বুধবার ২০ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

আ’লীগের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণেই সীমান্তে মিয়ানমার সেনা সমাবেশের দুঃসাহস দেখাচ্ছে

গতকাল শুক্রবার গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : গুলশানের বাসায় বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া যেমন ছিলেন তেমনই আছেন, কোনো উন্নতি নেই বলে জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল শুক্রবার সকালে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা জানান। তিনি বলেন, ম্যাডাম যেমন ছিলেন তেমনই আছেন। খুব একটা উন্নতি নেই। ডাক্তার সাহেবরা যেটা বলেছেন সেটা শুনেছেন আপনারা। তাতে খুব একটা ইম্প্রুভমেন্ট হয়নি তার। উপরন্তু তার বড় যেটা সমস্যা হয়ে গেছে আবার তিনি খেতেও পারছেন না এখন।
৭৫ বছর বয়েসী কথিত দুর্নীতির দায়ে সাজা প্রাপ্ত হয়ে কারাবন্দি অবস্থায় খালেদা জিয়া ডায়াবেটিক, আর্থারাইটিসহ চোখের সমস্যা অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসাধীন ছিলেন দীর্ঘদিন।
সরকার অনুমতি দিলে খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বৃটেন যেতে ভিসা দেবে- বৃটিশ হাইকমিশনার রবার্ট ডিকশনের এরকম বক্তব্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, বৃটেন এখনো একটা ডেমোক্রেটিক কান্ট্রি। তাদের মধ্যে সভ্যতা, ভদ্রতা-এই বিষয়গুলো এখনো যথেষ্ট অন্যান্য যেকোনো দেশের চাইতে। তারা একটা গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে একজন গণতান্ত্রিক নেতা তার প্রতি তাদের যে দায়িত্ব সেই কথাটাই তারা বলেছেন। তাদেরকে (বৃটিশ সরকার) ধন্যবাদ জানাই আমি। আমরা তাকে (হাইকমিশনার) ধন্যবাদ জানাই যে, তিনি তার ডেমোক্রেটিক আচরণ দেখিয়েছেন আরেকজন ডেমোক্রেটিক লিডারের প্রতি, ফরমার প্রাইম মিনিস্টারের প্রতি- এজন্য আমরা তাকে ধন্যবাদ জানাই।
বেগম জিয়ার বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে ফখরুল বলেন, এই বিষয়টা নির্ভর করছে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চাওয়া এবং সরকারের দেয়ার ওপর। বেগম জিয়া যদি যেতে চান এবং সেটা যদি পরিবারের পক্ষ থেকে বা আমাদের পক্ষ থেকে যে পক্ষই হোক যদি সরকারের কাছে বলে। সরকার যদি দেয়। তাহলে তো তিনি যেতে পারবেন। এখন পর্যন্ত যেটা আছে যে শর্ত। সেই শর্তে তো যাওয়ার কোনো বিষয় নাই। এখন পর্যন্ত দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কিছু বলেননি, তার পরিবারের পক্ষ থেকেও কিছু বলা হয়নি।
গত ২৫ মার্চ সরকারের নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়ার সাজা ছয় মাস স্থগিত করে তাকে মুক্তি দেন। এরপর থেকে তিনি গুলশানের বাসায় কোয়ারেইনটাইটের মধ্যে বাস করছেন। ছয় মাসের সেই মেয়াদ পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার আরো ছয় মাস বৃদ্ধি করে।
মেজর সিনহা হত্যার ফলোআপ কোথায় মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, আপনারা লক্ষ্য করে দেখবেন, এতো বড় একটা ঘটনা ঘটলো মেজর সিনহা হত্যা। কৈ? হোয়ার ইজ দ্যা ফলোআপ। আপনি মিন্নীর ফাঁসি দিচ্ছেন, অন্যান্যদের ফাঁসি দিচ্ছেন। তো এটা (মেজর সিনহা হত্যার বিষয়টা) দ্রুত সামনে আসছে না কেনো? অন দ্যা স্পট মার্ডার করা হয়েছে। এটাই কারণ যে, তারা রাষ্ট্র যন্ত্রগুলোকে পুরোপুরিভাবে নিজেদের কবজায় নিয়ে কাজ করতে চাইছে। কাউকে অখুশি করতে চায় না। তিনি বলেন, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আজকে অবণতিটা কেনো? যারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিত লক্ষ্য রাখবে তারা তো সরকারের কাছে কোনো দায়বদ্ধতা নাই তো। তাদের জন্য সরকার টিকে আছে।
সীমান্তে মিয়ানমারের সেনা সমাবেশের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারকে ‘আন্ত:আঞ্চলিক কূটনৈতিক’ উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, সরকারের দুর্বল পররাষ্ট্রনীতি আজ মিয়ানমারের কাছে স্পষ্ট। এর পরিপূর্ণ সুযোগ গ্রহন করেই মূলত মিয়ানমার সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ অযাচিত ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাংলাদেশ-মিয়ানমার আন্তর্জাতিক সীমান্তে সেনা সমাবেশ করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে। বিএনপির পক্ষ থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এহেন সেনা সমাবেশের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাই। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এই ধরনের অপততপরতা রুখতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণপূর্বক আন্তঃআঞ্চলিক কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের পদক্ষেপ করতে বর্তমান নতজানু সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
ফখরুল বলেন, কেনো আজকে এ্রখানে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আমরা কথা বলছি। এই দেখেন না- সৈন্য সমাবেশ করছে। আজকে ভারত-চীন সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ হয়-এটা নিয়ে তোলপাড় হয়ে যায়। আমাদের সরকারের কোনো কথা নেই। তারা একবারে চুপচাপ থেকে নিরাপত্তা পরিষদে একটি চিঠি দিয়েছে। এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ এই সরকার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে নিতে পারেনি।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বিতাড়িত হয়ে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বাংলাদেশে সরকারের ব্যর্থতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা গণহত্যা ও জাতিগত নিপীড়ন-নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার তিনবছর পূর্তির প্রাক্কালে সীমান্তে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সমাবেশের ততপরতা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিক ফলাফল মাত্র। প্রায় ১২ লক্ষাধিক (গণমাধ্যমে প্রকাশিত) শরণার্থী সমস্যার সমাধানে যে ধরনের সমন্বিত বহুমুখী তৎপরতা নেয়া অত্যাবশ্যক ছিলো যা এই গণবিচ্ছিন্ন সরকার নিতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। এই সমস্যার সমাধানে আমরা বৈশ্বিক, আঞ্চলিক ও দ্বিপাক্ষিক সকল স্তরেই ব্যর্থ হচ্ছি। বর্তমান গণবিচ্ছিন্ন সরকারের নতজানু পররাষ্ট্র নীতির সুযোগে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান আজকে কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। কারণ হচ্ছে, সরকারের চরম ব্যর্থতা তারা তাদের বন্ধুদেশগুলোকে তাদের পক্ষে নিয়ে আসার ব্যাপারে ব্যর্থ হয়েছে।
ফখরুল বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠী। বিশ্বের মানচিত্রে এই জনগোষ্ঠীকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে অবশ্যই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনায় বেসামরিক তদারকিতে মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলকে একটি নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করে যথাযথ নাগরিক অধিকার ও মর্যাদায় রোহিঙ্গাদের নিজ দেশের আবাসভূমিতে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার কোনো বিকল্প নাই। আর সেটা কেবল তখনই সম্ভব হবে, যখন বাংলাদেশের নেতৃত্বের যাবতকালের সকল দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগকে রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীরকে বাঁচাতে এক সুতোয় বাঁধা সম্ভব হবে। এই সমগ্র প্রক্রিয়া কেবল তখই সম্ভব যখন বাংলাদেশের মানুষ তার অধিকার ফিরে পাবে। এদের মানুষ তার অধিকার নির্ভয়ে, নির্ভিঘ্নে প্রয়োগের মাধ্যমে জনগনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে। যার মাধ্যমে বর্হিবিশ্বে দূরীভূত হবে বাংলাদেশের প্রতি আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতার সংকট। এগিয়ে আসবে বিশ্ব বিবেক অধিকতর মানবিক হৃদয় নিয়ে রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর সমস্যা সমাধানে আর দেশ মুক্তি পাবে অনিশ্চিত সমাধানের হাত থেকে।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, সরকারের প্রতি আবারো আহ্বান জানাই, রোহিঙ্গা সমস্যা দূর করতে হলে জাতীয় ঐক্যমতের ভিত্তিতে মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিন, গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত করুন, বর্হিবিশ্বে দেশের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করুন। ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় কেন্দ্র স্থাপনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, কোনো একটা পত্রিকায় ছাপা হলো যে, স্থায়ীভাবে শরণার্থীদের বসবাসের জন্য ভাসানচরে একটি সিটি গড়ে তোলা হয়েছে। অর্থাৎ রোহিঙ্গারা স্থায়ীভাবে এখানে থাকবে সেই বিষয়টা বোধহয় সরকার নিশ্চিত করছেন। স্থায়ীভাবে তাদেরকে রেখে বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণের জন্য তো নয়। এটা যে বাংলাদেশের মানুষের কত বড় যে সমস্যা তা আপনার কিছুদিন পরে আমরা অনুধাবন করতে পারবো। এটা একটা আন্তর্জাতিক চক্রান্ত বলে আমরা মনে করি। এখনই যদি সরকার এটাকে (রোহিঙ্গা সমস্যা) অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে অগ্রাধিকারভাবে বিবেচনায় না নিয়ে আসে জাতিসংঘে তাহলে কিন্তু এটা বাংলাদেশের জন্য একটা ভয়ানক বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার শাসনামলে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে যেসব চুক্তি করা হয়েছিলো তাকে সামনে নিয়ে চুক্তি করা হলে এর সমাধান হতে পারে উল্লেখ করে ফখরুল বলেন, এই সরকার তো সেটা করছে না। তারা তো করছে একেবারে নিজেদের স্বার্থে। আজকে যে মিয়ানমারের কাছে তারা (সরকার) নতজানু হয়ে গেছে এটার কারণ হচ্ছে এই সরকারের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোনো অবস্থান নেই। বিশেষ করে যে দুইটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব যারা প্রভাব বিস্তার করে মিয়ানমারের উপরে- চীন ও ভারত। এই দুইটি রাষ্ট্রই কিন্তু এই বিষয়ে একেবারে নেগেটিভ অবস্থানে। বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্যটাই হচ্ছে ক্ষমতায় টিকে থাকা যেনতেনো ভাবে। নিজের দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌত্ব চলে যাক তাতে কোনো অসুবিধা নেই। দেখুন আমাদের সীমান্তে মানুষ হত্যা হয় একটা প্রতিবাদ পর্যন্ত তারা সঠিকভাবে করে না। যেসব চুক্তি-টুক্তি হয়েছে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করে না। তারা (আওয়ামী লীগ) রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ