মঙ্গলবার ২৬ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

নজরুল সাহিত্যে নারী

এ কে আজাদ : (গত সংখ্যার পর) নজরুলের প্রেম নিবেদন বিংশ শতকের অপরাপর কবিদের থেকে বেশ খানিকটা ভিন্ন। এক্ষেত্রে একটা আলালাদা পথ তৈরী করে নিয়েছিলেন নজরুল। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর গানে লিখেছেনঃ

মনে রবে কিনা রবে আমারে/ সে আমার মনে নাই মনে নাই। 

ক্ষণে ক্ষণে আসি তব দুয়ারে/ অকারণে গান গাই। 

এখানে কবি গুরুর আপ্লুত হৃদয়ে যে প্রেম নদীর ঢেউয়ের মতো ছলাৎছল করে উথলে উঠেছিল, সে প্রেম তাঁর প্রেয়সীর মনে স্থান পাবে কি পাবে না, তা নিয়ে যেন সংশয় কবির মনে। খানিকটা দ্বিধায়, খানিকা লাজে কবির মনটা যেন জড়াগ্রস্থ। অথচ প্রেমের কবি নজরুল গাইলেন- ভুলতে চাইলেও তাঁর প্রেয়সীকে ভুলতে দেবেন না তাঁকে ঃ

আমি চির তরে দূরে চলে যাব/ তবু আমারে দেবনা ভুলিতে,

আমি বাতাস হইয়া জড়াইব কেশ/ বেণী যাবে যবে খুলিতে 

তোমার সুরের নেশায় যখন/ ঝিমাবে আকাশ কাঁদিবে পবন 

রোদন হইয়া আসিব তখন/ তোমার বক্ষে দুলিতে।

তাঁর সমসাময়িক আরেকজন রোমান্টিক কবি জীবনানন্দ যখন তাঁর প্রেয়সীর কাছে খুঁজে পেলেন দু’দন্ড শান্তি। তখন তিনি বিস্ময়ে বলে উঠলেন- “চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা”। 

একটা রহস্যময়তা যেন জীবনানন্দের প্রেয়সীর কেশে। অপর পক্ষে প্রেয়সীর কেশের গন্ধে ব্যকুল হয়ে উঠলো নজরুলের উচাটন মন। কবির হৃদয় ফেঁসে গেলো প্রেয়সীর খোঁপার বাঁধনে। প্রেয়সীর প্রেমে তিনি যেন অন্ধ। কবির অন্ধ প্রেম যেন শক্ত-পোক্ত হয়ে এঁটে যায় প্রেয়সীর চুল বাঁধা জরিন ফিতায়। তাই তো প্রেয়সীর কাছে কবির নিবেদনঃ

আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন/ দিল ওহি মেরা ফাস গায়ি,

বিনোদ বেণীর জরিন ফিতায়/ আন্ধা ইশ্ক্ মেরা কাস্ গায়ি। 

তোমার কেশের গন্ধে কখন/ লুকায় আসিলো লোভী আমার মন 

বেহুঁশ হো কার গিরপারি হাথো ম্যায়/ বাজু বান্ধ ম্যায় বাস গায়ি।

রবি ঠাকুরের প্রেম অনেক ক্ষেত্রেই আদর্শায়িত। বহু ক্ষেত্রেই তা পূজার স্তরে উন্নীত। রবীন্দ্রনাথের আত্মনিবেদন ও প্রশান্তি নজরুলের প্রেমের কবিতায় নেই। নজরুলের প্রেমাঙ্খা সাধারণ মানুষের পর্যায়ের। তিনি নারীকে শ্রদ্ধা করেছেন, তার সম্মান অধিকার দাবী করেছেন। এমন কি বারাঙ্গনাকে মা বলে ডেকে তাকে মাতৃত্বের সম্মান দিতেও কুন্ঠা বোধ করেননি তিনি। জীবন ও সাহিত্যে নজরুলের কোন বিরোধ নেই। তাঁর কাছে জীবনই সাহিত্য, সাহিত্যই জীবন। তিনি স্বীকারও করেছেন সে কথাঃ  

বড় কথা বড় ভাব আসে না মাথায় বন্ধু বড় দুখে 

অমর কাব্য তোমরা লিখিও বন্ধু যাহারা আছ সুখে। [আমার কৈফিয়ত।]

যা হোক নারীর প্রেমে নজরুলও বড় কোমল হয়ে উঠেছেন। কখনো বিগলিত হৃদয়ের ভাষা বাণী লাভ করেছে তাঁর কবিতার পয়ারেঃ

আমি গোপন প্রিয়ার চকিত চাহনী/ ছল করে দেখা অনুক্ষণ 

আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা/ তার কাঁকন চুড়ির কঙ্কন

আমি চির শিশু, চির কিশোর

আমি যৌবন ভীতু পল্লী বালার আঁচর কাঁচুলী নিচোর। [বিদ্রোহী]

কখনো নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করেছেন কবি তাঁর প্রিয়ার কাছে, কখনো প্রেয়সীকে সাজিয়েছেন তারার ফুলে, কখনো বিদ্রোহী কবির উচ্চ শির প্রিয়ার কোলে রেখে হয়েছেন ধন্য। চির দ্রোহী অন্তর তাঁর প্রশান্ত সমাপ্তিতে হয়েছে আনন্দে ভরপুরঃ

হে মোর রানী! তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে

আমার বিজয় কেতন লুটায় তোমার চরণ তলে এসে। [বিজয়িনী]

প্রিয়ার মলিন বসনে সে যেন কবির কাছে হয়ে উঠেছে আরও আদরিনীঃ

তুমি মলিন বাসে যখন থাক সবার চেয়ে মানায়!

তুমি আমার তরে ভিখারিনী সেই কথা সে জানায়। 

-----

দেবী! তুমি সতী অন্নপূর্ণা, নিখিল তোমার ঋণী,

শুধু ভিখারীকে ভালোবেসে সাজলে ভিখারিনী। [সাধের ভিখারিনী]

 

বেদনা ক্লিষ্ট প্রেয়সীর গহনা-গাটিহীন দেহাবয়ব কবির কাছে হয়ে উঠেছে সোনা। প্রেয়সীর সান্নিধ্যে আল্পুত কবি। শান্তনার বাণী তাঁর লাভ করে ছন্দের হিমালয়, প্রেয়সীর মলিন দেহ কবির কাছে হয়ে উঠে সোনার মত দামী। প্রেয়সীর ব্যথায় ব্যথিত কবির অন্তরে আঁকা হয় আবেগের আল্পনা। বলে ওঠেন কবি- 

নয়ন ভরা জল গো তোমার/ আঁচল ভরা ফুল, 

আমি জল নেব না ফুল নেব/ ভেবে হই আকুল। 

কিংবা 

আমি জানি তুমি কেন যে নিরাভরণা, 

ব্যথার পরশে হয়েছে তোমার সকল অঙ্গ সোনা। [ভীরু]

প্রিয়ার ভালোবাসার দানে কবি হয়েছেন সিক্ত। ভালোবাসার জোয়ারে কবির হৃদয় ভেসে গেছে অজানার পানে। বিচিত্র রূপিনী রমণীর প্রেমের আগুনে পুড়তে পুড়তে কবি নিজেই যেন হয়ে উঠেছেন নিখাদ সোনা। পরিপূর্ণ ভালোবাসার দানে মুগ্ধ নজরুল ক্রমে ক্রমে হয়ে উঠেছেন কবি। কবির সে রূপ কেবল মনেই নয়, বহিরাবরণেও। তাই তাঁর স্বীকারোক্তিঃ 

তুমি আমায় ভালোবাস তাই তো আমি কবি,

আমার এ রূপ সে যে তোমার ভালোবাসার ছবি। [কবি রানি]

‘নারী’ কবিতায় তিনি লিখেছেন-

নারীর বিরহে নগারীর মিলনে নর পেল কবি প্রাণ,

যত কথা তার হইলো কবিতা শব্দ হইল গান। 

হ্যাঁ তিনি কবি হতে পেরেছেন, না না তিনি কবি হয়েই জন্মেছিলেন। তাই তো তিনি অনায়াসেই বুঝতে পারতেন মানুষের মনের ভাষা, বুঝতে পারতেন মানুষের চোখের ভাষা। প্রেয়সীর চোখের পাতায় পড়তে পারতেন হৃদয়ের কোণে লুকিয়ে থাকা কথামালা। শুধু তাই নয়, ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডস্ ওয়ার্থের মত প্রকৃতির মাঝে তিনিও খুঁজে পেয়েছেন প্রেয়সীর মুখ, তার চোখ, চোখের কাজল রেখা। প্রেমিক চোখে বৃক্ষের পাতার ফাঁকে খুঁজে পেয়েছেন প্রেয়সীর অনুপম অঙ্গের ভাঁজ। নদীর ঢেউয়ের মাঝে আবিষ্কার করেছেন প্রেয়সীর অশ্রুমতী চোখ। নিজের স্পর্শকাতর অনুভূতির ছান্দসিক প্রকাশ কবির কবিতায়ঃ

তোমার পাতায় দেখেছি তাহারি আখির কাজল রেখা, 

তোমার দেহের মতন দীঘল তাহার দেহের রেখা। [বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি]

কিংবা 

তুমি কি পদ্মা, হারানো গোমতী, ভুলে যাওয়া ভাগিরথী,

তুমি কি আমার বুকের তলায় প্রেয়সী অশ্রুমতী? [কর্ণফুলী]

নজরুলের কাব্যে কেবলই নারী কল্পনা কিংবা নারী পুরুষের আদি সম্পর্কের বিষয়ই স্থান পায়নি, তাঁর কবিতায় প্রেমিকের জন্য নারী হৃদয়ের চিরন্তন ব্যাকুলতাও করে নিয়েছে নিজের স্থান। দেশ কাল পাত্র ভেদে প্রেমিকের সফলতা কিংবা তাঁর বিজয়ের জন্য নারী হৃদয়ের শুভ কামনা চিত্রিত হয়েছে খালেদ কবিতায়ঃ

খর্জুর বিথী আজিও ওড়ায় তোমার জয় ধ্বজা, 

তোমার আশায় বেদুঈন বালা আজিও রাখিছে রোজা। 

অপর পক্ষে প্রিয়জনের পরাজয়ে কিংবা প্রিয় বিয়োগের বেদনায় নারীর ব্যথাতুর হৃদয়ের মাঝে বেজে ওঠে বেহাগের সুর। চিরকালের নারী হৃদয়ের এমন আকুতির প্রতিচ্ছবি কবি নজরুলের কবিতায়ঃ

মা ফাতেমা আসমানে কাঁদে খুলি কেশ পাশ,

বেটাদের লাশ নিয়ে, বধূদের শ্বেতবাস। 

রণে যায় কাসিম ঐ দু’ঘড়ির নওশা 

মেহেদীর রংটুকু মছে গেল সহসা। 

হায়! হায়! কাঁদে বায় পূরবী ও দখিনা, 

কঙ্কন পঁইচি খুলে ফেলে সখিনা। [মোহররম]

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) যখন নবুওয়াত লাভ করেন, সে সময় যিনি প্রথম মুসলমান হিসেবে কালেমা পড়েছিলেন, তিনি হলেন মহানবীর প্রিয়তমা স্ত্রী হযরত খাদিজা (রাঃ)। তিনি নিজের ধন সম্পদ সব কিছু বিলিয়ে দিয়ে স্বামীর আদর্শ বাস্তবায়নের এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে নিজের নাম ইতহাসের পাতায় লিখিয়েছেন স্বর্ণাক্ষরে। পুরুষের বিজয়ের পেছনে নারীর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাই তো নজরুলের কন্ঠে মহিয়ষী নারী খাদিজার বন্দনা তাঁর মরু ভাস্কর কবিতার পয়ারেঃ

সাধ্বী পতিব্রতা খাদিজাও কহেন স্বামীর সনে,

দূর কর ঐ লাত মানাতেরে পূজে যাহা সব জনে। 

তব শুভ বরে একেশ্বর সে জ্যোতির্ময়ের দিশা,

পাইয়াছি প্রভু কাটিয়া গিয়াছে আমার আধার নিশা। 

অর্থাৎ নজরুল সাহিত্যে যে নারীকে উপস্থাপন করা হয়েছে সে নারী অবলা নয়, অচল-অথর্ব নয়, সে নারী জ্ঞানী, সে নারী গুনী, সে নারী প্রতিবাদী, সে নারী বিদ্রোহী, সে নারী নিজের অধিকার আদায়ে সোচ্চার, সে নারী পুরুষের সহযোগী, উন্নয়নের নিত্য সঙ্গী, সভ্যতার সত্যাগ্নি আলোক বর্তিকা।  শুধু তাই নয় জগতের যে মঙ্গল, পৃথিবীর যে পরিত্রাণ, মানুষের যে মুক্তি, তার সূতিকাগারাও যেন নারী। নারী কেবল ভোগের সামগ্রী নয়, নারী কেবল ললনা নয়, এই নারীর বুকেই মানব জনম ও বেড়ে ওঠার বীজ লুকায়িত। আবার নারীই মানব সভ্যতার বিকাশে প্রথম পিলসুজ। অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বিকশিত হওয়ার যে আলোক রশ্মি, তারও উত্তরণ এবং উৎসরণ যেন নারীর কোলেইঃ

তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে

মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে,

যেন ঊষার কোলে রাঙ্গা রবি দোলে। 

কিংবা 

সাহারার বুকে মাগো তুমি মেঘ মায়া,

তপ্ত মরুর বুকে স্নেহ তরু ছায়া। 

এক দিকে যেমন প্রেয়সী বলে নারীর গলা জড়িয়ে ধরেছেন নজরুল, আনন্দে হয়েছেন গদগদ, তেমনি খুশির ছলকে ছলকে প্রেয়সীর খোঁপায় পরাতে চেয়েছেন তারার ফুল; তার কানে দোলাতে চেয়েছেন ‘তৃতীয়া তিথির চৈতী চাঁদের দুল’। আবার মা বলে লুটিয়ে পড়েছেন নারীর পায়ে। নারীকে কল্পনা করেছেন তার কাঙ্খিত বিপ্লবের প্রেরণাসঙ্গী হিসেবে। আবার নারীকে কেন্দ্র করে মান অভিমানও কম নেই নজরুলের কাব্য ছন্দের দ্যোতনায়। নারীকে যেমন ভালোবেসে বুকে টেনে নিয়েছেন, শ্রদ্ধায় মাথায় তুলে নিয়েছেন, তেমনি আবার ফুল তুলতে গিয়ে কেঁদেছেন কাঁটার আঘাতে। নারীর বিশ্বাসঘাতকতায় বেদনায় হয়েছেন মুহ্যমান। অভিযোগের তীরে নারীকে করেছেন বিদ্ধ। নারীর কাছে পুরুষের চিরন্তন আবেদনময় ভঙ্গিতে নজরুল বলেছেন- 

প্রিয়া হয়ে এলে প্রেমে, বধূ হয়ে এলে না অধরে 

দ্রাক্ষা বুকে রহিলে গোপনে তুমি শিরীন শরাব

পেয়ালায় নাহি এলে। [অনামিকা]

নারীকে কাছে না পাওয়ার বেদনায় বিষিয়ে ওঠে প্রেমিকের মন। আশাহত হৃদয়ের কোণে বেজে ওঠে ব্যথাতুর বীণ। আগুনে কখনো হৃদয় পুড়ে হয় ছারখার। মনের অজান্তেই ভালোবাসা হয়ে ওঠে অভিশাপের কাল বৈশাখীঃ

গাইতে বসে কন্ঠ ছিঁড়ে আসবে যখন কান্না

বলবে সবাই- সেই যে পথিক, তার শেখানো গান না!

...................

আসবে আবার আশিন হাওয়া শিশির ছেঁচা রাত্রি, 

থাকবে সবাই, থাকবে না এই মরণ পথের যাত্রী। 

...........................

তোমার সখার আসবে যেদিন এমনি কারা বন্ধ,

আমার মতন কেঁদে কেঁদে হয়তো হবে অন্ধ। 

সখার কারা বন্ধ।

আসবে ঝড়, নাচবে তুফান, টুটবে সকল বন্ধন

কাঁপবে কুটির সেদিন এসে, জাগবে বুকে ক্রন্দন

টুটবে যবে বন্ধন।  [অভিশাপ]

আবার কোন নারীকে ফিরিয়ে দিয়েও স্বস্তি পায় না প্রেমিকের অন্তর। সে অন্তর্দাহনও ভাষা লাভ করেছে কাজী নজরুলের কবিতায় পয়ারেঃ 

অনেক করে বাসতে ভালো পারিনি মা তখন যারে

আজ অবেলায় তারেই মনে পড়ছে কেন বারে বারে। 

...................

জল ঝরেছে, তখনো মা কইনি কথা অহংকারে

এমনি দারুন হতাদরে করেছি মা বিদায় তারে। 

.................

ও কে দুয়ার খোলে

দুয়ার ওমা? ঝড় বুঝি মা তারই মত ধাক্কা মারে?

ঝোড়ো হাওয়া। ঝোড়ো হাওয়া, বন্ধু তোমার সাগর পারে। [অবেলার ডাক]

কাউকে বিদায় দিলেও যেমন সে ঝড় হয়ে এসে বুকের মাঝে ধাক্কা মারে, কারও অপমানে কিংবা কারও দ্বারা প্রতারিত হলেও তেমনি বুকের মাঝে রক্ত ঝরে। ব্যথার আগুনে হৃদয় পুড়ে। পুড়তে পুড়তে খাঁটি সোনা হয় মানুষের বুকের জমীন। সে জমীনে বাস করেন ‘সত্য ভগবান’ঃ 

মোর বুকে জাগিছেন অহরহ সত্য ভগবান,

তাঁর দৃষ্টি বড় তীক্ষ্ম, এ দৃষ্টি যাহারে দেখে

তন্ন তন্ন করে খোঁজে দেখে তার প্রাণ।  [পূজারিনী]

জীবন জগতকে কবি দেখেছেন ‘সত্য ভগবান’ রূপে। ফলে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই গড়ে উঠেছে তাঁর জীবন দর্শন। নারীকে কেন্দ্র করে অনেক কবিই কবিতা লিখেছেন। তুলে ধরেছেন নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি। কাজী নজরুল ইসলামও কম কিসে? নারীর দক্ষতা যোগ্যতা ও মাতৃত্ব শক্তির প্রশংসায় যেমন পঞ্চমুখ হয়েছেন কবি, তেমনি আবার নারীর ছলনাকে করেছেন তুচ্ছ তাচ্ছিল্য। লালায়িত ললনার ছলনাকে এক হাত দেখাতেও ছাড়েননি তিনি। তিনি লিখেছেনঃ 

এযে সেই চিরপরিচিত অবহেলা/ এযে সেই চির ভাবহীন মুখ

পূর্ণা নয়, এযে সেই প্রাণ নিয়ে ফাঁকি/ অপমানে ফেটে যায় বুক। 

প্রাণ নিয়া এ কি দারুন খেলা খেলে এরা হায়, 

রক্ত ঝরা রাঙা বুক দলে অলক্তক পরে এরা পায়। 

এরা দেবী, এরা লোভী, এরা চাহে সর্বজন প্রীতি,

ইহাদের তরে নহে প্রেমিকের পূর্ণ পূজা, পূজারীর পূর্ণ সমর্পণ,

পুজা হেরি ইহাদের ভীরু বুকে তাই জাগে এত সত্যভীতি। 

নারী নাহি হতে চায় শুধু একা কারো,

এরা দেবী এরা লোভী, যত পূজা পায় এরা চায় তত আরো

ইহাদের অতি লোভী মন/ একজনে তৃপ্ত নয়, এক পেয়ে সুখী নয়/ যাবে বহুজন। [পূজারিনী]

উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে এ কথাই প্রতীয়মান বলে মনে হয় যে, নজরুল-সাহিত্যে কঠোরতা ও কোমলতার এক চমৎকার সম্মিলন ঘটেছে। এই বৈপরীত্যের মাঝখানে এসে তাঁর সৃষ্ট নারী সাহিত্যাঙ্গণে অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। নজরুলের নারী কোথাও হৃদয় রাজে ঐশ্বর্যমন্ডিত মহাশক্তিধর একক সম্রাজ্ঞী, কোথাও প্রেম বিরহের সম্মিলনে সুখ দুঃখের প্রিয়া, কোথাও কিশোরী সলাজ বধু, কোথাও মমতাময়ী মা, কোথাও বিদ্রোহ-বিপ্লবের সাহসী সঙ্গীনী, কোথাও প্রথম পরশের কম্পিত কুমারী, আবার কোথাও হৃদয়হীনা, অীবশ্বাসী এক নিষ্ঠুর প্রেমিকা। তবে তাঁর সৃষ্ট নারী দর্শনের ভারে নুব্জ নয়, কিংবা বাহুল্য চিত্রণে অস্বাভাবিক চরিত্রও নয়। 

নজরুল সাহিত্যে নারী যা তা-ই। কল্পলোকের অতিমানবী নয়, আবার লাঞ্চনা, গঞ্জনার যাঁতাকলে পিষ্ঠ অস্পৃশ্য কোন জীবও নয়। নজরুলের সিক্ত হৃদয়ের জলাভূমিতেই নারী-প্রেম ও নারী-ভক্তির জন্ম ও বেড়ে ওঠা। নারী হৃদয়ের ভালোবাসা কেবলই কুহেলিকা নয়, আলেয়া নয়; এ আলোও ছড়ায়। যদিও নজরুল নিজেই তার ‘ব্যাথার দান’-এ বলেছিলেন- ‘দুনিয়ার সবচেয়ে মস্ত হেয়ালী হচ্ছে মেয়েদের মন’। তার পরেও নজরুল কেবলই যুক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে নারীকে বিবেচনা করেননি, অবুঝ হৃদয়ের সবুজ ভালোবাসার জন্যও নারীকে তিনি ভাসিয়েছেন উত্তাল যমুনার জলে ভেসে চলা রঙিন সাম্পানে। তাঁর সৃষ্ট নারীতে আবেগ আছে, ভালবাসা আছে, কান্না আছে, বীরত্বের সাহস আছে, বঞ্চনার জ্বালা আছে, ঈর্ষা আছে, হিংসা-প্রতিহিংসা আছে, আছে ঘাত-প্রতিঘাত। নজরুল সাহিত্যের নারী কেবলই হৃদয় সর্বস্ব নয়, দেহের পসরা আছে, প্রকৃতির ব্যঞ্জনা আছে, আছে স্বপ্নের বিভোরতা। দোষ গুণে এক স্বাভাবিক নারীই নজরুল সাহিত্যের উপাদান। সমাজ সচেতন কবি নজরুল ইসলাম যখন নারীর আঁচলে ধরা পড়েছেন তখন হয়ে উঠেছেন চরম ভাব প্রবণ, আবার যখন নারীর বিরহে বেদনা ক্লিষ্ট হয়েছেন, তখন নারীকে করেছেন অভিশাপের বাণীতে জর্জড়িত। তাঁর নারী সুন্দরী, প্রেমিকা, তাঁর নারী মা, আবার কখনো লোভী, ছলনাময়ী। প্রকৃতপক্ষে কাজী নজরুল ইসলাম একজন স্বাভাবিক ও সামাজিক নারীর চরিত্রই চিত্রায়ন করেছেন তাঁর অমর সাহিত্যে। নজরুল শিখিয়েছেন প্রেম ভালবাসা, শ্রদ্ধা ও ভক্তি। আমরা যখন নারীর প্রেমে পড়ব, তখনও আমাদের যেতে নজরুলের কাছে। যখন নারীর বিরহে কাতর হব, তখনও আমাদের ফিরে যেতে হবে নজরুলের কাছে। আমরা যখন নারী জাগরণের কথা বলব, তখনও যেতে হবে নজরুলের কাছে। আবার যখন নারীর বিজয়ে উল্লাস করব, উৎসব করব, তখনও আমাদের ফিরে যেতে হবে নজরুলের কাছে- নজরুল সাহিত্যে নারীর চিত্রায়ণ এমনই চমকপ্রদ।

(সমাপ্ত)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ