ঢাকা, মঙ্গলবার 20 October 2020, ৪ কার্তিক ১৪২৭, ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী
Online Edition

খুলনা বিভাগের ৮০ শতাংশ নদীই অস্তিত্বের সংকটে

 

 

খুলনা অফিস : খুলনা বিভাগের ৮০ শতাংশ নদীই অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। এ বিভাগের নদ-নদীগুলো এখন মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতর। বিখ্যাত এবং ঐতিহ্যবাহী অনেক নদী মরে গেছে। অনেকগুলো মৃতপ্রায়। খুলনা বিভাগের নদীর সংখ্যা ১৮৯টি। বিভাগের নদীগুলোর বেশীরভাগেরই লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। 

খুলনা বিভাগের ছোট-বড় মোট ১৮৯টি নদীর জিও-মরফিফোলজি, ইকোলজি এবং মাছ উৎপাদনের অবস্থা সর্ম্পকে এক গবেষণায় দেখা গেছে, মধ্যে শতভাগ নদীরই গভীরতা কমে গেছে। ১৮০টি নদীর নদীর মাছের প্রজাতি কমে গেছে, ১৬৮টি নদীর মাছ চলাচলের রাস্তা ধ্বংস হয়েছে, ৪২টি নদী মরে গেছে। এই নদীগুলোর ৮০ শতাংশই আগের মত ¯্রােতস্বিনী, বিপুলদেহী, উচ্ছ্বল ও ক্ষিপ্রগামী নেই। জায়গায়-জায়গায় শুকিয়ে ভরাট হয়ে গেছে। অনেকগুলো আবার দেখলে বুঝবার উপায় নেই যে, একসময়ে এখানে কোনো তীব্র ¯্রােতবাহিনী নদী ছিল। আবার কোনো-কোনোটা ধীরে ধীরে মজে পরিণত হয়েছে সরু খালে। অনেকগুলোর গতিপথ পরিবর্তিত বা স্থায়ীভাবে রুদ্ধ হয়ে গেছে। তবে যেসব নদী এখনও জীবিত ও গতিশীল এবং বর্ষাকালে প্রচন্ড বেগবান, বস্তুত সমুদ্র দক্ষিণে বলে তার অধিকাংশই উত্তর থেকে দক্ষিণদিকে প্রবাহিত।

বিভাগের উপকূলীয় জেলা খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা প্রধান প্রধান নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে- শিবসা, রূপসা, বলেশ্বর, পশুর, আড়পাঙ্গাসিয়া, খোলপেটুয়া, আগুনমুখা, ভদ্রা, আঠারোবাকী, আলাইপুর, গাসিয়াখালী, দড়াটানা, ইছামতী, রায়মঙ্গল, নমুদ সমুদ্র, সোনাগাঙ্গ, ভাঙ্গরাকুঙ্গা, মালঞ্চ, সাতক্ষীরা, সুতেরখালী, মারজাতী, হরিণভাঙ্গা, মহাগঙ্গা, গলাঙ্গী, হরিপুর, সোনাই, বুধহাটার গাঙ্গ, ঢাকি, গালঘেমিয়া, উজীরপুর, কাটাখাল, গুচিয়াখালী, বদুরগাছা, ডেলুটি, মনসা, কয়রা, আড়শিবসা, কালিন্দী, মজুদখালি, খাল আকরার, খাল মংলা, সোলাপায়রা, আগুনমুখা, মুহুরী, মোদলা, হাড়িয়াভাঙ্গা, পানগুছি, কচা, পাকাশিয়া, মৈয়ার গাং, কাজিবাছা, কাকশিয়ালি, নারায়ণখালি, মেনস, কদমতলি, বাংরাশীলা, কলাগাছিয়া, বাঁশতলী, সালখী, শাকবাড়িয়া, আলকী, মানিকাদিয়া, চন্দেশ্বর, পানকুশী, বলেশ্বর, বলমার্জার বা মাঞ্জাল, কাগীবাগ, রামপাল, পানখালী, দাঁতখালী, শোলমারী, হামকুড়া, নাইনখালী শালতা, চৌদ্দরশি, মরাসুচিয়া ও মরাভোলা ইত্যাদি।

সূত্র মতে, ‘ব’ দ্বীপ অঞ্চলের এ নদ-নদীগুলো ভৌগোলিক ও ভূতাত্ত্বিক অবস্থানগত কারণে গঙ্গানদী তথা হিমালয়ের পার্বত্য জলপ্রবাহ পায় মাথাভাঙ্গা, গড়াই, ইছামতী ও মধুমতী-বলেশ্বরের মাধ্যমে। কিন্তু এ নদীগুলোর পানি প্রবাহ প্রধানত ফারাক্কা বাঁধের কারণে যে আগের মতো নেই। বরং শাখা ও উপনদীগুলোকে পানি সরবরাহের বদলে এরা নিজেরাই এখন অনেক স্থানে মৃত,  প্রায় মৃত ও ¯্রােতশূন্য অর্থাৎ এককথায় অস্তিত্ব সঙ্কটে উপনীত। সুতরাং এগুলোর মাধ্যমে গঙ্গা নদীর মিষ্টি পানি খুলনা অঞ্চলের নদ-নদীগুলো এখন আর তেমন পায় না।

নদীমাতৃক আমাদের এই দেশ। দেহের রক্ত কণিকার মতই আমাদের অস্তিত্বে মিশে আছে নদী। এ নদনদীর ইতিহাসই আমাদের ইতিহাস। নদীর তীরে তীরে মানুষ্যসৃষ্ট সভ্যতার জয়যাত্রা। মানুষের বসতি, কৃষির পত্তন, গ্রাম, নগর, বাজার, বন্দর, সম্পদ, সমৃদ্ধি, শিল্প-সাহিত্য, ধর্মকর্ম সবকিছুরই বিকাশ। আমাদের শস্যসম্পদ একান্তই এই নদীগুলির দান। চলাচল, পরিবহন, কৃষ্টি, শিল্প-সভ্যতা, আচার, ব্যবহারিক জীবন সবকিছুরই ভিত্তি নদী। নদীর পরিচয় মিলে কিংবদন্তীতে, ধর্মীয় পুরাণে, লোকগাথাঁয়, ব্যবহারিক জীবনের কর্মকান্ডে। বাংলাদেশের নদ-নদীর ইতিহাস এদেশের সামগ্রিক জনগোষ্ঠীরই ইতিহাস।

প্রকৃতি বিজ্ঞানের তত্ত্ব অনুযায়ী, সময়ের সাথে সাথে তার পরিবর্তন, বিশীর্ণতা এবং ক্ষয় অনিবার্য। ভূতাত্ত্বিক এবং ভূ-প্রাকৃতিক কারণে তা’ ঘটে থাকে। সেসব কারণ আমরা রোধ করতে পারব না, কেননা, স্থান এবং কালের ব্যাপ্তির নিরিখে তা’ সর্ববৃহৎ। তাহলে আমরা কি করব? আমরা যেটা করব সেটা হলো- আমাদের আগ্রাসী সভ্যতার পিপাসা মিটাতে নদীগুলার যে বিশীর্ণতা, দূষণ এবং মৃত্যুপথযাত্রা আরম্ভ হয়েছে- যা আমরা দেখেও না দেখার ভান করেছি-বুঝেও না বোঝার ভান করেছি-সেটা রোধ করার চেষ্টা করা। বিনা শর্তে নদীগুলো টিকিয়ে রাখতে এবং বাঁচাতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ