মঙ্গলবার ২৪ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

ব্যাংকগুলোকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপকে ইতিবাচক দেখছেন সংশ্লিষ্টরা

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান: ব্যাংকগুলোকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে সুবিধা দিয়েছে তা ইতিবাচক হিসাবে দেখছেন বিনিয়োগকারীরা। ব্যাংকগুলোকে  পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করার সুযোগ দিতে রেপোর (পুনঃক্রয় চুক্তি) সুদহার ২৫ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে আনা হয়েছে। এক সার্কুলারে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, রেপোর সুদ হার হবে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ, যা আগে ৫ শতাংশ ছিল। এদিকে শেয়ারবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে সক্রিয় রয়েছে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বাজারে কারসাজির অভিযোগে জরিমানা ও অগ্রিম তথ্য দেওয়া থেকে বিরত রাখতে কঠোর তদারকি চালাচ্ছে সংস্থাটি।
চলতি বছরের শুরুতে পুঁজিবাজার চাঙ্গা করতে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার আওতায় ব্যাংকগুলোকে বিশেষ তারল্য সুবিধা ও নীতিসহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেয় সরকার। কিন্তু তাতেও বাজার স্থিতি রাখা সম্ভব না হওয়ায় ফেব্রুয়ারী মাসে যে কোনো ব্যাংক তার নির্ধারিত সীমার বাইরেও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য ২০০ কোটি টাকার ‘বিশেষ তহবিল’ গঠন করতে পারবে বলে ঘোষণা আসে। ঘোষণায় বলা হয়, ব্যাংকগুলো নিজস্ব অর্থে এই তহবিল গঠন করতে পারবে। তা না পারলে ট্রেজারি বিল/ট্রেজারি বন্ড রেপোর মাধ্যমে তারা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তহবিল গঠন করতে পারবে। ইচ্ছে করলে প্রথমে নিজেদের অর্থে তহবিল গঠন করে পরবর্তীতেও ট্রেজারি বিল/ট্রেজারি বন্ড রেপোর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ওই পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ ফেব্রুয়ারি এই তহবিল গঠনের বিষয়ে একটি নীতিমালা জারি করে বলে, এ সুবিধা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। সরকারের এ ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন বাজার বিশ্লেষকরা। দীর্ঘদিন ধরে ধুঁকতে থাকা পুঁজিবাজার এখন ঘুরে দাঁড়াবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তারা।
জানা গেছে, দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার আওতায় ব্যাংকগুলোকে নির্ধারিত সীমার বাইরেও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য ২০০ কোটি টাকার ‘বিশেষ তহবিল’ গঠনের সুযোগ দিয়েছিল সরকার। আর এ জন্য ব্যাংকগুলোর টাকার প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রেপোর মাধ্যমে ঋণ নিয়ে তহবিল গঠন করতে বলা হয়েছিল। ব্যাংকগুলো যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার করে, তখন তার সুদহার ঠিক হয় রেপোর মাধ্যমে। অর্থাৎ, ব্যাংকগুলো এখন পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য তহবিল তৈরি করতে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদে ঋণ পাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে।
এ সুবিধা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বলবৎ থাকবে জানিয়ে নীতিমালায় বলা হয়েছিল, প্রতিটি তফসিলি ব্যাংক, তফসিলি ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান (মার্চেন্ট ব্যাংক ও ডিলার লাইসেন্সধারী ব্রোকারেজ হাউজ) এবং অন্যান্য মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজ (ডিলার) ‘শুধুমাত্র পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের’ জন্য সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকার এই তহবিল গঠন করতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ সার্কুলারে বলা হয়েছে, বর্তমান মুদ্রা বাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে রেপোর সুদহার ৫ শতাংশের জায়গায় ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তে পুঁজিবাজারে আরও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সাবেক সভাপতি আহমেদ রশীদ লালী জানান, পুঁজিবাজারকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে গত ফেব্রুয়ারিতে একটা ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। যার কিছুটা প্রভাবও পড়েছিল বাজারে। যে ব্যাংকগুলোর তহবিলের সমস্যা ছিল, এখন রেপো সুদহার কমানোয় তারাও এগিয়ে আসবে। বাজার এমনিতেই এখন ভালোর দিকে যাচ্ছে। নতুন এই সিদ্ধান্ত আরও ইতিবাচক হবে।
ব্যাংকগুলোকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে সুবিধা দিয়েছে তা ইতিবাচক হিসাবে দেখছেন বিনিয়োগকারীরা। তারা বলছেন, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক যে সুবিধা দিয়েছে তা বাজারে স্থিতিশীলতা আনায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আল-আমিন নামের এক বিনিয়োগকারী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটি এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন শেয়ারবাজারের উন্নয়নে বেশ কিছু ভালো পদক্ষেপ নিয়েছে। যার কারণে বিনিয়োগকারীরা এখন বাজার মুখী হয়েছে। ফলে বাজার এখন ক্রমান্বয়ে ভালোর দিকে যাচ্ছে।
ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো রেগুলেটরি মূলধনের ২৫ শতাংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারে। ব্যাংকের এ বিনিয়োগসীমার মধ্যে ব্যাংকের ধারণ করা সব ধরনের শেয়ার, ডিবেঞ্চার, করপোরেট বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিট ও অন্যান্য পুঁজিবাজার নির্দেশনাপত্রের বাজারমূল্য ধরে মোট বিনিয়োগ হিসাব করা হয়। ২০০ কোটি টাকার যে ‘বিশেষ তহবিল’ গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল- তা এই বিনিয়োগ সীমার বাইরে থাকবে বলে নীতিমালায় বলা আছে।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সভাপতি সাইদুর রহমান বলেন, এটা পুঁজিবাজারের জন্য একটি ভাল উদ্যোগ। ৬০টি ব্যাংক যদি ২০০ কোটি টাকা করে দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে, বেশ ভালো একটা টাকা বাজারে আসবে। এতে বাজারে তারল্য সংকট কমে যাবে।
এদিকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) শেয়ার কারসাজির বিরুদ্ধে বাজারে সক্রিয় অবস্থানে রয়েছে। রিউমার ছড়িয়ে যেন কেউ ফায়দা লুটতে না পারে সে ব্যাপরেও সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর কারসাজি করে শেয়ারের দাম বাড়ানোর অভিযোগে এক ব্যক্তিকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেছে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বিএসইসির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ড. এ কে এম কবির আহমেদ নামের ওই ব্যক্তিকে জরিমানা করার পাশাপাশি একটি ব্রোকারেজ হাউজ এবং দুই ব্যক্তি ও দুই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করা হয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) তদন্ত করে শেয়ার কারসাজির বিষয়টি উদঘাটন করে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত লিগেসি ফুটওয়্যার লিমিটেড, কুইন্স সাউথ টেক্সটাল মিলস লিমিটেড এবং বাংলাদেশ অটোকারস লিমিটেডের শেয়ার লেনদেনে অনিয়মের তদন্ত করতে গিয়ে ডিএসই দেখতে পায় কবির আহমেদ এর সঙ্গে জড়িত। আর এ কাজে তাকে ‘সহযোগিতা’ করেছে ব্রোকারেজ হাউজ এম সিকিউরিটিজ, আব্দুল কাইয়ুম ও মিসেস লুত্ফুন নেসা নামের দুই ব্যক্তি এবং আলিফ টেক্সটাইল লিমিটেড এবং মেসার্স কাইয়ুম অ্যান্ড সন্স নামের দুটি কোম্পানি। তাদের মধ্যে কবির আহমেদকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করে বাকিদের সতর্ক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিএসইসি।
এদিকে পুঁজিবাজারের সূচকের গতিবিধি নিয়ে ফেইসবুকে আগাম মন্তব্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছে চিঠি দিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম এই তথ্য জানিয়েছেন। শেয়ারের দাম নিয়ে কারসাজির ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের অভিযোগ অনেক দিনের। এ ধরনের ক্ষেত্রে অতীতে মামলা হয়েছে, বিচারে শাস্তিও হয়েছে; কিন্তু বন্ধ হয়নি। দুর্বল মৌলভিত্তির ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ কোম্পানির শেয়ার নিয়ে এভাবে গুজব ছড়ানো হলে এবং তাতে বিনিয়োগ করলে পরে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফেইসবুকে পেইজ খুলে নির্দিষ্ট কোম্পানির শেয়ারের বিষয়ে প্রচার চালানোর পাশাপাশি এসএমএস, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, মেসেঞ্জার গ্রুপসহ বিভিন্নভাবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে শেয়ারের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়।
বিএসইসি জানায়, কারসাজির তথ্য প্রমাণ এলে আইন অনুযায়ী ১ লাখ টাকা থেকে যে কোনো অঙ্কের জরিমানা হতে পারে বিএইসি। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলাও করতে পারে। বিএসইসির পক্ষ থেকে একটি গ্রুপের ব্যাপরে জানিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। একাজগুলো যারা করে যাচ্ছে বিএসইসি তাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ