বৃহস্পতিবার ২৬ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

খালেদা জিয়া মুক্ত নন তিনি গৃহে অন্তরীণ

স্টাফ রিপোর্টার : বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দলের চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মুক্ত নন, তাকে গৃহে অন্তরীণ করে রাখা হয়েছে। গতকাল রোববার দুপুরে সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে গুলশানে চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এই মন্তব্য করেন।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, দুর্নীতির মামলায় সরকারের নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়ার সাজা সাময়িক স্থগিত হলেও ‘তিনি মুক্ত নন’। তাকে গৃহে অন্তরীণ করে রাখা হয়েছে। খালেদা জিয়া মুক্ত নন। সি ইজ নট ফ্রি। এই যে বলা হচ্ছে যে, উনার সাজা স্থগিত করা হয়েছে। সাজা স্থগিত হলে তার ওপর তো কোনো বিধি-নিষেধ থাকার কথা না। ডিফারেন্সটা হচ্ছে যে, শুধুমাত্র হাসপাতাল থেকে তাকে তার বাসায় নিয়ে আসা হয়েছে। ওখানে  তিনি হোমলি পরিবেশের মধ্যে আছেন। যেটাকে সোজা কথা বললে বলা যায়- এটা হচ্ছে যে, গৃহে অন্তরীণ করা।
বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ভালো নয়- দলের যুগ্ম মহাসচিব মাহবুবউদ্দিন খোকনের বক্তব্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা প্রথম থেকেই বলছি যে, ম্যাডাম অসুস্থ। আমরা যেটা চেয়েছিলাম, তার একটা এডভ্ন্সা ট্রিটমেন্ট। কারণ এখানে ডাক্তার যারা আছেন তারা বলছেন যে, সি নিডস অ্যাডভান্স ট্রিটমেন্ট। এডভান্স ট্রিটমেন্টের জন্য এডভান্স সেন্টার দরকার। সেটা তো আমাদের এখানে নাই। এমনকি এই ডিজিজের জন্য যে এডভান্স ট্রিটমেন্টগুলো সেগুলো আসলে বাংলাদেশে নেই। ট্রিটমেন্টে আছে হয়ত কিন্তু সেই ট্রিটমেন্টের জন্য আনুষঙ্গিক যে ব্যাপারগুলো আছে- রক্ত পরীক্ষা, অন্যান্য পরীক্ষা, একটা থ্যারাপী দেয়ার পরে তার ফলোআপ করার যে সমস্ত বিষয়গুলো সেগুলো এখানে পরিপূর্ণভাবে নেই। আমাদের যুগ্ম মহাসচিব সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক যেটা বলেছেন- কথাটা তো সত্যি বলেছেন। সি ইজ রিয়েলী সিক। ম্যাডাম বলেননি এই কথাটা। সি থিংকস এন্ড উই অলসো থিংক সি নিডস বেটার ট্রিটমেন্ট।
এ বছরের ২৫ মার্চ সরকার প্রথম দফা ৬ মাস এবং দ্বিতীয় দফায় আরো ছয় মাস খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত করে। ওই আদেশে পর থেকে মুক্তি হয়ে খালেদা জিয়া গুলশানের বাসা ‘ফিরোজায়’ আছেন। সেখানে ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের একটি টিম তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চলছে। খালেদা জিয়া ডায়াবেটিক, হাতে-পায়ে আর্থারাইটিসসহ চোখের সমস্যা ভুগছেন। খালেদা জিয়া বাসায় থাকলেও তার সাথে দলের নেতা-কর্মীসহ কেউই সাক্ষাতের কোনো সুযোগ পাচ্ছে না। শুধুমাত্র তার ভাই-বোনসহ নিকট আত্মীয় কয়েকজন সাক্ষাত করতে পারছেন।
নির্বাচন কমিশন সরকারের ‘বশংবদ ক্রীড়নক’ হিসেবে কাজ করছে বলে অভিযোগ করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পাবনা-৪, ঢাকা-৫ ও নওগাঁ-৬ আসনের অনুষ্ঠিত উপ-নির্বাচনের ভোট নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্যে প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি মহাসচিব এরকম অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, তিনটি উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও সরকার দলীয় সন্ত্রাসী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের মতোই ত্রাস সৃষ্টি করে এবং ভোট ডাকাতি করে জাল ভোট মেরে বিরোধী দলের এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে জোর করে বের করে দিয়ে ভোট ছিনতাই করেছে। নির্বাচন কমিশন নির্বিকার দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। রিটার্নিং অফিসার ধানের শীষের প্রার্থীদের অভিযোগ গ্রহণ করেনি।
মির্জা ফখরুল বলেন, অবলীয়লায় মিথ্যা কথা বলেছেন কালকে চিফ ইলেকশন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। কোনো অভিযোগ নাকী তারা দেন নাই। ঢাকা থেকেই ১৬২টা অভিযোগ দেয়া হয়েছে। বিনা ভোটের স্বঘোষিত সরকার একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নীল নকশা বাস্তবায়নের জন্য ভোট ডাকাতির কৌশলে জনগণকে আবারো প্রতারিত করলো। অযোগ্য এবং সরকারের বশংবদ নির্বাচন কমিশন ক্রীড়নকের থেকে এই ভূমিকা পালন করছে।
বিএনপি মহাসচিব অভিযোগ করে বলেন, এই অবৈধ সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে দেশে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করে একদিকে নজিরবিহীন দুর্নীতি ও দুঃশাসন, অন্যদিকে জনগণের সাংবিধানিক অধিকার হরণ করে ফ্যাসিস্ট রাজত্ব কায়েম করেছে। সুপরিকল্পিভাবে নির্বাচন কমিশন জনগণের ভোটাধিকার বঞ্চিত করে দেশে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
চাল-ডাল-পেঁয়াজ-আলুসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের উর্ধবগতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে মির্জা ফখরুল বলেন, সরকারি দলের মদদপুষ্ট এক শ্রেণীর ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা ও দুর্নীতির কারণে দ্রব্যমূল্য বেড়েই চলেছে। একদিকে করোনা ভাইরাসের কারণে কর্মসংস্থানের অভাব ও পরিস্থিতিকে আরো জটলা করে ফেলেছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির রাশ টেনে ধরতে সরকারের ব্যর্থতার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে স্থায়ী কমিটি।
পুলিশের ধর্ষণবিরোধী সমাবেশ লোক দেখানো মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, সারাদেশে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ব্যাপকতা বৃদ্ধি প্রতিরোধে সরকারের চরম ব্যর্থতা সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করে মৃত্যুদন্ডের বিধান সংযোজন সমস্যার একমাত্র সমাধান নয়। ধর্ষকদের সরকারি দলের প্রশ্রয় অথবা ধর্ষক সরকারি দলের সদস্য বলে কোনো বিচার হয় না। গত শনিবার ধর্ষণবিরোধী লং মার্চে আন্দোলনকারীদের ওপর ফেনীতে পুলিশের সহায়তায় আওয়ামী লীগেরে সন্ত্রাসীদের হামলা প্রমাণ করেছে যে, পুলিশ গতকাল সারাদেশে যে ধর্ষণবিরোধী সমাবেশ শুধুমাত্র লোক দেখানো। প্রকৃত অর্থে সরকারের সদিচ্ছার অভাব ও ব্যর্থতাই ধর্ষণের মতো অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধর্ষণ মামলার দ্রুত বিচারের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করার দাবিও জানান তিনি।
কেনো মধ্যবর্তী নির্বাচন হবে না- আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এরকম বক্তব্যের জবাবে বিএনপি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা তো একথা (মধ্যবর্তী) এখনো বলিনি। আমরা গত নির্বাচন যেটা হয়েছে সেটাই তো মানছি না, আমরা ওইটাকে অবৈধ বলছি, আমরা ওইটাকে বাতিল করার কথা বলছি। আপনারা দেবেন আমাদের প্রত্যেকটা স্টেটমেন্ট এ কথা বলেছি যে, এই নির্বাচন আমরা মানি না, এই নির্বাচন বাতিল করে ফ্রেস নির্বাচন দেয়া হোক। মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা আমরা তো বলিনি ভাই। যখন বলব তখন দল থেকে বলা হবে। এখন ব্যক্তিগতভাবে কেউ কিছু বললে, যারা সিভিল সোসাইটিতে আছেন তাদের মধ্যে কেউ বলতে পারেন- দ্যা ইজ দেয়ার অপিনিয়ন। আমরা বিশ্বাস করি যে, আওয়ামী লীগের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। যে কারণে আমরা বলি যে, নির্দলীয় সরকারের অধিনে নির্বাচনের কথা বলে এসেছি, এটাতে আমরা বিশ্বাস করি।
জিডিপিসহ অর্থনীতির উন্নয়ন শুভংকরের ফাঁকি মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন,  আইএমএফের যে রিপোর্ট আমরা দেখছি ভারতের জিডিপি ১০% কমে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের জিডিপি বেশি করে দেখানো, বাংলাদেশে অর্থনীতি এতো চমৎকার ইকনোমী দেখানো, একটা সাকসেসফুল দেখানো হচ্ছে। এর পেছনে আরো অনেক উদ্দেশ্য আছে। প্রথম থেকে বাংলাদেশকে বলা হয়েছে রোল মডেল। আপনারা দেখবেন যে, একটা বিশেষ মহল জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে এই রোল মডেলের কথা বলছে, এটা প্রচার করছে। যেখানে বাংলাদেশের মানুষের চাকরি নেই, বেকারত্ব, যে হারে বেকারত্ব বেড়েছে, শিক্ষিত ছেলে-পেলেদের চাকরি নেই। সেক্ষেত্রে রোল মডেল কিভাবে বলবেন? কোন শুভংকরের ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে বোকা বানানো হচ্ছে।
সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি জারির এবং শনিবার রাতে যশোরে দলের স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য তরিকুল ইসলামের বাসভবন, জেলা বিএনপির কার্যালয়সহ জেলা নেতাদের বাসায় আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের হামলা ঘটনার নিন্দা জানান ফখরুল। যশোরের ঘটনায় জড়িত দুষ্কৃতকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবিও জানান তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ