বুধবার ২০ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

অস্ত্রধারী কিশোরদের ‘গ্যাং কালচার’ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে

নাছির উদ্দিন শোয়েব : সাভারে এক স্কুলছাত্রীকে ভাইয়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যা এবং বরগুনায় আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার রায়ের পর আবারও আলোচনায় এসেছে ‘কিশোর গ্যাং’। অস্ত্রধারী কিশোরদের ‘গ্যাং কালচার’ দিন দিন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে । গ্যাং কালচার গড়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। পাড়া-মহল্লায় নানা নামে কিশোররা সংঘবদ্ধ গ্রুপ করে অপরাধ করছে। বড় ধরনের অপরাধ করলেই কেবল সেটি আলোচনায় আসে। কিন্তু উঠতি বয়সি বখাটে কিশোরদের হাতে বিভিন্ন সময় নাজেহাল হতে হচ্ছে স্কুল-কলেজগামী সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের। প্রশ্ন হচ্ছে- কিশোরদের অবাধে অপরাধ করার সুযোগ করে দিচ্ছে কারা? কারা এদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দাতা? আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও এ নিয়ে উদ্বিগ্ন। অভিভাকরাও চিন্তিত।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার নানা উপাদান এখন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে বিদ্যমান। দেশের সামাজিক অবস্থা, দুর্নীতি, অপরাধ, রাষ্ট্রীয় এবং পরিবারের মধ্যে যে অপরাধের বীজ রয়েছে কিশোররা তার বাইরে নয়। বরগুনার নয়ন বন্ড ছিলেন রিফাত হত্যা মামলার প্রধান আসামি। ২০১৯ সালের ২৬ জুন রিফাত হত্যার পর দেশজুড়ে আলোচনায় আসে নয়ন বন্ড ও তার ০০৭ গ্রুপের নাম। একই বছরের ২ জুলাই পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় নয়ন। রিফাত হত্যা মামলায় পুলিশ যে অভিযোগপত্র দেয়, তাতে বলা হয়, নয়ন বন্ডের গড়ে তোলা ‘০০৭’ নামে মেসেঞ্জার গ্রুপে ১০৬ জন সদস্য ছিল। কিন্তু রিফাত হত্যাকাণ্ডে এই বাহিনীর ২৩ জন আসামি হয়। তাদের মধ্যে ১৪ জন কিশোর। এরা স্কুলপড়ুয়া। বাহিনীটির দ্বিতীয় প্রধান ছিলেন নয়নের প্রধান সহযোগী ও রিফাত হত্যা মামলার ২ নম্বর আসামি রিফাত ফরাজী। আর কিশোরদের সমন্বয় করত রিফাত ফরাজীর ছোট ভাই রিশান ফরাজী। রিশান ফরাজীও রিফাত হত্যা মামলার কিশোর আসামিদের মধ্যে ১ নম্বর। এই বাহিনীর বাকি সদস্যদের ব্যাপারে পুলিশের কাছে কোনো তথ্য নেই।
রিফাত হত্যামামলার রায়ের পর সাজাপ্রাপ্ত কয়েকজন আসামির অভিভাবক-আক্ষেপ করে বলেছেন-‘আমাদের সন্তানদের যারা পথভ্রষ্ট করেছে, যারা নেপথ্যে ইন্ধন দাতা তারা ধরা ছোয়ার বাইরে। কারা এতই প্রভাবশালী যে তাদের নাম আলোচনায় আসছে না। রাজনৈতিক দলের যেসব নেতা ক্ষমতার দাপটে কিশোর ছেলেদের ব্যবহার করেছে তারা আজ কোথায়? তাদের কারণেই ছেলেরা ঘরের বাইরে গিয়ে নির্দ্বিধায় অন্যায়-অপরাধ করতে সাহস পেয়েছে। তারাই কিশোরদের হাতে মাদক তুলে দিয়ে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দিয়েছে।’
সর্বশেষ গত ২০ সেপ্টেম্বর ঢাকার সাভারে প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় স্কুলছাত্রী নিলা রায়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নিলার ভাই অলক রায়ের দাবি, মিজানুর রহমান চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি বখাটে হাতে ছুরি নিয়ে নিলাকে কুপিয়ে হত্যা করে। নিলা মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার বালিরটেক গ্রামের নারায়ণ রায়ের মেয়ে। সে পরিবারের সঙ্গে পৌর এলাকার কাজী মোকমাপাড়ায় শীতল ভিলায় ভাড়া থেকে স্থানীয় অ্যাসেড স্কুলের দশম শ্রেণিতে লেখাপড়া করত। হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত মিজান পরিত্যক্ত ওই বাড়ির মালিক আবদুর রহমানের ছেলে বখাটে মিজান। মিজান তার পরিবারের সঙ্গে একই এলাকার টগর ভিলায় ভাড়া থাকে ও স্থানীয় এক কলেজের ছাত্র। নীলা হত্যার মূল আসামি মিজানুর রহমান ও তার দুই সহযোগীকে পুলিশ এরই মধ্যে আটক করেছে। মিজানুরের নেতৃত্বে ওই এলাকায় একটি কিশোর গ্যাং অপরাধ করে আসছিল দীর্ঘদিন ধরে। তারা মাদক ব্যবসায়ও যুক্ত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এলাকায় দাপিয়ে বেড়াতো তারা। মোটর সাইকেলে মহড়া দিতো। তাদের মূল গডফাদার স্থানীয় এক যুবলীগ নেতা। মূলত তার মাদক ব্যবসা এবং নানা অপরাধকর্মে সহযোগিতার জন্যই মিজানুর এই গ্যাংটি গড়ে তোলে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর রিফাত শরীফ হত্যার ঘটনায় আলোচনায় আসে বরগুনার নয়ন বন্ড গ্রুপ্য এবং ওই এলাকার একটি কিশোর গ্যাং। তারাও মাদকসহ নানা অপরাধে জড়িত ছিল। তাদের আলাদা ফেসবুক গ্রুপও ছিল। সেই গ্রুপে আহ্বান জানিয়েই তারা রিফাতকে হত্যা করেছিল। তাদেরও গডফাদার বা পৃষ্ঠপোষকদের নাম প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু তারা কেউ আইনের আওতায় আসেননি।
জানা গেছে, গত ১৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের ইস্পাহানী এলাকায় কিশোর গ্যাং দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের কারণে স্থানীয় দুই কিশোর ১৮ বছরের কলেজছাত্র নিহাদ ও ১৫ বছরের নবম শ্রেণির স্কুলছাত্র জিসান শীতলক্ষ্যা নদীতে ঝাঁপ দিলে তাদের মৃত্যু ঘটে। ২৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর হাতিরঝিলে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে খুন হয় হাসনাত শিপন নামের এক তরুণ। গত বছরের ২০ ডিসেম্বর সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বের জের ধরে মুগদায় মাণ্ডার ল্যাটকার গলি বালুর মাঠে ছুরিকাঘাতে খুন হয় তরুণ মাহিন হোসেন। ১৮ নভেম্বর মিরপুরের শাহ আলী স্কুলের পেছনে কিশোর গ্যাংয়ের ছুরিকাঘাতে আহত হয় শিক্ষার্থী আরাফাত হোসেন রিফাত ও শাহেদ। গত ৩০ আগস্ট রাজধানীর ওয়ারীতে পূর্ব বিরোধের জেরে আশুরার দিন ছুরিকাঘাতে মো. মুন্নাকে (১৭) খুন করা হয়। এ বিষয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে ওয়ারীর উপপুলিশ কমিশনার শাহ ইফতেখার আহমেদ জানান, ঘটনার পর ১৩ কিশোরসহ ১৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শাহ ইফতেখার আহমেদ জানান, গত বছর আশুরার দিনে মুন্না ও তার বন্ধুদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয় বাপ্পি, সায়েম ও ফেরদৌস নামে স্থানীয় কিছু কিশোরের। এবার আশুরার দিন সন্ধ্যায় পূর্ব শত্রুতার জেরে মুন্নাদের ওপর হামলা করে বাপ্পি ও সায়েমরা। রাজধানী সুপার মার্কেটের সামনে মুন্নাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় তার সঙ্গে থাকা খালাতো ভাই শাহিন গুরুতর জখম হন।
পুলিশ সূত্র জানায়, রায়েরবাজার এলাকায় ইয়াসিন আরাফাত (১৬) নামের এক কিশোর খুন হয় বাংলা ও লাভলেট নামে দুটি গ্রুপের বিরোধে। বাংলা গ্রুপের প্রধান সাখাওয়াত হোসেন সৈকত ওরফে বাংলা বয়সে বড় এবং এলাকার ক্যাডার বলে পরিচিত। গত বছরের ৪ সেপ্টেমর মোহাম্মদপুরে আতঙ্ক গ্রুপ গ্যাং স্টার থেকে সরে আসার কারণে ফিল্ম ঝিরঝির গ্রুপের সদস্য চাইল্ড হ্যাভেন ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র মহসিনকে (১৬) হত্যা করা হয়। এর আগে ২৮ জুলাই মোহাম্মদপুর থেকে লাড়া দে গ্রুপের প্রধান তামিমুর রহমান মিম, লেভেল হাই গ্রুপের প্রধান মানিককে গ্রেফতার করা হয়, যাদের বয়স ২০ বছরের ওপরে। এরআগে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে গ্যাং কালচারে শিকার হন উত্তরার একটি স্কুলের ছাত্র আদনান কবির। তাকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। সেই ঘটনা পুরো দেশে তোলপাড় ফেলে দেয়। উঠে আসে একের পর এক কিশোর গ্যাংয়ের নাম। তাদের অপকর্মের কাহিনী। র‌্যাব-পুলিশ নানা নামের সেইসব কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযানে নামে। আটক করা হয় শত শত কিশোরকে।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, রাজধানীতেই ৬২টি কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব পেয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে ৪০টির বেশি গ্রুপ এ মুহূর্তে সক্রিয় আছে। প্রতিটি গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ জন। এদের বয়স ১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। উত্তরা, ধানমণ্ডি, তেজগাঁও, কাফরুল, মোহাম্মদপুর, তুরাগ, নিউমার্কেট ও গাজীপুরের জয়দেবপুর এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেশি। সারা দেশে কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা সহস্রাধিক। কারাবন্দি শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের সহযোগীরা ঢাকার জিগাতলা ও রায়েরবাজারে একটি চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। স্থানীয় যুবলীগ নেতা হেজ্জাজ বিন আলম, জিগাতলা নতুন রাস্তা এলাকার ভাইগ্না রনি, মিতালী রোডের রুবেল, ধানমণ্ডির তাহাজ্জিব, বাস্টার্ড সেলিম, হাসান আসিফ হোসেন, শরীফ ইসলাম, ইমাম হোসেন প্রতীক ওরফে শুভ, মেহেদী হাসান অনিকসহ কয়েকজন সন্ত্রাসীর নিয়ন্ত্রণে আছে অর্ধশতাধিক কিশোর ও তরুণ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ