মঙ্গলবার ২৪ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

ভেঙে গেল গণফোরাম

স্টাফ রিপোর্টার : প্রতিষ্ঠার ২৭ বছর পর দুই ভাগে বিভক্ত হলো ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম। সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টুসহ তিন কেন্দ্রীয় নেতার নেতৃত্বে দলটি থেকে বেরিয়ে যাওয়া অংশ আগামী ২৬ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের ঘোষণা দিয়েছে। গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে মন্টুর নেতৃত্বাধীন গণফোরামের বর্ধিত সভায় এ কাউন্সিলের ঘোষণা দেয়া হয়।
গত ২২ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গণফোরামের বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সভাপতি ড. কামাল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, ২৬ সেপ্টেম্বর ডাকা বর্ধিত সভার সঙ্গে গণফোরামের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। সে মোতাবেক গতকালের বর্ধিত সভায় তারা কেউ উপস্থিত ছিলেন না।
এ সভায় গণফোরামের সাবেক নির্বাহী সভাপতি আবু সাইয়িদ বলেন, বর্ধিত সভায় আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি সংগঠনকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী ও গণমুখী করার লক্ষ্যে আগামী ২৬ ডিসেম্বর জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় কাউন্সিলকে সফল করার লক্ষ্যে সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টুকে আহ্বায়ক করে ২০১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে।
আজকের (শনিবার) সভার মধ্য দিয়ে গণফোরাম নামে আরেকটি দল গঠন করতে যাচ্ছেন কি-না, এমন প্রশ্নের জবাবে মোস্তফা মহসিন মন্টু বলেন, ২৬ ডিসেম্বরের কাউন্সিলে উপস্থিত ডেলিগেটদের মতামত নিয়ে নতুন দলের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত হবে।
ড. কামাল হোসেনের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত, তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে কি-না, জানতে চাইলে মন্টু বলেন, আমরা এখনো বিশ্বাস করি ড. কামাল হোসেন আমাদের সঙ্গে আসবেন। বিতর্কিত লোকদের পরিহার করবেন। মাঠের পোড় খাওয়া লোকদের নিয়ে এগিয়ে যাবেন। তিনি না এলে তার বহিষ্কারের বিষয়ে আমাদের সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেব। সম্মেলনে কাউন্সিলর ও ডেলিগেটরা আসবেন, তাদের মতামত নিয়ে এ বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নেব।
গণফোরাম তো বিএনপির নেতৃত্বধীন ঐক্যফ্রন্টে আছে, আপনারা তাহলে ঐক্যফ্রন্ট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন কি-না, জানতে চাইলে মন্টু বলেন, ঐক্যফ্রন্টের বিষয়ে আমরা এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নেব না। সামনে আমাদের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সভা আছে, সেখানে সিদ্ধান্ত নেব।
ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে জোট করে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে মন্টু বলেন, আমি একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেব না বলেছিলাম কামাল হোসেনকে। কিন্তু তিনি যেহেতু দলের সভাপতি ছিলেন, সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তার নির্দেশে আমি নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। কারণ আমি তার আদেশ অমান্য করতে পারি না সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। সেই নির্বাচন কীভাবে আগের রাতে হয়ে গেছে আপনারা সবাই জানেন। অর্থবহ পরিবর্তনের লক্ষ্যে গণফোরাম জাতীয় ঐক্য চায় বলেও মন্তব্য করেন মন্টু।
বর্ধিত সভায় গণফোরামের কতো জেলার প্রতিনিধি আছেন, জানতে চাইলে দলটির সাবেক নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, আমাদের সঙ্গে গণফোরামের ৫২ জেলার ২৮৩ জন প্রতিনিধি উপস্থিত আছেন।
পরে দলের সদস্য জগলুল হায়দার আফ্রিক বর্ধিত সভার সাংগঠিক সিদ্ধান্ত পড়ে শুনান। সর্বসম্মত এই সিদ্ধান্তের মধ্যে আছে, সংগঠনের শৃঙ্খলা ও গণতন্ত্র অমান্য করে দলের ঐক্য ও স্বার্থ বিরোধী কর্মকান্ডের জন্য সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মহসীন রশিদ, আওম শফিকউল্লাহ ও মোশতাক আহমেদকে ইতিপূর্বে কেনো সংগঠন থেকে বহিস্কার করা হবে না এই মর্মে কারণ দশানো নোটিশ দেয়া হলে তার কোনো জবাব না দেয়ায় বর্ধিত সভা এই চারজনকে সংশ্লিষ্ট পদসহ সাধারণ সদস্য পদ থেকে বহিষ্কার করেছে।
২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে গণফোরামের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিল হয় গুলিস্তানের মহানগর নাট্যমঞ্চে। তিন বছর পর পর জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার বিধান থাকলেও একাংশে এক বছরের মাথায় আবার কাউন্সিল আহবান করলো। জাতীয় প্রেস ক্লাবের তৃতীয় তলায় আবদুস সালাম হলে টানানো ব্যানারে লেখা ছিলো ‘অর্থবহ পরিবর্তনের লক্ষ্যে চাই জাতীয় ঐক্য : বর্ধিত সভা: গণফোরাম’।
বর্ধিত সভার মূল মঞ্চে সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু, সাবেক নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, কেন্দ্রীয় নেতা জগলুল হায়দার আফ্রিক, আসাদুজ্জামান, খান সিদ্দিকুর রহমান, আবদুর রায়হান, মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর, ফজলুল হক সরকার, এম এ মতিন প্রমূখ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বর্ধিত সভার ঘোষণাপত্রে ৭ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। এগুলোর মধ্যে আছে- মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠায় জাতীয় ঐক্যমত গড়ে তোলা, নির্বাচন কমিশনের বিধিমালা সংশোধন ও কার্যকরীভাবে প্রয়োগ করা, দুর্ণীতিবাজ, ঋণখেলাপী ও অর্থ পাঁচারকারীদের দ্রুত শাস্তির বিধান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিরাজমান সর্বনাশা দলীয়করণ উচ্ছেদ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আইনের দ্বারা জনস্বার্থে পরিচালনা প্রভৃতি।
সাবেক নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। গণফোরামকে শক্তিশালী করে গড়ে তুলি, গণজাগরণ সৃষ্টি করে স্বৈরাচার, দুঃশাসন, দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি মুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলি।
ড. কামাল হোসেন আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) থেকে বেরিয়ে আসা সাইফ উদ্দিন আহমেদ মানিককে সঙ্গে নিয়ে গণফোরাম গঠন করেন। গত বছরের ৪ এপ্রিল পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলের পরে ঘোষিত কমিটিতে মন্টুকে বাদ দিয়ে রেজা কিবরিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করার পর থেকে গণফোরামে বিরোধ প্রকাশ্যে রূপ নেয়। কেন্দ্রীয় কমিটির সভা আহবান নিয়ে পাল্টা পাল্টি অবস্থানে দাঁড়ায় দুই গ্রুপ। রেজা কিবরিয়ার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলে অন্য পক্ষের নেতারা। এক পর্যায়ে রেজা কিবরিয়া চারজনকে বহিষ্কার করেন। তারা হলেন- কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল হাসিব চৌধুরী, খান সিদ্দিকুর রহমান, হেলাল উদ্দিন ও লতিফুর বারী হামিম। সুব্রত চৌধুরীরাও পাল্টা বহিষ্কার করেন সাধারণ সম্পাদক রেজা কিবরিয়া, কেন্দ্রীয় কমিটির মহসীন রশিদ, আ ও ম শফিকউল্লাহ ও মোশতাক আহমেদকে।
পাল্টাপাল্টি বহিস্কারের মধ্যে গত ৪ মার্চ গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দিয়ে দুই সদস্যের আহবায়ক কমিটি গঠন করেন। তিনি নিজে আহবায়ক হয়ে সাধারণ সম্পাদক করেন রেজা কিবরিয়াকে।
ড. কামাল হোসেনের ‘কিছুটা স্মৃতি বিভ্রাট’ ঘটছে বলে মন্তব্য করেছেন মোস্তফা মহসিন মন্টু। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সাবেক সাধারণ সম্পাদক এরকম মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমরা উনাকে (কামাল হোসেন) বারে বারে বলেছি, সাক্ষাত করে বলেছি কেন্দ্রীয় কমিটির মিটিং ডাকেন, কেন্দ্রীয় কমিটি মিটিং ডেকে সম্মেলনের তারিখটা নির্ধারণ করেন। আমরা চিঠি দিয়েও বলেছি। আমরা কয়েকদিন আগে যে গেয়েছি, উনি বলেছেন যে, বসেন। তারপরে বলেন যে, না এরকম কোনো কথা আমি বলিনি। আমরা যেটা মনে হয়- হয়ত উনি কিছু জিনিস ভুলে যান। যেমন আমাদের সাংবাদিক বন্ধুরা অনেকে গেছেন তারা অনেকে বলেছেন হয়ত স্যার কিছু কথা বলতে বলতে পরে খেই হারিয়ে ফেলেন। আমার মনে হয়- একটু স্মৃতি বিভ্রাট ঘটছে আর কি। তাছাড়া ওদের একটা অশুভ প্রভাব আছে যে প্রভাবে উনি অনেক কিছু গুলিয়ে ফেলেন।
ড. কামালের প্রতিক্রিয়া: ওদের বর্ধিত সভা ডাকার কোনো বৈধ্যতা নেই বলে মন্তব্য করেছেন গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন। গণফোরামের ব্যানারে জাতীয় প্রেস ক্লাবের আবদুস সালাম হলে একাংশের বর্ধিত সভা ও আগামী ২৬ ডিসেম্বর জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠানে বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে গণফোরামের সভাপতি গণমাধ্যমের কাছে এই মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, ওদের কোনো সাংগঠনিক ক্ষমতা এবং বৈধতা নেই এই ধরনের মিটিং করার। এই মিটিংয়ের সাথে আমাদের দল গণফোরামের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটি আমাদের দলের কোনো সিদ্ধান্ত না। যেহেতু এটি আমাদের দলের বিষয় না সেজন্য এই বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।
একাংশের আহুত বর্ধিত সভায় বলা হয়েছে আপনাকে কিছু লোক ভুল বুঝাচ্ছেন- এই রকম প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল হোসেন বলেন, এসব কথা তারা বলার জন্য বলছে। এটা তাদের একটা কায়দা-কৌশল। এসব বিষয় আমি কথা বলতে চাই না। এদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নাই। তারাই দলে বিশৃংখলা সৃষ্টি করছে।
গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, এই যে মিটিংটা হলো এটা গণফোরামের মিটিং না। তারা গণফোরাম থেকে চলে গিয়ে সভা করতে পারেন কিন্তু গণফোরামকে ক্ষতি করে যাচ্ছেন। এটা খুবই দুঃখজনক। তারা নিজেদেরকে গণফোরাম থেকে সরিয়ে নিয়েছেন এই অগঠনতান্ত্রিক কাজটি করার মধ্য দিয়ে। তিনি বলেন, সাধারণ সম্পাদক ছাড়া কেউ সভা ডাকতে পারেন না। তারা এরকম সভা করে গর্হিত কাজ করেছেন। এই সভার সাথে গণফোরামের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। ২৬ তারিখে মিটিংটা করে তারা নিজেদেরকে গণফোরাম থেকে সরিয়ে নিয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ