ঢাকা, শনিবার 24 October 2020, ৮ কার্তিক ১৪২৭, ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী
Online Edition

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে কোচিং করা কতটা প্রয়োজন?

সংগ্রাম অনলাইন ডেস্ক: করোনাকালে চাকরি-বাকরি ব্যবসায়-বাণিজ্য সবকিছুতেই মন্দার প্রভাবে নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে নেমে এসেছে বিপর্যয়।এই আর্থিক বিপর্যয়ের মধ্যেই বাড়তি বিড়ম্বনা হিসেবে অভিভাবকদের টুটি চেপে ধরেছে কোচিং বাণিজ্য।উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের অটোপাস দেয়ার ঘোষণা আসার পর থেকেই নড়েচড়ে বসেছে কোচিং সেন্টারগুলো।তাদের পক্ষে কাজ করছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও এলাকাভিত্তিক কোচিং সেন্টারগুলোর শিক্ষকরা।তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির হওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের প্ররোচনা দিচ্ছে।এতে বাড়তি চাপে পড়েছেন আর্থিক অনটনে পড়া পরিবারগুলো। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কোচিং করা একটা ফ্যাশনে পরিণত হলেও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের জন্য তা এক ধরনের বিলাসিতা।

আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কোচিং করা কতটা প্রয়োজন থেকে ভেবে দেখা জরুরী হয়ে পড়েছে।শহরের মোবাইল আসক্ত কিছু ছেলে-মেয়ের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কোচিং করা অত্যাবশ্যক মনে হলেও বাস্তবে 

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষায় ভাল করে দরিদ্র পরিবারের পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীরা।যে ছেলে করোনাকালের পুরো সময়টাতে -প্রায় সাত-আট মাস বই স্পর্শ করেনি, যে কিনা ২৪ ঘন্টার মধ্যে ১৮ ঘন্টাই ফেসবুক, ‘বিগো লাইভ’, ‘টিকটক’, ‘লাইকি’ নিয়ে মেতেছিল, যার উচ্চমাধ্যমিক পাশ করা নিয়েই ঘোরতর সন্দেহ ছিল, সেই এখন অটোপাসের সুবাদে বাইচাঞ্চ পাশের সুবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির স্বপ্ন দেখছে আর পরিবারের উপর চাপ সৃষ্টি করছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কোচিং করানোর জন্য।আর দুই মাসের এই কোচিংয়র জন্য কোচিং সেন্টারগুলো দাবি করছে ১৫/১৬ হাজার টাকা, যা অনেক বাবা মা'র পক্ষেই দেয়া সম্ভব নয়।

কোচিংয়ে ভর্তি হতে ইচ্ছুক এমন এক শিক্ষার্থীর ধারণা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় পাঠ্যপুস্তক বহির্ভূত প্রশ্ন করা হয়, যা কোচিং না করলে জানা যায় না।তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে হতে হলে কোচিং করা আবশ্যক।কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন ভিন্ন কথা।তারা বলছেন, অধিকাংশ প্রশ্নই আসে পাঠ্যপুস্তক থেকে।আর ইংরেজি বাংলার বেসিক বিষয় থেকেও কিছু প্রশ্ন আসে, যারা নিয়মিত পড়াশোনা করে তাদের জন্য সেটা কোন সমস্যা না।যারা নিয়মত পড়াশোনা করে তাদের জন্য বাংলা ইংরেজি সহ নিজ নিজ বিষয়ের মৌলিক বিষয়ের প্রশ্নের জবাব দেয়া কোন কঠিন বিষয় নয়।তাই কোচিংয়ের কোন প্রয়োজন নেই বরং যে কোন পরীক্ষার্থী ব্যক্তিগতভাবে ভালভাবে পড়াশোনা করলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায়। আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির ক্ষেত্রে কোচিং সেন্টারগুলো কোন ইতিবাচক প্রভাব ফেলছেনা।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ প্রশ্নই আসে উচ্চ মাধ্যমিকের বই থেকে। এছাড়া ইংরেজি, বাংলার বেসিক থেকেও বড় অংশ প্রশ্ন করা হয়। ফলে দুই এক মাসের কোচিং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় কোনো কাজে আসে না। এটা একেবারেই নিষ্প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের উচিত বেশি বেশি করে উচ্চ মাধ্যমিকের বই এবং বেসিক জ্ঞানের দিকে নজর দেয়া।’

আরেফিন সিদ্দিক আরো বলেন, ‘মানবিক বিভাগ থেকে সাধারণ জ্ঞানের প্রশ্নকে অনেকেই মনে করে থাকে বাইরে থেকে করা হয়। কিন্তু মানবিক বিভাগের সাধারণ জ্ঞানের অর্ধেকই থাকে ঐতিহাসিক, সামাজিক বিষয়ের ওপর; যা আমাদের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের বইয়েই রয়েছে। এর বাইরে সাম্প্রতিক কিছু বিষয় আসে। যার জন্য পত্রপত্রিকা পড়াই যথেষ্ট।’

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরাও বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিংগুলো চলছে এক ধরনের অসত্য তথ্যের ওপর ভর করে। কোচিংগুলো শিক্ষার্থীদের কাছে এমনভাবে নিজেদের কর্মকান্ড তুলে ধরে যা থেকে একজন শিক্ষার্থী মনে করতে বাধ্য যে কোচিং করা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু বড় ও গুরুত্বপূর্ণ অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন যেহেতু মূল বই থেকে আসে সেহেতু এসব কোচিংয়ের কোন প্রয়োজন আছে বলেও মনে করেন না তারা। একই সঙ্গে কিছু ছোট বিশ্ববিদ্যালয় যারা মূল বইয়ের বাইরে থেকে প্রশ্ন করছে তাদেরকে মূল বই থেকে প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করার কথাও বলছেন শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা।

রাজধানীর ফার্মগেটের লিজেন্ড কোচিংয়ের ভর্তির দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের কোচিংয়ে যারাই ভর্তি হয় তারাই কোথাও না কোথাও চান্স পায়।’ কিন্তু ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন যেহেতু উচ্চ মাধ্যমিকের বই এবং বেসিক থেকে আসে সেহেতু কোচিংয়ে আলাদা কি করানো হয় এমন প্রশ্নে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘বই এবং বেসিকের থেকে আসলেও সেটি সহজে ও সুন্দরভাবে আমরা শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরি। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ ভালো প্রতিষ্ঠানের মেধাবীরা আমাদের এখানে ক্লাস নেয়ায় অনেক শিক্ষার্থীই নিজেদের প্রতিভা সম্পর্কেও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। এ কারণে কোচিংয়ে ভর্তি ছাড়া ভার্সিটিতে চান্স পাওয়া কষ্টকর।’

বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অসংখ্য কোচিংয়ের এসব চটকদার প্রচারণায় তারা কোনটি সঠিক আর কোনটি ভুল তা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেছেন। কিছু অভিভাবক জানিয়েছেন, সন্তানদের পরীক্ষা দিতে নিয়ে যাওয়ার পর এসব কোচিং সেন্টারের লোকজন এসে তাদের সঙ্গে যেসব কথা বলেছে, তাতে তারা এখন মনে করছেন- কোচিং না করিয়ে সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা অসম্ভব।

যদিও একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভর্তি পরীক্ষার অধিকাংশ প্রশ্নই আসে উচ্চ মাধ্যমিকের বই থেকে। অর্থাৎ এইচএসসি পরীক্ষায় যারা তাদের মূল বই ভালো করে পড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাতেও তারাই ভালো করবেন বলে দাবি তাদের। শুধু মানবিক বিভাগে বাইরে থেকে কিছু সাধারণ জ্ঞানের প্রশ্ন সংযোজন করা হয় বলেও জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

ডিএস/এএইচ

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ