অঞ্চলে যানবাহন ও কলকারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া এবং রান্নাঘর থেকে নির্গত ধোঁয়া এক দিকে বায়ুমন্ডলের কার্বনের উপস্থিতির বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে, অপর দিকে বায়ুমন্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধি করে চলেছে। উভয় দূষণের কারণে শহরাঞ্চল ও শিল্পাঞ্চলে বসবাসরত জনমানুষ বিশুদ্ধ ও নির্মল বায়ুর প্রভাব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এ পৃথিবীতে রেলগাড়ির প্রচলন পরবর্তী এগুলো স্টিম ইঞ্জিন চালিত ছিল। এ ধরনের ইঞ্জিনে জ্বালানি হিসেবে খনিজ কয়লা ব্যবহৃত হতো। স্টিম ইঞ্জিন ব্যাপকভাবে বায়ুদূষণ করার কারণে ধীরে ধীরে এর ব্যবহার কমে এসে বর্তমানে শূন্যে পৌঁছেছে। সড়কে যেসব যান্ত্রিক যান চলাচল করে এগুলো গ্যাস চালিত হলে তুলনামূলকভাবে পেট্রল ও ডিজেল চালিতের চেয়ে দূষণ কম। আমাদের রাজধানী শহর ঢাকায় এ ধরনের জ্বালানি চালিত বেবিটেক্সি প্রচলনকালীন সমগ্র শহর সকাল থেকে রাত অবধি ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন থাকত। এ ধরনের ধোঁয়ার আচ্ছন্নতা ঢাকা শহরের পরিবেশকে অসহনীয় করে তুলেছিল। বর্তমানে ঢাকা শহরে যেসব যান্ত্রিক যান চলাচল করে এগুলোর মধ্যে পণ্যবাহী ট্রাক ছাড়া অপরাপরগুলো গ্যাস চালিত হওয়ায় ধোঁয়াজনিত বায়ুদূষণের অনেকাংশে হ্রাস ঘটেছে। আমাদের দেশে নির্মাণসামগ্রী হিসেবে পাথর ইটের তুলনায় ব্যয়বহুল। পৃথিবীর যেসব দেশের ভূ-ভাগের উপরের স্তরে পাথর রয়েছে এসব দেশ প্রাকৃতিক উৎস থেকে পাথর সংগ্রহ করে নির্মাণকাজ সমাধা করে থাকে।
আমাদের দেশে প্রাকৃতিক উৎস থেকে সংগৃহীত পাথর অপ্রতুল হওয়ায় আমাদের নির্মাণকাজে ইটের ব্যবহার অধিক হচ্ছে। ইটভাটায় জ্বালানি কাঠের ব্যবহার আমাদের বনভূমির দ্রুত হ্রাস ঘটিয়ে যেমন বায়ুদূষণে সহায়ক হিসেবে কাজ করছে অনুরূপ ইটভাটা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া বায়ুদূষণকে আরো তীব্রতর করছে।
আমাদের দেশে শহরাঞ্চলের গৃহস্থালি বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থা বিজ্ঞানসম্মত পন্থায় গড়ে না ওঠায় শহরের যেসব অঞ্চলে গৃহস্থালি বর্জ্য প্রাথমিকভাবে রাখা হয় সেগুলোতে বর্জ্যরে পরিমাণ ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত হওয়ায় এবং বর্জ্য উন্মুক্ত অবস্থায় রাখায় যে অসহনীয় দুর্গন্ধ ছড়ায় তা আশপাশের বায়ুমন্ডলকে দূষিত করে তোলে। এ ধরনের দূষিত বায়ুতে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করা হলে তা যেকোনো মানুষের শারীরিক অস্বস্তির কারণ হয়ে দেখা দেয়। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে কখনো বর্জ্য প্রাথমিক স্থানে উন্মুক্ত রাখা হয় না এবং এগুলো সবসময় ঢাকনাযুক্ত গাড়িতে রাতের শেষ প্রহরে পরিবহন করা হয়। এসব দেশে অপসারণস্থলও শহর থেকে অনেক দূরে জনবসতিহীন এলাকায় হয়। অধুনা অনেক উন্নত দেশ গৃহস্থালি বর্জ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সার উৎপাদনে ব্যবহার করছে। আমাদের দেশে অনুরূপ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে তা বায়ুদূষণ রোধে সহায়ক হবে।
পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনমানুষের জন্য সহায়ক ও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে অনবদ্য অবদান রেখে চলেছে। আমরা এ পথে উন্নত দেশের মতো সফলতা না পাওয়ায় আমাদের দেশের সামগ্রিক বায়ুমন্ডলের পরিবেশ সুস্বাস্থ্যের জন্য এখনো নিরাপদ হয়ে উঠতে পারেনি। আর যত দিন পর্যšত এটি নিরাপদ না হবে তত দিন পর্যšত বায়ুদূষণ আমাদের উন্নত ও সমৃদ্ধিশালী এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনে অšতরায় হয়ে থাকবে। সবচেয়ে বড় কথা, বায়ুদূষণ রোধ করার জন্য মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। এ সমস্যা একেবারে নির্মূল করা সম্ভব না হলেও ধাপে ধাপে কমিয়ে আনার মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সবার ভেতর পরিবেশবান্ধব মনোভাব তৈরি করতে হবে। বায়ুদূষণ প্রতিরোধে সরকার, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, অন্যান্য সংস্থা ও জনগণ সমন্বিত উদ্যোগ নিলে সুফল বয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়। জাতীয়ভাবে পরিবেশ রক্ষার জন্য আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসা উচিত, সচেতন হওয়া উচিত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ