বুধবার ২১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

রায়হানকে সুস্থ অবস্থায় আমার ঘর থেকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ

* আকবরকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!
* রায়হানের বাড়িতে আজ সাংবাদিক সম্মেলন
* কঠোর কর্মসূচি আসতে পারে
সিলেট ব্যুরো : সিলেটে রায়হান হত্যার ৮দিন অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি এসএমপির কতোয়ালী থানা পুলিশ। প্রতিদিনই আসামীদের গ্রেফতারের দাবীতে সভা সমাবেশ মানববন্ধন অব্যাহত রয়েছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের হাজারো নেতা কর্মীরা রায়হানের বাড়িতে গিয়ে সমবেদনা জানাচ্ছেন। স্মারকলিপি দিচ্ছেন কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছেনা। এমনকি খোদ এসএমপি কমিশনার গোলাম কিবরিয়া নিহত রায়হানের বাড়িতে গিয়ে রায়হানের পরিবারকে আসামীদের গ্রেফতারের ব্যাপারে আশ্বস্ত করে এসেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত এস আই আকবরসহ কাউকেই পুলিশ আইনের আওতায় আনতে পারেনি। আজ রোববার নিহিত রায়হানের পরিবারের পক্ষ থেকে এক জরুরী সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। এই সংবাদ সম্মেলন থেকে সিলেটের বিশিষ্ট জনেরা পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারেন।
এদিকে সিলেটে পুলিশের নির্যাতনে রায়হান উদ্দিনের মৃত্যুর ঘটনার ৮ দিন পেরিয়ে  গেলেও আসামী গ্রেফতার না হওয়ায় জনমনে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। যদিও রায়হান হত্যার ঘটনার অগ্রভাগে থাকা বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (বরখাস্ত) এসআই আকবর হোসেন ভূইয়ার হদিস পাচ্ছে না পুলিশ। তবে তার পালিয়ে যাওয়ার পেছনে মহানগর পুলিশের উত্তর বিভাগের ইন্ধন ছিল বলে অভিযোগে প্রকাশ। ঘটনার পর থেকে বরখাস্ত ও প্রত্যাহার হওয়া দুই এএসআই ও চার কনস্টেবল পুলিশের পাহারায় সিলেট পুলিশ লাইন্সে রয়েছে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটনের জন্য ইতোমধ্যে কাষ্টঘর এলাকার সুইপার কলোনীর সুলাই লালসহ দুজনকে জিজ্ঞাবাদ করেছে। মূল হোতা এসআই আকবর হোসেনসহ জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবিতে উত্তাল সিলেট।
এদিকে বৃহস্পতিবার কবর থেকে লাশ তুলে আবার ময়নাতদন্ত করা হয়। রায়হান হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটনে বিল্লু দাস নামের এক সুইপারকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে পিবিআই। শুক্রবার বিকেলে নগরীর কাস্টঘর এলাকার সুইপার কলোনি থেকে কচুয়া লাল বিজয়ের ছেলে বিল্লু দাশকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। আরেক সুইপার সুলাই লাল বলেন, এর আগে তাকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে গিয়েছিল পিবিআই।
সংবাদ মাধ্যমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সুলাই লাল জানিয়েছেন, ‘ওই রাতে অর্থাৎ গত রোববার রায়হান আহমদকে (৩০) সুস্থ অবস্থায় পুলিশ আমার ঘর থেকে ধরে নিয়ে যায়।’ তিনি বলেন, “ওই রাতে আমি ঘুমিয়েছিলাম। হঠাৎ দরজায় শব্দ শুনে আমার ঘুম ভেঙে যায়। তাকিয়ে দেখি ছেলেটি (রায়হান) ধাক্কায় দরজার জোড়াতালির ছিটকানি ছুটে গেলে সে ঘরে ঢুকে যায়। আমি মনে মনে ভয় পেলাম। এতো রাতে আমার দরজা ঠেলে কে এলো? আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কে ভাই আপনি? তখন দেখলাম ছেলেটি নিঃশ্বাস নিতে পারছে না, কথাও বলতে পারছে না। এর পাঁচ মিনিটের মধ্যে পুলিশ এসে হাজির। পুলিশ বাসায় ঢুকে রায়হানকে ধরে। কিন্তু সে যেতে চাচ্ছিল না এবং আমাকে বলছিল- ‘আমি ছিনতাইকারী না।’ আমিও ভয়ে কিছু বলার মতো অবস্থায় ছিলাম না।”
সুলাই লাল আরো বলেন, ‘ছেলেটিকে আমার বাসা থেকে সুস্থ অবস্থায় আটক করে নিয়ে যায়। পরদিন শুনি ছেলেটি নাকি ছিনতাইকালে গণপিটুনিতে মারা গেছে। শুনে মনটা খুব খারাপ হলো। তবে এখানে কোনো গণপিটুনি হয় নাই, আমি নিশ্চিত।’
জানা যায়, ঘটনার রাতে ২টা ৯ মিনিটে রায়হানকে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে ধরে আনেন এএসআই আশিক এলাহি। এরপর তাকে নেয়া হয় ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক (এসআই) আকবরের কক্ষে। সেখানে লাঠি দিয়ে তাকে উপর্যুপরি আঘাত করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আকবরের সাথে অতি উৎসাহী হয়ে রায়হানকে মারধর করেন কনস্টেবল হারুন ও টিটু। এসময় রায়হানকে মারতে এসআই আকবরকে নিষেধ করেন আশিক এলাহি। কিন্তু তার কথা শোনেননি আকবর। পুলিশ ফাঁড়িতে অমানুষিক নির্যাতন করায় ভোর রাতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন রায়হান। এ অবস্থায় তাকে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
সবকিছু ছাপিয়ে এবার সবার মনে একই প্রশ্ন আকবর হোসেন ভূঁইয়া কোথায়? সিলেট মহানগর পুলিশের লাপাত্তা এই অফিসারের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছেনা কোথাও। এ বিষয়ে অবশ্য বিভিন্নজন বিভিন্ন কথা বলছেন। কেউ বলছেন, তিনি পুলিশের হাতের মুঠোয়ই আছেন। আবার পুলিশের কর্মকর্তারাও বলছেন, তিনি নাগালের বাইরে। সবকিছু ছাপিয়ে এবার সবার মনে একই প্রশ্ন আকবর হোসেন ভূঁইয়া কোথায়?
সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার গোলাম কিবরিয়া বলেন, ঘটনার পর থেকেই আকবর পলাতক রয়েছে। পুলিশ সব বিষয়ে সর্তক রয়েছে। মামলাটি তদন্ত করছে পিবিআই তারা চাইলে আকবর ছাড়া অন্যদেরকে তাদের কাছে দেয়া হবে।
পিবিআই সিলেটের পুলিশ সুপার মো. খালেদুজ্জামান জানান, তদন্তকালে যাদের না পাওয়া যাবে তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। মামলাটি স্পর্শকাতর সব বিষয় তথ্য প্রমাণের প্রয়োজন। সেজন্য পিবিআই এর তদন্ত দল নানা বিষয় মাথায় রেখে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
রায়হান হত্যার ঘটনার পর থেকে পুলিশ লাইন্সে ৬জন পুলিশের পাহারায় রয়েছেন জানিয়েছে সিলেট মহানগর পুলিশের উপ পুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) বি এম আশরাফ উল্যাহ তাহের। তিনি বলেন, হত্যা মামলাটির পুরো বিষয় তদন্ত করছে পিবিআই। আর তাদেরকে সহযোগীতা করছে পুলিশ। বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির বরখাস্ত হওয়া ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূইয়া পলাতক রয়েছেন ঘটনার পর থেকেই। পুলিশ তাকে ধরতে খোঁজতেছে। ইতোমধ্যে সম্ভাব্য কয়েকটি জায়গায় অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। এছাড়াও সীমান্ত এলাকা ব্যবহার না করে এসআই আকবর দেশ ছাড়তে না পারে সেজন্য পুলিশের নজরদারি রয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, পুলিশের হেফাজতে থেকে পুলিশ সদস্যের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি নাটকের একটি অংশ। এখন দেখুন নিরাপত্তা কোথায় রয়েছে। এই ঘটনায় পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পক্ষপাতিত্ব আচরণ করেছেন পুলিশেরই সাথে। বরখাস্ত ও প্রত্যাহার হওয়ার পুলিশ সদস্যদের পুলিশ লাইনে নিরাপত্তা দিয়ে রাখা হলেও এসআই আকবরকে তারাই পালাতে সুযোগ করে দিয়েছেন। এটা পুলিশের ব্যর্থতা ও উদাসীনতার কারণ।
নিহত রায়হানের মা সালমা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশ যে আচরণ করেছে তা আমাদেরকে হতাশ করেছে। আমার ছেলের হত্যাকারী এসআই আকবরকে তারাই পালাতে কিংবা সরে যেতে বলেছে। এক সপ্তাহ হয়ে গেলেও আকবরসহ খুনি পুলিশদের গ্রেফতার করেনি পুলিশ। আমি কিছুই চাইনা আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই। সেই সাথে ওই যমদূত এসআই আকবরকে ধরার জন্য পুলিশের কাছে অনুরোধ জানান তিনি।
পুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, গত সোমবার বিকাল ৩ টা ১০ মিনিট পর্যন্ত আকবর বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতেই অবস্থান করছিলেন। তখন পর্যন্ত তাকে বেশ চিন্তিত দেখা গেছে। এরপরই লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান তিনি। আকবর তার নিজের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন সেট এবং সরকারি সেট দুটোই ফাঁড়িতে রেখে গায়েব হয়ে যান। গা ঢাকা দিয়ে কোথায় আছেন-সেই হদিস কেউ দিতে পারছেন না আকবরের। তার আগে সে খুনের সব আলামত নষ্ট করে দেয়। তবে ফাঁড়ির ইনচার্জ গা ঢাকা দিলেও অভিযুক্ত অন্য সদস্যদের পুলিশ লাইন্সেই রাখা হয়েছে। এএসআই আশেক এলাহি, কুতুব উদ্দিন, কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাশ, হারুনুর রশিদ, তৌহিদ মিয়া ও সজিব এখন পুলিশ লাইন্সে বিশেষ নজরদারিতে আছেন। তবে রায়হান উদ্দিন হত্যার ঘটনায় কাউকেই গ্রেফতার করা হয়নি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ