মঙ্গলবার ২৪ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

প্রধান আসামী সাইফুর ও অর্জুন গ্রেফতার

সিলেট ব্যুরো : গত শুক্রবার সন্ধ্যা রাতে সিলেটের এমসি কলেজে স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীকে কেড়ে নিয়ে গণধর্ষণের ঘটনায়  মামলার দুই আসামীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গতকাল রোববার সকালে সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার নোয়ারাই এলাকা থেকে ছাত্রলীগ নেতা মামলার প্রধান আসামী সাইফুর রহমানকে গ্রেফতার করে ছাতক থানা পুলিশ এবং মামলার ৪ নং আসামী অর্জুন লস্করকে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার মনতলা সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে গ্রেফতার করে হবিগঞ্জ গোয়েন্দা পুলিশ। এ ছাড়া গত শুক্রবার এমসি কলেজ হোস্টেলে মহিলা ধর্ষণের ঘটনায় গত শনিবার যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে তা প্রশ্নবিদ্ধ।
এদিকে গ্রেফতারকৃত দুই আসামীকে গতকাল রোববার সিলেট নিয়ে আসা হয়েছে এবং বিকেল ৫ টায় রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আসামীরা  পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। এসএমপির শাহপরাণ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল কাইয়ূম চৌধুরী দৈনিক সংগ্রামকে জানান, আসামীদ্বয় এখনও পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। তাদেরকে আদালতে সোপর্দ করা হবে।
এদিকে আমাদের ছাতক সাংবাদদাতা জানান, সিলেট এমসি কলেজে স্বামীকে মারধর করে আটকে রেখে গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় প্রধান আসামী সাইফুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে ছাতক থানা পুলিশ।
গতকাল  রোববার সকালে ছাতক খেয়াঘাটসংলগ্ন এলাকা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় ছাতক থানার এসআই হাবিবুর রহমান পিপিএম-এর নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল তাকে গ্রেপ্তার করে। ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
প্রশ্নবিদ্ধ তদন্ত কমিটি!
গত শুক্রবার সন্ধ্যা রাতে এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে ধর্ষণের ঘটনায় কলেজ কর্তৃপক্ষ যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। এ নিয়ে সিলেটসহ দেশে-বিদেশে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।  অনেকেই কলেজ অধ্যক্ষ ও হোস্টেল সুপারের পদত্যাগ দাবী করছেন। কলেজের ৩ সদস্য বিশিষ্ট কমিটিতে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে ছাত্রাবাসের হোস্টেল সুপার জামাল উদ্দিনকে। মূলত তার আশ্রয়-প্রশ্রয়েই এমসি কলেজের ছাত্রাবাসের কয়েকটি ব্লক দখল করে রাখে ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী। করোনা ভাইরাসের কারনে সারা দেশের ন্যায় এমসি কলেজ ও হোস্টেল বন্ধ ছিল গত মার্চ মাস থেকে। তাহলে কিভাবে ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা বন্ধ হোস্টেলে অবস্থান করে এ প্রশ্ন বার বার ঘুরপাক খাচ্ছে সচেতন সিলেটবাসীর মনে। অথচ এই জামাল আহমদও ৩ সদস্য কমিটির একজন। এদিকে নিরাপত্তা পালনে গাফিলতির অভিযোগে গত শনিবার ছাত্রাবাসের দুই নিরাপত্তা কর্মীকে বরখাস্ত করা হলেও বহাল তবিয়তে রয়েছেন হোস্টেল সুপার জামাল উদ্দিন।
এ বিষয়ে এমসি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর সালেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, কমিটি যাতে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে কাজ করে সেজন্য সবার পরামর্শ অনুযায়ী কলেজের গণিত বিভাগের প্রধান আনোয়ার হোসেন চৌধুরীকে আহ্বায়ক রাখা হয়েছে। আর ছাত্রাবাসের বিস্তারিত বিষয় জানার জন্য হোস্টেল সুপার জামাল উদ্দিনকে রাখা হয়েছে। সেইসঙ্গে গত পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে দায়িত্ব নেয়া আরেক হোস্টেল সুপার কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জীবন কৃষ্ণ ভট্টাচার্যকে সদস্য করে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
যার বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ তাকে কমিটিতে রাখার বিষয়ে অধ্যক্ষ বলেন, এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে যে ঘটনাটি ঘটেছে তা ন্যক্কারজনক। এই ঘটনায় আমরাও হতবাক। হোস্টেল সুপার জামাল উদ্দিনকে কমিটির সদস্য রাখা হয়েছে কারণ তিনি এই ছাত্রাবাসের অনেক পুরাতন হোস্টেল সুপার। তার অনেক বিষয় জানা রয়েছে। অতীতে কী হয়েছে আর বর্তমানে কীভাবে কী ঘটনা ঘটেছে তা জানার জন্য তাকে রাখা হয়েছে। অন্য কোনও কারণ নেই।
দায়িত্ব পালনের অবহেলার অভিযোগে ছাত্রাবাসের দুই নিরাপত্তা কর্মীকে বরখাস্ত করার বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের কাজ হলো ছাত্রাবাসের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয় দেখাশোনা করা। ছাত্রাবাসের ভেতরে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে অথচ তারা এ বিষয়ে কিছুই জানে না। তারা তাদের দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করেছে বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় জরুরি বৈঠকে বসে রাসেল মিয়া ও সবুজ আহমদকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তারা মাস্টার রোলে চাকরি করতেন।
এমসি কলেজের অধ্যক্ষ আরও বলেন, তদন্ত কমিটিকে আগামী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর আরও যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। ছাত্রাবাস থেকে দুই নিরাপত্তা কর্মীকে বরখাস্ত করা হলেও হোস্টেল সুপারের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেয়া হলো না এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সূত্র জানায়, এমসি কলেজ হোস্টেল সুপারের বাংলোতে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে অবস্থান করছেন ধর্ষণ ও অস্ত্র মামলার প্রধান আসামী সাইফুর রহমান। তার দখলে থাকা ওই বাংলো থেকে এসএমপির শাহপরাণ থানা পুলিশ গত শুক্রবার রাতে অভিযান চালিয়ে একটি আগ্নেয়াস্ত্র, চারটি রামদা, একটি ছুরি ও দুটি লোহার পাইপ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় শাহপরাণ থানার এসআই মিল্টন সরকার বাদী হয়ে সাইফুরকে একমাত্র আসামী করে অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের করেন। করোনাভাইরাসের কারণে সরকারের নির্দেশনা অনুসারে এমসি কলেজ বন্ধ থাকলেও ছাত্রাবাস খোলা ছিল। ছাত্রাবাসে শুধু সাইফুর নয় হোস্টেল সুপার জামাল উদ্দিনের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ছাত্রাবাসে থাকতেন অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী। দীর্ঘদিন থেকে ছাত্রাবাসে ছাত্রলীগের কর্মীরা নানা ধরনের উৎপাত করলে হোস্টেল সুপার একেবারেই নীরব ছিলেন।
ধর্ষিতার জবানবন্দী আদালতে রেকর্ড
গত শুক্রবার সিলেট এমসি কলেজে এলাকায় স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে গণধর্ষণের শিকার হওয়া মহিলা আলাদাতে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। গতকাল রোববার দুপুরে সিলেট মহানগর হাকিম ৩য় আদালতের বিজ্ঞ বিচারক শারমিন খানম নিলার কাছে তার জবানববন্দি প্রদান করেন।
এসএমপির সহকারি কমিশনার (প্রসিকিউশন) এ তথ্য নিশ্চিত করে দৈনিক সংগ্রামকে  বলেন, রোববার  দুপুরে পুলিশ নির্যাতিত মহিলাকে সিলেট ওসমানী হাসপাতাল থেকে আদালতে নিয়ে আসে। দেড়টার দিকে তিনি আদালতে ওই রাতের ঘটনার ব্যাপারে বিস্তারিত বর্ণনা দেন। আদালতে তার জবানববন্দি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
শাস্তির দাবি সিলেট মহানগর বিএনপির

সিলেটের এতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে বেঁধে স্ত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়েছেন সিলেট মহানগর বিএনপির নেতৃবৃন্দ।

গত শনিবার রাতে এক বিবৃতিতে সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শামীম সিদ্দিকী এই নিন্দা জানান।
এক বিবৃতিতে সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন বলেন, ৩৬০ আউলিয়ার শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.) এর স্মৃতি বিজড়িত পূণ্যভূমি সিলেটের এই পবিত্র মাটিকে যারা পৈচাশিক ও র্বরোচিত ন্যাক্কার জনক ঘটনা ঘটিয়ে অপবিত্র করেছে তাদেরকে অতি দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, ঐতিহ্যবাহী এই  বিদ্যাপীঠে সরকারি বাহিনীর দ্বারা ব্যাপক ঘৃণ্য অপরাধ সংগঠিত হলেও এখন পর্যন্ত এর কোন সুষ্ঠু বিচার দেশের জনগণ দেখতে পায়নি। তিনি জানান, সরকার সব সময় সুষ্ঠু বিচারের সাফাই করেন, অথচ তাদের দলের কোন নেতাকর্মীকে সাজা প্রদানে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। তিনি অতি দ্রুত এই ঘৃণ্য অপরাধীদেরকে  গ্রেফতার করার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ