মঙ্গলবার ২৬ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

রহিমনের স্বপ্ন

আবদুল হালীম খাঁ : অগ্রহায়ণ মাস। মাঠে মাঠে পাকা ধান। বাতাসে মো মো গন্ধ ভাসছে। চাষিরা ধান কাটছে। মাথায় করে ধানের আঁটি বাড়ি আনছে। ক্ষেতে ক্ষেতে লোক। হাতে হাতে কাঁচি। দুপুরের রূপালি রোদে চাষিদের হাতের কাঁচি ঝলছে ঝকমক করছে।

ধান শুধু ক্ষেতে ক্ষেতে নয়। উঠোনে উঠোনে ঘরে ঘরে।

সবার মুখে হাসি আর গান। মনে আনন্দের ঢেউ। সবার চোখে স্বপ্ন। বুকে স্বপ্ন। নতুন দিনের নতুন আশার।

নিয়তালী পহেলা শুক্রবার থেকে ধান কাটা শুরু করেছে। শুক্রবার সপ্তাহের প্রথম বার। শুভ দিন। প্রত্যেক বছর সে শুক্রবার থেকেই ধান কাটা শুরু করে। নিয়তালীর সব ক্ষেতের ধান এক সঙ্গে পেকে গেছে। যত তাড়াতাড়ি কেটে বাড়ি আনা যায় ততই ভালো। পাকা ধান ক্ষেতে থাকলেই ক্ষতি। ইঁদুরে খায়। গরু ছাগলে খায়। পোক-পাখালিয়ে খায়। ঝরে পড়ে কিছু কিছু। নিয়তালী দুটা কামলা সঙ্গে নিয়ে ধান কাটছে।

আল্লাহর রহমতে এবার ধান খুব ভালো হয়েছে। এ জন্য নিয়তালী মনে মনে আনন্দিত। কামলার টাকার কথা ভাবছে না। সে সকালে ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামায পড়ে কামলা নিয়ে মাঠে যায়। সঙ্গে না থাকলে কামলারা কাজে ফাঁকি দেয়। আলে বসে বসে বিড়ি টানে আর গল্প করে সময় কাটায়। ঠুকা কামলাদের স্বভাব নিয়তালী ভালো করেই জানে। নাস্তার বেলা হতে না হতেই বাড়ি আসে খেতে। দুপুরে অই একই কথা। ওরা শুধু বেলার দিকে চেয়ে থাকে। গৃহস্থের কাজ হলো কিনা সে চিন্তা করে না।

নিয়তালী তাই কামলার সঙ্গে থেকে খাটিয়ে ছাড়ে। কোন কোন দিন নাস্তার বেলা ও দুপুরের খাবার সে ক্ষেতে নিয়ে যায়। বিকালে একবারে ধানের আটি নিয়ে বাড়ি আসে।

বাড়িতেও এখন অনেক কাজ। নিয়তালী শেষ রাতে ওঠে ধানের মলন দেয়। রহিমন সকালে সে মলন মারে। খেড় ছড়িয়ে শুঁকাতে দেয়। ধান উড়ায়। ধান সিদ্ধ করে। তারপর সিদ্ধ ধান উঠোনে ছড়িয়ে দিয়ে বার বার নাড়ে।

রহিমন এখন ভাত খাবারই সময় পায় না। এ কাজ ছাড়া সময় মতো রাঁধতে হয়। বড় ছেলে ইমরান কলেজে যায়। ছোট ছেলে কামরান স্কুলে যায়। ওদের তো আর কোন কাজে লাগানো যায় না। কাজে লাগালেই পড়ার ক্ষতি। নিজের যতই কষ্ট হোক ছেলেদের পড়ার ক্ষতি করতে চায় না রহিমন। নিয়তালীও না।

নিয়তালী বউয়ের কষ্ট দেখে একটা কাজের মেয়ে রাখতে বলেছিল। কিন্তু রহিমন তা রাখেনি। রহিমনের মনে হয়েছিল পনেরো বছর আগের কথা। পনেরো বছর আগে নিয়তালীর তেমন কোন আবাদি জমিই ছিল না। মাত্র দু’বিঘে জমি ছিল নদীর মধ্যে। নিয়তালী গৃহস্থ বাড়ি কামলা দিতো। আর রহিমন ধনী গৃহস্থ বাড়িতে কাজ করতো। গরুর গোয়াল সাফ করতো। কাপড় চোপড় ধুয়ে দিতো। তাতে তার খাওয়া চলতো। একটা দুটা জামাকাপড় পেতো। কখনো কিছু চাল ডাল পেতো। সে চাল রহিমন রেঁধে খেতো না। বিক্রি করে টাকা জমা করতো।

নিয়তালী প্রতিদিন কামলা দিতো। কোন দিনই বাড়িতে বসে থাকতো না। তার মধ্যে কোন আলসেমি নেই। মাঠের কাজ বন্ধ হলে সে বাড়িতে বসে বাঁশের কাজ করতো। টোপা ও ওছা বানিয়ে হাটে বিক্রি করতো। কখনো খালবিলে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করতো। এভাবে সারা বছর টাকা জমিয়ে একটু একটু করে জমি কিনে। নিয়তালীর আবাদে এখন কয়েক বিঘে ধানী জমি। নদীতে পড়ে থাকা জমিটা উঠেছে। বছরে দুই মওসুমে বেশ ধান ওঠে ঘরে। এছাড়া সরিষা, কলাই, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, আলু আবাদ করে। সারা বছর খরচ বাদে ধান ও অন্যান্য জিনিস বিক্রি বেশ পরিমাণে করে নিয়তালী।

নিয়তালী যেমন হিসাবি, রহিমনও তেমনি হিসাবি। হিসাব করে চলার জন্যই তাদের সংসারে এখন এতোটুকু উন্নতি। রহিমন তাই কাজের মেয়ে রাখেনি।

ধান কাটার মওসুমে একটু কষ্ট তো হবেই। আগে পরের বাড়িতে দিন-রাত খেটেছে। আল্লাহ এখন তাদের সুদিন দিয়েছে। পরের বাড়ি যেতে হয় না। নিজের কাজ একটু জুলুম করে করতে এমন আর কি কষ্ট!

ছেলে দুটি পড়ছে। ওদের জন্য খরচ বেড়েছে। নিজের একটু কষ্ট হলেও ওদের তো লেখাপড়া আর খাওয়া পড়ায় কষ্ট দেয়া যায় না। ওরাই তো ভবিষ্যতের আশা।

সকালে খেয়ে ছেলে দুটি স্কুল-কলেজে যায়। নিয়তালী মাঠে যায়। নিয়তালী লেখাপড়া করার সুযোগ পায়নি। বিদ্যালয়ের পরিবেশ ছিল অন্যরকম। সে কয়েক দিন স্কুলে গিয়েছিল বটে। 

মাস্টারের তর্জন গর্জন আর বেতের সাপুর সুপুর শব্দ শুনে ভয়ে কুমোর বাড়ি গিয়ে বসে বিকালে বাড়ি এসেছে। শিক্ষকদের গর্জন তর্জন ও মারের ভয়ে যেসব ছেলে স্কুল থেকে ঝরে পড়েছিল নিয়তালী ছিল তাদের একজন।

তারপর পথেঘাটে খেলাধুলা কাদাজলে মাছ ধরা ও আত্মীয় বাড়ি অনাহুত ঘুরে ঘুরে যৌবনে পৌঁছার আগেই বাবা তার ফরজ কাম করে তাড়াতাড়ি মারা যায়। মা বিদায় নিয়েছিল তো আগেই। তখন চালচুলোহীন সংসারে আসে রহিমন। তারপর রহিমনকে নিয়ে শুরু করে সংসার জীবন। জীবন কি? আর সংসার কী? তারা কিছ্ইু বুঝতো না। বুঝিয়ে দেবার মতো তাদের কেউ ছিল না। সঙ্গী ছিল একমাত্র পেটে ক্ষুধা। ক্ষুধাই তাদেরকে কাজে লাগায়।

এতো দিন দু’জনের খাটাখাটির পর এখন আল্লাহ তাদের দিকে মুখ তুলে চেয়েছেন। তাদের খাটুনি কাজে লেগেছে। কিন্তু চিন্তা কমছে না। বরং ক্রমশই বাড়ছে। চিন্তা বাড়ছে এখন ছেলে দুটো নিয়ে।

নিয়তালী স্কুল-কলেজে না পড়লেও লেখাপড়ার যে কত দাম সেটা ভালো করেই বোঝে। হাড়ে হাড়ে বোঝে। তার সে লেখাপড়া না জানার অপূর্ণ সাধটি ছেলে দুটির মাধ্যমে লাভ করতে চাচ্ছে। ছেলে দুটোর মাধ্যমে সে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভ করতে চাচ্ছে।

মেয়ে নাহিদা খুব ভালো ছাত্রী ছিল। এসএসসি পাস করার আগেই বিয়ে হয়ে গেল। আর লেখাপড়া হলো না ওর। এতো গেন্দা মেয়ে বিয়ে দেবার ইচ্ছে ছিল না তাদের। কিন্তু বসুমিয়া বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসে এমনভাবে ধরলো যে তার কথা এড়াতে পারা গেল না। দিন-রাত সে ঘুরাফিরা করতে লাগলো। একদিন নাহিদার বাবাকে ধরে বললোÑ নাহিদার বাপ, এখন দিনকাল যা পড়েছে ছোট মেয়ে বিয়ে দেয়াই ভালো। ছেলেটা স্কুল পাস করে বাজারে দোকান করছে। বেশ আয় করছে। জমিজিরাতও ভালো আছে। রসূলপুরের আলফাজ হাজীর ছেলে। হাজী সাব যেমন ধনী তেমনি মানি লোক। খাওয়াপরায় কোন কষ্ট হবে না। মেয়েটা খুব আদরে থাকবে। সুখে থাকবে।

বিয়ের আলোচনা অনুষ্ঠানে ইমরান ও কামরান দু’ভাইও ছিল। ইমরান জিজ্ঞেস করলো : আচ্ছা চাচামিয়া, ছেলে কি  নামায পড়ে? কুরআন পড়ে, আপাকে বেনামাজি ছেলের কাছে বিয়ে দেয়া যাবে না। তার জমিজিরাত যত বেশিই থাক না কেন।

নিয়তালীও কথাটা ধরে বসলো।

বসুমিয়া জোর গলায় বলল : আরে বাবজি, আলফাজ হাজীর একমাত্র ছেলে নূরু পাক্কা নামাযী। ওর মাও নামাযী। বাড়িতে পর্দাপসিদা আছে। তোমাদের বাড়িতে যেমন ইসলামী পরিবেশ আছে। সে বাড়িতেও তেমনি পরিবেশ। তোমাদের ভালোর জন্যই বলছি। নাহিদা যেমন শান্ত স্বভাবের মেয়ে, হাজী সাবও এমনি একটি মেয়ে চান। মেয়ের চান।

মেয়ের সুখ-শান্তি কোন বপ-মায় চায় না? ঘটকের কথায় শেষমেষ নিয়তালী মেয়ে বিয়ে দেবার নিয়ত করলো। নাহিদার মাও রাজি হয়ে গেল। বিয়ে হয়ে গেল। এই অগ্রহায়ন মাসে এক বছর পূর্ণ হচ্ছে।

বসুমিয়া মিছা কথা বলেনি। নাহিদা স্বামীর ঘরে খুব আদরে আছে। কাপড়চোপড় তেল-সাবানে কোন জিনিসের কষ্ট নেই। জামাইটার স্বভাব চরিত্র ভালো। শ্বশুর-শাশুড়ি নাহিদাকে তাদের মেয়ে মতো আদর করে। নাহিদা খুব সুখে আছে।

আল্লাহ ওর কপালে ভালোই মিলিয়েছেন। ওর কপাল ভালো।

রহিমন ধান সিদ্ধ করছে আর মেয়ের কথা ভাবছে। উঠোনে ধান শুঁকাতে দিয়ে পা দিয়ে নাড়ছে আর নাহিদার কথা ভাবছে। বাইর বাড়ি খেড় নাড়ছে আর নাহিদার কথা ভাবছে। মাথার উপর দিয়ে কা কা করে কাক উড়ে যায়। রহিমনের মেয়ের কথা আরো বেশি বেশি মনে পড়ে। আহারে কতো দিন হলো মেয়টাকে নাইওর আনা হয়নি!

যে চোখের সামনে নেি তার কথা বেশি মনে পড়ে। তার চেহারা ছবির মতো মনের পটে ভেসে ওঠে। পাঁচটা নয় সাতটা নয়, একমাত্র মেয়ে। যে যতই আদরে থাক না কেন, পরের বাড়ি তো। খেতে বসলে গলায় ভাত ঠেকে যায়। তখন মনে হয় নাহিদা বুঝি তার কথা মনে করছে।... আহা! এক মাস যাবত মেয়েটাকে নাইওর আনা হয়নি। জামাইটাও দোকানে নাকি বেচাকেনায় খুব ব্যস্ত। নাহিদার জন্য তার কলিজা ফেটে কান্না আসছে।

সেদিন রাতে খাওয়া দাওয়ার পর নিয়তালীর হাতে পান দিতে দিতে রহিমন বললো :

আর কয় বিঘা জমির ধান কাটার বাদ আছে?

দুই বিঘা।

কাটতে কয় দিন লাগবে?

দূরের ক্ষেত তো। তিন দিনের কমে হবে না।

নাহিদারে আনলেও না, দেখতেও গেলে না।

আরে পাকা ধান রাইখা কেমনে যামু?

তোমার কাজ তো সারা বছরই।

আমি কি সারাদিন বসে থাকি? চোখে দেখো না?

তোমার দরদ ধানের প্রতি। মেয়ের প্রতি নয়।

রহিমনের গা জ্বালানো কথায় নিয়তালী রাগে ছ্যাৎ করে ওঠে বলে, জামাই মেয়ে আনতে হবে তা কি আমার জানা নেই? মেয়ে কি শুধু তোমার? জামাই মেয়ে আনলে তোমার পিঠা বানাতে হবে। তোমার হাত তো এখন আজাইর না। তুমি কেমনে কি করবে? তাই বলছি, ধান কাটা, মলন ঝাঁড়ি শেস হোক তারপর মেয়ে নাইওর আনমু। জামাই দাওয়াত করমু। তুমি তেলের পিঠা ভাজবে। দুধের পিঠা বানাবে। মোরগ জবাই করমু। রুটি তৈরি করবে। তখন দেখবো তুমি কত খাওয়াতে পারো।

রহিমনের মনটা খানিক খুশি হয়ে যায়। আসলে সেও বুঝে এ সময় মেয়ে আনা সম্ভব নয়। তবু নাহিদার কথাটা একটু আলাপ করলেই মনে শান্তি পাওয়া যায়। রহিমন নিয়তালীর সঙ্গে একটু ঝাল মিষ্টি আলাপ করে সেই সুখটা লাভ করলো।

নিয়তালী বললো, ঘুমাও এখন। ফজরের আযানের আগে ওঠে আমাকে মলন দিতে হবে।

রহিমন ঘুমায়। ঘুমায় আর স্বপ্ন দেখে। মেয়ে নাহিদা এসেছে। সঙ্গে জামাই নুরু এসেছে। ছেলে দুটা ওদের দুলাভাই আর আপার সঙ্গে আলাপ করছেÑ হাসিঠাট্টা করছে। কত কি রহিসকতা করছে। সারা বাড়ি আনন্দ আর হাসিতে থই থই করছে।

রহিমন ঢেঁকিতে চালের গুঁড়া ফুটছে। দুধের পিঠা বানাচ্ছে। তেলের পিঠা বানাচ্ছে। আরও কত কি...।

ছেলেমেয়ে আর জামাইকে খাওয়াচ্ছে।

মেয়ে জামাইর পাতে একটার পর আরেকটা পিঠা দিচ্ছে।

জামাই খাচ্ছে আর বলছে :

আর খেতে পারবো না গো আম্মা। আর দেবেন না। অনেক খেলাম তো। আর দেবেন না।

রহিমন নয়া জামাইর সামনে ঘোমটা টেনে হাসি হাসি মুখে বলছে : এ্যাই আর একটু। এ্যাই সামান্য একটু। এ্যাই টুক নাও বাবা। 

না গো আম্মা।

কী আর খেলে? এ্যাই সামান্য একটু নাও...।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ